বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্যাম্পিং ও ট্রেকিং করে হাজারিখিল

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে সীতাকুণ্ডের পাহাড়গুলোর পাশ দিয়ে যতবারই যাই, ততবারই মনে হয় পাহাড়গুলো যেন আমায় ডাকছে। সময় সুযোগের অভাবে যাওয়া হচ্ছিল না। বিগত চার বছর অনেকবার পরিকল্পনা করে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সুযোগটা আসলো অপ্রত্যাশিতভাবেই। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানে প্রকৃতি পর্যটন কী হতে পারে সেটা যাচাই করার জন্য অফিস আমাকে পাঠালো সেখানে। আমার সাথে দুজন বিশেষজ্ঞ, মহিউদ্দিন মাহী ও সালেহীন আরশাদি। নির্ধারিত দিনে আমরা রওনা দিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।
দুই দফায় জ্যামে পড়ে বেলা আড়াইটার সময় এসে পৌঁছালাম খৈয়াছড়া ঝর্ণায়। সেখানে ‍অপেক্ষা করছে আমাদের সাইট টিম। তাদের সাথে কথাবার্তা শেষ করে দ্রুত খৈয়াছড়া দেখে চলে গেলাম সহস্রধারা ঝর্ণায়। বিধাতার অনন্য উপহার এই জাতীয় উদ্যানটি। প্রায় ৩,০০০ হেক্টরের এ বনাঞ্চলের পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে ছোট বড় শতাধিক ঝর্ণা। এ বছর বর্ষা শুরু হয়েছে আগেই। তাই প্রাণচঞ্চল ঝর্ণাগুলো। সহস্রধারা থেকে সন্ধ্যার দিকে আসলাম ক্যাম্প সাইট বাওয়া ছড়ায়। বৃষ্টি আসে আসে ভাব, আকাশে ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছে। তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে রওনা দিলাম ক্যাম্প সাইটে। বাওয়া ছড়া লেক প্রায় ৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে, লেকের প্রান্তে রয়েছে বাঁধ ও স্লুইস গেইট। বাঁধের উপরই আমরা ক্যাম্প করব আজকে।

সকালের ক্যাম্পসাইট, আগের রাতের ঝড়ের চিহ্ণও নেই ছবি লেখক

বৃষ্টি আসার আগেই তাড়াহুড়ো করে তাঁবু স্থাপনের কাজ শুরু হলো। ব্যাকপ্যাক থেকে ইতোমধ্যে তাঁবু বের করে এর পোলগুলো জোড়া লাগাচ্ছিল সালেহীন। তাকে সাহায্য করছে মাহি আর আমার হাতে লাইট। কয়েক মিনিটেই কাজ শেষ। বৃষ্টি আসি আসি করে পুরোপুরি উধাও। তাই আমরা নিশ্চিন্ত মনে খাবারের সন্ধানে রওনা দিলাম ২ কিমি দূরের কমলদহ বাজারের দিকে। তবে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য সঙ্গে নিলাম ওয়াটারপ্রুফ ওশেন ব্যাগ। কমলদহ বাজারের যে হোটেলে খেতে গেলাম তার নাম “ড্রাইভার হোটেল”। বেশ জমজমাট, ভেতরে প্রায় ৫০ জনের মতো খাওয়া দাওয়া করছেন।
আমরা অর্ডার করলাম গরুর মাংস ভুনা। গরম ভাত আর কালো করে ভুনা করা মাংস খেয়ে গেলাম পরের দিনের বাজার সদাই করতে। বাজার মানে পাউরুটি, কলা, বিস্কিট আর কয়েক লিটার পানি। সেগুলো নিয়ে যখন ফিরতে শুরু করলাম ক্যাম্প সাইটের দিকে ঠাণ্ডা বাতাসে গা জুড়িয়ে যাচ্ছিল। এর অর্থ কিন্তু ভালো না, মানে দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। দেখতে দেখতে বেড়ে গেল বাতাসের বেগ আর বিদ্যুৎ চমকানি। সঙ্গে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। এর মধ্যেই ডাফল ব্যাগের মধ্যে মানিব্যাগ মোবাইল ঢোকানো হয়ে গেছে, এ দিক থেকে নিশ্চিন্ত। একমাত্র চিন্তা ক্যাম্পের কী অবস্থা সেটা নিয়ে।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আর ঝড়ো বাতাসের মধ্যে ক্যাম্প সাইটে পৌঁছে দেখি, তাঁবু হেলে পড়েছে একদিকে, পুরোপুরি পিনগুলো খুলতে পারিনি, তাই উড়ে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। তিনজন মিলে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়লাম ক্যাম্প ঠিক করার কাজে। না হলে আজ রাতে আশ্রয় আর মিলবে না। ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে একসময় শেষ হলো কাজ, শক্ত করে আবার দাড় করানো গেল তাঁবুটাকে। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে আমরা স্লুইস গেটের নিচে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই নেই। ঘণ্টাখানেক পর বৃষ্টি একটু কমলে তিনজন দৌড় দিয়ে ঢুকলাম তাঁবুতে। সালেহীন আগে ঢুকে বৃষ্টিতে ভেজা তাঁবুর মেঝের পানি মুছে ফেলল, সেই সাথে বিছিয়ে দেল ম্যাট্রেস। বাকি দুজন হুড়হুড় করে ঢুকে গেলাম তাঁবুতে। বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেছে আবার, সেই সাথে আছে বিদ্যুৎ চমকানো।
তাঁবুর ভিতরেই ভেজা জামা কাপড় খুলে শুকনো কাপড় বের করে পরে ফেললাম। এতক্ষণে আশ্রয়স্থলে মোটামুটি নিরাপদ অবস্থানে আছি। সমস্যা কিন্তু তখনই শেষ হলো না, ভেজা ফ্লোরে বিছানো ম্যাট্রেস শুধু অর্ধেকটা জায়গা জুড়ে আছে। বুদ্ধি বের করলো মাহি। আমার ব্যাগ থেকে হ্যামক বের করে সেটাই বিছিয়ে দিল, ব্যাস হয়ে গেল খটখটে শুকনো ফ্লোর। এবার আরেকটা হ্যামক আমাকে দিয়ে বললো রাতে এটাই গায়ে দিতে হবে। এতক্ষণে আমার মনে পড়ল স্লিপিং ব্যাগ আনিনি। রাতে আজকে রীতিমতো ঠাণ্ডা পড়ছে। প্রায় তিন ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অবস্থা দফারফা। অবশিষ্ট হ্যামকই রাতের সম্বল। সারারাত ঝড় বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকানোর সঙ্গে ঘন ঘন বজ্রপাত, এর মধ্যে তিনজন ঘুমাচ্ছি তাঁবুতে।

পাহাড়ের উপর দিয়ে শুরু হয়েছিল পথ চলা ছবি লেখক

সকালে ঘুম ভেঙে তাঁবুর বাইরে বের হয়ে দেখি স্বর্গীয় সকাল। মিষ্টি রোদ উঠেছে, ঝিরি ঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস। বৃষ্টির চিহ্নও প্রায় মুছে গেছে। এমন জায়গা ছেড়ে আর উঠতেই মন চাচ্ছে না। কিন্তু উপায় নেই সামনে অপেক্ষা করছে ১৪ কিমি ট্রেইল। আগের রাতের বৃষ্টির পর ট্রেইলের ঝিরিপথের অবস্থা কী রকম হবে বোঝা মুশকিল। তাই তাড়াতাড়ি নাস্তা করে বের হয়ে পড়লাম। আমাদেরকে পথ দেখাচ্ছেন স্থানীয় বন পাহারা দলের সদস্য টিপু ভাই। ছোটখাটো শক্ত-সামর্থ্য লোক তিনি। বাওয়া ছড়া থেকে কিছুক্ষণ হেঁটে একটা ছোট ঝিরি পার হয়ে উঠে পড়লাম একটা পাহাড়ে। শুরু হলো পাহাড়ের উপর দিয়ে পথ চলা।
উপর থেকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্র আর নিচের লোকালয়। যতই আগাচ্ছি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে লোকালয়ের শব্দ, একসময় শুধু পাখির ডাক, ঝিঁঝি পোকার একটানা সংগীত আর বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই। ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে হাঁটছি, কিন্তু এখনও কোনো মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি পথে। এ যেন অন্য এক পৃথিবী। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সরু একটা প্যাসেজে এসে থামলাম আমরা। কিছুক্ষণের যাত্রা বিরতি, এত সুন্দর বাতাস, না থামলে অন্যায় হতো। এবার নামতে হবে ঝিরি পথে।

যেখানে মন বার বার হারাতে চায় ছবি মাহি

ঝিরি পথে হাঁটাটা সাধারণত আমি খুব উপভোগ করি। কিন্তু আজকের ঝিরিপথ যেন অচেনা, আগের রাতের তুমুল বৃষ্টিতে পানি পুরোপুরি ঘোলা, ডুবে থাকা কোনো পাথর দেখা যাচ্ছে না। দলের মধ্যে আমার ট্রেকিং অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে কম। মাহি ও সালেহীন দুজনেই প্রতিষ্ঠিত ট্রেকার, রীতিমতো এ জগতের তারকা। অপরদিকে গত ১০ বছরে দেশের আনাচে কানাচে অনেক ট্রেকিং করলেও আমার দেশের বাইরে ট্রেকিং করা হয়নি। তবে এ পথের জন্য বিশেষজ্ঞ ট্রেকারের প্রয়োজন নেই, শুধু বৃষ্টির কারণে পথ দেখা না যাওয়াতেই মূল কষ্টটা হচ্ছিল। এর সাথে যোগ দিল জোঁক! সামান্য পানি বা ঘাসে ঘেরা জায়গা পার হলেই এক সাথে ১৫/২০টা করে জোঁক উঠে বসছে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, সাথে সাথে নির্দয়ভাবে শুষে নিচ্ছে রক্ত।
ছুরি দিয়ে জোঁক শরীর থেকে ফেলতে ফেলতে আমাদের গতি আরও কমে। আগের ট্রেইলে প্রতি ঘণ্টায় পার হচ্ছিলাম ৩ কিমির বেশি, এখানে ঝিরি পথের মধ্যে সময় প্রতি কিমি পার হতে সময় লাগছে ৩০-৪০ মিনিট। এর মধ্যে মাহির চিৎকারে সামনে তাকিয়ে দেখি প্রায় দেড় ফুট লম্বা একটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে কী একটা প্রাণী যাচ্ছে, একটু ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম এটা আসলে একটা বাইন মাছ। এত বড় হওয়াতে প্রথমে সাপ মনে হয়েছিল, ইতিমধ্যে মাছটি অপেক্ষাকৃত গভীর পানিতে চলে যাওয়ায় আর ধরার সুযোগ থাকলো না। ছোট ঝিরি পথটা একসময় শেষ হয়ে বড় ঝিরিতে পড়ল, এই পথই আমাদের নিয়ে যাবে হাজারিখিল অভয়ারণ্যে। ইতোমধ্যে ডজন খানেক আছাড় খাওয়াও হয়ে গেছে।

বনের মধ্য দিয়ে পথ ছবি লেখক

বড় ঝিরিতে নেমে আসার পর সমস্যা কমলো না। কারণ পানি বেশি থাকাতে অনেক জায়গায় কোমর সমান পানি দিয়েও যেতে হচ্ছে। জিপিএসে দেখাচ্ছে বনের শেষ প্রান্তে আছি আমরা, কিন্তু পথ আর শেষ হয় না। এর মধ্যে হঠাৎ গাইড টিপু ভাইয়ের ইংগিতে সবাই চুপচাপ হয়ে গেলাম। কাছের একটা গাছ থেকে একদল বানরের দল তো আমাদেরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিছুক্ষণ পর দলের অন্য সদস্যের সাথে বানরগুলো স্থান ত্যাগ করল। একটু পরে আবার বানরের দল, এবার দলনেতা ঝিরি পার হচ্ছে। আমরা অপেক্ষা করছি একটু দূরে। প্রথমে মুরব্বী বানর পার হয়ে গিয়ে বাকিদের আসার ইঙ্গিত দিল, বেশ কয়েকটা বানর একসাথে পার হয়ে গেল। সবাই পার হয়ে গেছে ভেবে আমরা আবার শুরু করি পথচলা।
ভুল ভাঙল একটু পরেই, হঠাৎ করে একটা বানর গাছের উপর থেকে ঝাপ দিয়ে ঝিরিতে পড়লো, পরমুহূর্তেই উধাও, তারপর দেখলাম ওপারে আমাদের কারণেই মনে হয় আটকা পড়েছে আর ৮/১০ টা বানরের বাচ্চা। তাদেরকে বিরক্ত না করে হাঁটা ধরলাম, একসময় উঠে আসলাম ঝিরিপথ থেকে। কিন্তু বিধি বাম, আমাদের গাইড পথ সামান্য ভুল করেছে, গন্তব্য থেকে আমরা এখনও ২ কিমির বেশি দূরে। আবার ঝিরিতে নেমে বনের পথ ধরে একসময় হাজারিখিল অভয়ারণ্যে পৌঁছালাম। ৬ ঘণ্টারও বেশি সময়ে ১৪ কিমি ট্রেকিংয়ের এখানেই সমাপ্তি। রক্তাক্ত পা (জোঁকে ধরা জায়গাগুলো থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে তখনও কিছু রক্ত পড়ছিল), খালি পেট আর অসাধারণ ট্রেইলে ট্রেকিংয়ের আনন্দ নিয়ে ভ্রমণ এখানেই শেষ হলো।

শেষ হতে চলেছে পথচলা ছবি মাহি

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠে মিরসরাইয়ের কাছে কমলদহ বাজারে নেমে পূর্ব দিকে ২ কিমি হাঁটলে বাওয়াছড়া পাওয়া যাবে, ক্যাম্পিংয়ের অনুমতি নিতে হবে বাওয়া ছড়া পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে। ক্যাম্পের পাশেই বাথরুমের ব্যবস্থা আছে। বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে হাজারিখিল যাওয়ার জন্য বাওয়া ছড়া থেকে গাইড নিতে হবে।
ফিচার ছবি- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: ঈদের ছুটিতে মেঘালয় ও শিলং ভ্রমণ

বাংলাদেশের অন্যতম বই বিপণি কেন্দ্র পাঠক সমাবেশ