মারায়ন তংয়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং এবং গ্যালাক্সি দর্শন

আলীর গুহা দেখে ফেরার পরই দুপুরের খাওয়া হয়। এরপর থেকে বেশ ক্লান্ত লাগছিল। কিন্তু ক্লান্ত হলে চলবে কেন? এখনও তো অনেক পথ যেতে হবে। এরই মধ্যে আলীকদম বাজার থেকে আবাসিক নামক একটা জায়গায় এসে চাঁদের গাড়ি নামিয়ে দিল। এখান থেকে মূলত ট্রেকিং শুরু।

ক্যাম্পিংয়ের জন্য হাঁড়িপাতিল, তাঁবু, পানি, চাল, ডাল, তেল-নুনসহ সব কিছু সাথে করে নেওয়া হয়েছে। চাঁদের গাড়ি থেকে সব নামিয়ে নিজেদের মধ্যে সব ভাগযোগ করে নিয়ে হাঁটা শুরু করি।

ট্রেকিং শুরু; ছবি- বিপু বিধান

ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে আমরা ট্রেকিং করে উপরের দিকে উঠছি। অল্প কিছুদূর যেতেই পা ধরে আসে। অনেকদিন পর লম্বা পথ হাঁটলে যা হয় আর কি! তার উপর সাথে আছে ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম। পাহাড়ে হাঁটলে ব্যাগের ওজন এমনই কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ক্যাম্পিংয়ের রসদের জন্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। দুই মিনিট ট্রেকিং করলে পাঁচ মিনিট হাত পা ছড়িয়ে জিরিয়ে নেই।

পাহাড়ের কষ্টকর পথটুকু পাড়ি দিতেই দেখা মেলে এক পাড়ার। পাড়া পরিষ্কার এবং বেশ সুন্দর। ঘরগুলো কাঠের মাচাংয়ের তৈরি। মাটি থেকে বেশ উঁচু। এভাবে আরও কিছু দূর এগোতে দেখা পাই মারায়ন তং পাড়ার। এ পাহাড়ে রয়েছে বিভিন্ন আদিবাসীর বসবাস। ত্রিপুরা, মারমা এবং মুরং উল্লেখ্য। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মুরংদের বসবাস। আর পাহাড়ের নিচের দিকে থাকে মারমারা। এই সকল আদিবাসীরা তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য পাহাড়ের উপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তামাক চাষ হয়।

পথিমধ্যে বিশ্রাম; ছবি- বিপু বিধান

যত উপরের দিকে উঠছি চারদিকের সবুজ প্রকৃতি তার সৌন্দর্য অবারিত করে দিচ্ছে আমাদের জন্য। উঁচুনিচু সবুজ শস্যক্ষেতের মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি মাতামুহুরী নদীর পানি বিকালের বাঁকা আলোয় চকচক করছে। এরই মধ্যে কয়েকজন পড়ন্ত বিকেলের এই দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দী করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অন্যদিকে, পাহাড়িরা তাদের সারাদিনের কাজ শেষ করে পিঠে করে ফলমূল, সবজিসহ নানা রকম লতাপাতায় ভরা ঝুড়ি নিয়ে ঘরের দিকে ফিরছে।

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এঁকেবেকে চলেছে মাতামুহুরি নদী; ছবি- সাইমুন ইসলাম

কেউ একজন পাশ থেকে বলল, ঐ দেখা যায় মারায়ন তংয়ের চূড়া। খুব বেশি দূরে নয়। আরেকবার শক্তি এবং সাহস সঞ্চয় করে এক টানে উঠে যাই চূড়ায়। খাড়া পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করে বেশ কিছুটা ক্লান্তি লাগলেও চূড়ায় পৌঁছে প্রকৃতির এত কাছে এসেছি বলে হয়তো সব কষ্ট এক নিমেষে ভ্যানিস হয়ে গিয়েছে।

মেঘে ঢাকা মারায়ন তংয়ের চূড়া; ছবি- সাইমুন ইসলাম

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলিকদম উপজেলার মিরিঞ্জা রেঞ্জের একটি পাহাড় মারায়ন তং। এর উচ্চতা প্রায় ১,৬৪০ ফিট। মিরিঞ্জা রেঞ্জের সব থেকে বড় পাহাড় মারায়ন তং। চূড়ায় রয়েছে এক বৌদ্ধ উপসানালয়। এখানে আছে বৌদ্ধের এক বিশাল মূর্তি। উপসানালয়ের চারদিকে খোলা আর উপরের দিকে আছে চালা। এই চূড়া থেকে যতদূরে চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। চারদিকে সবুজের গালিচা বিছানো তার মধ্যে টুকরো টুকরো সফেদ সাদা মেঘেরা খেলা করছে।

সূর্যাস্তের আগ মুহূর্তে; ছবি- বিপু বিধান

সূর্য ডুবিডুবি করছে। হাতে আর বেশি সময় নেই। দিনের আলো থাকতে থাকতে তাঁবু পেতে ফেলি। রাতের রান্নার জোগাড়-যন্ত করতে লেগে পড়ি। তাঁবু টানানো শেষে এবার আগুন জ্বালাবার পালা। খোলা আকাশের নিচে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করাটা ভীষণ কঠিন কাজ। বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যায় যায় অবস্থা। ত্রিপল দিয়ে ঘিরে কোনো রকমে খিচুড়ি আর মাংস রান্না করা হয়।

ত্রিপল দিয়ে ঘিরে রান্না চলছে; ছবি- বিপু বিধান

খিদেই পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে। খাবার খেয়ে পেটকে শান্ত না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। সবাই মিলে একসাথে খেয়ে নেই। আকাশে তখন হাজার হাজার তারা জ্বলে উঠছে। গ্যালাক্সিটাও পরিষ্কার দেখা যাছে। এই দেখে সাইমুন কোনোমতে খাওয়া শেষ করে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছে শুধু মাত্র গ্যালাক্সির একটা ছবি তোলার জন্য।

অনেক চেষ্টা-চরিতের পর শেষ পর্যন্ত ছবিটা সে তুলতে পেরেছিল। মুগ্ধ নয়নে দেখছি আকাশের জ্বলজ্বল করা তারাগুলো। বুনো প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে হিম হিম হাওয়া যেন অন্যরকম এক আবহের সৃষ্টি করেছে।

রান্না শেষে খাওয়া চলছে; ছবি- বিপু বিধান

রাতের গভীরতার সাথে পাল্লা দিয়ে ঠাণ্ডা বাড়ছে। ক্যাম্প ফায়ারকে ঘিরে আড্ডা চলছে। সবাই যে যার মতো আড্ডা দিচ্ছে। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প করছে আবার কেউ বা আপন মনে হেঁটে বেড়াচ্ছে চূড়ায়। চারদিকে সুনসান নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কুয়াশা টপটপ করে পড়ছে। তাই আর বেশিক্ষণ বাইরে থাকা গেল না। যে যার মতো তাঁবুতে গিয়ে ঢুকে পড়ি। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকতেই চোখে একরাশ ঘুম নেম এলো।

হাজার হাজার তারার মেলা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখি, মেঘের সাদা চাদর ভেদ করে পাহাড়ের আড়াল থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসছে প্রভাকর। মনে হলো, স্বর্গের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি। প্রতিবারই প্রকৃতির এই অপরূপ লীলাখেলায় মুগ্ধ হই আমি। হয়তো বা সেই টানেই প্রকৃতির এত কাছে বারবার ছুটে আসি।

সকালের প্রথম আলোয় জাদির চূড়া থেকে; ছবি- বিপু বিধান

তাঁবু গুটিয়ে এবার নিচে নামার পালা। সকালের নাস্তা আলিকদম বাজারে করে দামতুয়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে আবার ছুটে চলা…

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে চকরিয়া। জনপ্রতি নন এসি বাস ভাড়া ৭৫০ টাকা। চকরিয়া থেকে আলিকদম জিপ গাড়ি বা চাঁদের গাড়িতে আসতে পারেন। লোকাল ভাড়া জনপ্রতি ৬৫ টাকা। চাইলে রিজার্ভ করে যেতে পারেন।

সারিবদ্ধ পাহাড়; ছবি- সাইমুন ইসলাম

থাকা খাওয়া

আলীকদম বাজারে ছোটখাটো খাবার হোটেল আছে। তবে থাকার তেমন ভালো ব্যবস্থা নেই।

অবশ্যই মনে রাখবেন
*ভালো মানের টর্চ লাইট সাথে নিতে ভুলবেন না।
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।
*লেকে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে।

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেট: জাফলংয়ের ঝর্ণা-পাহাড়, রাতারগুলের নিস্তব্ধতা আর বিছানাকান্দির মায়ার রাজ্য!

কুমিল্লার ধর্মসাগর দিঘির পাড়ে একটি বিকেল