পূর্ণিমার আলোয় নাফাখুমে ক্যাম্পিং

বান্দরবানের গহীনে বেশ কিছু ঝর্ণা দেখার সৌভাগ্য হলেও কখনো সেইসব ঝর্ণার পাশে ক্যাম্পিং করে থাকার সুযোগ হয়নি। কোনো এক পূর্ণিমার রাতে ঝর্ণার পাশে তাঁবু করে চাঁদের আলোয় কাটিয়ে দিবো সারারাত, এ যেন দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন আমার!
এই বারের অভিযান পূর্ণিমা রাতে নাফাখুম জলপ্রপাতের পাশে ক্যাম্পিং।

ক্যাম্প সাইড; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

দিনক্ষণ ঠিক করে সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। হৈ-হুল্লোড় করতে করতে ভোরে গিয়ে বান্দরবান শহরে পৌঁছে যাই। আধ ঘণ্টার বিরতির পর থানচির দিকে রওনা দিলাম। বান্দরবান থেকে লক্করঝক্কর মার্কা বাসে করে রাস্তার দু’পাশে মাথা উঁচু করে থাকা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। অনেকের কাছে এই লক্করঝক্কর মার্কা বাস বিরক্ত লাগে, কিন্তু আমার কাছে তা কখনই খারাপ লাগে না। আর যদি কখনো বাসের ছাদে ওঠার সুযোগ পাই তাহলে তো আর কথাই নেই। তখন পুরো পথটাই স্বর্গ মনে হয়!

ক্যানেল; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম 

পাহাড়ের আঁকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু পথ ধরে যাচ্ছে বাস। বাসের জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখ ছানাবড়া অবস্থা। সফেদ, সাদা মেঘের গালিচা বিছিয়ে স্বাগতম জানাচ্ছে আমাদের। এক মুহূর্তের জন্য হলেও মনে হবে যে স্বর্গের দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়িয়ে আছি।

বান্দরবান শহর থেকে থানচি যেতে সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা। বেলা বাড়ার সাথে পেটের নাড়িভুঁড়ি মোচড় দিয়ে জানান দেয় যে তাদেরকে কিছু দিতে হবে। পথিমধ্যে দেখা মিলবে চিম্বুক ক্যান্টিনের। সকালের নাস্তা সেখানেই সেরে নেই।

সকাল ১১টা নাগাদ থানচি পৌঁছে স্থানীয় গাইড হারুন ভাইয়ের সাথে পুলিশ এবং বিজিবির অনুমতি নিতে যাই। অনুমতি নিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে থানচি ঘাটে চলে আসি। সেখানে আগে থেকে রিজার্ভ করা ট্রলারে করে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে রওনা হই।

থানচি ঘাট; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

সাঙ্গু নদী ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। দু’পাশে মাথা উঁচু করে আছে পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা সাঙ্গু নদী। শীতকালে সাঙ্গুর পানি কম থাকলেও বর্ষাকালে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। নদীর স্বচ্ছ, সবুজ নীলাভ পানি দেখে বার বার মুগ্ধ হই। কোথাও কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে চুয়ে পড়ছে জলধারা; আর সেই জলধারা গিয়ে মিলিত হচ্ছে সাঙ্গুর বুকে।

সাঙ্গু নদী; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

পথিমধ্যে পড়বে তিন্দু। বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গের রাজধানী বলে থাকে ‘তিন্দু’কে। আদিবাসীদের কাছে এই জায়গাটি পূজনীয়। আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ সমান পাহাড়। পুরো পথ জুড়ে রয়েছে বড় বড় বোল্ডার। অবাক বিস্ময়ে দেখতে থাকি এই বড় বড় বোল্ডারগুলোকে!

তিন্দু; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

ট্রলার এসে থামল বিশাল এক ক্যাসকেডের সামনে। নাম তার রেমাক্রি। এই ক্যাসকেডের শীতল পানিতে কয়েকজন গা ভিজিয়ে নেয়। এখান থেকেই আমাদের ট্রেকিং শুরু।

রেমাক্রি; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

রেমাক্রি খালের পাশ ধরে হাঁটছি আমরা। সাথে ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম থাকায় ব্যাগ বেশ ভারী হয়। আর পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটার কারণে ব্যাগের ভার দুই-তিন গুণ বেশি মনে হয়। সেই কারণে অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। যে যেখানে পারছি হাত-পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছি।

রেমাক্রি ফলসে গোসল; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখা মেলে ঠাণ্ডা ঝর্ণার। রেফ্রিজারেটরের পানির মতো শীতল থাকায় এই ঝর্ণার নাম দিয়েছি ঠাণ্ডা ঝর্ণা। আহা! এই ঠাণ্ডা পানি পান করতেই ভেতরটা জুড়িয়ে গেল।

দিনের আলো ক্রমশ কমে আসছে তাই আর বসে না থেকে দ্রুত গতিতে হাঁটতে থাকলাম। দূর থেকে শোনা যায় নাফাখুম জলপ্রপাতের গর্জন।

নাফাখুম; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এই সেই নাফাখুম! মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। নাফাখুমের অপার্থিব সৌন্দর্য যেন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করেছিল।

দুধ-সাদা পানি গড়িয়ে পরে তৈরি হয়েছে খুমের মত এক-জায়গায়। পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে থাকা জংলি লতাপাতা নাফাখুমকে দিয়েছে এক অনিন্দ্য রূপ।

একটা তাঁবু নাফাখুমের পাশে; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

পাহাড়ে ঝুপ করেই অন্ধকার নেমে আসে। তাই আর দেরি না করে ক্যাম্পিং সাইড ঠিক করে তাঁবু পেতে ফেলি। সেখানে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফ্রেশ হয়ে নেই। চারপাশে মশাল জ্বালিয়ে বসে গল্প করতে করতে রাতের খাবার খাওয়ার সময় হয়ে যায়। খিচুড়ি আর মাংস দিয়ে ভুরিভোজ শেষ করি।

মশাল জ্বালিয়ে রান্নার ব্যবস্থা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

এমন একটি রাতের অপেক্ষায় ছিলাম দীর্ঘদিন। পূর্ণিমা রাতে ঝর্ণার পাশে কাটাব একটি রাত। আকাশ ভরা চাঁদের আলো আর নাফাখুমের গর্জন শুনতে শুনতে কাটিয়ে দেওয়া যায় পুরো একটা রাত। আজ সেই স্বপ্ন যেন সত্যি হলো।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত খুব বেশিক্ষণ জ্যোৎস্না বিলাস করতে পারিনি। কোথা থেকে যেন একঝাক মেঘ এসে ঢেকে দিয়ে গেল চাঁদকে। তাই বাধ্য হয়ে তাঁবুতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।

ঘুম থেকে উঠে এমন একটি দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, যা লিখে বোঝান যাবে না। সে যে এক মোহনীয় দৃশ্য।

অপূর্ব এক সকালের সূচনা; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম 

হালকা হালকা শীতের মধ্যে মশাল জ্বালিয়ে, মাথার উপর অজস্র তারা আর বন-জঙ্গলের মধ্যে থেকে মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে বুনো প্রাণী। আর এইভাবেই অনন্তকাল ধরে বয়ে চলে নাফাখুম জলপ্রপাত।

এবার যে ঘরে ফিরতে হবে। সকালের নাস্তা সেরে হাঁটা শুরু। দুই আড়াই ঘণ্টা হেঁটে রেমাক্রি। সেখান থেকে নৌকায় করে থানচি। দুপুরের খাবার খেয়ে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা। রাতের বাসে করে বান্দরবান ত্যাগ।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বান্দরবন

ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে হানিফ, ইউনিক, শ্যামলি ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানে যায়। ভাড়া জনপ্রতি নন-এসি ৬২০ টাকা।

বান্দরবন থেকে থানচি

সকালে বান্দরবান শহর থেকে লোকাল বাস থানচি যায়। লোকাল বাস/জীপ রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারেন। জীপ ভাড়া ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০টাকা।

নাফাখুমের পাশে ক্যাম্প সাইড; ছবিঃ সাইমুন ইসলাম

থাকা-খাওয়া ও গাইড

গাইডের নাম হারুনুর রশিদ হারুন। গাইডের নাম্বার- ০১৮৪৯৫৫৬৩৪০। আগে থেকে গাইডের সাথে কথা বলে রাখা ভালো। ক্যাম্পিং করে চাইলে নিজে রান্না করতে পারেন সেক্ষেত্রে রান্নার উপকরণ আপনাকে বহন করতে হবে। আর তা না চাইলে নাফাখুমের উপরে এখন একটি পাড়া আছে। তাদেরকে বললে তারা খাবারের ব্যবস্থা করে দেবে।

অবশ্যই মনে রাখবেন:

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।

*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্ত: টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট এবং জাদুকাটা নদীর জাদু

সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: বিছানাকান্দির হুটহাট পরিকল্পনা