বাজেট ট্রিপে নেপাল: অন্নপূর্ণা আর মুক্তিনাথ দর্শনে জমসমের পথে

বাংলাদেশ থেকে প্রচুর মানুষ ইদানিং নেপাল যাচ্ছে। মোটামুটি কাঠমান্ডু আর পোখরা ঘুরেই নেপাল ট্যুর শেষ করে দেয়া হয়। কিন্তু নেপালের আসল সৌন্দর্য গতানুগতিক এই পর্যটন স্থানগুলোয় পাওয়া যাবে না। নেপালের মূল সৌন্দর্য দেখতে হলে যেতে হবে অনেক ভেতরে, পাহাড়ের একদম কাছে।

নেপালকে বলা হয় ট্রেকারদের স্বর্গ, নেপাল থেকে যত বাঘা বাঘা ট্রেকিং করা যায় তা আর কোনো দেশ থেকে সম্ভব না। নেপালের ট্রেকিং স্বর্গদ্বার হিসেবে একটি জেলা খুবই বিখ্যাত, নাম মুসতাং। বিশ্ববিখ্যাত কয়েকটি ট্রেকের বেশ কয়েকটি শুরু করতে হয় এই মুসতাং থেকে।

এই জেলার কয়েকটি বিখ্যাত গ্রাম হলো মানাং, লেতে আর জমসম। পোখরা ঘুরে আমাদের গন্তব্য ছিল এই জমসম গ্রাম।

উরব্জমসমের পথে, ছবিঃ লেখক

কাঠমান্ডু আর পোখরার ছোট ছোট পাহাড় দেখে ভুলতেই বসেছিলাম নেপাল এভারেস্টের দেশ। টনক নড়লো জমসম গিয়ে। পোখরা থেকে জমসম যাওয়ার জন্য আগে থেকে পারমিশনের প্রয়োজন। যদি আপনি ট্রেকে যেতে চান তবে TIMS নামক একটি পারমিট লাগবে আর যদি শুধু জমসমে ঘোরার উদ্দেশ্যে যেতে চান তবে ACA নামক একটি পারমিট লাগবে।

জমসম যাওয়ার পথে কোথাও এই পারমিট চেক করে না কিন্তু না থাকলে বাসের চালকই আপনাকে বাধ্য করবে পারমিট নেয়ার জন্য। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে কাঠমান্ডু বা পোখরা থেকে এই পারমিট করিয়ে ফেলা।

TIMS এর জন্য ৬০০ নেপালি রুপি আর ACA এর জন্য ২০০ নেপালি রুপি খরচ করতে হবে। আর জমসম যাওয়ার রাস্তায় পারমিট করালে দুটো পারমিটই নিতে হবে আপনি ট্রেকিং করুন আর না করুন, সেক্ষেত্রে মোট ১,১৫২ নেপালি রুপি যাবে। তাই যদি ট্রেকিং না করেন তবে পোখরা থেকে রাত আটটার আগে শুধু ACA পারমিটটা করিয়ে নিন।

পথে ACA পারমিট করাতে হবে এখান থেকে, ছবিঃ লেখক

পোখরা থেকে জমসম যাবার রাস্তা আমার মনে হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ বিপদজনক রাস্তাগুলোর মধ্যে একটি। তাই বাসের টিকেট কাটার আগে বুঝে শুনে কাটবেন। পোখরা থেকে জমসম যাওয়ার সবচেয়ে ভালো বাস হচ্ছে ঘোড়াঘোড়ি ডিলাক্স।

পোখরায় কোথায় কাউন্টার আছে জানি না তবে ওদের নাম্বারে (9841454328, 9841390837) যোগাযোগ করে বুকিং দেয়া যাবে। আমরা এত কিছু জানতাম না, তাই লক্করঝক্কর বাসের টিকেট কাটি। আর দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য বলবো ঠিক বুঝতে পারছি না, আমাদের সবগুলো সিট ছিল একদম শেষের সারির। রাস্তার অবস্থা এতই খারাপ যে যদি দেখেন শেষের সারির সিট পেয়েছেন তবে টিকেট পরেরদিনের কাটুন, তবুও এই সিটে বসে যাবেন না।

বেণী, ছবিঃ লেখক

প্রতিটি বাস পোখরা থেকে জমসম যায় বেণী হয়ে। পোখরা থেকে বেণীর রাস্তা মোটামুটি ভালো, এরপর থেকে যে রাস্তা শুরু হবে সেটাকে এক প্রকার আজাবই বলা যায়। শেষ সিটে বসে কড়াইয়ে ভাজা ভুট্টার দানার মতো প্রায় লাফাতে লাফাতে চলতে লাগলাম জমসমের পথে।

বেণী পর্যন্ত আসতেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, বেণীর পরের রাস্তা দেখে একজন আরেকজনের মুখ দেখাদেখি করছিলাম আর ভাবছিলাম কোনোমতে এ যাত্রায় বেঁচে ফিরতে পারলেই হয়।

পথে পড়বে এমনি সুন্দর ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

জমসম যাবার পথে দুপুরে এক জায়গায় খাবারের জন্য বাস দাঁড়ায়, আগে থেকেই জানতাম এখানে খাবার দাম আরো বেশি। তবুও সারাদিনে আর খাওয়া হবে না ভেবে ৩০০ রুপি দিয়ে নিরামিষ থালি খেয়ে নিলাম। তবে খাবারের ক্ষেত্রে একটা জিনিস খুব ভালো, ভাত-ডাল-সবজি সব কিছুই আনলিমিটেড মানে আপনি যতবার খুশি নিতে পারবেন।

জমসম যাওয়ার সময় পথে অনেকবার বাস থামিয়েছিল, কারণ রাস্তার কাজ চলছিল। যাওয়ার সময়ই এই ঝামেলাটা হয়, উঠতে বেশি সময় লাগে। অবশেষে বিশাল এক জার্নি শেষে রাত সাড়ে বারোটায় আমরা জমসম পৌঁছাই।

সকালের জমসম, ছবিঃ লেখক

চারিদিকে হু হু বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল আমাদের, মাথার উপর পূর্ণিমার চাঁদ আলো বিলাচ্ছিল। জমসমের একদম শেষ মাথায় বাস নামিয়ে দেয় আমাদের। এরপর একটা কাঠের ব্রীজ পার হয়ে হোটেলে উঠি, হোটেলের নাম কালিদাকি লজ।

হোটেলের চাইতে হোটেলে আসার ব্রীজটি অনেক সুন্দর। নিচ দিয়ে প্রচণ্ড বেগে কালিগান্দাকি নদী গর্জন তুলে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম গতিতে আর তার জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়ছে। মাতাল করা সেই পরিবেশে আমরা পদার্পণ করি জমসমে।

এদিকের হোটেল ভাড়া মোটামুটি সস্তা কিন্তু রাত হওয়ায় ভাড়া বেশি চেয়ে বসে আমাদের কাছে, প্রতিরাত আটজনের রুম ২,০০০ রুপি। এর মধ্যে আমাদের সাথে এসে জুটলো ফ্রান্সের এক জুটি, ওরাও রুম পাচ্ছিল না। ব্যস ,রুম শেয়ার করে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়লাম কারণ হাঁটুতে তখন রাজ্যের ব্যথা আর গায়ে অসীম ক্লান্তি।

নীলগিরির অপরুপ সেই মোহতা, ছবিঃ লেখক

পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে আমি একাই হাঁটতে বের হলাম। এই সকালে হাঁটার আরেকটা কারণও আছে, গতরাতে বাসে আমি আমার হেডফোন ফেলে দিয়ে এসেছি, বাসে উঠে সেটা নিয়ে আসতে হবে।

জমসমে আসা প্রায় সব বাসই পার্ক করে এয়ারপোর্টের কাছে। আপনি চাইলে পোখারা থেকে ছোট ছোট বিমানে করেও জমসম চলে আসতে পারবেন, সেক্ষেত্রে রিটার্ন টিকেট সহ খরচ হবে প্রায় ১৬,০০০ নেপালি রুপি।

জমসম এয়ারপোর্ট, ছবিঃ লেখক

সকাল সকাল বেরিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল, হালকা ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে আর পাহাড়ের কোল থেকে সূর্য ওঠা শুরু করেছে। জমসমের চারদিকের সুউচ্চ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা শুভ্র বরফ।

হাঁটতে হাঁটতে হাতের বাম পাশে চোখ পড়তেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল, বরফ পড়ে পুরো পাহাড়টা সাদা হয়ে গিয়েছে। এত বিশালতা আর সৌন্দর্যের খুব অল্প অংশই লেখায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ক্যামেয়ার তাও যা ধরা পড়ে তা এই ভয়ংকর সৌন্দর্যের সিকিভাগ মাত্র।

সূর্যোদয়ে জমসম, ছবিঃ লেখক

হেডফোন নিয়ে চলে এলাম হোটেলে। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে চেক-আউট করে নিলাম হোটেল থেকে। গন্তব্য মুক্তিনাথ।

মুক্তিনাথ থেকে এসে অন্য হোটেলে উঠবো। আমাদের সাথে একদল বয়স্ক ইন্ডিয়ান এসেছিল, উনারা বললো “আপ লোগ যাওগে মুক্তিনাথ, এক সাথ চ্যল সাকতে হ্যায়!” আমরা রেডিই ছিলাম বের হবো বলে, উনারা আবার জীপ দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তাই হোটেলে ব্যাগ রেখে উঠে পড়লাম মুক্তিনাথের জীপে।

জীপ ভাড়া ৩০০ রুপি, বাস ভাড়াও ৩০০ রুপি। যাওয়া আসা মিলিয়ে ৬০০ রুপিতে হয়ে যাবে। বলা হয়নি, মুক্তিনাথ প্রায় ৩,৭১০ মিটার উপরে একটি শিব মন্দির। মন্দির তো আকর্ষণ বটেই, পৃথিবীর ৮টি উচ্চতম শৃঙ্গের ছয়টিই মুক্তিনাথ থেকে দেখা যায়। যাওয়ার রাস্তাটাও বেশ সুন্দর, পাথরের ভ্যালি দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি উঠে যায় অনেক উঁচুতে।

মুক্তিনাথের পথে, ছবিঃ লেখক

মুক্তিনাথ জীপ স্ট্যান্ডে পৌঁছে নাস্তা করে নিলাম সবাই। ১০০ রুপিতে ভেজ ফ্রাইড রাইস। এই জীপ স্ট্যান্ড থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় ১-১.৫ কিলোমিটার উপরে উঠতে হয়, তারপর দেখা মেলে মুক্তিনাথ আর অন্নপূর্ণা রেঞ্জের।

আমরা খাবার খেয়ে আশেপাশে জিজ্ঞেস করে করে উঠতে লাগলাম। শেষ দিকে টানা পাথরের সিঁড়ি আছে, সিঁড়ির উপর বসে পড়েই দেখা যায় চারদিকে লেগে আছে সুন্দরের আগুন। অন্নপূর্ণার পাদদেশে অবস্থিত এই জমসমের প্রতিটি ল্যান্ডস্কেপ আজীবন মনে রাখার মতো।

মুক্তিনাথ থেকে ভিউ, ছবিঃ টিম মেম্বার গৌরব

আস্তে আস্তে উঠে গেলাম মুক্তিনাথ পর্যন্ত, প্রচুর ভক্তরা সেখানে পুণ্যস্নান করে। মন্দিরের পাশেই একটি বৌদ্ধ মন্দির আছে, কালো পাথরে বানানো বিশাল এক বৌদ্ধ মূর্তিও আছে যা নিচ থেকে চোখে পড়বে। মুক্তিনাথে উঠে পেছনের দিকে তাকাতেই চোখের দৃষ্টিতে পুরো রেঞ্জটা এসে গেল, কী অপূর্ব সে দৃশ্য! আহা, নিজে না গেলে যে কখনোই বুঝতাম না পাহাড়ের সৌন্দর্য কত অসীম।

মুক্তিনাথের প্রধান ফটক, ছবিঃ লেখক

মুক্তিনাথ থেকে ফেরার পথে মন্দিরেই আমরা প্রসাদ খেয়ে দুপুরের ক্ষুধা নিবারণ করি। প্রসাদে ছিল ভাত, আলুর তরকারী, পাপড়, মিষ্টি আর জিলাপী। ভারতের বৃন্দাবন থেকে আগত একদলের এক ভদ্রলোক কিশোর দা’র সাথে পরিচয় হয়।

মুক্তিনাথ, ছবিঃ লেখক

এতই অমায়িক ছিলেন যে নিজে বসে প্রসাদ খাবার ব্যবস্থা করেছেন। মুক্তিনাথ থেকে আবার জীপে করে জমসম ফিরে আসলাম দুপুর আড়াইটা কি তিনটার দিকে।

আগের হোটেল থেকে ব্যাগ নিয়ে চলে এলাম এয়ারপোর্টের কাছাকাছি হোটেল মাউন্টেন ব্রীজে। তিনটি সিঙ্গেল বেডের একটি রুম মাত্র ৫০০ রুপি ভাড়া। এত সস্তায় হোটেল পাওয়ার চেয়ে রুম থেকে নীলগিরি দেখা যাওয়ার ব্যাপারটায় খুশি আমার বেশি কাজ করছিল।

হোটেল ভিউ, ছবিঃ টিম মেম্বার গৌরব

জমসম থেকে সরাসরি কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায় দুপুর বারোটায়। আসার সময় লক্কর-ঝক্করে আসলেও যাওয়ার সময় ঘোড়াঘোড়ি ডিলাক্সের টিকেট কিনে নিলাম, কাঠমান্ডু পর্যন্ত ভাড়া ১,৬০০ রুপি।

সকালের নাস্তা হিসেবে ১০০ রুপি দিয়ে খেয়ে নিলাম লুচি আর ডাল-তরকারী। পথে আবার আসার সময় যে হোটেলটায় ভেজ-থালি খেয়েছিলাম সেটায় চিকেন মম খেলাম শেয়ার করে। বাসের সিট থেকে শুরু করে সার্ভিস পর্যন্ত সবকিছুই আগের তুলনায় ঢের ভালো।

পোখরায় পৌঁছে গেলাম রাত বারোটায় আর কাঠমান্ডু পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায়। এভাবেই একরাশ অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে শেষ হলো আমাদের নেপাল ট্যুর। পুরো ট্রিপে কাঠমান্ডু ছিলাম দুইরাত, পোখারা ছিলাম দুইরাত আর জমসম ছিলাম দুইরাত, সব মিলিয়ে মোট খরচ হয়েছে ১৫,৪৫০ টাকা।
ফিচার ইমেজলেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অসহ্য সুখের ভ্রমণবিলাস কাশ্মীরের আরু ভ্যালীতে

তেতুলিয়া: সমতলের চা বাগানের গল্প