বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: পাহাড়ি কন্যা শিমলা ভ্রমণ

অনেকেরই পুরো জীবনের স্বপ্ন থেকে যায় জীবনের কোনো একটা সময়ে হাতের কাছে বরফ দেখবে, বরফ স্পর্শ করবে আর ছুঁড়ে মারবে একে অপরের দিকে। খুব বেশি দূরে যেতে হয় না এই ইচ্ছে পূরণের জন্য। পাশের দেশ ভারতের হিমাচল প্রদেশের এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে বছরের একটা সময় খুব ভালো বরফ পড়ে। শুধু বরফের জন্য নয়, অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় সেসব জায়গার সৌন্দর্যও থাকে মন কেড়ে নেয়ার মতো।

ভারতের হিমাচল প্রদেশের তেমনি একটি জায়গার নাম শিমলা। অনেকেই জানেন বা চেনেন হিমাচলের রানী শিমলার কথা। হিমাচল প্রদেশের অন্যতম প্রধান শহর শিমলায় প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক ঘুরতে যায় যাদের মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশী পর্যটক। প্রচণ্ড শীত আর পরিষ্কার সুন্দর আবহাওয়া শিমলাকে করেছে অনন্যতার এক সুন্দর উদাহরণ। পাহাড়ের উপর হরেক রকম রঙের বাড়িঘরের বাহারে চোখ জুড়াবে নির্দ্বিধায়। আজকে গল্প করবো শিমলায় যাওয়ার উপায় আর কম খরচে ঘুরে আসার উপায় নিয়ে।

বাজেট ট্রিপ নিয়ে লেখা এই সিরিজের প্রতিটি লেখা আপনাকে দেবে এখানে গল্প করা প্রতিটা জায়গায় একদম কম খরচে ঘুরে আসার কিছু প্রয়োজনীয় টিপস। তাই বিলাসবহুলভাবে ঘুরে আসার চেয়ে যারা কম খরচে একই জায়গা একইভাবে ঘুরতে আসতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাদের জন্যই মূলত এই লেখাগুলো। চলুন তাহলে শুরু করা যাক কম খরচে শিমলা ঘুরে আসার গল্প।

শিমলা, ছবিঃ দীপ সেন

প্রায় ১৭,০০০ ফুট উপরের হিমাচলস্থ শহর শিমলা। ছোট কিন্তু অসম্ভব সুন্দর এক শহরের নাম শিমলা। যারা দেশের কাছাকাছি খুব সুন্দর কোথাও থেকে অর্ধাঙ্গ বা অর্ধাঙ্গীনিকে নিয়ে ঘুরে আসতে চান তাদের জন্য শিমলা এক উত্তম গন্তব্য। কয়েকজন মিলে গ্রুপ করেও ঘুরে আসা যায় শিমলা থেকে।

শিমলার আশেপাশে আছে কুল্লু, মানালির মতো বিশ্বমানের সুন্দর সব জায়গা। চাইলে শিমলা ঘুরে ফেলা শেষে ঘুরে আসা যায় এসব জায়গা থেকেও। সেসব জায়গা নিয়ে লেখা থাকছে পরের পর্বে। আপাতত শিমলার যাবতীয় বিষয় নিয়ে শুরু করা যাক।

কীভাবে যাবেন:

শিমলা যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় সরাসরি বিমানে করে শিমলা এয়ারপোর্টে নেমে যাওয়া। তবে এক্ষেত্রে সেই একই নিয়ম খাটে, যত আগে বিমানের টিকেট কেটে ফেলবেন ততই টাকা কম লাগবে। দম্পতিরা শিমলা ঘুরতে গেলে বিমানে যাওয়াই ভালো। মোটামুটি এক-দেড় মাস আগে থেকে বিমানের টিকেট কেটে নিলে জনপ্রতি ৮ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে বিমানের টিকেট পেয়ে যাবেন।

তবে এই বিমান ভাড়া আরো কমানো যায় আরেকটি উপায়ে। বাংলাদেশ থেকে বিমানে না উঠে ভারতের যেকোনো বর্ডার দিয়ে ঢুকে ভারতের আন্তঃদেশীয় যে ফ্লাইটগুলো শিমলা উড়ে যায় সেগুলোর টিকেট কাটতে পারেন। এতে করে জনপ্রতি সাশ্রয় হবে অন্ততপক্ষে ৪ হাজার টাকার মতো।

কালকা স্টেশন, ছবিঃ লেখক

যারা এত এত টাকা দিয়ে বিমানে ভ্রমণ করতে ইচ্ছুক নন তাদের একটু কষ্ট পোহাতে হবে, তবে সেই কষ্টেও আছে অন্যরকম অভিজ্ঞতা। ভারতীয় ভিসাধারী হলেই আপনি কিছু জায়গা দিয়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভারতে প্রবেশ করতে পারবেন, বেনাপোল বর্ডার সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। বেনাপোল দিয়ে ভারতে ঢুকে হাওড়া স্টেশন থেকে ধরতে পারেন শিমলার কাছাকাছি যাওয়ার ট্রেন।

ভারতীয় কোনো ট্রেন সরাসরি শিমলা যায় না, যায় কালকা নামক এক স্টেশন পর্যন্ত যা হিমাচলের এই রুটের শেষ স্টেশন। হাওড়া থেকে কালকা যাওয়ার অনেক ট্রেন পেয়ে যাবেন, তবে এই রুটে সাধারণত সবসময়ই একটু বেশি ভিড় থাকে। তাই বাংলাদেশ থেকেই কালকা যাবার ট্রেনের টিকেট কেটে রাখুন ভারতে অবস্থানকারী কোনো বন্ধু-বান্ধব অথবা আত্মীয় দিয়ে অথবা কোনো ট্রাভেল এজেন্সীর মাধ্যমে। যদি কোনোভাবেই ট্রেনের টিকেট কাটতে না পারেন তবে কলকাতার শিয়ালদাহ স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা চলে যান ফেয়ারলি প্যালেসে।

ফেয়ারলি প্যালেস ভারতীয় রেলওয়ের বৈদেশিক কার্যালয়। ভারতের মোটামুটি সব ট্রেনেই তিন থেকে চারটা বিদেশি কোটার সিট বরাদ্দ থাকে যা ফেয়ারলি প্যালেস থেকে ভিসা এবং পাসপোর্টের ফটোকপি দিয়ে কাটতে পারবেন যাত্রার একদিন আগেও সিট খালি থাকা সাপেক্ষে। সিট খালি আছে কিনা তা জানতে পারবেন ভারতীয় রেলওয়ের বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ যেমন “Trainman” এ ট্রেনের নাম্বারটি দেয়ার মাধ্যমে। সাধারণ কোটায় কাটতে চাইলে ট্রেনের টিকেট কাটুন অন্ততপক্ষে এক মাস আগে নাহলে সিট পাবেন না লিখে দেয়া যাবে।

শিমলা যাওয়ার টয় ট্রেন, ছবিঃ লেখক

এমনিতে সাধারণ কোটায় হাওড়া থেকে কালকা যাওয়ার ট্রেনের টিকেট ৬৮০ রুপি যেখানে বৈদেশিক কোটায় একই সিটের ভাড়া ৯৯৫ রুপি। তাই খরচ বাঁচাতে আগে থেকেই টিকেট কেটে নিন। হাওড়া থেকে সন্ধ্যা ৭:৪০ মিনিটে কালকা যাওয়ার কালকা মেইল (ট্রেন নং ১২৩১১) ছেড়ে যায়। কালকা যেতে সময় লাগে পাক্কা ৩৩ ঘন্টা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, ৩৩ ঘন্টা! এই ৩৩ ঘন্টায় ট্রেনগুলো পার করে প্রায় ১,৮০০ কিলোমিটার পথ যা অন্য কোনো যানবাহনে সড়কপথে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

তাই বিমানে না হলে ট্রেনই আপনার ভরসা। ৩৩ ঘণ্টা ট্রেনে থেকে শেষে আপনি পৌঁছাবেন কালকা স্টেশনে। কালকা স্টেশনে এসেও কিন্তু ভ্রমণ শেষ হবে না। কালকা থেকে দুইভাবে শিমলা যাওয়া যায়, প্রথমটি গাড়িতে করে সড়ক পথে আর দ্বিতীয়টি টয় ট্রেনে করে। মনে প্রশ্ন আসছে টয় ট্রেন কী জিনিস? টয় ট্রেন বিভিন্ন সিনেমায় দেখানো পাতলা ট্রেনগুলো যেগুলো অনেকটা খেলনা ট্রেনের মতো দেখায়,  এই ট্রেনগুলো ভ্রমণের সাথে সাথে নান্দনিকতারও মাধ্যম।

টয় ট্রেন থেকে দেখা, ছবিঃ লেখক

শিমলা ঘুরতে যাওয়া প্রথমবারের মতো হলে অবশ্যই অবশ্যই টয় ট্রেনে যাবেন। জীবনের কিছু সুন্দর মুহূর্তের মধ্যে এই টয় ট্রেনে শিমলা যাওয়ার স্মৃতিটুকু গেঁথে যাবে। কিছু কিছু টয় ট্রেন কালকা এসে থামা ট্রেনগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ। চুক্তিটা অনেকটা এমন যে হাওড়া বা দিল্লি থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত কালকা স্টেশনে পৌঁছাবে না ততক্ষণ টয় ট্রেনগুলোও কালকা স্টেশন ছেড়ে যাবে না। কালকা মেইলের সাথে চুক্তিবদ্ধ টয় ট্রেনটি হলো শিবালিক ডিলাক্স।

কালকা মেইলের টিকেট কাটার সময় যে কেউ ইচ্ছে করলে শিবালিক ডিলাক্সের টিকেটও করে ফেলতে পারেন, কালকা থেকে শিমলা পর্যন্ত যার ভাড়া ৫০০ রুপির মতো। এটা সিটসহ টিকেটের ভাড়া, যদি আপনি সিট না চান তবে এই ভাড়া মাত্র ৫০ রুপি। সেক্ষেত্রে শিবালিক ডিলাক্স বাদে যেকোনো টয় ট্রেনের টিকেট কালকা স্টেশন থেকেই কেটে নেয়া যাবে। এই সিট ছাড়া টয় ট্রেনের টিকেটগুলোর ব্যবস্থা হচ্ছে আগে গেলে আগে পাবেন ভিত্তিতে সিট ভর্তি হয়ে যায়, তাই ৫০ রুপি দিয়ে টিকেট কিনেই সিটে গিয়ে বসে পড়তে হবে।

কালকা থেকে শিমলা যেতে সময় লাগে ঠিক ৬ ঘণ্টা। পাহাড়ের গা কেটে বসানো একদম সরু রেললাইন ধরে তরতর করে উঠে যাবে টয় ট্রেন, দু’পাশে বিশাল উপত্যকা রেখে। যদি ট্রেন ঠিক ঠিক সময়ে ছেড়ে যায় তবে হাওড়া থেকে শিমলা পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৩৯ ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন:

শিমলার হাতের কাছে সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা মল রোড। তাই চেষ্টা করবেন হোটেল যাতে মল রোডের আশেপাশে হয়। দরকার হলে হোটেলের লোকেশন যাচাই করে নেবেন মল রোড থেকে ঠিক কতটুকু দূরে। সাধারণত শিমলা ওল্ড বাস স্টপের দিকে হোটেল নিলে একদম ঠিক উপরেই মল রোড পাবেন। এক্ষেত্রে সাহায্য নিতে পারেন “Booking.com” এর।

মল রোড, ছবিঃ লেখক

শিমলার হোটেল ভাড়া মানালির তুলনায় একটু বেশি। ১,০০০ থেকে ১,২০০ রুপির ভেতর চারজনের থাকার জন্য এক রুম পেয়ে যাবেন। তবে এসব এলাকায় শীত প্রচণ্ড, তাই হোটেল বা রুম নেয়ার আগে দেখে নেবেন রুমের বাথরুমে গরম পানির ব্যবস্থা মানে গিজার আছে কিনা।

আগে থেকে বুকিং দিয়ে না গেলে যাচাই করে রুমে উঠবেন আর নিজের পছন্দ মতো রুম হলে কেবল তখনই উঠে যাবেন। শিমলায় অত রুম বা হোটেলের দালাল নেই, তাই হোটেল নির্বাচন করতে পারবেন স্বাচ্ছন্দ্যে।

কোথায় ঘুরবেন:

৩৯ ঘণ্টার বিশাল জার্নি শেষে হোটেলে উঠে ভালোমতো ফ্রেশ হয়ে বিকেলের দিকে বের হয়ে যান শিমলার রাস্তায়। হেঁটে হেঁটে আশেপাশের মানুষদের জিজ্ঞেস করে চলে যান মল রোডে। সন্ধ্যাটা মল রোডে কাটান। শিমলার মল রোড নিয়ে যারা জানেন না তাদের জানিয়ে রাখছি, ইউরোপের যেকোনো আড্ডাখানার চেয়ে কোন অংশে কম না এই শিমলার মল রোডের সন্ধ্যা।

মল রোডে অনেক এজেন্সি আছে যারা শিমলার লোকাল ট্যুর করায় মানে শিমলা শহরের যত জায়গা আছে সব দেখিয়ে আনবে। তাই মল রোড থেকে হোটেলে ফেরার পথে টাটা অল্টো ক্যাব ঠিক করে রাখুন পরের দিনে পুরো শিমলা ঘোরার জন্য।

জাখু মন্দির, ছবিঃ লেখক

শুধু শিমলা ঘুরলে এক ক্যাবে নেবে ১,২০০ রুপির মতো, এক ক্যাবে বসতে পারে সর্বোচ্চ ৪ জন। তাই শিমলা মানালি ভ্রমণে গ্রুপ নিয়ে গেলে চেষ্টা করবেন সবসময় চারজনের গুণিতকে মানুষ নেয়ার। শিমলা সারাদিনের ট্যুরে আপনাকে ক্যাব নিয়ে যাবে জাখু মন্দির, গ্রীন ভ্যালি, একটি এমিউজমেন্ট পার্ক আর কুফরী।

কুফরীতে যাওয়ার জন্য ঘোড়ায় চড়তে হয়, প্রতি ঘোড়ায় যাওয়া এবং আসায় খরচ হবে জনপ্রতি ৫০০ রুপি। জায়গাগুলো একটু দূরে দূরে বলে এগুলো ঘুরতেই সকাল ৭টায় বের হলে দুপুর দুইটা বেজে যাবে হোটেলে ফিরে আসতে আসতে। তবুও ড্রাইভারকে বলে বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি থামিয়ে যত ইচ্ছে তত ছবি তুলে নেয়া যাবে খুব সহজেই।

কী খাবেন:

শিমলা যেহেতু হিমাচল প্রদেশের একটি শহর এবং হিমাচলের দিকে অধিকাংশ মানুষই শতভাগ নিরামিষ খায় তাই এখানে অধিকাংশ হোটেলে আপনি আমিষ পাবেন না। একমাত্র বাঙালি হোটেল পেয়ে গেলে আমিষের দেখা পেতে পারেন।

শিমলার মিষ্টি যাকে বলা হয় “গোলাপ জামুন” তা চেখে দেখতে পারেন। এমনিতে লুচি আর ছোলা-ভাটুরে পাওয়া যাবে সব হোটেলে। প্রতিদিন তিন বেলার খাবারে মোটামুটি খরচ হবে ৩০০-৪০০ রুপি সর্বোচ্চ।

গ্রিন ভ্যালি, ছবিঃ লেখক

শিমলায় মোটামুটি ৩ দিন থাকলে সব ঘুরে ফেলা যাবে একদম আরাম করে। আবার মানালি যেতে হলে দুই দিনের বেশি শিমলায় থাকা উচিত হবে না। নিচে শিমলা ভ্রমণের যাবতীয় খরচ জনপ্রতি হিসেবে ৪ জনের গ্রুপের জন্য দিয়ে দিলাম।

কুফরী, ছবিঃ লেখক

১. হাওড়া- কালকা = ৬৮০ রুপি
২. কালকা- শিমলা= ৫০ রুপি
৩. শিমলায় হোটেল ভাড়া (২দিন) = ৩০০*২= ৬০০ রুপি
৪. শিমলা লোকাল ট্যুর (ক্যাব)= ৩০০ রুপি
৫. কুফরী ঘোড়া ভাড়া= ৫০০ রুপি
৬. খাবার খরচ ( ট্রেনে ৫ বেলা, শিমলায় ৩দিন) = ১,৬০০ থেকে ১,৮০০ রুপি
৭. শিমলা- কালকা- হাওড়া= ৫০+৬৮০ = ৭৩০ রুপি

রাতের শিমলা, ছবিঃ লেখক

মোট= ৪,৬৬০ রুপি মানে প্রায় বাংলাদেশী টাকায় ৬,২০০ টাকা। শুধু শিমলা ঘুরে আসতে এর চেয়ে বেশি হলে এক হাজার টাকা বেশি লাগবে। তবে এত দূর যেহেতু যাবেনই একই সাথে ঘুরে আসুন মানালি, কুল্লুর মতো সব দুর্দান্ত জায়গা। সেসব জায়গার বাজেট ট্রিপের গল্প নিয়ে আসছি পরের লেখাগুলোয়। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

4 Comments

Leave a Reply

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    এক ট্রিপে খৈয়াছড়া , গুলিয়াখালি বিচ এবং মহামায়ায় কায়াকিং

    সকালপর্বে চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে পদব্রজের গল্পকথা