বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের পোখরা ভ্রমণ

ঘুরতে গেলে সবাই-ই চায় খরচটা একটু কম হোক। তা সে দেশের ভেতরেই ঘুরতে যাওয়া হোক অথবা দেশের বাইরে। একটা জায়গায় ঘুরতে গিয়ে অযথা অনেকগুলো টাকা নষ্ট করে দিয়ে আসলে ঘুরে ফেরার পথে মনের খচখচটা থেকেই যায়। তবে সবকিছু তো আর একসাথে পাওয়া যায় না, কম খরচে সবাই ঘুরতেও পারে না। বেশি বাজেটের ট্যুরগুলোতে থাকা খাওয়ার কোনো চিন্তা থাকে না, সবকিছুই ভালো হয় পকেটে টাকা থাকলে।

আবার একই জায়গায় যদি কম বাজেট নিয়ে যাওয়া হয় দেখা যায় ঘোরাঘুরির ক্ষেত্রে কোনো অংশেই বেশি বাজেটের ট্যুরের তুলনায় পেছনে পড়তে হয় না, সমস্যা হয় খাবার-দাবার আর থাকার জায়গায়। এটা মানুষের অভ্যাস আর ঘুরতে গেলে আত্মত্যাগের মনোভাবের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে।

আবার একই সাথে বাজেট ট্রিপের সফলতা নির্ভর করে ভালো একটি পরিকল্পনা আর সুযোগ্য নেতৃত্বের উপর। নেপালের কাঠমান্ডু নিয়ে গল্প করেছি এই সিরিজের আগের লেখায়। এ লেখায় থাকছে নেপালের পোখরায় কীভাবে কম খরচে ঘুরে আসা যায় তার গল্প। শুরু করা যাক তাহলে।

পোখরা, ছবিঃ লেখক

পোখরা নেপালের অন্যতম জনপ্রিয় ছোট্ট এক শহরের নাম। কাঠমান্ডু থেকে ২০৫ কিলোমিটার দূরের শহর পোখরায় যেতে সময় লাগে মোটামুটি ৬ ঘণ্টার মতো। যারা নেপাল ঘুরতে যান তাদের সবার দুটি গন্তব্য থাকেই, একটি কাঠমান্ডু এবং অন্যটি পোখরা। বেশ পরিষ্কার শহর পোখরা, ফেওয়া লেকের শহর পোখরা। দিনের বেলায় যেমন স্থবির থাকে পোখরা শহর রাতের বেলায় ঠিক ততটাই জীবন্ত হয়ে ওঠে এর রাস্তা ঘাট।

কীভাবে যাবেন:

পোখরা যাবার জন্য প্রথমেই নেপালে ঢুকে কাঠমান্ডু চলে আসতে হবে। ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু বিমানে আসলে রিটার্ন টিকেট সহ ভাড়া পড়বে ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। আর ট্রানজিট ভিসা নিয়ে সড়ক পথে ভারতের উপর দিয়ে নেপালে প্রবেশ করলে ২,৫০০ টাকার মধ্যে একদম ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু চলে আসা যাবে। কাঠমান্ডু থেকে বিমানে অথবা বাসে করে পোখরা চলে আসা যায়।

তবে নেপালের আন্তঃদেশীয় বিমান ভাড়া অত্যধিক বেশি হওয়ায় আর কাঠমান্ডু থেকে পোখরার রাস্তা বেশ ভালো হওয়ায় বাসেই কাঠমান্ডু থেকে পোখরা যাওয়া বেশি সুবিধেজনক। কাঠমান্ডু থেকে পোখরা যাওয়ার বাসের টিকেট কাঠমান্ডুতে যে হোটেলে থাকবেন সেখানে বললে তারাই ব্যবস্থা করে দেবে।

কাঠমান্ডু থেকে পোখরা যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

নন-এসি বাস ভাড়া সাধারণত ৬০০ রুপি আর এসি বাস ভাড়া সাধারণত ৮০০ রুপি। হোটেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের লাভের জন্য ভাড়া বাড়িয়ে বলতে পারেন, তাই কথা বলে ভাড়া কমাতে হবে। নেপালের বাসের অবস্থা অতটা ভালো না, বাসের গায়ে ফ্রি ওয়াই-ফাই থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অনেক কিছুই লেখা থাকে। বেশির ভাগ বাসে এসবের কিছুই নেই, তাই দেখে শুনে বাসের অবস্থা যাচাই করে তবেই বাসের টিকেট কাটা ভালো।

তবে আমরা যেটায় পোখরা গিয়েছিলাম সেটা বেশ ভালো ছিল, ট্রাভেল এজেন্সী বাসের টিকেট করে দিয়েছিল। ট্রাভেল এজেন্সীর নাম “REED Travel & Tours P. Ltd.” তাদের নেপালি ফোন নাম্বার (+977014358139) দিয়ে দিলাম, ফোন দিয়েও বাসের টিকেট বুক করা যাবে। কাঠমান্ডু থেকে পোখরা যেতে সময় লাগবে ৬ ঘণ্টা বা তার একটু বেশি।

কোথায় থাকবেন:

কাঠমান্ডু থেকে যে বাসগুলো পোখরা যায় সেগুলো গিয়ে থামে পোখরা বাস পার্কে। সেখান থেকে ক্যাবে করে প্রথমেই চলে আসতে হবে ফেওয়া লেকের পাড়ের সাইডে। বাস পার্ক থেকে ফেওয়া লেক পর্যন্ত ক্যাব ভাড়া ৫০ নেপালি রুপি। পোখরায় থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো ফেওয়া লেকের আশেপাশে। ফেওয়া লেক ঘিরেই মূলত গড়ে উঠেছে পোখরা মূল শহর।

ফেওয়া লেক, ছবিঃ লেখক

এই লেকের আশেপাশে তাই প্রচুর নামী-দামী হোটেল, রেস্টুরেন্ট, থাকার জায়গা। তবে প্রচুর হোটেলের ভিড়ে একটু দেখেশুনে থাকার হোটেল বিবেচনা করুন। পোখরায় প্রতিদিন থাকার জন্য ১২,০০০ রুপির হোটেলও আছে আবার ৬০০ রুপির হোটেলও আছে, তাও আবার একদম পাশাপাশি অবস্থিত।

মোটামুটি রুম দেখে দাম অনুযায়ী ঠিক মনে হলে উঠে পড়ুন। তবে রুম নির্বাচনে চেষ্টা করুন ৭০০ থেকে ১,০০০ রুপির মধ্যে তিন জন থাকা যায় এমন রুম নিতে। উল্লেখ্য যে, এখানে রুপি বলতে শুধুমাত্র নেপালি রুপি বোঝানো হচ্ছে।

কোথায় এবং কীভাবে ঘুরবেন:

পোখরা ঘুরতে হলে পোখরায় অন্ততপক্ষে দুইদিন থাকতে হবে। অনেক কিছু ঘোরার আছে এখানে। প্রথম দিন পোখরা শহরটা নিজেরা ঘুরে দেখুন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম হলো সাইকেল। পোখরায় ভাড়ায় প্রচুর সাইকেল পাওয়া যায়। দেখে শুনে একদম ভালো সাইকেল না নিলেও মধ্যমানের সাইকেল ভাড়ায় নিয়ে নিন।

ঘণ্টা হিসেবে তারা ভাড়া রাখে সাধারণত ৭০ থেকে ১৫০ রুপি প্রতিঘণ্টা। নেপালের একমাত্র খাবার হোটেল বাদে সব জায়গাতেই দরদাম চলে, তাই লজ্জা পেয়ে দামাদামি না করলে নিজেই ঠকে যাবেন।

সাইকেলে পোখরা ভ্রমণ, ছবিঃ লেখক

মোটামুটি ২ ঘণ্টার জন্য সাইকেল ভাড়া নিয়ে নিলে পোখরা এয়ারপোর্ট হয়ে আবার ফেওয়া লেকের উল্টো পাশ ধরে ফিরে আসতে পারবেন, এতে করে অনেকটা দেখা হয়ে যাবে পোখরা শহরের। রাতের বেলায় সাইকেল জমা করে এসে ফেওয়া লেকের পাড়ে বসুন আর ফেওয়া লেকের রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করুন। রাতের সৌন্দর্য কিন্তু ফেওয়া লেকের পানিতে নয়, খোলা আকাশের নিচে আশেপাশের যে রেস্টুরেন্টগুলো আছে সেগুলোয়।

চাইলে সেখানে বসে আড্ডাও দিতে পারেন সবাই মিলে, হালকা কিছু খাওয়া-দাওয়াও করলেন। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো সন্ধ্যার পরে ফেওয়া লেকের পাড়ের রেস্টুরেন্টগুলোতে গানের আসর বসে, কী অভাবনীয় এক সন্ধ্যা-অনুভূতির সৃষ্টি হয় তা কেবল যারা গিয়েছেন তারা জানেন।

ফেওয়া লেকের পাশে জীবনের জয়গান, ছবিঃ লেখক

দিনের বেলায় সাইকেল ভাড়া করার আগেই যে হোটেলে উঠেছেন সেখানে পোখরা সিটি ট্যুর করার জন্য মাইক্রো ঠিক করে রাখতে বলবেন। যদি হোটেল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তেমন সহায়তা না করতে পারে তবে অনেক ট্যুর এজেন্সী পেয়ে যাবেন পোখরা সিটি ট্যুর দেয়ার জন্য। মোটামুটি ৬-৭ জন আরামে বসতে পারবেন এমন একটা মাইক্রোর ভাড়া ৭,৫০০ রুপি থেকে শুরু করে ১০,০০০ রুপি পর্যন্ত বলতে পারে।

বিশ্ব শান্তি স্তুপা, ছবিঃ লেখক

দেখে শুনে যাচাই করে তারপর যেটা সবচেয়ে কম সেটাতেই রাজী হবেন তবে অবশ্যই সেটা রাত ৮টার আগে ঠিক করে ফেলতে হবে। রাত ৮টার পর পোখরার সব দোকান বন্ধ হওয়া শুরু করে। পোখরা সিটি ট্যুরে মাইক্রো দিয়ে ঘুরে ফেলবেন সারাংকোট, বিন্দুবাসিনী মন্দির, শ্বেতী নদী, ব্যাট কেইভ, মাহেন্দ্রা কেইভ, বেগানাস লেক, বিশ্ব শান্তি স্তুপা। সব কয়টা জায়গা ঘুরতেই ভালো লাগবে, দুপুরের আগে আগেই শেষ হয়ে যাবে।

কী খাবেন:

পুরো নেপালে খাবার জন্য একটা ভালো জিনিস পাবেন সেটা হলো মোমো। যদি মোমো না খেতে ইচ্ছে করে তবে ফ্রাইড রাইস অথবা নুডুলস খেয়ে থাকতে হবে। পোখরায় আপনি নিরামিষ থালি পাবেন, প্রতি থালি ৩০০ রুপি করে যতদূর মনে পড়ে।

প্রতিবেলায় তো আর খারাপ খাওয়া যায় না, তাই একবেলা হলেও ভাত খাওয়ার চেষ্টা করুন। পোখরা ঘোরার দিনগুলোতে মোটামুটি খাবার খরচ হবে প্রতিদিন ৫০০ নেপালি রুপি।

বেগানাস লেক, ছবিঃ লেখক

পোখরা অনেক সুন্দর সাজানো গোছানো শহর। ফেওয়া লেকের পাড়ে গড়ে ওঠা এই শহরে বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করা যায় যাদের মধ্যে প্যারাগ্লাইডিং অন্যতম। ফেওয়া লেকের উপর আধ-ঘণ্টা প্যারাগ্লাইডিং করতে মোটামুটি ৪,৫০০ রুপি লাগে। তাই প্যারাগ্লাইডিং করার শখ থাকলে আগে থেকেই টাকা গুছিয়ে নিয়ে যেতে হবে, পোখরা গিয়ে হুট করে পরিকল্পনা করলে বিপদে পড়ে যাবেন টাকা-পয়সা নিয়ে। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের কাঠমান্ডু ভ্রমণ

মদেসিয়াদের গল্প