বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের কাঠমান্ডু ভ্রমণ

বাংলাদেশ অনেক ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে দেশটির কিন্তু কোনো কমতি নেই। প্রচুর সুন্দর জায়গা আছে এই দেশে ঘুরে বেড়ানোর মতো। অত বেশি টাকাও দরকার হয় না দেশের ভেতর সব কয়টি জায়গায় ঘুরে আসতে। বাংলাদেশ ঘুরে দেখা শেষ হলে বেশিরভাগ বাংলাদেশি পর্যটক দেশের বাইরে ঘুরতে যায়, এই রীতি আজকের না। তবে আগে মানুষ অনেক টাকা খরচ করে বাইরে ঘুরতে যেতো, এখন আর এটা হয় না। এখন বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে বাইরে ভ্রমণের ক্ষেত্রে।

এখন আর বাইরে ঘুরতে যেতে অত টাকার প্রয়োজন হয় না। হাতে সময় আর ঘুরতে গেলে যে টাকা না হলেই নয় সেটা থাকলে ঘুরে আসা সম্ভব বাইরের কোনো দেশ থেকে। বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে সহজ বিদেশ ভ্রমণ সম্ভব প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল আর ভুটানে। নেপালে ইদানিং বিমান দুর্ঘটনার মাত্রা বাড়লেও রয়েছে নেপাল যাওয়ার বিকল্প পন্থা। খুবই কম খরচে নেপালের কাঠমান্ডু, পোখরা আর মুসতাং জেলার জমসম থেকে ঘুরে আসা যায়। বাজেট ট্রিপের এই সিরিজে আজ গল্প করবো কীভাবে নেপালের কাঠমান্ডুতে কম খরচে ঘুরে আসা যায় তা নিয়ে। চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

নেপাল, ছবিঃ লেখক

কীভাবে যাবেন:

বাংলাদেশি হিসেবে বেশ কয়েকটি দেশে আপনি অন এরাইভাল ভিসা পাবেন। নেপাল, ভুটান তাদের মধ্যে অন্যতম। অন এরাইভাল ভিসার মানে হচ্ছে নেপালে হোটেল বুক করা থাকলে এবং উড়োজাহাজের টিকেট কাটা থাকলে কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টে নামামাত্র তারা আপনাকে এক মাসের একটি ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়ে দেবে একটা ফর্ম পূরণ করার মাধ্যমে।

বাংলাদেশ থেকে নেপাল বিমানে যাওয়া-আসা মানে রিটার্ন টিকেটের ভাড়া প্রায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। যাদের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা আছে তারা একটু কষ্ট করে হলেও সড়ক পথে নেপাল যেতে পারেন। এক্ষেত্রে দরকার হবে ট্রানজিট ভিসার।

নেপাল- ভারত সীমান্ত, ছবিঃ লেখক

এক্ষেত্রে প্রথমেই ঢাকার নেপাল এম্বাসিতে আবেদন করতে হবে নেপালের ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য। নেপালের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে তেমন কোনো ঝামেলা হয় না যদি আপনি অন্ততপক্ষে একবার ভারতে গিয়ে থাকেন। নেপাল এম্বাসিতে পাসপোর্ট জমা দেয়ার একদিন পরেই ভিসাসহ পাসপোর্ট দিয়ে দেবে আপনাকে নেপাল এম্বাসি। প্রথমবার নেপালের ট্যুরিস্ট ভিসা ফি সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ফ্রি।

নেপালের ট্যুরিস্ট ভিসা হয়ে গেলে নেপালের হোটেল বুকিংয়ের কপি, শ্যামলি বা গাবতলি থেকে কেনা ঢাকা-বুড়িমারি-ঢাকার হানিফ বাসের টিকেট, ট্রানজিট ভিসার আবেদনপত্র এবং প্র‍য়োজনীয় কাগজপত্র সহ পাসপোর্ট জমা দিতে হবে গুলশানস্থ আইভ্যাকে। ভিসা ফি ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসার মতোই ৭০০ টাকা। সাধারণত যাত্রার একদিন আগে আপনাকে পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হবে আর ভিসার মেয়াদ থাকবে ১৫ দিন, পোর্ট হিসেবে দেয়া থাকবে চেংড়াবান্ধা রানীগঞ্জ।

কাকরভিটা থেকে কাঠমান্ডু যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

ঢাকা থেকে হানিফের বাস ছাড়ে রাত ৮টায় আর বুড়িমারী পৌঁছায় একদম ভোরে। এত ভোরে বর্ডার নাও খোলা থাকতে পারে। তাই বুড়িমারী বর্ডারে বুড়ির হোটেলে নাস্তা করে ইমিগ্রেশন শেষ করে ঢুকে পড়ুন ভারতে। ওইপাশ থেকে অটো নিয়ে চলে যাবেন বিশ্বরোড। বিশ্বরোড থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার বাস পাওয়া যাবে একটু পর পর, ভাড়া ৬০ রুপি। শিলিগুড়ি পৌঁছাতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।

শিলিগুড়ি নেমে নেপাল পানির ট্যাংকির বাস খুঁজবেন। শিলিগুড়ি থেকে পানির ট্যাংকি যেতে মোটামুটি ৪০ মিনিটের মতো সময় লাগে, ভাড়া ২৫ রুপি। পানির ট্যাংকি পৌঁছানোর পর রানীগঞ্জ ইমিগ্রেশন পড়বে। সেখান থেকে ভারতের এক্সিট সীল নিয়ে ঢুকে পড়ুন নেপালে। নেপাল ইমিগ্রেশন অফিসে গিয়ে পাসপোর্ট জমা দিন আর এন্ট্রি সীল নিয়ে নিন।

ভারতের এদিকে জায়গার নাম রানীগঞ্জ আর ওপাশে নেপালের জায়গার নাম কাকরভিটা। মাঝখানে শুধু একটি সেতু। কাকরভিটা থেকে কাঠমান্ডুর সরাসরি বাস আছে। নন-এসি বাস ভাড়া ৬০০-৭০০ ইন্ডিয়ান রুপি আর এসি বাস ১,০০০ ইন্ডিয়ান রুপি। পুরো নেপালেই ইন্ডিয়ান রুপি চলবে, তবে টাকা, ডলার বা ইন্ডিয়ান রুপি যাই নিয়ে থাকেন না কেন সেটা
নেপালি রুপিতে ভাঙিয়ে নিলে সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়। কাকরভিটা থেকে কাঠমান্ডু যেতে সময় লাগে ১২-১৩ ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন:

হোটেল হিমালয়ান দর্শন, ছবিঃ লেখক

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। কাঠমান্ডুতে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো থামেল। দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট আর থাকার হোটেল দিয়ে ভর্তি এই থামেলের খুব কাছেই রয়েছে নেপালের অন্যতম বিখ্যাত জায়গা দরবার স্কয়ার। যেহেতু নেপালের হোটেল আগে থেকেই বুক করে তার কাগজপত্র ভিসা পেতে ভারতীয় এম্বাসিতে জমা দিতে হবে তাই দেখে শুনে হোটেল বুক দিন “Booking. com” থেকে।

থামেলে আগে থেকে হোটেল বুক দিয়ে গেলে বেশ ভালোই লাভ, প্রতি ৩ জনের রুম ভাড়া মাত্র ১০ ডলার করে অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় হিসেব করলে তা দাঁড়ায় মাত্র ৮৫০ টাকায়। এমনই একটি হোটেল হলো “Hotel Himalayan Darshan”। হোটেলটি থামেলের কেশর মহলে অবস্থিত। হোটেলটির নেপালি ফোন নাম্বার (+97714411884) দিয়ে দিলাম। নেপালে ঢুকেও ফোন দিয়ে রুম বুক করা যাবে।

কোথায় ঘুরবেন:

কাঠমান্ডুতে ঘুরতে যাওয়ার জায়গা অনেক। কাঠমান্ডুর সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা নাগরকোট। এছাড়াও রয়েছে প্রচুর মন্দির আর বৌদ্ধ স্থাপনা। নাগরকোট যাওয়ার জন্য একটা ক্যাব ঠিক করা যেতে পারে যেটি খুব সকালে আপনাকে নাগরকোটে সূর্যোদয় দেখাবে।

নাগরকোট থেকে সূর্যোদয় দেখে ক্যাব নিয়ে পুরো কাঠমান্ডু ঘুরে আসা যায়। যদি আগে কখনো কাঠমান্ডু না গিয়ে থাকেন তবে ক্যাবই আপনার ভরসা। পুরো কাঠমান্ডু ক্যাবে ঘুরতে খরচ হতে পারে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ নেপালি রুপি। বাংলাদেশী টাকা থেকে নেপালের টাকার দাম কিন্তু কম।

পশুপানিপথ মন্দির, ছবিঃ লেখক

বাংলাদেশি ১ টাকা নেপালের ১.৪০ রুপির সমান। তাই ২,০০০ নেপালি রুপি চাইলে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই। নেপালে সবচেয়ে ভালো হয় ডলার নিয়ে গেলে, থামেলে ডলার নেপালি রুপিতে পরিবর্তন করলে বেশ ভালো দাম পাওয়া যায়। কাঠমান্ডুর সারাদিনের ট্যুরে ড্রাইভারকে বলে নেবেন আপনি নাগরকোট, পশুপতিনাথ মন্দির, শম্ভুনাথ মন্দির, হনুমান ধোকা, গার্ডেন অফ ড্রিমস ইত্যাদি জায়গা ঘুরতে চান।

বাকিটা ড্রাইভারের উপর ছেড়ে দিন, নেপালি মানুষজন এমনিতেই অনেক ভালো স্বভাবের। নিজেকে অবশ্যই বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দিন, কারণ ভারতীয়দের সাথে তাদের একটা শীতল যুদ্ধ চলে।

কী খাবেন:

নেপালে গেলে সবচেয়ে বেশি যে খাবারটি খাওয়া হবে তা হলো নেপালি মোমো। যারা এখনো মোমো চেখে দেখেননি তারা নেপালে গিয়ে গোগ্রাসে মোমো খাবেন এটা আগে থেকেই বলা যায়। মমো খাবারটাই অনেকটা এরকম। নেপালে একদম অহরহ ভাত-মাছ-মুরগীর মাংস পাওয়া যাবে না, গেলেও খুব কম দোকানে। অধিকাংশ রেস্টুরেন্টে এই বাঙালি খাবারের দাম অনেক বেশি, প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ নেপালি রুপি। নেপালে যে খাবারগুলো একটু সস্তা তা হলো, বাফেলো ফ্রাইড রাইস, প্লেইন ফ্রাইড রাইস, মোমো আর নুডুলস।

ডিম এবং মুরগীর মাংসের দাম নেপালে অনেক বেশি। নেপালে একটি পেঁয়াজ-মরিচ ছাড়া সাদামাটা ডিম ভাজি ৪০ রুপি দিয়ে খেতে হয়েছে কাঠমান্ডুতে। আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে এই ডিমের দাম বেড়ে ১০০ রুপিও হয়েছে। তাই খাবার-দাবারের অত সুবিধে নেই নেপালে, নিরামিষ থালিও এখানে ২০০ রুপি করে। প্রতিদিন তাই খাবার খরচ হিসেব করলে প্রায় ৫০০ নেপালি রুপি চলে যাবে।

চিকেন ফ্রাইড রাইস, ছবিঃ লেখক

কাঠমান্ডু নেপালের রাজধানী হলেও থামেলসহ কিছু এলাকা বাদে অত উন্নত নয় শহরটি। এর মূল কারণ ভূমিকম্প। প্রচুর ভূমিকম্পের কারণে সরকার আধুনিক ভবনাদি বানানোর ঝুঁকি নেয় না। তবে পুরো কাঠমান্ডু ঘুরতে একদিন কি সর্বোচ্চ দুইদিন লাগবে। থামেলের মার্কেট, দরবার স্কয়ার অনেক ভালো লাগবে।

নেপালের অধিকাংশ মানুষ হিন্দি ভাষা বোঝে এবং হিন্দিতে কথাও বলতে পারে। তাই আপনি হিন্দি ভাষা বলতে পারলে আপনার কোনো সমস্যা হবে না, আর যদি না বলতে পারেন তবে ইংরেজী ভাষার সাহায্য তো আছেই। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরব আমিরাতের শ্রেষ্ঠ আমিরাত দুবাইয়ের কিছু বিখ্যাত স্থান

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের পোখরা ভ্রমণ