বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: স্বপ্নময়ী গন্তব্য মানালি ভ্রমণ

ভারতের শিমলা মানালির নাম শোনেননি এমন পর্যটক পাওয়া দুষ্কর। বরফের চাদরে ঢাকা বিস্তীর্ণ প্রান্তরের হিমাচল সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে তার ছোট বড় শহরগুলোয়। সেই শহরগুলোর মধ্যেই এক অন্যতম সুন্দর শহর মানালি। শিমলা থেকে আরো ৮-৯ ঘণ্টা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিলে পাওয়া যাবে মানালির সন্ধান। হিমাচল প্রদেশের রানী হিসেবে খ্যাত মানালি প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে যাবে যে কারো।

যারা ভাবছেন এত সুন্দর জায়গায় যেতে টাকাটাও হয়তো বেশি লাগবে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তেমন না। আপনার হাতে সময় থাকতে হবে মানালি ঘুরে আসতে হলে। ভারতের একদম উত্তরের প্রদেশ হিমাচল প্রদেশের এই মানালিতে প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারিতে প্রচুর পর্যটক যায়।

প্রচণ্ড কনকনে ঠান্ডায় হাঁটু সমান বরফের চাদরে ঢেকে যায় মানালির রাস্তা-ঘাট নগর। বেশি বরফ পড়ে গেলে মানালির অনেক জায়গায় যাওয়াও যায় না। মানালি ঘুরতে যে বেশি একটা টাকার প্রয়োজন নেই তা এই লেখাটি পুরোটা পড়লেই বুঝবেন। বাজেট ট্রিপ সিরিজের এ লেখায় করবো কম খরচে মানালি ঘুরে আসার গল্প।

ছবি- লেখক

সাধারণত পর্যটকরা কুল্লু অথবা শিমলা ঘুরে তারপর মানালির দিকে পা বাড়ায়। কারণ মানালি যেতে হলে প্রথমেই শিমলা চলে আসতে হবে। শিমলার বাজেট ট্রিপের গল্প করেছি আগের লেখায়। শিমলার বাজেট ট্রিপ শেষে চলুন পা বাড়াই মানালিতে কীভাবে কম খরচে ঘুরে আসবেন সেদিককার গল্পে।

কীভাবে যাবেন:

মানালি যেতে হলে প্রথমেই শিমলা চলে আসতে হবে। সরাসরি মানালির কোনো বিমান বা ট্রেন নেই। শিমলা আসার দুটি উপায়, বিমান এবং ট্রেন। বিমানে শিমলা আসলে ৮-১২ হাজার টাকা খরচ হবে রিটার্ন টিকেট সহ। আর ট্রেনে আসলে সব মিলিয়ে ৮০০ রুপির মধ্যে শিমলা পৌঁছে যেতে পারবেন। শিমলা থেকে দুইভাবে যাওয়া যায় মানালি, প্রাইভেট ক্যাব অথবা বাসে।

মানালির রাস্তায়, ছবিঃ লেখক

শুধু মানালির যাওয়ার জন্য প্রাইভেট ক্যাব ভাড়া করলে ঠকে যাবেন, তার চেয়ে শিমলায় গিয়ে বিভিন্ন ট্যুর এজেন্সীর সাথে এভাবে কথা বলুন যে আপনি মূলত শিমলা-মানালি ঘুরতে চান। তারপর তারাই আপনাকে শিমলা লোকাল ট্যুর, শিমলা থেকে মানালি ক্যাব, মানালি লোকাল ট্যুর এবং রোথাং পাসে যাওয়ার অনুমতি সহ যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেবে।

সব মিলিয়ে জনপ্রতি ২,৮০০ থেকে ৩,২০০ রুপি নিতে পারে। আর যদি ভেঙে ভেঙে যেতে হয় তবে শিমলা আসার পর শিমলা নিউ বাস স্টপ থেকে বাস পাওয়া যায় মানালি যাওয়ার, ভাড়া ৮০০ রুপি করে। সময় লাগবে ৮-৯ ঘণ্টা।

কোথায় থাকবেন:

মল রোড, ছবিঃ লেখক

শিমলার তুলনায় মানালিতে হোটেল ভাড়া তুলনামূলকভাবে কম। মানালিতেও শিমলার মতো আছে মল রোড। সেই মল রোডের পাশেই আছে প্রচুর হোটেল। মানালিতে তাই থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো মল রোড। মোটামুটি ৬০০ থেকে ৮০০ রুপির মধ্যে চার জনের থাকার জন্য খুব ভালো রুম পেয়ে যাবেন।

মানালিতে প্রচুর ঠাণ্ডা, তাই রুমে গিজার মানে গরম পানির ব্যবস্থা আছে কিনা যাচাই করে তবেই রুম নেবেন। কিছু কিছু হোটেলে সকালের নাস্তা অন্তর্ভুক্ত থাকে, আবার বেশিরভাগ হোটেলে থাকে না। এটা যাচাই করে নিতে পারেন।

কোথায় এবং কীভাবে ঘুরবেন:

যদি আপনি শিমলা থেকে বাসে করে মানালি আসেন তবে আপনাকে নামিয়ে দিবে ভলবো বাস স্টেশনে, সেখান থেকে হেঁটে হেঁটেই মল রোডে চলে যাওয়া যাবে। মল রোডে হোটেল নিয়ে ফ্রেশ হয়ে কথা বলে নিন হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে মানালি ঘুরে ফেলার ব্যাপারে।

মানালির লোকাল স্পটগুলো ঘুরতে সর্বোচ্চ একদিন সময় লাগবে, ক্যাবে করে ঘুরবেন হাদিম্বা টেম্পল, বন বিহার, ক্লাব হাউস, মানো টেম্পল, বশিষ্ঠ ওয়ার্ম ওয়াটার ফল টেম্পল, রাম মন্দির ইত্যাদি। পুরো দিনের ঘোরাঘুরিতে ক্যাব ভাড়া নেবে ১,০০০ থেকে ১,২০০ রুপির মতো। তবে অবশ্যই এক্ষেত্রে দরদাম করে নিতে ভুলবেন না, ভাগ্য ভালো থাকলে আরো কমেও পেয়ে যেতে পারেন।

হাদিম্বা টেম্পল, ছবিঃ লেখক

মানালির স্থানীয় স্পটগুলো ঘুরে ফেলা হয়ে গেলে পরদিনের জন্য গাড়ি ঠিক করুন রোথাং যাওয়ার। রোথাং পাস মানালি এবং লাদাখের মধ্যবর্তী একটি পাস যা প্রায় ১৩,০৫৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। রোথাং যাওয়ার জন্য আগে থেকে অনুমতি নিতে হয় যা আপনার গাড়ির ড্রাইভারই আপনাকে নিয়ে দেবে, অনুমতির জন্য খরচ করতে হবে ৭০০ রুপি।

জানুয়ারির দিকে যখন বেশ বরফ পড়ে তখন রোথাং যাওয়ার রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়, তাই রোথাং যেতে হলে নভেম্বরের যে কোনো সময় এবং ডিসেম্বরের একদম শুরুর দিকে মানালি যাওয়া উচিত।

ক্লাব হাউজ, ছবিঃ লেখক

মানালি থেকে রোথাং যাওয়ার গাড়ি ভাড়া আসা-যাওয়া মিলিয়ে ৮০০-১,০০০ রুপি রাখবে। মানালি থেকে আপনি ইচ্ছে করলে লাদাখ, কুল্লু, স্পিতি ভ্যালি এসব জায়গাও যেতে পারবেন, তবে তার জন্য দরকার হাতে আরো সময় এবং টাকা। মানালি থেকে ফেরার সময় শিমলা হয়ে ফিরতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে সময় লাগবে প্রচুর।

রোথাং পাস, ছবিঃ লেখক

মানালি গিয়ে সবাই ফিরে আসার সময় মানালি থেকে বাসে করে দিল্লী চলে আসে, সময় লাগে ১২ ঘণ্টার মতো এবং ভাড়া লাগে ৯০০ রুপি। দিল্লী থেকে হাওড়ার ট্রেন কালকা মেইল (ট্রেন নং ১২৩১২) ছেড়ে যায় প্রতিদিন সকাল ৬টায়, হাওড়া পৌঁছাতে সময় লাগে ২৫ ঘণ্টা আর ভাড়া লাগে ৬০০ রুপির মতো। এভাবে মানালি থেকে হাওড়া ফিরে আসতে সড়কপথে সবচেয়ে কম সময় লাগে।

কী খাবেন:

মানালিতে মল রোডের পাশেই রয়েছে প্রচুর খাবার হোটেল। অধিকাংশ ভারতীয় হোটেলই শতভাগ নিরামিষ রান্না করে। হিমাচল প্রদেশে আসলে আপনার অনেকটা অভ্যেস হয়ে যাবে নিরামিষ খেতে খেতে। তাই যদি একটু মাছ-মাংসের সন্ধান খুঁজতে থাকেন তবে খুব কাছেই রয়েছে বাঙালি হোটেল। সেখানে চিকেন থালি, মাটন থালি, এগ থালি সবই পাওয়া যাবে। দাম ১৬০ রুপি থেকে ২৪০ রুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

দামের দিক দিয়ে খুবই সাশ্রয়ী এই থালিগুলো কারণ পরবর্তীতে মূল আইটেম মানে চিকেন, মাটন বা ডিম বাদে থালিতে যা যা আছে তা তাই পাওয়া যাবে যতবার ইচ্ছে ততবার। তাই দেশের বাইরে অনেকদিন ছাইপাঁশ খেয়ে যখন একদম ঘরের খাবার পাবেন তখন নিশ্চয়ই তৃপ্তি সহ পেটভরে খেতে চাইবেন, এই ইচ্ছেটাতেই বাঙালি হোটেলগুলো কোনোরকম কার্পণ্য করে না। প্রতিদিন খাবার খরচ যেতে পারে ৪০০ রুপির মতো।

মানালির চিকেন থালি, ছবিঃ লেখক

মানালি ঘুরে আসার জনপ্রতি যাবতীয় খরচাদি ৪ জনের গ্রুপের জন্য নিচে দিয়ে দিলাম-
১. হাওড়া- কালকা- শিমলা- মানালি= ৬৮০+৫০+৮০০ = ১,৫৩০ রুপি
২. মানালি লোকাল ট্যুর= ৩০০ রুপি (মোট ১২০০ রুপি)
৩. মানালি- রোথাং পাস ক্যাব ভাড়া= ২৫০ রুপি (মোট ১০০০ রুপি)
৪. রোথাং পাসের অনুমতি খরচ= ১৭৫ রুপি (মোট ৭০০ রুপি)
৫. হোটেল ভাড়া= ২০০ রুপি (মোট ৮০০ রুপি)
৬. খাবার খরচ ( মানালিতে ২ দিন)= ৮০০ রুপি
৭. মানালি- দিল্লি বাস ভাড়া= ৯০০ রুপি

রোথাং যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক


মোট= ৪,১৫৫ রুপি অর্থাৎ ৫,৫০০ টাকার মধ্যে মানালি ভ্রমণ শেষ হয়ে যাবে। মানালিতে শপিং করার মতো অনেক কিছু আছে। তাই শপিং করার জন্য অতিরিক্ত টাকা নিয়ে গেলে মন্দ হবে না। মানালির লেদার জ্যাকেট মোটামুটি ভাল মানের, ১,০০০ টাকার ভেতর ভালো একটা জ্যাকেট হয়ে যাবে। তবে দেখে শুনে কিনতে হবে জ্যাকেট বা স্যুট জাতীয় সব কাপড়।

প্রচুর ছোট ছোট সুন্দর সাজিয়ে রাখার জিনিস পাওয়া যায় মানালির রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে। সর্বোপরি মানালি অনেক পরিষ্কার শহর। এর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সাথে সাথে নিজের দেশে আসার দাওয়াতটাও দিয়ে আসতে ভুলবেন না সে দেশের মানুষদের। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিস্ময়কর খুম রাজ্যের আদিঅন্ত

চট্টগ্রামে আড্ডাবাজি করার মতো কিছু জায়গা