বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: দিল্লি ও আগ্রা ভ্রমণ

কবি বলেছেন, অদ্ভুত সুন্দর কিছু দেখতে হলে ঘর থেকে বের হয়ে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না, আশেপাশেই পাওয়া যায় অদ্ভুত সুন্দরের সন্ধান। এর জন্য ঘর থেকে বের হওয়াটাই বেশি জরুরি। আমাদের চারদিকে এমন সব দু্র্দান্ত জায়গা আছে যেখানে খুব কম খরচেই ঘুরে আসা যায়। আছে দেশের ভেতর প্রচুর জায়গা, রয়েছে দেশের বাইরেও অনেক স্থান। একটু বুদ্ধি আর অনেকখানি পরিকল্পনা আপনাকে করে তুলবে কম খরচে এক একটা জায়গা ঘুরে আসায় পারদর্শী।

শিক্ষা জীবনে থাকাকালীন আমরা অনেকেই চেষ্টা করি একটু ঘোরাঘুরি করে বিশ্বকে জানার, বিশ্বমানের রীতিনীতি বোঝার। ইচ্ছে থাকে প্রবল, কিন্তু পকেটের অবস্থা সায় দেয় না প্রায় সময়ই। বিলাসবহুলভাবে ঘুরে আসতে আজকের পর্যটকরা আগ্রহী নয়, তাদের কাছে প্রকৃতি বা অবাক করা সৌন্দর্য প্রিয় আরামের চেয়ে। তাই বেদুইন হয়ে পথে পথে অক্লান্ত অসীম পথ পাড়ি দেয়ায় আজকের পর্যটকরা একটুও পিছুপা হয় না। এদেরকে ইংরেজীতে বলা হয় “বাজেট ট্রাভেলার”।

নিজের দেশ ঘুরে দেখা মোটামুটি শেষ হলে আমাদের জন্য সবচেয়ে সহজ গন্তব্য পাশের দেশ ভারত। ভারতের সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো এটি এতই বড় দেশ যে একই দেশে একই সাথে এক জায়গায় বরফ পড়ে তো আরেক জায়গায় কাঠফাটা রোদের দাবদাহে জীবন হয় অতিষ্ঠ। বলছি গরমের রাজ্য ভারতের রাজধানী দিল্লির কথা। বাজেট ট্রিপের এই সিরিজের আজকের লেখাটি দিল্লি এবং আগ্রায় কীভাবে কম খরচে ঘুরে আসা যাবে তার উপায় নিয়ে সাজানো। চলুন তাহলে শুরু করা যাক দিল্লি এবং আগ্রার বাজেট ট্রিপের গল্প।

লোটাস টেম্পল, ছবিঃ wallpaperclicker.com

কীভাবে যাবেন:

দিল্লি যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সহজ আরামদায়ক উপায় হলো বিমান, বিমানের টিকেট এক-দেড় মাস আগে কাটলে ১০,০০০ টাকার ভেতর যাওয়া-আসার রিটার্ন টিকেট পেয়ে যাবেন। আর যদি ভারতে ঢুকে ভারতীয় আন্তঃদেশীয় ফ্লাইট যেগুলো দিল্লি উড়ে যায় সেগুলোর টিকেট কাটেন তবে সাশ্রয় হবে আরো দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

এক্ষেত্রে কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে দিল্লি এয়ারপোর্টের বিমানের টিকেট কাটা যেতে পারে। যাদের বিমানে ভ্রমণ করার এবং এত টাকা শুধু বিমান ভাড়ায় খরচ করার ইচ্ছে নেই তারা কলকাতার হাওড়া স্টেশন থেকে দিল্লি যাওয়ার ট্রেনের টিকেট কেটে নিতে পারেন।

দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন, ছবিঃ staticflickr.com

হাওড়া থেকে প্রচুর ট্রেন যায় দিল্লির উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রেও টিকেট কাটতে হবে অন্ততপক্ষে এক মাস আগে, টিকেট ভাড়া স্লিপার শ্রেণীর ৫৫০ থেকে ৭০০ রুপি। হাওড়া থেকে সন্ধ্যা ৭:৪০ এ কালকা মেইল (ট্রেন নং ১২৩১১) ছেড়ে যায় দিল্লির উদ্দেশ্যে, থামে ওল্ড দিল্লি স্টেশনে।

কালকা মেইলে স্লিপার শ্রেণীর ভাড়া ৬০৫ রুপি। হাওড়া থেকে দিল্লি যেতে সময় লাগবে পাক্কা এক দিন এক ঘণ্টা মানে ২৫ ঘন্টা। ওল্ড দিল্লি স্টেশনে নেমে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নিউ দিল্লি স্টেশনের আশেপাশে চলে আসা যাবে।

কোথায় থাকবেন:

চাঁদনী চৌক ,ছবিঃ goibibo.com

নিউ দিল্লি রেলস্টেশনের পাশে থাকাই সবচেয়ে বেশি সুবিধাজনক। এখানে কম খরচে মোটামুটি ভালো মানের হোটেল পাওয়া যাবে। হোটেল ভাড়া ১,২০০ রুপির ভেতর সীমাবদ্ধ। ১,২০০ রুপি দিয়ে চার জনের দুটি রুম বা এক রুমেই চার জনের থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

ভারতের যে কোনো হোটেলের অধিকাংশতেই এক রুমে তিন জন থাকার নিয়ম আছে। অতিরিক্ত একজন থাকলে তার জন্য কথা বলে নিতে হবে হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে, দিতে হবে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ রুপি। এটি একটি উটকো ঝামেলা, কিন্তু সব হোটেলেই এটি খুব কড়াকড়িভাবে মানা হয়।

কোথায় এবং কীভাবে ঘুরবেন:

দিল্লি ঘুরে ফেলা যায় দুইভাবে। প্রথমটি হলো দিল্লির সিটি বাসে করে আর দ্বিতীয়টি হলো ক্যাব ভাড়া করে। দিল্লি কম খরচে ঘুরতে হলে সিটি বাসের বিকল্প নেই। ইন্ডিয়া গেটের কাছ থেকে খুব সকালে প্রায় ভোর ৬টা থেকে ৬:৩০ এর মধ্যে পাওয়া যাবে এই সিটি বাস।

হরেক দেশের নানান মানুষে বাস ভরে যাবে একসময়। বাসের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার কিচিরমিচির হবে, পরিচয় হবে দেশান্তরের মানুষের সাথে। দিল্লির মূল ভ্রমণস্থানগুলোর সবগুলোতেই যাবে এই সিটি বাস। ভাড়া খুব সম্ভবত ৩৫০ থেকে ৪০০ রুপি। সাথে থাকবে গাইড, বলবে প্রতিটি জায়গার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত তাৎপর্য।

দিল্লি সিটি বাস, ছবিঃ hindustantimes.com

কেউ যদি একান্তই নিজের মতো করে ঘুরতে চান তবে ক্যাব ভাড়া করে নিন। সারাদিনে বিভিন্ন দূর্গ, জাদুঘর আর প্রত্নতাত্ত্বিক সব নির্দশন দেখিয়ে আনবে আপনাকে আর ভাড়া নেবে ১,৫০০ রুপির মতো।

দিল্লির ঘুরে দেখার মতো জায়গাগুলো হলো “দ্য রেড ফোর্ট”, কুতুব মিনার, ইন্ডিয়া গেট, জামে মসজিদ, চাঁদনী চৌক, পুরান দিল্লি, হুমায়ুনের স্মৃতিস্তম্ভ, লোটাস টেম্পল ইত্যাদি। সব কয়টা জায়গা ঘুরতে সারাদিন লেগে যাবে যে কারো।

দ্যা রেড ফোর্ট , ছবিঃ ytimg.com

দিল্লি ঘুরে দেখা শেষ হলে পরদিন নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে উঠে পড়ুন আগ্রা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে যাওয়ার ট্রেনে। দিল্লি থেকে আগ্রা ট্রেনে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ, ভাড়া স্লিপার ক্লাসে ১৮০ রুপি। এই ট্রেনের টিকেট আগে থেকে কাটার অতটা দরকার নেই, স্টেশনে গিয়েই ট্রেনের টিকেট কেটে নেয়া যাবে।

আগ্রা স্টেশনে নেমে ট্যাক্সি নিয়ে চলে যান তাজমহল স্কয়ারে। স্টেশন থেকে ৭ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত তাজমহল স্কয়ার, তাই সিএনজি নিয়েও চলে যাওয়া যাবে, ভাড়া রাখতে পারে সর্বোচ্চ ৩০-৪০ রুপি।

তাজ মহল, ছবিঃ লেখক

তাজমহল স্কয়ারে ঢুকতেই টিকেট কাউন্টার পড়বে তাজের। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য টিকেটের মূল্য ৫৩০ রুপি, ভারতীয়দের জন্য শুধু ৩০ রুপি। পাসপোর্ট দেখিয়ে টিকেট কিনে ঢুকে পড়ুন তাজে। তাজমহল দেখা শেষে ঘুরে আসতে পারেন আগ্রা ফোর্ট, আকবরের সমাধিসৌধ, মেহতাব বাগ এবং মতি মসজিদ থেকে।

এই জায়গাগুলো ঘুরতে ট্যাক্সি ক্যাব অথবা সিএনজির যেকোনো একটা ভাড়া করতে পারেন। সিএনজিতে ভাড়া অপেক্ষাকৃত কম হবে, ৫০০ রুপির ভেতর একটি সিএনজি ভাড়া করা যাবে।

কী খাবেন:

দিল্লিতে একসময় মোঘলদের সাম্রাজ্য ছিল। তাই মোঘলাই যত খাবার দাবার খেতে ইচ্ছে করে তার সবকটিই পাওয়া যাবে এখানে। শাহী বিরিয়ানি থেকে শুরু করে রাজস্থানি জীভে পানি আনা সব খাবার-দাবার আর মজাদার সব স্ট্রিটফুড অবশ্যই চেখে দেখা উচিত। তবে শরীরের দিকে খেয়াল রেখে খাবার দাবারে মনোযোগ দিতে হবে যাবে ভ্রমণের দিনগুলোতে খাবারের কারণে শরীর অসুস্থ না হয়ে পড়ে।

দিল্লি আর আগ্রায় খাবার দাবারে প্রতিদিন মোটামুটি খরচ হবে ৩০০ থেকে ৪০০ রুপির মতো। তবে আপনি চাইলে খাবার খরচ কমিয়ে আনতে পারেন সকালে হালকা নাস্তা করে দুপুরে এবং রাতে ভাল খাবার খেয়ে। এটা সম্পূর্ণই আপনার খাওয়া-দাওয়ার অভ্যেস আর ইচ্ছের উপর নির্ভর করবে আপনি খাওয়া-দাওয়ায় কত খরচ করতে চাচ্ছেন।

শাহী বিরিয়ানি, ছবিঃ dfordelhi.in

দিল্লি এবং আগ্রায় ঘুরে আসার মতো প্রচুর জায়গা আছে। সারাদিন ঘুরলেও মনে হবে পুরো দিল্লির হয়তো কিছুই দেখা হয়নি। আর আগ্রার তাজমহলের কথা নতুন করে কিছুই বলার নেই, সবাই জানে এই উপমহাদেশে এরকম স্থাপনা আর একটাও নেই। তাই দিল্লি এবং আগ্রা ভ্রমণে মনে পাবেন যথেষ্ট তৃপ্তি। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- guidevilla.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রিছাং ঝর্ণা: উচ্ছ্বাস ও উৎকণ্ঠা যেখানে হাত ধরে চলে

আদিবাসীদের জাদুঘরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ঐতিহ্য খুঁজে বেড়ানো একটি বিকেল