একদিনে বৌদ্ধমন্দির, শুভলং ও বালুখালি ভ্রমণের গল্প

সাগর, পাহাড়, নদীতে এক জাদু আছে। যে জাদুর টানে বারবার ফিরে আসতে বাধ্য হই এসবের কাছে। তাই দশম বারের মতো আসতে হলো রাঙামাটির টানে। এখানে যতই আসি, এখানকার প্রতি তৃষ্ণা কমার চাইতে বরং বাড়তেই থাকে প্রবল বেগে। ঘুরেফিরে সেই নীল জলই আমাদের ঠিকানা। তাই সুযোগ পেলেই চলে আসি এই লেকে।

যাত্রার শুরু এখান থেকে। ছবি : লেখক

এবারে আমাদের ৪০ জনের দল। বোটের ছাদে টাঙানো হয়েছে প্যান্ডেল। বসানো হয়েছে চেয়ার। পেট শান্তির জন্য সারাদিনের খাবারদাবারও নেওয়া হলো বনরূপা থেকে। ধীরে ধীরে সব জিনিসপাতি উঠছে বোটে। সকাল সকাল সকলে ঝিমাচ্ছে। কয়েকজন অল্পস্বল্প কথা বলছে, তাও অনিচ্ছা সত্ত্বে। আমরা তখনও জানি না সারাদিন আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

একটু পরেই চোখে পড়ে এই ব্রিজটি। ছবি : লেখক

অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দিলো আমাদের বোট। আমরা লেকের পাড় থেকে আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছি। যে যার মতো করে বসার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে ততক্ষণে। লেকের নীল জল ছেদ করে আমাদের বোট চলছে তার আপন গতিতে। কেউ হাঁটছে এদিক-সেদিক আবার কেউ কেউ সেরে নিচ্ছে টুকটাক আলাপ। নাস্তা দেওয়া হলে খুব মনোযোগী হয়ে নাস্তাও খেলো সবাই।

লেকের সাথে একাকার হওয়ার চেষ্টা। ছবি : লেখক

এমন সময় সবাইকে অবাক করে দুই পেয়ার সাউন্ডে বেজে উঠলো গান। এবার তো কেউ স্থির থাকতে পারে না। শুরু হয়ে গেল পাগলা নাচ। যে কোনোদিন নাচেনি সেও হাত-পা, কোমর নাড়াচ্ছে আর যে প্রায় নাচে সেও নাচছে তার মতো করে। আবার যে কয়েকজন নিজেকে নাচ থেকে দূরে রাখতে গা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছিলো তাদেরকে ধরে এনে বানানো হচ্ছে মধ্যমণি। একটু লাজুক ছেলেটাও তখন সবার সাথে তাল মিলিয়ে নাচ শুরু করে।

ছবি: লেখক

সবুজ পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে চলছে আমাদের বোট। কখনো কখনো উঁচু উঁচু পাহাড়ের ছায়া এসে পড়ছে আমাদের উপর। আর দু’পাশের একেকটা পাহাড়ের কারুকাজ আমাদের মুগ্ধই করে যাচ্ছে। আবার পাশ দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করা স্থানীয়রা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে বোট নিয়ে। আবার প্রকৃতির সাথে একাকার হয়ে নিজেকে ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত অনেক। কেনই বা হবে না ব্যস্ত! এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাদের দেশে খুঁজে পাওয়াই বিরল ব্যাপার।

পাহাড়ের চূড়া থেকে লেক দর্শন। ছবি: লেখক

আমরা শুভলং যাওয়ার পথেই একটা বৌদ্ধমন্দির পেয়ে গেলাম। যেটা এখানো নির্মাণাধীন কিন্তু ইতোমধ্যেই দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত লাভ করে ফেলেছে বলে সকলে ভিড় জমাচ্ছে। ২/৩টা বড় পাহাড়কে ঘিরেই এই মন্দিরটি বানানো হচ্ছে। সর্বোচ্চ চূড়ায় বসানো হয়েছে বুদ্ধমূর্তি। যা অনেক দূর থেকে যেকারো নজর কাড়বে। আবার মাটির সিঁড়ি বেয়ে এটার কাছে আসতে আপনার কষ্ট হলেও আসতে বাধ্য। তার পাশেই একটি টং ঘরের মতো করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা উপরে উঠে গাছের ছায়ায় একটু বিশ্রাম নিতে পারে।

লেকে বাঁশের সাঁকো। ছবি : লেখক

আর এখান থেকে আশেপাশে তাকালে লেকের বিস্তৃত একটা অংশ আপনার চোখে পড়বে। আরও বেশ কিছু আয়োজন এখনো নির্মাণাধীন রয়েছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে এসব হয়ে গেলে পূর্ণতা পাবে মন্দিরটি। আর এই মন্দিরকে ঘিরে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে উঠেছে একটি ছোট বাজার, যেখান থেকে দর্শনার্থীরা নিজেদের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি কিনে নিচ্ছে আদিবাসীদের বানানো বাহারি ডিজাইনের কাপড়। আবার লেকে বাঁশ দিয়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার জন্য পানির উপর বেশ চওড়া করে বানানো হয়েছে বাঁশের সাঁকো। এটাতে হেঁটে সকলেই উপভোগ করছে বেশ।

শুভলং। ছবি :লেখক

শুভলং ঝর্ণায় যাওয়ার পথে চারপাশের পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। কাপ্তাই লেকে আপনার মাথার উপর ঝকঝকে নীল আকাশ, স্বচ্ছল জলরাশির খেলা আর দানবের মতো দু’পাশের পাহাড় আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ছোট্ট ছোট্ট ঘরগুলো দেখে আপনি বিস্মিত হতে বাধ্য। পথে পথে দেখা যাবে মাছ ধরার বা বড় কোনো জাল ফেলার দৃশ্য। আবার অনেককে দেখতে পাবেন কাজের জন্য এদিক থেকে ওদিক যাতায়াত করছে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায়।

মাঝি। ছবি :লেখক

আবার শুভলং যাওয়ার পথেই পাহাড়ের উপরে রয়েছে বড়কল উপজেলা। বড়কল উপজেলার চূড়ায় উঠলেই পাখির চোখে দেখা যাবে পুরো লেক। অপার সৌন্দর্যে ডুবে যাবেন আপনি এখানে দাঁড়িয়েই। এর একটু পরেই চলে আসলাম শুভলং ঝর্ণায়। এসে হতাশই হলাম বলা যায়। বছরের একেক সময় একেক রূপে দেখা যায় এ ঝর্ণাকে। আর সবচেয়ে সুন্দর ও বেশি পানি থাকে বর্ষাকালে। কথায় বলে, “আদা পচে গেলেও তার গ্যাস থাকে”। এখানের অবস্থাও তেমনই। তাই এই শীতকালেও দলে দলে দর্শনার্থী আসছে এ শুভলং ঝর্ণা দেখতে।

লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ। ছবি :লেখক

এরপর চলুন এবার আপনাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসি বালুখালি দ্বীপ থেকে। আমাদের ভ্রমণের সাথে সাথে সমান তালে চলছে নাচ, গান, হাসি, আড্ডা, গল্প। কখনো সবাই প্রবল উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে গানের তালে তালে আবার কখনো কখনো একেবারে মনোযোগী হয়ে শুনছে গানের প্রতিটি লাইন, হয়ে উঠছে আবেগী। অর্থাৎ গানের সাথে সাথে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে।

শেষ বেলায়। ছবি :লেখক

এভাবে অল্প সময়েই আমরা ফিরে আসলাম বালুখালি পিকনিক স্পটে, যেখানে আমাদের মতো আরও ৪/৫টা দল এসেছে। এই দ্বীপে একেক দল একেকভাবে কাটাচ্ছে তাদের সময়। একদল গোল হয়ে তালি দিচ্ছে আর মাঝখানে গানের তালে তালে নাচছে দুজন। আমরাও দুটো খেলার আয়োজন করলাম। তারপর লেকের পাড়ে চেয়ারে বসে হিমেল বাতাসে কখন যে বিকেল চলে গেল টেরই পেলাম না। সূর্যকে বিদায় জানিয়েই আমরা রওনা হলাম শহরের পথে।

সারাদিনের দৌড়াদৌড়িতে সকলে ততক্ষণে ক্লান্ত। নীরবেই বোট চলছে, আর পানির শব্দ আমরা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। আমাদের সঙ্গী হয়ে চাঁদও চলে আসছে সাথে সাথে। এমন পরিবেশে হয়তো সকলে মনে করছে নিজের প্রিয়জনের কথা।

ফিচার ইমেজ: মোমেন উদ্দিন চৌধুরী

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্পেনের গোপন দ্বীপগুলো

শৈলারোহনে হাতেখড়ি ও চূড়ান্ত পরীক্ষা