বোটানিক্যাল গার্ডেন মিরপুর:দেখেছ কি দু'চোখ মেলিয়া? 

হঠাৎ সেদিন অফিস থেকে গাড়িতে বাসায় ফেরার সময় ঝিরঝিরি বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো আর আমি স্বভাববশত জানালার কাঁচের সাথে মুখ লাগিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝরে পড়া উপভোগ করতে লাগলাম। কিন্তু জানালার কাঁচ খোলার উপায় ছিল না দেখে বৃষ্টিকে ছুঁয়ে দেখে উপভোগের সুখটুকু থেকে বঞ্চিত হলাম।

সেই ক্ষীণ কষ্টের মাঝেই আনন্দ হয়ে মাথার মধ্যে আর চিন্তার যোগ হলো একটি অল্প পরিচিত বা আমাদের মতো পাগুলে ভ্রমণকারীর অফট্রাক হিসেবে পরিচিত ঢাকার ভেতরেই একটি দারুণ দান্দনিক ও সবুজে সবুজে ভরপুর কোলাহল মুক্ত আর নির্মল প্রাকৃতিক আচ্ছাদনে সাজানো এই জায়গাটার কথা। যে গল্পের বা যে জায়গাটার কথা লেখার ভাবনা আসার পর থেকে এই একটাই তুমুল জনপ্রিয় লাইন আমার বারবার মনে পড়েছে, আর এর চেয়ে জুতসই নাম আমি খুঁজে পাইনি। তাই সেই লাইনটাকে একটু এডিট করে নিলাম নিজের মতো করে।

ছোট্ট কিন্তু নান্দনিক লেক। ছবিঃ http://tourmet.com

আমাদের ঢাকাবাসীর কাছে খুব খুব পরিচিত নাম কিন্তু তেমন একটা যাওয়া হয় না বা গেলেও “দেখা হয় না চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া!” বলুন একটু ভেবে একটা জায়গায় যাওয়া আর দেখার মধ্যে অনেক-অনেক পার্থক্য আছে না? আরও আছে উপভোগের ও অনুভবের বিষয়। এই জায়গাটাতে আমরা সবাই কম-বেশী গিয়েছি কিন্তু সত্যিকারের চোখ মেলে দেখেছি কজন? বা ভেবেছি-ই বা কজন যে এখানেও বেড়াতে যাওয়া যায়, একদিন বা রাতে চাইলে ক্যাম্পিংও করা যায়! অনেকে মিলে।

হ্যাঁ এটা তেমন কোনো জায়গা নয়, আমাদেরই পরিচিত ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেন! একটু অবাক হচ্ছেন তাই না? আর মনে মনে বলছেন অ্যাহ, বোটানিক্যাল গার্ডেনে আবার দেখার বা উপভোগের কী আছে? ওটা তো নোংরা আর প্রেমিক-প্রেমিকাদের নিবিড় সময় কাটানোর প্যাচপ্যাচে এক জায়গা! হ্যাঁ সেটা ঠিক। আবার এটাও ঠিক যে এটা কিন্তু একদিনের বা রাতের ক্যাম্পিং ও নিবিড় নির্জনতা উপভোগের দারুণ একটি জায়গা।

সবুজ নির্মলতা। ছবিঃ http://3.bp.blogspot.com

একটু ভেবে দেখুন তো গেট দিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে সব রকমের গোলাপের সমারোহ, মৌ-মৌ গন্ধে মাতাল হবার জোগাড় প্রায়! আর ডানে একটু বন্য পরিবেশ মাড়িয়েই টলমলে জলের ছায়াঘেরা লেক। যার পাশে অনায়াশে কাটিয়ে দেয়া যায় হেঁটে-বসে-এলিয়ে বা হেলেদুলে। কোনোরকম বাধা বা নাগরিক যন্ত্রণা ছাড়াই। আর একটু ঘুরে যদি লেকের মাঝখানে তৈরি কৃত্রিম দ্বীপে গিয়ে ওঠেন দেখবেন এটা কৃত্রিম হলেও আপনাকে একটা অন্য রকম আনন্দ আর উপভোগের উপলক্ষ এনে দেবেই দেবে।

হোক সে অল্প-অগভীর আর অবিস্তৃত জায়গা জুড়ে কিন্তু আপনার চারপাশে পানি আর পানি কৃত্রিম দ্বীপের মাঝে আপনি! আর সেই লেকের চারপাশেই হিজল-তমাল আর নানা বুনো ফুলের ফুটে থাকা, কখনো কখনো থাকতে পারে গোলাপি আর সাদা রঙের ফুটে থাকা শাপলা গোটা লেক জুড়ে। আর মাথার উপরে তাকালেই নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ভেলা। কেমন হবে একটু ভাবুন তো?

লেকের পাড়ে হিজল-তমাল। ছবিঃ i.ytimg.com

না হয় কাটালেন এখানে কিছু সময়। এরপর চলুন আবার একটু ঘুর পথে গিয়ে রাস্তায় উঠে সোজা হেঁটে যাই আরও ভেতরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের গভীরে ধীর লয়ে, হেলতে-দুলতে ছায়া ঘেরা পথ আর ঝিরঝিরে হিমেল বাতাসের পরশ গায়ে মেখে। রাস্তার দুই পাশে পড়বে অনেক বড়-বড় আর উঁচু-উঁচু মেহগনি-কড়ই-রেইন ট্রি-দেবদারু-কোথাও কৃষ্ণচুড়ার ছায়া ঘেরা অভিবাদন। আর এই অভিবাদনের মাঝে হেঁটে যেতে যেতে একটু ঢালু রাস্তা পেরিয়েই আবার ফুলেদের সম্ভাষণ! অন্যপাশে ছোটখাট পিকনিক বা পারিবারিকভাবে সময় কাটানোর চমৎকার লোকেশন।

আর যদি রাস্তার উপরের দিকে না গিয়ে একটু বামে আর নিচের দিকে নেমে যান তো দারুণ পুকুর আর সিনেমার স্যুটিং লোকেশনের মতো দর্শনীয় বনাঞ্চল প্রায়। বেশ ঘন আর অন্ধকারময় একটু গা ছমছমে পরিবেশও। আর রাতে একেবারেই রোমাঞ্চকর।

এমন যায়গায় একটু গাঁ ছমছমে অনুভূতি হবেই। ছবিঃ wikimedia.org

এরপর হেঁটে হেঁটে কোনো একটা ফাঁকা মাঠে আশেপাশে জলাধার, ছায়াঘেরা বৃক্ষরাজী আর খোলামেলা নির্মল বাতাসের স্রোত দেখে তাবু ফেলা যেতে পারে। আছে পদ্ম পুকুর, চারদিকে নারিকেল গাছ ঘেরা দীঘি, আছে নানান পাতাবাহার আর ফুলের জন্য নার্সারি, আছে সবজি ক্ষেত আর বনবনানি সমৃদ্ধ সবুজের আঁধার, আছে রোদ আর ছায়ার লুকোচুরি আলোছায়া! আছে ছোট-খাট টিলা ও ঢাল বেঁয়ে নেমে যাওয়া গাছের শিকড়, আছে কচুরিপানায় ভরপুর দীর্ঘ লেক।

আর যদি চান একেবারে গ্রামীণ পরিবেশ, সেও আছে, সেক্ষেত্রে চলে যেতে হবে বোটানিক্যালের শেষ সীমানায়। যেখানে ভঙ্গুর ইটের প্রাচীর এই আছে, এই নেই। আছে পাখিদের কিচিরমিচির, পাশের চিড়িয়াখানার বন্য পশুর অবন্য হাহাকার, ক্ষুধার্ত চিৎকার, ভাঙতে না পারা পিঞ্জরের অসহ্য আর অসহনীয় বন্য যন্ত্রণা! আছে সবুজ গালিচার নরম কোমল মাঠ। দূর প্রান্ত থেকে ধেয়ে আসা হুহু বাতাস।

যখন আঁধার ঘনায়। ছবিঃ staticflickr.com

এভাবে কেটে যাবে হেঁটে-বসে-ঘুরে-দেখে আর ভেবে-ভেবে সারাদিন আর এরপরেই নামে সন্ধ্যা ঝুপ করে ঢাকা শরের ইট-কাঠ-পাথরের ব্যস্ততার চেয়ে বেশ আগেই। আর সন্ধ্যা নামতেই একবারে নীরব-নিস্তব্ধ আর নিথর চারিদিক। যেন কোনো গহীন অরণ্যে এসে পড়েছি। সুনসান আর চুপচাপ চারপাশ চারিদিক। দল বেঁধে না থাকলে শিউরেও উঠতে হবে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে, শুনে বন্য পশুর অবন্য হুংকার! আর বেঁচে থাকার আর্তনাদ!

আর যদি হয় জ্যোৎস্না ঝরা কোনো রাত… সে সম্মোহন আর সৌন্দর্যের বিচার কোনো পার্থিবতায় অসম্ভব। সে হবে এক অমোঘ আলো-আঁধারির ব্যঞ্জনা! বাতাসে পাতাদের দোলের ছায়া, গাছকে মানুষ ভেবে ভুল করে ভয়ে গুটিসুটি মেরে থাকা! আর ছোট গাছের ঝুলে থাকা লতা যেন জীবন-যুদ্ধে পরাজিত কোনো নারীর চুল। হয়তো ভেবে বসা লাশের স্তূপ দূরের কোনো বস্তুকে! আলো-আঁধারির অবুঝতা আর মনের মাঝের শঙ্কায়! এই ভেবে ভয়ে কুঁকড়ে থাকা! হয়ে থাকা জবুথবু।

সবুজ-হলুদের নান্দনিকতা। ছবিঃ http://4.bp.blogspot.com

একটু ভাবনা কি জেগেছে পাঠকের মনের মাঝে যে আসলেই কী বোটানিক্যাল গার্ডেনের এই রূপ? সত্যি কী? আর হয়তো ভাবছেন, আরে বোটানিক্যাল গার্ডেনে কত গেলাম, এমন তো কখনো মনে হয়নি বা ভাবনায় আসেনি? যা বলছি তা কি সত্যি-ই না কি একেবারেই কাল্পনিক একটা লেখা বা ভাবনা কল্পনার রঙ লাগিয়ে?

পরখ করতে হলে যেতে হবে একদিন, অবশ্যই একা বা দুই-একজন নয়, যেতে হবে দল বেঁধে সকালের শুরুতে আর উপভোগ করতে হবে নিঝুম রাত্রিকেও!

ভাবা যায় কী এই ভাবনাটা? কাটানো যায় কি একটি রাত্রি সেখানে, চলুন না যাই একদিন, দেখে আসি এই আমাদের ঢাকাবাসীর ঘরের আঙ্গিনার নির্মল আর বিশুদ্ধ প্রকৃতির রূপ!

সন্ধ্যায় পেতে পারেন এমন প্রকৃতি। ছবিঃ flickr.com

আমি জানি আপনি বা আমি বা অনেকেই দেখিনি বা ভাবিনি বা জানিনি আমাদের এত কাছের একটি প্রকৃতিতে ভরপুর আর নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ একটি ভ্রমণের জায়গা থাকতে পারে বা আছে।

সেজন্যই আমার এই লেখার এর চেয়ে উপযুক্ত বা যুক্তিযুক্ত নাম খুঁজে পাইনি, তাই “দেখা হয় নাই, চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া” কে নিজের মতো করে বলেছি সবার জন্য-

দেখেছো কি দু’চোখ মেলিয়া?

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নির্ঘুম করিডোর থেকে মনপুরার স্নিগ্ধ সকালে

হাদার বিবাহ বার্ষিকী ভ্রমণ!