বোরা বোরা: পৃথিবীর সেরা মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য?

বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমা কোথায় করবেন, সেটা নিয়ে দম্পতিদের গবেষণার কোনো শেষ থাকে না। বাংলাদেশের মানুষের হানিমুনের প্রধান গন্তব্য কক্সবাজার। সমুদ্র সৈকত না থাকলে হানিমুন যেন জমতেই চায় না। নীল সমুদ্রের খোঁজে অনেকে তাই কক্সবাজার ছাড়িয়ে চলে যান সেন্টমার্টিনও।

আর যাদের আরও বেশি সামর্থ্য আছে তারা চলে যান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সেরা সমুদ্র সৈকতগুলোতে। মধুচন্দ্রিমার জন্য বাংলাদেশের মানুষের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে থাইল্যান্ড, মালেশিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশ। আর গত কয়েক বছর ধরে “অন এরাইভাল ভিসা”র সুবিধার কারণে ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপও কম জনপ্রিয় না।

পৃথিবীর বুকে সত্যিকারের স্বর্গ-ছবি Tahiti.com

কিন্তু পৃথিবীর সেরা মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য কোনটি জানেন কি? দেখা গেল আপনার পছন্দ সমুদ্র সৈকত আর আপনার স্ত্রীর পছন্দ পর্বত। সমুদ্র না পর্বত এর ভিত্তিতে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড সহ অনেকগুলো দেশই বিখ্যাত হানিমুনের জন্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন এ তালিকার শীর্ষস্থানটি বোরা বোরা দ্বীপের দখলে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার একটি ছোট্ট দ্বীপ বোরা বোরা। পৃথিবীর বুকে যেন সত্যিকারের স্বর্গ এই দ্বীপটা। পর্বত আর সমুদ্রের এ ধরনের অসাধারণ সমন্বয় পৃথিবীর বুকে যে আরেকটি পাওয়া যাবে না।

ভিউকার্ডের ছবির মতো হানিমুন গন্তব্য-ছবি Tahiti.com

বোরা বোরা দ্বীপের গঠনটাই অন্যরকম। মূলত দুটি পর্বত মাউন্ট পাহিয়া ও মাউন্ট ওতেনামোকে ঘিরে ৩০.৫ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট দ্বীপটি গড়ে উঠেছে। বিলুপ্ত অাগ্নেয়গিরি এক সময় এ দুটি পর্বত তৈরী করেছিল যার সর্বোচ্চ চূড়ার উচ্চতা ২,৮৮৫ ফিট। এ পর্বতকে ঘিরে একটি বৃত্তের মতো বোরা বোরা দ্বীপটি।

দ্বীপের স্থলভাগ আর পর্বতের অংশের মধ্যে রয়েছে নয়নাভিরাম লেগুন। উপর থেকে তাই দ্বীপটিকে একটি মালার মতো মনে হয়। এখনো কিন্তু বলা হয়নি দ্বীপটির অবস্থান কোথায়। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার দ্বীপটি অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার মোটামুটি মাঝামাঝিতে।

রয়েছে পাঁচ তারকা সব রিসোর্ট-ছবি tahiti.com

অগভীর লেগুনের উপরই গড়ে উঠেছে পাঁচ তারকা মানের সব রিসোর্ট। এ রিসোর্টগুলোর প্রত্যেকটি পানির উপরে গড়ে ওঠা আলাদা এক একটি বাংলো। প্রত্যেকটি বাংলো এমনভাবে তৈরী যখন ইচ্ছে পানিতে ঝাপিয়ে পড়তে পারবেন এবং উঠতে পারবেন। প্রশান্ত মহাসাগরের হাজার রকমের মাছ ঘুরে বেড়ায় এ লেগুনে। তার মধ্যে হাঙরও রয়েছে।

তবে ভয়ের কিছু নেই, এই প্রজাতির হাঙর মানুষকে আক্রমণ করে না। চাইলে হাঙরগুলোকে খাওয়াতেও পারেন। তবে কিছুটা কম খরচের কিছু রিসোর্টও আছে যেগুলো পানির উপর না, দ্বীপের দিকে। সেগুলোর সৌন্দর্যও কোনো অংশে কম না।

পানির নিচের স্বর্গ ছবি tahiti.com

শুধু রিসোর্টের সৌন্দর্য নয়, বোরা বোরা দ্বীপে রয়েছে অনেক ধরনের আ্যডভেঞ্চার একটিভিটিজ। নব দম্পতিদের কথা মাথায় রেখেই এগুলো তৈরী করা হয়েছে। আর এজন্যই এগুলো আপনাদের মন জয় করবেই।

এর মধ্যে রয়েছে প্যারাসেইলিং, স্পীড বোট দিয়ে টেনে নিয়ে দম্পতিকে যখন ৩০০ ফিট উপরে তুলে ফেলা হবে পুরো দ্বীপটাই দেখা যায় উপর থেকে। প্যারাসেইলিং পৃথিবীর অনেক জায়গায় করা যায়, কিন্তু নিচের এরকম স্বর্গ আর কোথাও দেখা যায় না।

বোরা বোরার স্বর্গীয় সন্ধ্যা ছবি tahiti.com

এছাড়াও রয়েছে করার মতো অনেকগুলো অ্যাডভেঞ্চার। হেলিকপ্টার ভাড়া করে ঘোরা যায় পুরো দ্বীপ। যেতে পারেন স্বচ্ছ তলদেশে বোট নিয়ে ঘুরতে, যেতে পারেন স্নোরকেলিং বা ডাইভিং করতে। অ্যাডভেঞ্চার বাইক নিয়ে ঘুরতে পারেন দ্বীপ, ট্রেকিংয়ের জন্য মাউন্ট ওতানামো তো আছেই।

কাছের দ্বীপগুলোতেও বেড়াতে যেতে পারেন। আর খাবারের কথা তো বলাই হয়নি, দ্বীপের ঐতিহ্য আর আধুনিকতা মিশে দারুণ সব খাবার পরিবেশন করা হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না সীফুডের প্রাধান্যই থাকে বেশি।

দ্বীপে রয়েছে অনেকগুলো অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটিজ ছবি tahiti.com

দ্বীপের প্রশংসাই করলাম এতক্ষণ, খরচ নিয়ে তো আলোচনা করা হয়নি। পৃথিবীর সেরা হানিমুন গন্তব্যের খরচটাও কম হবার কোনো কারণ নেই। বাংলোগুলোর প্রতিদিনের ভাড়াই বাংলাদেশি টাকায় ৭০,০০০ টাকার মতো। পানির উপরের বাংলোগুলোতে না থেকে দ্বীপের দিকে থাকলে ভাড়া কিছুটা কম পড়বে। তবে সেটাও ৫০,০০০ টাকার কম না। আর অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটিজগুলোর জন্য আলাদাভাবে গুনতে হবে টাকা। সবগুলো করতে চাইলে মোটামুটি ৩২০,০০০ টাকা খরচ পড়বে।

সাদা বালির অপূর্ব সৈকত-ছবি tahiti.com

দ্বীপপুঞ্জগুলোর মধ্যে তাহিতির সাথে বিমান যোগাযোগ আছে বেশি। বিমানে পৌঁছুতে হলে তাহিতিতে পৌঁছানোয় ভালো। বেশিরভাগ রিসোর্টগুলোই তাদের অতিথিদের তাহিতি থেকে বোরা বোরা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে থাকে। বিমানে তাহিতি পৌঁছানোও কিন্তু সহজ নয়। দক্ষিণ আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়া থেকে এর বিমান যোগাযোগ মোটামুটি ভালো।

কিন্তু অন্য দেশ থেকে আসতে হলে ভালোই কাটখড় পোড়াতে হবে। বাংলাদেশ থেকে বিমানে বোরা বোরা পৌঁছাতে কমপক্ষে ৪টি কানেক্টিং ফ্লাইটের প্রয়োজন পড়বে। খরচও পড়বে জনপ্রতি অন্তত ৪,০০,০০০ টাকা।

বোরা বোরা দ্বীপ, দূরে দেখা যাচ্ছে মাউন্ট ওতেনামো ছবি tahiti.com

এত কিছুর পরেও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা তো আছেই। এ দ্বীপপুঞ্জগুলো ফ্রান্সের শাসনাধীন। ফলে সেখানে যাওয়ার জন্য ফরাসী ভিসার প্রয়োজন পড়বে যার আবেদন করতে হবে নিকটস্থ ফরাসী দূতাবাস থেকে। ভিসার আবেদনের সময় এই দ্বীপে যেতে চান সেটা পরিস্কারভাবে জানাতে হবে। ভিসা দেবার সময় সেটা উল্লেখ করে দিবে।

বাংলাদেশে যেহেতু ফরাসী দূতাবাস আছে, বোরা বোরা যাবার জন্য ভিসার জন্য আবেদন এখানেই জমা দেয়া যাবে। যদি শেষ পর্যন্ত আপনি বোরা বোরায় যেতে পারেন বলার অপেক্ষা রাখে না প্রেয়সীর জন্য পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি সুন্দর কোনো জায়গা খুঁজে বের করতে পারবেন না, এটাই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ: খানজাহান আলীর ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ

ভারতের শ্রেষ্ঠ সমুদ্র সৈকতগুলো সম্পর্কে জেনে নিন এখনই