বগালেক থেকে রুমা বাজার: মহুয়ার গন্ধ ও পাহাড়ের আলিঙ্গন!

জীপের ছাদে রোমাঞ্চ! ছবিঃ মারুফা

বগালেক থেকে ফেরার সময় আমাদের প্ল্যান ছিল বগালেক থেকে ঝিরিপথ হয়ে ফিরবো। ততক্ষণে নতুন যারা, তারাও পরিশ্রমের সাথে খাপ খাইয়ে নেবে। কিন্তু হায়, সবাই যে এভাবে ভেঙে পড়বে তা কী ভেবেছিলাম? ভাবিনি।

সুতরাং, আগের রাতে গাইডের সাথে সবাই বসে ভোট দিলাম, ঝিরিপথ বনাম গাড়িপথ! এতে তেরো জনের মধ্যে আমি আর একজন বিপুল ভোটে পরাজিত হলাম! তাই ঠিক হলো গাড়ি পথেই রুমা বাজার যাব। বেশ মন খারাপ করে ঘুমোতে গেলাম।

বগালেকের বিলাসী আবাস। ছবিঃ wordpress.com

সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই প্রস্তুত এবং প্রফুল্ল। কিন্তু আমার মাথায় অ্যাডভেঞ্চারের নেশা! এই গাড়ি পথকেই কীভাবে অ্যাডভেঞ্চার বানানো যায়! এই ভাবতে, ভাবতেই গাড়ির কাছে গেলাম। শুনছি, আমাদের ড্রাইভার বেশ অশ্লীল সব শব্দ ব্যবহার করছেন! প্রতিটি বাক্যের আগে ও পরে, একটু অবাক লাগলো।

ভোর বেলা তো সবার মন মেজাজ সাধারণত ভাল ও খোশ মেজাজে থাকে। কিন্তু তার সমস্যা কী? কাছে গিয়ে কথা বলতে শুরু করতেই বুঝে গেলাম, ইনি সকাল সকালই মহুয়ার নেশায় মত্ত! ব্যস, সাথে সাথে আমার মাথায়ও দারুণ দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। গাড়ি ছাড়ুক, আমিও অ্যাডভেঞ্চার শুরু করবো! রক্ত আবার চঞ্চল হলো, আমি আবার নেশাতুর হলাম, আমার অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়!

আহা সেই বগালেক! ছবিঃ http://magazine-image.bdstall.com

গাড়ি চলতে শুরু করলো। কিছুদূর আসার পরে সবাইকে নামতে হবে। একটা রিস্কি সাঁকো পেরতে হবে বলে। সবাই নামতে শুরু করলো, আমি নামলাম না। তাই দেখে ড্রাইভার আমার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলে উঠলো-

“ওই ব্যাটা নামে না ক্যারে? মইরবার চায়!”

“তুমি যা চালাও ভ্যান গাড়ির নাহান, প্যানপ্যান কইরা! যাও, ভ্যান চালাও গিয়া!” আমার ক্ষেপিয়ে তোলা উত্তর।

আমার কথা শোনা মাত্র, হেল্পার দাঁতে দাঁত কেটে, আমাকে ইশারা করলো, ড্রাইভারকে না খ্যাপাতে, তাতে ও ভীষণ স্পিডে ও রিস্কি চালাবে! আরে আমি তো ওইটাই চাই!

এবার ড্রাইভার, আমার কাছে এসে বলল, “আমি চালামু, আমার নাহান, তুই পারবি, ছাদে যাইতে?”

পারলে কি হইব? আমার উত্তর।

“আমার তিনডা এক্সিডেন্টের রেকর্ড আছে, এই রুমা বাজার আর বগালেকে, দুইডা মরছে! তারপর থেইকা স্পিড কমাইয়া চালাই। তুই পারলে ছাদে যা, আমি চালামু, দেহি কেমন পারছ”।

সেই পথে। ছবিঃ i.ytimg.com

পারলে কি দিবি? আমার উত্তর।

“তুই যদি রুমা বাজার তরিত, ছাদে যাইতে পারস, তো তোর ভাড়া লাগব না যা”।

নাহ, আমি যদি যাইতে পারি তুই আমারে ৫০০ টাকা দিবি, তোর ভাড়া তোকে দিয়ে দেব, রাজি? আমার জিজ্ঞাসা।

হ, ঠিক আছে, ওঠ ছাদে…

ব্যস।

শুরু হলো, অ্যাডভেঞ্চার আর উম্মত্ত ড্রাইভ। আমিও প্রস্তুত আমার সকল নিরাপত্তা সরঞ্জাম আর দোয়া কালাম নিয়ে। আর এর আগেও যে তিনবার চাঁদের গাড়ির ছাদে করেই রুমা থেকে বগালেক গিয়েছি, সেই অভিজ্ঞতা সাথে নিয়ে! আমার আগের অভিজ্ঞতার কথা বলিনি, তাতে ও রাজি হবে না ভেবে। আর আমার ৫০০ টাকা রোজগারের চিন্তা করে, যা আমার পরবর্তী ভ্রমণের জন্য প্রথম সঞ্চয় হিসেবে জমা হবে, ভ্রমণ বাজেটে!

এরপরে সে এমন স্পিডে চালালো এবং প্রায় সেই সমান স্পিডেই বাঁক নেয়া শুরু করলো, যে চরম শক্ত সামর্থ্য দুই-তিন জন বমি করতে লাগলো। বিভিন্ন গাছে ডাল, লতা-পাতা, বাঁশের চিকন ও ধারাল কঞ্চি আমাকে ক্ষণে ক্ষণে ছোবল মারতে লাগলো, আমার গাল, মাথা, ঘাড়, গলা, হাত, মোট কথা শরীরের যেটুকু উন্মুক্ত ছিল সব জায়গায় চাবুকের ফলা বসে গেল।

বগালেক থেকে রুমা বাজার। ছবিঃ journeytobangladesh.com

তীব্র বাতাসে চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো ঝরঝর করে, নিঃশ্বাস নিতেও কিছুটা কষ্ট শুরু হলো, বাতাসের তীব্রতা আর গাড়ির প্রচণ্ড গতির কারণে আর প্রতিটা বাঁক যেন ছিল এক একটা মরণ ফাঁদ! কারণ বাঁকের কাছে এসেই সে গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বাঁকটা নেবার চেষ্টা করে!

এতে করে যেটা হয়, গাড়ি কাঁত হয়ে যায় অনেকখানি, যখন উপরে ওঠে, গাড়ি এতটা খাড়া হয়ে যায় যে, ধরে থাকাও মুশকিল! আর যখন নিচে নামে, তখন, ছিটকে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা! এভাবেই চলে এলাম রুমা বাজার, বেশ কিছুটা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে! পুরো অ্যাডভেঞ্চারে এবারই প্রথম ঔষধপত্র বের করতে হলো, কিছুটা শুশ্রূষার জন্য।

ভাড়া দেয়া শেষ, নগদ ৫০০ টাকা! অ্যাডভেঞ্চার, সাহস আর চরম ঝুঁকির পুরস্কার! তবে স্বীকার করছি যে, এই অ্যাডভেঞ্চারে নিজেকে রক্ষা আর চ্যলেঞ্জে জয়ের নেশার স্বার্থে, পাহাড়কে উপভোগ করতে পারিনি একটুও! এই অ্যাডভেঞ্চারের তৃপ্তি, জয়ী হওয়া আর অতৃপ্তি পাহাড়কে উপভোগ ও আলিঙ্গন করতে না পারা!

সবুজের গালিচা বেছানো পাহাড়। ছবিঃ farm4.staticflickr.com

সুতরাং এবার তবে পাহাড়কে আলিঙ্গনের পালা। রুমা থেকে বাসের টিকেট কাটা হলো, দেড় ঘণ্টা পরে বাস ছাড়বে, তো চল এই ৪ কিমি আমরা হেঁটে যাই- এই প্রস্তাবে অনেকেই নিমরাজি, কিন্তু কেউই তেমন আপত্তি করেনি। হেঁটেই চলে এলাম বাস স্ট্যান্ডে, পাহাড়কে দেখতে, দেখতে।

বাস ছাড়তে আরও এক ঘণ্টা দেরি। চলে গেলাম ব্রিজ পেরিয়ে এক পাহাড়ের ঝিরিঝিরি গাছের ছায়ায়। এক ঘণ্টার জন্য নিজেকে, নিজের মতো করে পাহাড়কে, একা ও নির্জনে নিশ্চুপভাবে নিজের করে নিতে। কী দ্রুততায় যে এক ঘণ্টা কেটে গেল, বুঝতে পারলাম না! বাসে উঠবো, এমন সময় মনে হলো, আরে পাহাড় দেখা তো শেষ হয়নি! এখনও তো সুযোগ আছে! যেই ভাবা, সেই কাজ। নির্ধারিত সিট একজন সিট ছাড়া যাত্রীকে দিয়ে, উঠে পড়লাম ছাদে!

আমাদের অপূর্ব পাহাড়। ছবিঃ i1.wp.com/

এবার সত্যিই আনন্দ, পাহাড়কে এত নিজের করে, এভাবে উজাড় করে পাওয়ার ও দেখার আনন্দ। আমার চারদিকে পাহাড় আর পাহাড়, ছোট, বড়, মাঝারি, বিভিন্ন আকৃতির ও ধরনের পাহাড় আমার চারপাশ ঘিরে। সে এক অনন্য আনন্দ, শুধুমাত্র সত্যিকারের পাহাড় প্রেমীই এই ভালো লাগা অনুধাবন করতে পারবেন।

পরামর্শ: আপনিই যদি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম এবং সবার জন্য নির্ভরশীল ব্যক্তি হন, তবে এমন অ্যাডভেঞ্চার না করাই বাস্তবসম্মত।

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. এই শেষ ঈদে বান্দরবান > রোমা > বগালেক > কেউক্রাডং ঘুরে এলাম। চমৎকার যায়গা। আমাদের সবার উচিৎ ভ্রমণের স্বাদ নেয়া। সজল জাহিদ ভাই আপনার লেখার ভক্ত হয়ে আছি কয়েক বছর ধরে! ধন্যবাদ সুন্দর করে গুছিয়ে লিখেন বলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইলিশ খেতে চাঁদপুরে টিজিবি বাহিনী (১৩ সেপ্টেম্বর)

পেহেলগামের বেতাব ভ্যালীর আক্ষেপের গল্প