দিয়াবাড়ির খালে নৌকাভ্রমণ আর কাশফুলের শুভ্রতায় হারিয়ে যাওয়া একটি বিকেল

উত্তরা গিয়ে অনেকদিন ধরেই শিহানের কাছে বায়না ধরেছি- এক বিকেলে আমায় দিয়াবাড়ি ঘোরাতে হবে। কিন্তু জবের প্রেশারে সে রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে সে নিজে থেকেই সেদিন আমায় প্রস্তাবটা উত্থাপন করল। আমিও ভাব নিয়ে বললাম- যেতে পারি, যদি আমায় দিয়াবাড়ির লেকে বোটে চড়িয়ে ঘোরানো হয়।

তাই সই। এক শুক্রবার দেখে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। উত্তরার বেলা একদম গড়িয়ে যায়নি। সবে আড়াইটা বাজে। তাই তড়িঘড়ি করে এগারো নম্বর সেক্টরের ইমেন্স রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সারলাম আমরা। এরপর দিয়াবাড়ির দিকে রওনা দিলাম দুজনে।

ইমেন্স থেকে বেরিয়ে জমজম টাওয়ারের কাছে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও লেগুনায় উঠতে পারলাম না। শিহান বিরক্ত হয়ে রিকশাই ঠিক করে ফেলল। রিকশা যোগে চলে গেলাম ঢাকার ভেতর একটু নিশ্চিন্তে পা ফেলার এই জায়গাটাতে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, শুক্রবার হওয়ায় দিয়াবাড়িতে যেন মানুষের ঢল নেমেছে।

কাশফুল। সোর্স: শিহান

রিকশা খালপাড় ধরে বারো নম্বর সেক্টরের দিকে না ঢুকে সোজা বিআরটিএ অফিসের রাস্তা ধরে যাওয়াতে আমাদের লেকপাড় অবধি যাওয়া হয়নি। রিকশা থেকে নেমে হাঁটা ধরলাম। গেল এক বছরে শিহান উত্তরার কাছাকাছি থাকায় কয়েকবার এই জায়গা ঘুরে গেলেও আমি এলাম এই প্রথমবার। তাই উচ্ছ্বাসটা একটু বেশিই ছিল। উপরন্ত শরৎকাল হওয়ায় পুরো দিয়াবাড়ি যেন সাদা থান গায়ে জড়িয়ে আছে। যতদূর চোখ যায়, কেবল বাতাসে কাশফুলের দুলুনি চোখে পড়ে।

আমরা একটা বাঁধানো পিচ করা পথ ধরে হাঁটছিলাম। খানিক পরে ওটা ছেড়ে নেমে পড়লাম কাশবনে। হিল খুলে পা রাখলাম মাটিতে। সত্যিই, কতদিন পর যে পা জোড়া মাটির ছোঁয়া পেল! ঢাকায় আসার পর ইদানিং আর খালি পায়ে দু’কদমও হাঁটা হয় না। তাই তো আজ সুযোগ পেয়ে ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলাম শহুরে কায়দাকানুন।

চারপাশে কাশফুলের শোভা, শরীরময় ভেজা ভেজা মাটির স্পর্শ। দূরে, আকাশের দরজা একেবারে হাট করে খোলা। কিছু সময়ের জন্য মনের সমস্ত অবসন্নতাকে ঝেঁটিয়ে ফেলতে এর কোনো বিকল্প ছিল না।

খাল। সোর্স: শিহান

এর মধ্যে শিহান আমায় টেনে নিয়ে গেল লেকের পাড়ে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম- খাল, বা শাখা নদী জাতীয় কিছু একটা। পরে দেখলাম- এই লেকের পানি অতটা নোংরা নয়, যতটা ঢাকার নদীতে বা খালগুলোতে থাকে। যদিও এর মাথার দিকে তাকালে ভালো করে বোঝা যায় না। কোনো স্রোত যেহেতু নেই, তাই মনে হলো এটা বদ্ধই হবে হয়তো। শিহানকে একথা বলতেই সে বলল, ‘চলো, বোট নিয়ে ঐ মাথায় যাই। গিয়ে দেখে আসি- বদ্ধ কিনা।’ কিন্তু তখনো রোদ পড়েনি একেবারে। তাই আরেকটু অপেক্ষা করতে বললাম।

স্বভাবতই ঢাকার কাপলদের কাছে দিয়াবাড়ি এক অন্যরকম ডেটিংস্পট হিসেবে পরিচিত। তাই এখানকার ব্যবসায়িরাও তাদের কথা চিন্তা করে নিয়েছে কিছুটা ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ। লেকের পাড় ধরে একচালা ছোট্ট ছাউনি দিয়ে তার নিচে একটা দুটো চেয়ার টেবিল পাতা। যাতে করে কাপলরা একটু হলেও প্রাইভেসি পায়। আমরা বসেছিলাম লেকের উত্তরপাড়ে। আমাদের ঠিক পেছনেই একেক চটপটি বিক্রেতা পাঁচ সাতটা করে ছাউনি তুলে বসে আছে। সে তুলনায় দক্ষিণপাশে দোকান ও লোকসমাগম বেশ কম।

চটপটি ফুচকার ছাউনি।  সোর্স: শিহান

এর মধ্যে শিহান বাদাম কিনে নিয়ে এলো। রোদও মরে এসেছে প্রায়। আকাশটা কেমন নিভু নিভু করছে। সেই আকাশ লেকের জলের ওপর পড়তেই একটু আগের নীল দেখানো জলটা কালচে হয়ে এলো। একটু পর সন্ধ্যে নামবে। বোটিং করতে চাইলে এখনি উপযুক্ত সময়। কিন্তু এখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। অনেকদিন পর এমন খোলা জায়গায় বসলাম। চাঁদপুর গেলে হুটহাট মোহনার পাড়ে গিয়ে বসে থাকার স্বভাব আমার অনেকদিনের। সেখানকার হাওয়ার সাথে কিছুরই তুলনা চলে না।

কিন্তু এখানকার হাওয়াটা কেমন যেন আলাদা। খুব অবসন্ন শরীরে আচমকা একটু স্বস্তির বাতাস বুঝি এমনই অনুভূতির জন্ম দেয়! সেই সাথে শিহানের গান- “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান”…..। আমার তখন খুব আফসোস হচ্ছিল- ইস, চারপাশে এত কোলাহল না থাকলে এখানেই শরীর এলিয়ে দিয়ে খানিকক্ষণ শুয়ে থাকতাম। কিন্তু ছেলেটা গজগজ করতে করতে টেনে তুলল আমায়। আশ্চর্য! আমার কি তবে তন্দ্রা এসেছিল? অসম্ভব কিছুই না। দিয়াবাড়ি আমায় একটুর জন্যে হলেও প্রশান্তি দিয়েছে। এর কাছে এই ঘুমকাতুরে ট্যাগ কিছুই না।

দিয়াবাড়ির সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে। সোর্স: শিহান

অদূরের ঘাটে অনেকগুলো বোট বেঁধে রাখা। এক ঘণ্টায় দুশো টাকা ভাড়া। আমরা নীল রঙের একটা বোট নিয়ে লেকের জলে ভাসিয়ে দিলাম। দুজনে দুইপাশে বসে সমানে প্যাডেল করছি। শিহান হাল ধরে আছে। দেখতে দেখতে আমরা মাঝ বরাবর চলে এলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! লেকের ভেতর বাতাসের ঝাপটা তেমন গায়েই লাগে না।

চারপাশে কাশফুলের দেয়ালটা হাওয়া আটকে দিচ্ছে। তার ওপর জলের লেয়ার লেকের অনেক নিচের দিকে। কী ভেবে আমি প্যাডেল রেখে এক পা চুবিয়ে দিলাম। মৃদুমন্দ বাতাসে এই স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় লেকের জলে পা চুবিয়ে বসে থাকতে মন্দ লাগল না।

প্যাডেল বোট। সোর্স: শিহান

আমরা শেষমেশ প্যাডেল করতে করতে লেকের একদম পূর্বে চলে গেছি। দেখলাম- নেট দিয়ে বেশ শক্ত এক দেয়াল তোলা। সম্ভবত এখানে মাছ চাষ হয়। পরে ম্যাপ ঘেটে দেখেছি- আশেপাশের কয়েকটি লেকের সাথে এর সংযোগ থাকলেও, কোনো নদীর সাথে যোগাযোগ নেই।

অবস্থান

উত্তরা মডেল টাউন, সেক্টর নম্বর-১৫ এর ব্লক এ, ব্লক বি, ব্লক সি, সেক্টর-১৬ ও সেক্টর-১৮ এর কিছু অংশ নিয়ে দিয়াবাড়ির অবস্থান।

প্যাডেল বোট।সোর্স: শিহান

কীভাবে যাবেন

ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সহজেই উত্তরায় আসা যায়। উত্তরার হাউজবিল্ডিং থেকে দিয়াবাড়িতে যাবার সরাসরি লেগুনা আছে। চাইলে আজমপুর বাস স্টপেজ থেকেও খালপাড়ের লেগুনায় যেতে পারেন, সেখান থেকে রিকশায় করে যাওয়া সহজ।

এছাড়া যারা রাইদা বাসে চলাফেরা করেন, তারা হাউজবিল্ডিং না নেমে সরাসরি চেলে যেতে পারেন দিয়াবাড়িতে (যদিও রাইদার অধিকাংশ বাস খালপাড় পর্যন্ত যায়)। আর চাইলে হাউজবিল্ডিং, আজমপুর থেকে সরাসরি রিকশাতেও যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে ৮০-১০০ টাকা।

ফিচার ইমেজ: শিহান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পৃথিবীর উচ্চতম গ্রাম কিবের অভিযান

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের জমসম ভ্রমণ