খুলনার রূপসা নদীতে নৌকাবাইচ

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা নৌকাবাইচ। এক সময় দেশের সব প্রান্তেই দেখা মিলত এ প্রতিযোগিতার। নৌকাবাইচকে ঘিরে নদীর পাড়ের গ্রামগুলোতে বেশ কিছুদিন ধরেই চলতো আনন্দ আর উত্তেজনা। কোন গ্রাম পাবে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট, সেটা নিয়েই চলতো বিস্তর জল্পনা-কল্পনা। আর খেলার দিন নদীর দু’পাড়ে উপচে পড়তো মানুষের ভিড়। উৎসবমুখর এ খেলাটি দিন দিন হারিযে যেতে বসেছে।

এখনও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় হয় নৌকাবাইচ। অধিকাংশ জায়গা থেকেই হারিয়ে গেছে এ ঐতিহ্য। আধুনিক খেলাগুলো জায়গা করে নিয়েছে সেখানে। প্রথমবার আমি নৌকাবাইচ দেখেছিলাম নড়াইলের চিত্রা নদীতে। সেটা প্রায় ১০ বছর আগের ঘটনা। এ বছর জানতে পারলাম দেশের সবচেয়ে বড় নৌকাবাইচের আয়োজন হয় খুলনায়। তাই এ সুযোগ কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

জেলখানা ঘাট থেকে রূপসা নদীর দৃশ্য ছবি লেখক

অফিসে যখন বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল তখন আমাদের অফিস সহকারি বললো, একটা ট্রলার ভাড়া করে ফেলেন, না হলে দেখতে বেশ অসুবিধা হবে। বাইচের দিন নদীর দুধারে আর খান জাহান আলী (রূপসা) সেতুতে তিল ঠাঁই ধারণের জায়গা থাকবে না। রূপসা বাড়ি হওয়াতে তাকেই ট্রলার ঠিক করতে বললাম।

পুরো খুলনা শহর জুড়ে বেশ কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা থাকে। শহরের একমাত্র আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে এ নৌকাবাইচ। আমি যে বাসায় থাকি সেখানের অন্য ফ্ল্যাটের সবাই যেতে চায় আমাদের সাথে। ভাবলাম এক ট্রলারে সবাইকেই তো নেয়া যাবে।  আমি খুশি মনে রাজি হলাম। তখনও ভাবতে পারিনি কী ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছি।

বাইচ শুরু হবে দুপুর ২টা থেকে চলবে বিকেল ৫টা থেকে। আগের দিন রাতে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতে চাইলাম ট্রলারের। শুনলাম ট্রলার এখনও ঠিক করা হয়নি, কাল সকালে ঠিক করবে। আমি তো একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ দেখছি তাতে ট্রলার পাওয়া যাবে বলেই মনে হচ্ছে না।

সকাল বেলায় দু:সংবাদটা পেলাম, কোনো ট্রলারই পাওয়া যাচ্ছে না। চারদিন আগে থেকেই সব বুকিং। বিকেলে নৌকাবাইচ কীভাবে দেখবো, এখন রীতিমতো চিন্তায় পড়লাম। সকাল ১১টার দিকে নিজেই বের হলাম ট্রলার খুঁজতে। শহরের জেলখানা ঘাটে অনেকক্ষণ খোঁজাখুজি করে একজনকে পাওয়া গেল যার বুকিং নেই।

বুকিং পায়নি কথাটা ঠিক না। চালাক মাঝি সে, ফ্যামিলির লোকজন নিতে চায়, যাতে নৌকার উপর বেশি না লাফায়। ২টা থেকে ৫টা তিন ঘণ্টার জন্য প্রথমে তিন হাজার টাকা চাইলেও দরাদরি করে শেষ পর্যন্ত ২,৫০০ টাকায় রাজি হলো।  ঠিক হলো দুটোর সময় আমাদেরকে জেলখানা ঘাট থেকে তুলে নেবে।

তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে সবাইকে খাওয়ার জন্য তাড়া দিয়ে গোছগাছ করে নিলাম। একটা ইজিবাইক আমাদেরকে সবসময় নিয়ে যায়, তাকে ফোন দিয়ে আসতে বলে শুনলাম সেও রূপসা ব্রীজে আছে। বাসা থেকে বের হয়ে আমরা অন্য ইজিবাইক ধরে জেলখানা ঘাটে এসে দেখি ভয়াবহ অবস্থা, পা ফেলার জায়গা নেই ঘাটে।

এদিকে আমাদের মাঝির কোনো হদিস নেই। দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করতে জানালো ওপারে আছে চলে আসবে। একই সময়ে মাঝিও ফোন করে জানালো সে এপারে আসছে, সবাই ট্রলারে ওঠার পর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাকিয়ে দেখি সব দিক থেকে শত শত লোকজন ভর্তি ট্রলার আসছে। সবার একটাই লক্ষ্য, বাইচ দেখা।

খুলনার রূপসা ঘাট থেকে শুরু হবে নৌকাবাইচ। আর রূপসা সেতুর নিচে শেষ হবে এ প্রতিযোগিতা। আমরা ততক্ষণে ট্রলার নিয়ে শুরুর পয়েন্টের কাছে চলে এলাম। নৌ পুলিশ এবং নেভি তাদের স্পীড বোট ও ট্রলার নিয়ে নিশ্চিত করছে যাতে কেউ চাইলেও খুব কাছে যেতে না পারে। অবশ্য এ দূরত্ব থেকে বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছিল।

আকাশ মেঘলা থাকায় একটা সমস্যা হচ্ছিল ছবিগুলো মোটেই ভালো হচ্ছিল না। অন্যদিকে এ গরমের দিনে স্বস্তিও পাওয়া যাচ্ছিল। মাইকে ঘোষণা দেবার লম্বা ধরনের বাইচের এ বিশেষ নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে নদীর মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। সবার মধ্যে উত্তেজনা, এর মধ্যে বাইচ শুরু করার ঘোষণা দেয়া হলো।

চলছে প্রাণপণে দাঁড় বাওয়া ভিডিও লেখক

দেখার মতো বিষয় বটে, সাথে সাথে সবগুলো নৌকা যেন লাফিয়ে উঠে সামনে এগিয়ে গেল। নৌকার ঠিক মাঝে একজন দাঁড়িয়ে একভাবে বাজনা বাজিয়ে যাচ্ছে। আর বাকি সবাই একতালে প্রাণপণে বৈঠা বাইছে। গতি আছে বটে নৌকাগুলোর। আমাদের ইঞ্চিনের ট্রলার, তাও ওদের পাশে পাশে যেতে কষ্টই হচ্ছিল।

রূপসা নদীর দুধারে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। হাত তালি, বাঁশি আর চিৎকার করে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে সবাই। তীরবেগে এগিয়ে চলেছে নৌকাগুলো। ট্রলারগুলোও সব পিছু নিয়েছে নৌকার। ভালোই যাচ্ছিল সবাই, কিন্তু খুলনা শিপইয়ার্ডের বাঁকের কাছে এসে নদীর তীব্র স্রোতে ডুবে গেল ৩/৪ টা নৌকা।

স্রোতে ডুবে গেল ৩/৪ টি নৌকা ভিডিও লেখক

অবশ্য নৌকার সবাইকে দেখলাম সুন্দর করে সাঁতার কেটে তীরে পৌঁছে গেল। এ সুযোগে অনেক পেছন থেকে এক নৌকাকে দেখলাম তীর বেগে বেরিয়ে এসে বাকি প্রতিযোগিদের ধরে ফেললো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো না ডুবলেই একটা পজিশন পাওয়া যাবে। যাই হোক এর মধ্যে প্রথম দল রূপসা ব্রীজের নিচে পৌঁছে গেল।

ডুবে যাওয়া নৌকার সদস্যরা ছবি লেখক

তার একটু পরে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলও পৌঁছে গেল। ছোট নৌকার তিন বিজয়ীকে আমরা পেয়ে গেছি। রূপসা ব্রীজও লোকে লোকারণ্য, হাজার হাজার মানুষ ব্রীজের উপর থেকে নৌকা বাইচ দেখছিল। আমরাও ট্রলার ঘুরিয়ে আবার রওনা দিলাম শুরুর পয়েন্টের দিকে, এবার যে বড় নৌকার খেলা শুরু হবে।

ছোট নৌকাগুলোতে ১০ জনের মতো লোক বৈঠা বাইছিল, আর বড়গুলো বেশ বড় আকারের। সেখানে অন্তত ২৫ জন আছে। গতিও বেশি এবং এ ঢেউয়ে তাদের ডোবার সম্ভাবনাও কম। আমরা যখন ফিরে যাচ্ছিলাম অর্ধেক পথও যেতে পারিনি, এর মধ্যেই তীর বেগে আসতে দেখলাম বড় নৌকাগুলোকে।

এবার অবশ্য আমরা খুব কাছে থেকে ভালোমতোই দেখছি। বাজনার তালে তালে বিশাল এ নৌকার সবাই প্রাণপণে ঠেলে যাচ্ছে বৈঠা। ব্রীজ যে আর বেশি দূরে নয়। সবার সামনে আছে বাবা মায়ের আশীর্বাদ নামে কয়রা উপজেলার একটি দল। এদেরই জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। 

প্রতিযোগিতা শেষ এবার বাড়ি ফেরা ছবি লেখক

তাদের পিছনে যে দু নৌকা রয়েছে তাদের মধ্যে হাড্ডহাড্ডি লড়াই হচ্ছে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে। মাত্র কয়েক হাত আগে পরে তারা। দেখার মতো চালাচ্ছে বিশাল এ নৌকাগুলো। চরম উত্তেজনার মধ্যে বাইচ শেষ হলো এভাবে। রূপসা ব্রীজের নিচে তখন সব দলগুলো আস্তে আস্তে নৌকা চালাচ্ছে।

জানতে পারলাম প্রতিবছরই রূপসা নদীর বুকে আয়োজন করা হয় এ নৌকাবাইচ। বর্তমানে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নৌকা বাইচ। এ আয়োজনের স্পন্সর করে থাকে গ্রামীণফোন। এভাবেই বেঁচে থাক বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো। দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ুক।

ফিচার  ইমেজ লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মন প্রশান্তির হাজাছড়া ঝর্ণা

পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য ৫টি আকর্ষণীয় স্থান