চট্টগ্রামের এক পাহাড়ে বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) মাজার

মাজার প্রথায় আমি বিশ্বাসী নই। যেকোনো মাজারে গেলে কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি হয় আমার। তবুও ভাবলাম, চট্টগ্রামে যেহেতু এসেছিই, বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) মাজারে কী চলছে, দেখে আসি।

চট্টগ্রাম নগরীর একটি পাহাড়ে অবস্থিত বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) মাজার। ইরানের বিখ্যাত পার্সিয়ান সুফি বায়েজিদ বোস্তামির নামে গড়ে ওঠে মাজারটি। বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) নাম অনুসারে এই মাজার হলেও, ইরানের বিখ্যাত সুফী বায়েজিদ বোস্তামীর এই অঞ্চলে আগমনের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ধারণা করা হয়, সুফী সাধক ও আউলিয়াগণ চট্টগ্রামে ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় সচরাচর পাহাড়ের উপরে কিংবা জঙ্গলঘেরা অঞ্চলে আবাস স্থাপন করেন এবং এসব জায়গাতে মাজার কিংবা এই ধরনের বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেন। বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার মূলত উনাকে উৎসর্গ করে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিরূপ মাত্র।

প্রবেশদ্বার। সোর্স: লেখিকা

যদিও এলাকার জনশ্রুতি অনুযায়ী বায়েজিদ বোস্তামীর চট্টগ্রামে আগমনের ইতিহাস শুনতে পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে অবস্থানের পরে প্রস্থানকালে ভক্তরা তাকে এখানেই থেকে যাবার অনুরোধ করলে তিনি তাদের ভালোবাসা ও ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে কনিষ্ঠ আঙুল কেটে কয়েক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়ে যেতে দেন এবং ওই স্থানে তার নামে মাজার গড়ে তুলবার কথা বলে যান।

এই জনশ্রুতির স্বপক্ষে অষ্টাদশ শতাব্দীর চট্টগ্রামের কিছু কবির কবিতার উল্লেখ করা হয়- যেখানে শাহ সুলতান নামক একজন মনীষীর নাম বর্ণিত আছে। বায়েজীদ বোস্তামীকে যেহেতু সুলতান-উল আরেফীন হিসাবে আখ্যায়িত করা হয় সেই সূত্রে এই শাহ সুলতান আর সুলতান-উল আরেফীনকে একই ব্যক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

মহিলা-পুরুষেরা কাঠির মধ্যে কলা নিয়ে কচ্ছপকে খাওয়ানোর জন্য বসে আছে। সোর্স: লেখিকা

আগেই শুনেছিলাম, বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পাদদেশে একটি সুবিশাল দীঘি অবস্থিত। এর বাসিন্দা হিসাবে বোস্তামীর কাছিম ও গজার মাছ সুবিখ্যাত। মাজারের বাইরে থেকেই এই দীঘি দেখতে পেলাম। মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার রাস্তার দুই ধারে সার বাঁধা দোকান। দোকানে আগরবাতি, মোমবাতি, লাল সূতোর পশরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। সেই সাথে আছে বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান। তার মধ্যে কলা উল্লেখযোগ্য। এখানকার দোকানে এত পরিমাণ কলা থাকার কারণ বুঝতে পারলাম না। তবে একটু পরেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো।

এই মাজারের ভক্তদের ভাষ্য ও আঞ্চলিক জনশ্রুতি অনুযায়ী মাজার প্রতিষ্ঠাকালে এ অঞ্চলে প্রচুর দুষ্ট জিন এবং পাপীষ্ঠ আত্মার পদচারণা ছিল। বায়েজিদ বোস্তামী তার এ অঞ্চলে ভ্রমণকালে এসব দুষ্ট আত্মাকে শাস্তিস্বরূপ কচ্ছপে পরিণত করেন এবং আজীবন পুকুরে বসবাসের দণ্ডাদেশ দেন।

কলার পুকুর তথা সমুদ্রে বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ। সোর্স: লেখিকা

কিছুদূর যেতেই বিশালাকার পুকুরটি দেখতে পেলাম। পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে পা ফেলার জায়গা নেই। ওখানকার প্রত্যেক ইঞ্চি জায়গা জুড়ে মহিলা-পুরুষেরা কাঠির মধ্যে কলা নিয়ে বসে আছে। কলা খেতে পুকুরের পাড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে বিশালাকার কিছু কচ্ছপ। এই তাহলে সেই বিস্ময়কর কচ্ছপ বা কাছিম বা গজার মাছ! স্থানীয়রা এদের মাজারি ও গজারি বলেই আখ্যায়িত করে।

এটি একটি কাঠগোলাপ গাছ। আশেপাশে আরোও কিছু কাঠগোলাপ গাছ ছিল। তন্মাধ্যে এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ বোধগম্য হয়নি।  সোর্স: লেখিকা

এ কচ্ছপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অত্যন্ত বিরল এবং বিপন্নপ্রায় প্রজাতি। বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামির মাজার ছাড়া তাদের বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। মাজারের কচ্ছপগুলো দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। এই কচ্ছপগুলোর অনেকগুলোরই বয়স প্রায় ২০০-২৫০ বছর। কচ্ছপের আয়ু অনেক বেশি, সাধারণভাবেই তারা প্রায় ১০০ বছরের ওপরে বাঁচে। ফলে কচ্ছপগেুলোর বয়সজনিত ভক্তদের দাবি প্রায় কয়েক শত বছরের পুরাতন এই মাজার।

মাজার পূজায় জ্বলন্ত মোমবাতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে! সোর্স: লেখিকা

মাজারের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মাজার তত্বাবধায়ক কমিটির লোকদের দ্বারাই এদের প্রতিপালন করা হয়। বর্তমানে মাজার প্রাঙ্গণ সংলগ্ন এই দীঘিতে দেড়শ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ কচ্ছপের আবাস রয়েছে বলে জানা যায়। প্রজনন মৌসুমে মাজারের মূল পাহাড়ের পেছনে এদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে এদের ডিম পাড়ার ব্যবস্থা করা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ আহসান বলেন, বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মাজারের এ বিস্ময়কর কচ্ছপ চট্টগ্রামের অন্যতম ঐতিহ্য। এ প্রাণি এখন বিলুপ্তির পথে। এখনই এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

মাজারের মিনার। সোর্স: লেখিকা

বায়েজিদ বোস্তামির (রহ.) মাজার উল্লেখ্য, প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যান্ডারসন ১৮৭৫ সালে সর্বপ্রথম ভারতের জাদুঘরে রক্ষিত দুটি নমুনা থেকে বোস্তামীর কচ্ছপের প্রজাতিটির সন্ধান পান। রক্ষিত নমুনা দুটি ছিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী পুকুর থেকে সংগৃহীত।

১৯১২ সালে প্রাণিবিজ্ঞানী এন এনানডেলের মতে, বোস্তামীর কচ্ছপ এক সময় ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে বিচরণ করত। এই পুকুরে কচ্ছপগুলো কীভাবে এলো এতদিন পরে এখন তা আর জানার কোনো উপায় নেই।

আল্লাহর এই বান্দাটি ঠিক কার কাছে সিজদায় রত, জানতে ইচ্ছে করে। সোর্স: লেখিকা

তবে যেভাবে আসুক না কেন মাজারের এই পুকুরে শত শত বছর ধরে বাস করা কচ্ছপগুলো বিশ্বে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রজাতি, তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এই প্রজাতির কচ্ছপ এতই দুর্লভ যে ১৯১৪ সালে প্রাণিবিজ্ঞানী এন এনানডেলের ও অন্য প্রাণিবিজ্ঞানী এম শাস্ত্রী এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, বোস্তামীর কচ্ছপ বর্তমানে শুধু চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী মাজার সংলগ্ন পুকুরেই টিকে আছে। পৃথিবীর অন্য কোথাও এই প্রজাতির কচ্ছপ দেখা যায় না।

অন্দরমহল। সোর্স: লেখিকা

মাজার প্রাঙ্গণের বাতাস আগরবাতির ধোঁয়ায় ভারি হয়ে আছে। সেসব ছাপিয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। মাজারে ওঠার সিঁড়িতে জুতাপায়ে যাওয়া যাবে না। জুতা নিলয়ের কাছে জমা রেখে আমি আর আরমান উপরে উঠে গেলাম। গিয়ে দেখি এক মহিলা মাজারের সামনে যে সিজদায় পড়েছে, আর ওঠার কোনো নাম নেই। আমি মাজার ঘুরে ঘুরে দেখছি, এক খাদেম আমাকে বললো, ‘মাজারে এলে আগে এখানে সালাম করে যেতে হয়।’

আমি কিছু না বলে ওখান থেকে সরে আসতেই শুনতে পেলাম, ‘মাজারে সম্মান জানায় না, আসছে খালি ছবি তুলতে।’

আমি একরাশ বিতৃষ্ণা নিয়ে ওখান থেকে নেমে এলাম। 

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চা বাগানের শহরের আনাচেকানাচে ইতিউতি পদচারণ

কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতসমূহ