হাজারো পদ্মের ভুতিয়ার বিল

জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস “হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম” পড়েছিলেন কি? বাংলা গল্প, উপন্যাস, গান বা কবিতায় পদ্মের অবাধ বিচরণ। গোলাপী রঙের জলজ এই ফুল জন্মায় দেশের অনেক বিলেই, কিন্তু এক সাথে হাজার হাজার পদ্ম ফুটে আছে এরকম জায়গা খুঁজে পাওয়া একটু কঠিনই বটে।

পদ্ম ফোটা বিলের জলে; ছবি- লেখক

খুলনার তেরখাদা উপজেলাটা রূপসা নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন বলে যাওয়াটা একটু ঝামেলার লাগতে পারে অনেকের কাছেই। তবে নদী পার হওয়ার পর রাস্তাটা একেবারেই মসৃণ আর গাড়িও চলে খুব কম। খুলনা থেকে আসা যাওয়া ৬০ কিমি এর নিচে, তাই মনে মনে ঠিক করেছিলাম সাইকেল চালিয়ে চলে যাব।

সঙ্গে কয়েকজন না হলে এত দূর সাইকেল চালানোটা বেশ একঘেঁয়ে ব্যপার। এসময় দেখলাম শুক্রবারে খুলনা সাইক্লিস্টসের একটি দল যাবে তেরখাদার বিখ্যাত পদ্মের বিল “ভুতিয়ার বিলে”। সাথে সাথে তাদেরকে জানিয়ে দিলাম আমিও যেতে চাই ওদের সঙ্গে। ৭ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল ৬:৩০ এ ২২ জন রওনা দিলাম খুলনার শিববাড়ী মোড় থেকে।

জেলখানা ঘাট থেকে রূপসা নদীর দৃশ্য; ছবি- লেখক

জেলখানা ঘাটে পৌঁছাতে ১৫ মিনিটের মতো সময় লাগলো। খুলনার জেলা কারাগার এখানে বলেই এর নাম জেলখানা ঘাট। ফেরী ছিল ঘাটে, কিন্তু ছাড়ার কোনো লক্ষণই দেখছি না। পর্যাপ্ত গাড়ি না হলে ফেরী ছাড়ে না। তাই একটা ট্রলার রিজার্ভ করে নিলাম ৮০ টাকা দিয়ে। এমনিতেই ট্রলারে জনপ্রতি ৫ টাকা দিয়েই পার হওয়া যায়।

জেলখানা ঘাটের ওপারে রূপসা উপজেলার সেনপাড়া বাজার। ঘাট থেকে বাস-লেগুনা যায় তেরখাদা। মোটামুটি ২৩ কিমি দূরত্ব। চমৎকার রাস্তা, কোথাও একটু ভাঙাও নেই। রাতে ও সকালে ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তা বেশ ভেজা, সাবধানেই চালাচ্ছি আমরা। হঠাৎ হঠাৎ অটো, ট্রাক্টর বা ভ্যানের দেখা মেলে। অনেকক্ষণ পর পর বাসও আসছে একটা-দুটো।

চমৎকার এ রাস্তায় সাইকেল চালানোটাও সৌভাগ্যের বিষয়। বৃষ্টি আসি আসি ভাব। এর মধ্যে প্রথম এক ঘণ্টায় দুই তৃতীয়াংশ পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি আমরা। বৃষ্টিটা হঠাৎ করেই আসলো। তখনই অল্প দূরে একটি বাজার চোখে পড়ল আমার। সকালে নাস্তা করা হয়নি কারোই, তাই নাস্তার জন্য বিরতির ঘোষণা দিলাম আমরা।

পদ্মবিলের ভিডিও

গ্রামের বাজার, সকালের নাস্তায় তেলে ভাজা পরোটা আর ডাল। সাথে দেখি খিচুড়িও আছে। আরও অনেকক্ষণ সাইকেলে থাকতে হবে ভেবে খিচুড়ি আর ডিম মামলেট নিয়ে খেতে বসলাম। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। আরাম করে ডিম-খিচুড়ি খেয়ে যখন উঠলাম ততক্ষণে বৃষ্টি পুরোপুরি বন্ধ। আবার শুরু হলো পথচলা।

তেরোখাদা উপজেলা পার হয়ে সামান্য যেতেই চোখে পড়লো অনেকগুলো অটো রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটখাটো একটা জটলা সেখানে। বুঝতে পারলাম এটাই আমাদের গন্তব্য “ভুতিয়ার বিল”। দুপাশে সারি সারি নৌকা বাঁধা। গাছের সাথে আমাদের সাইকেলগুলো লক করে আমরা নৌকা ঠিক করার কাজে লেগে গেলাম।

বিল এলাকার বাচ্চার খেলনাও এই ফুল; ছবি- লেখক

বিলের ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে চলার উপযোগী নৌকা। এক নৌকায় সর্বোচ্চ ওঠা যাবে তিনজন করে, আর এক ঘণ্টা ঘোরার জন্য দিতে হবে ৩০০ টাকা। আমরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নৌকায় উঠে পড়লাম। বৈঠার পরিবর্তে লগি দিয়ে একরকম ঠেলেই বাওয়া হচ্ছে এ নৌকা। রাস্তার পাশ থেকে ছোট একটা ব্রীজের নিচে দিয়ে নৌকা গিয়ে পড়লো মূল বিলে।

পানি বেশি বলে মনে হচ্ছে না। কোনো কোনো জায়গায় ধান কেটে নিয়ে যাওয়ার পর রেখে যাওয়া অংশে ধান গাছ গজিয়েছে কিছু। এর মধ্যে দিয়ে এক হাতের কম জায়গা দিয়ে দক্ষতার সাথে নৌকা বেয়ে চলেছে আমাদের মাঝি। একটু খোলা জায়গা পেরিয়ে মূল পদ্ম ফোটা অংশে পৌঁছালাম আমরা। বেশ বাতাস বিলে, এর মধ্যে দিয়েই পদ্মের গাছ আর ফুলের মধ্য দিয়েই চলেছে আমাদের নৌকা।

যাওয়ার পথেই ফুটে আছে কিছু পদ্ম; ছবি- লেখক

হাজারো পদ্ম ফুল বিলে। কোনোটা পুরো ফুটে আছে, কোনোটা অর্ধেক ফোটা আর কোনোটা পুরোপুরি কলি। আমি বসেছি নৌকার একেবারে সামনের গলুইয়ে। সাঁতার জানি, তবে এখানে প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না। বেশির ভাগ জায়গায় পানির গভীরতা কম, অগভীর পরিস্কার জলে সূর্যরশ্মির অনেকদূর প্রবেশের ফলে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।

ফড়িংদের স্বর্গরাজ্য এ বিল; ছবি- লেখক

খুব কাছে দিয়েই পদ্মফুলগুলো দেখা যাচ্ছে। হাত দিলে ছোঁয়াও যাবে এ দূরত্বে। তবে কোনো ফুল ছেঁড়া থেকে বিরত থাকলাম। আমার নৌকার মাঝি জানালো আগে রাস্তার পাশেও পদ্মফুল ছিল। দলে দলে পর্যটকরা এসে সেগুলো ছিঁড়ে নিয়ে যাওয়াতে এখন পদ্ম দেখাতে তাদেরকে বিলের বেশ গভীরে আসতে হয়। ফুল ছিঁড়তে নিষেধ করলে সেটাতে কেউ কর্ণপাত করে না।

অর্ধেক ফোটা পদ্ম দেখতেই বেশি সুন্দর; ছবি- লেখক

খেয়াল করে দেখি পদ্মের কাণ্ডে ছোট ছোট কাঁটা। এজন্য মনে হয় কবি বলেছিলেন, ”কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে, দু:খ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে?” নৌকা যখন এগিয়ে যায়, ঘাসফড়িংয়েরা লাফিয়ে লাফিয়ে দু’পাশে সরে যায়। আর পদ্ম পাতার উপর রাতের বৃষ্টির পানি জমে জ্বলজ্বল করছে হীরার মতো। এত মুগ্ধ ছিলাম, কীভাবে সময় পার হয়ে এক-দেড় ঘণ্টা কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।

পদ্ম পাতার জল; ছবি- লেখক

নৌকা ফিরে চললো ঘাটের উদ্দেশ্যে। ঠিক ব্রীজের নিচে এসে দেখলাম আরও অনেকগুলো নৌকা আসছে, মোটামুটি ট্রাফিক জ্যাম। অন্য নৌকাগুলো এক পাশে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে যেতে দিল আগে। যারা ফিরে এসেছে প্রায় সবার হাতে অনেক ফুল। যে যা পেরেছে নিয়ে এসেছে। বিলের পদ্ম দ্রুতই আবার ফোটে বলে স্থানীয় লোকজনও কাউকে বাধা দেয় না।

ফেরার পথে বেশ রোদ চড়ে ওঠাতে কষ্টই হলো খুলনা পর্যন্ত আসতে। রাস্তায় প্রবল বাতাসও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বহাল তবিয়তে দুপুর ১২:৩০ এর দিকে বাসায় এসে পৌঁছালাম। খুলনা থেকে আসা-যাওয়া মোট ৫৬ কিলোমিটার ছিল। যারা পদ্মবিল দেখতে তেরোখাদা ভুতিয়ার বিলে যাবেন, তাদের কাছে শুধু একটাই অনুরোধ করবো ফুল ছিঁড়বেন না।

কীভাবে যাবেন:

খুলনার জেলখানা ঘাট পার হলেই লেগুনা বা বাসে তেরোখাদা উপজেলা গিয়ে সেখান থেকে ভ্যান বা অটোতে যেতে পারবেন ভুতিয়ার বিল। একবার বিলে পৌঁছালে বেড়ানোর জন্য নৌকা পাবেন। সবচেয়ে ভালো হয় খুব ভোরে বা বিকেলে গেলে।

নৌকায় সতর্কভাবে বসবেন, সামান্য অযাচিত ধাক্কায় নৌকা উল্টে যেতে পারে। যেকোনো সময় বৃষ্টি এসে ধুয়ে দিতে পারে তাই সঙ্গে ছাতা এবং মোবাইল, মানিব্যাগ রক্ষা করার জন্য পলিথিন ব্যাগ রাখবেন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঘুরে আসুন তিন রাত চার দিনে ঢাকা-কাপ্তাই-সাজেক

ম্যাডনেসের সাথে ধুপপানি, মুপ্পছড়া ও ণ-কাটা ঝর্ণার টানে