ভারতের সমুদ্রস্বর্গ গোয়ার নয়নাভিরাম সব ভ্রমণস্থানের গল্প

দক্ষিণ ভারতের অপূর্ব সুন্দর এক শহরের নাম গোয়া। মুম্বাই শহরের অদূরে অবস্থিত এই শহরকে বলা হয় ভারতের সমুদ্রস্বর্গ। কলকাতা থেকে ট্রেনে অথবা বিমানে করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গোয়ায়। ব্যস্ততম জীবন থেকে একটু মুক্তি পেতে, কয়েকটা দিন ভিন্ন মাত্রার সমুদ্রবিলাস করতে জমকালো জীবনযাত্রায় ভরপুর গোয়ার কোনো বিকল্প নেই।

যেহেতু ভারত আমাদের পাশের দেশ তাই এখানে ভিসা সংক্রান্ত ঝামেলাও তেমন একটা নেই, আর যাতায়াতেও রয়েছে বেশ সুবিধে। তাই দক্ষিণ ভারতে ঘুরতে যাওয়া যায় কোনো রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। কী আছে দেখার গোয়ায়?

সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি গোয়ায় আছে প্রচুর দর্শনীয় স্থান যা প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটকের মন মাতিয়ে রেখেছে, সামনেও রাখবে। বন্ধু-বান্ধব বা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়ানোর শহর গোয়া। আপনি যদি পরিকল্পনা করে থাকেন গোয়ায় ঘুরতে যাওয়ার তবে লেখাটি আপনার জন্যই। ব্যাগ গুছানোর আগে চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক গোয়ার নামকরা সব ভ্রমণস্থানের আদ্যোপান্ত।

১. চ্যালানগুটে সমুদ্র সৈকত

ছবিঃ upload.wikimedia.org

গোয়ার বিশেষ করে উত্তর গোয়ার সবচেয়ে নামকরা সমুদ্র সৈকতের নাম চ্যালানগুটে। উত্তর গোয়ার সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত এটি। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় এই সৈকত পিক-সিজনে ভরে ওঠে দেশ-বিদেশের বাঘা বাঘা সব পর্যটক দিয়ে। দিনে এবং রাতে পর্যটকের গুঞ্জনে জীবন্ত এই সৈকতে দেখা মিলবে দীর্ঘ উপকূলীয় রেখা আর অসাধারণ সামুদ্রিক দৃশ্য।

সৈকতের সামনের অংশে রয়েছে প্রচুর কটেজ, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব আর কেনাকাটার দোকানপাট। আপনি চাইলে সামুদ্রিক বিভিন্ন খেলায়ও মেতে উঠতে পারেন এখানে। চ্যালেনগুটা সমুদ্রসৈকতকে বলা হয় সৈকতের রানী যেখানে একবার গেলে যেতে ইচ্ছে করবে বারবার।

২. এগুয়াডা দুর্গ

ছবিঃ wsimag.com

সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ এবং মাথারাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা গড়ে তুলতে পর্তুগিজ সেনারা তৈরী করেন এগুয়াডা দুর্গ। এগুয়াডা দুর্গ উত্তর গোয়ার সিনকুয়েরিম সমুদ্র সৈকতের পাশে অবস্থিত। গোয়ায় পর্তুগিজদের সবচেয়ে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ দূর্গ এটি। দূর্গটি মোটা মোটা সব প্রাচীর আর গভীর পরিখায় সজ্জিত। এই দূর্গের প্রধান আকর্ষণ হলো ১৮৬৪ সালে নির্মিত ১৩ মিটার উঁচু এক লাইটহাউস আর খিলানওয়ালা এক বিশাল চৌবাচ্চা যা প্রায় ১০ মিলিয়ন লিটার পরিষ্কার পানি ধরে রাখতে পারে।

তৎকালীন সময়ে এই দুর্গের জেটিতে যেসব জাহাজ ভিড়তো সেগুলোতে পরিষ্কার পানি সরবরাহের কাজে এই চৌবাচ্চা ব্যবহৃত হতো। এই দুর্গের বেশ কয়েকটি স্থাপনা এখনো অক্ষত রয়েছে এবং কারাগারে রূপান্তর করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, কাকতালীয়ভাবে এটি এখন গোয়ার সবচেয়ে বড় কারাগার।

৩. ডেল্টিন রয়াল ক্যাসিনো

ছবিঃ deltin.com

গোয়ার পাঞ্জিমে সবচেয়ে বড় ক্যাসিনো বোট হলো এই ডেল্টিন রয়াল ক্যাসিনো। ২৪ ঘণ্টা অবিরাম বিনোদনের রাজকীয় আড্ডাখানা এই ৪০,০০০ স্কয়ার ফিটের জাহাজটি। এখানে ঢুকতে হলে আপনার “এন্ট্রি এন্ড প্লে” প্যাকেজটি কিনতে হবে। তাহলে ঢুকে ঘুরে ফিরে দেখা শেষ হলে আবার বের হয়ে আসা যাবে।

যদি ডেল্টিন হোটেলে একরাত থাকতে চান তবে সে সুযোগও আছে, সেক্ষেত্রে কিনতে হবে “স্টে এন্ড প্লে” প্যাকেজটি। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় সকল জাতীয় ছুটির দিনে ডেল্টিন রয়াল ক্যাসিনো বন্ধ থাকে। আমোদপ্রিয় পর্যটকদের জন্য এটি ঘুরে দেখার জায়গা বটে।

৪. ছাপোরা দুর্গ

বলিউডের এক সময়কার নামীদামী সফল সিনেমা “দিল চাহতা হ্যায়” এর শুট্যিংয়ের কিছু অংশ যে দুর্গে হয়েছিল সেটি গোয়ার ছাপোরা দুর্গ। ছাপোরা নদীর একদম মুখে অবস্থিত এই দুর্গটি যেন ছাপোরার নদীর আদিরক্ষক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে।

তবে এর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি আর আগের মত অক্ষত নেই, তবুও এখান থেকে উপকূলীয় এক অপার্থিব দৃশ্যের সাক্ষী হওয়া যায়। ছবিপ্রেমীদের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় জায়গা।

৫. বম জিসাসের ব্যাসিলিকা

গোয়ায় যে জিনিসটি নতুন পর্যটকদের চোখে পড়বে প্রথমেই তা হলো এখানে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বসতি। পুরো দক্ষিণ ভারতেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগুরু, তাই গির্জা বা চার্চ অথবা ব্যাসিলিকা পাবেন অলিতে গলিতে। গোয়ার তেমনি এক বিখ্যাত ব্যাসিলিকা হলো বম জিসাসের ব্যাসিলিকা।

গোয়ার ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক ব্যাপারস্যাপার বুঝতে হলে এখানে আসতে হবে আপনাকে। এই গির্জাগুলো শুধুমাত্র উপাসনালয় নয়, বরং ঐতিহ্য রক্ষাকারী একেকটা রক্ষকও বটে। ফ্রান্সিস জেভিয়ারের পার্থিব শেষাংশ অত্যন্ত পবিত্রতার সাথে রক্ষিত আছে এখানে। ইউনেস্কো এই ব্যাসিলিকাকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সম্মাননা দিয়েছে।

৬. পান্ডাভা গুহা আর আরভালেম জলপ্রপাত

ছবিঃ cdn.zeebiz.com/

সাগর অথবা দূর্গ থেকে একটু সরে আসতে চলে আসতে পারেন এখানে। উত্তর গোয়ার বিচলিম শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পান্ডাভা গুহা কমপ্লেক্স আর আরভালেম জলপ্রপাত। পান্ডাভা গুহা কমপ্লেক্সটি মোট ৫টি আলাদা কুঠুরিতে ভাগ করা যার মাঝখানের কুঠুরিকে বলা হয় “লিংগা” যা সাধু-সন্ন্যাসীর আরাধনার জন্য বিশেষভাবে তৈরী এবং বরাদ্দকৃত।

পান্ডাভা গুহার একদম কাছেই রয়েছে নয়নাভিরাম আরভালেম জলপ্রপাত যার জলরাশি প্রায় ৫০ মিটার উঁচু থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ে অপার্থিব এক দৃশ্যের সৃষ্টি করে প্রতিনিয়ত। জলপ্রপাতের কাছে একটি পার্কও আছে যেখানে বসেই জলপ্রপাত আর তার নিচের হৃদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যাবে নিরিবিলিতে।

৭. মাংগেশী মন্দির

ছবিঃ goibibo.com

গোয়ায় পর্তুগীজ ঐতিহ্য বেশি প্রভাব বিস্তার করলেও এখানে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত মন্দির-মসজিদও রয়েছে। গোয়ার পন্ডা অঞ্চলটি বিশেষ করে এর সাফা শাহাউরি মসজিদ আর প্রায় ৪৫০ বছর পুরনো শ্রী মাংগেশ মন্দিরের জন্য বিখ্যাত। এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হলো সাত তলা বিশিষ্ট ল্যাম্প টাওয়ার যাকে বলা হয় দীপস্তম্ভ আর অনন্যসুন্দর এক জলাশয় যা এই মন্দিরের সবচেয়ে পুরনো অংশ বলে মানা হয়। এটি গোয়ার সবচেয়ে বড় মন্দিরগুলোর একটি।

৮. দুধসাগর জলপ্রপাত

ছবিঃ mouthshut.com

গোয়া থেকে তামিলনাড়ু রেলপথে ভ্রমণ করলে যে জলপ্রপাত দেখা যায় তার নাম দুধসাগর জলপ্রপাত। আক্ষরিক অর্থ যার দুধের সাগর সেই জলপ্রপাত মোট চারটি জলপ্রপাতের সম্মিলিত রূপ। এটি ভারতীয় চতুর্থ উচ্চতম জলপ্রপাত। গোয়ার ম্যাডগাউ থেকে প্রায় ৪৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জলপ্রপাতের গল্প শুনে থাকবেন দক্ষিণ ভারত ঘুরতে আসা সকল পর্যটকদের কাছ থেকে। এই জলপ্রপাতের পাশ দিয়েই গেছে রেললাইন, যখন কোনো ট্রেন এই জলপ্রপাতের পাশ দিয়ে যায় তখন ট্রেনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরে চালানো হয় যাতে ভ্রমণকারীরা এই জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো রেললাইন ব্যতীত এখানে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে দাঁড়িয়ে আপনি জলপ্রপাতটি দেখতে পারবেন। অনেকে তাই দুধসাগর স্টেশনে নেমে পেছনে হাঁটতে শুরু করেন রেললাইনে দাঁড়িয়ে জলপ্রপাতটি দেখবেন বলে যা অত্যন্ত বিপদজনক একটি কাজ।

ফিচার ইমেজ- tourezze.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতায় কেনাকাটার টিপস

আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: লাস ভেগাস সিটি