আল্পাইন পর্বতমালার দেশ অস্ট্রিয়ার দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থানের গল্প

ইউরোপের অন্যতম দেশ জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য অস্ট্রিয়ার নাম তো কম-বেশি সবাই শুনেছেন। আল্পস পর্বতের ঠিকানা এই অস্ট্রিয়ায় গরম এবং শীত উভয়কালেই পর্যটকরা ভীড় জমায় সমানভাবে। ইউরোপের সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি হলো অস্ট্রিয়া। আল্পাইন রিপাবলিকের এই দেশে রয়েছে ইউরোপের বিখ্যাত কিছু স্কিংয়ের স্পট যেগুলো শীতকালে মেতে উঠে বরফ আর স্কিং করতে আসা প্রচুর পর্যটকে।

অস্ট্রিয়ার প্রায় ৬০ ভাগ অংশ জুড়ে আছে পূর্বাঞ্চলীয় আল্পাইন পর্বতমালা আর দক্ষিণ থেকে পূর্বে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার ব্যাপী বয়ে চলেছে দেশটির অন্যতম নদী দানোব। পর্যটকরা যেমন অস্ট্রিয়ায় আসে আল্পাইন পর্বতমালার সৌন্দর্য উপভোগ করতে তেমনি আসে, এর বিখ্যাত নগরী ভিয়েনা আর সালসবার্গ দর্শনে।

শীতকাল তো আসছে সামনে, অস্ট্রিয়ায় শীত এসেও গেছে অনেক আগে। ইউরোপ ঘুরে আসার এই তো মোক্ষম সময়। চলুন তাহলে দেখে নেয়া যাক অস্ট্রিয়া ভ্রমণকালে কী কী দেখবেন বা কোথায় কোথায় ঘুরে আসবেন সে দেশের।

১. দ্য ভিয়েনা হফবার্গ- অস্ট্রিয়ার রাজকীয় প্রাসাদ

ছবিঃ media6.trover.com

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অবস্থিত হফবার্গ প্রাসাদ প্রায় কয়েক দশক ধরে অস্ট্রিয়ার রাজ-পরিবারের একমাত্র স্থায়ী ঠিকানা ছিল। যে সকল রাজ-পরিবার এই প্রাসাদে ছিলেন তাদের বলা হতো হ্যাবসবার্গ। এখন সেই একই ঘরগুলোতে অস্ট্রিয়ার প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্র পরিচালনা করেন যেগুলো একসময় সম্রাট দ্বিতীয় জোসেফের অধীনে ছিল।

প্রায় সকল অস্ট্রিয়ান শাসক কিছুদিনের জন্য হলেও এই প্রাসাদে থেকেছেন আর আস্তে আস্তে পরিবর্তন করে গেছেন প্রাসাদের স্থাপত্যশৈলীতে। সেই হফবার্গ প্রাসাদই আজকে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৫৯ একর জমির উপর যেখানে প্রায় ১৯টি আলাদা বাগান আছে আর আছে প্রায় ২,৬০০ কক্ষ। এখানকার মূল আকর্ষণের ভেতর আছে রাজকীয় রৌপ্য সম্ভার, সিসি জাদুঘর আর রাজকীয় কক্ষগুলো।

২. সালসবার্গ এল্টাসতাদত

ছবিঃ footage.framepool.com

ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত অস্ট্রিয়ান নগরী সালসবার্গ ইউরোপীয় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান কারণ এই সালসবার্গেই ছিল প্রিন্স আর্চবিশপের স্থায়ী নিবাস। ৬৯০ অব্দে সালসবার্গের পুরনো শহর এল্টাসতাদতে সেইন্ট রুপার্টের দ্বারা স্থাপিত হয় প্রিন্স আর্চবিশপের বাসভবন।

আর্চবিশপরা তৎকালীন সবচেয়ে নামীদামী স্থাপত্যবিদ আর চিত্রকরদের দিয়েছিলেন নিজেদের চার্চ, বাসভবন আর আশ্রমগুলোর স্থাপত্যশৈলী একদম উঁচুস্তরে নিয়ে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব, যদিও পরে সবকিছুই আবার হালনাগাদ করা হয়েছে। এখানকার অলিতে গলিতে পাওয়া যাবে কারুকাজে ভরপুর অনন্য এক অভিজ্ঞতা যার প্রধান অংশ ধরে রেখেছে এখানকার মিডিইভাল আর বারোক ভবনগুলো। বেশ কয়েকটি গির্জা আর জাদুঘর দেখতে পাওয়া যাবে পায়ে হাঁটা দূরত্বেই।

৩. দ্য স্প্যানিশ রাইডিং স্কুল, ভিয়েনা

ছবিঃ i.pinimg.com

দ্য স্প্যানিশ রাইডিং স্কুলটি সম্রাট দ্বিতীয় ম্যাক্সিমিলানের আমলের যিনি কিনা অস্ট্রিয়ায় প্রথমবারের মতো বিখ্যাত ঘোড়া লিপিজানের আমদানী করেছিলেন। এই স্কুলটি মূলত ঘোড়সওয়ারি শেখানোর বিদ্যাপীঠ। সারা বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি জায়গার মধ্যে এই স্কুলটি অন্যতম যেখানে এখনো রাজকীয়ভাবে একদম প্রথম শ্রেণীর ঘোড়সওয়ারি শেখানো হয়।

১৭৩৫ সালে স্থাপিত এই স্কুলটির দুর্দান্ত সব হলগুলো বানানো হয়েছে এমনভাবে যাতে ঘোড়সওয়ার তাদের কারুকলা সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারেন। অনিন্দ্যসুন্দর উঁচু জাতের ঘোড়ার প্রদর্শনী দেখাটা ভিয়েনা থাকাকালীন অবশ্য করণীয় কাজের মধ্যে পড়ে, তাই ভিয়েনায় থাকাকালীন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অনলাইনের মাধ্যমে টিকেট কেটে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৪. স্কনব্রুণ প্রাসাদ, ভিয়েনা

ছবিঃ www.airfrance.fr

ভিয়েনার অদূরবর্তী অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণস্থান হলো স্কনব্রুণ প্রাসাদ। প্রাসাদটি গড়ে তোলা হয় ১৭০০ সালের প্রথম দিকে এবং শেষ রূপান্তর অনুযায়ী এটি পরে সম্রাজ্ঞী মারিয়া থেরেসার গ্রীষ্মকালীন বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্কনব্রুণ প্রাসাদ ভ্রমণে মূল আকর্ষণ হলো এই প্রাসাদের ৪০টি কক্ষ যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।

রাজকীয় কক্ষ, দুর্দান্ত গ্যালারি সাথে প্রাসাদের সিলিং জুড়ে আঁকা অসাধারণ সব চিত্রকর্ম পর্যটকদের করে বিমোহিত, আশ্চর্য। প্রায় ৫০০ একর জমির উপর স্থাপিত বিশাল এই প্রাসাদের অন্যতম আকর্ষণ রানী থেরেসার সুসজ্জিত প্রদর্শনী কক্ষ যেখানে শোভা পায় গোলাপ কাঠের প্যানেল, কাঁচঘর ইত্যাদি। ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এই প্রাসাদটি ঘুরে দেখতে বেশ সময়ও লাগে পর্যটকদের।

৫. হলস্ট্যাট এবং ডাশ্চটেইন সালজকামার্গাট

ছবিঃ netdna-ssl.com

অস্ট্রিয়ার অন্যতম ছোট এবং ছবির মতো সুন্দর শহর হলস্ট্যাট। এখানকার বারোক আঙ্গিকে গড়ে তোলা ভবনাদির স্থাপত্যশৈলী দেখলেই এই শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা চলে আসবে। অস্ট্রিয়ার অন্যতম সুন্দর অঞ্চল ডাশ্চটেইন সালজকামার্গাট ঘুরে দেখার জন্য হলেও হলস্ট্যাটে আসতে হবে যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটককে। এই শহরের রয়েছে বহু বছরের পুরনো লবণ উৎপাদনের ঐতিহ্য।

আরো রয়েছে হোর্নারওয়ের্ক গুহার কাছে সল্ট লেক, ডাশ্চটেইন গুহা যা কিনা ইউরোপের অন্যতম সুন্দর গুহামুখ যেটি প্রায় ১,১৭৪ মিটার গভীর। এতক্ষণ যারা অস্ট্রিয়ার প্রাসাদগুলোর ইট-পাথরের ভীড়ে একটু প্রকৃতির ছোঁয়া খুঁজছিলেন তাদের জন্যই মূলত এই জায়গাটি। বরফে জমে যাওয়া জলপ্রপাত, জায়ান্ট আইস কেইভ, ম্যামথ কেইভের মতো দুর্দান্ত কিছু গুহা আর চারদিকে ঘিরে থাকা আল্পস পর্বতমালা এক মুহূর্তের জন্যও নিজেদের সৌন্দর্য চাহিদা কমায় না পর্যটকদের চোখে।

৬. কিটজবুহেল এবং কিটজবুহেলার হর্ণ

ছবিঃ res-4.cloudinary.com

যাদের বরফের গায়ে স্কিইং করা জীবনের অন্যতম এক ইচ্ছের সামিল তাদের জন্য অস্ট্রিয়ার রয়েছে বেশ দুর্দান্ত কিছু স্কিইং জোন। কিটজবুহেলের স্কিইং জোন সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। বরফপ্রেমীদের জন্য কিটজবুহেল সাজিয়ে রেখেছে প্রায় ১৭০ কিলোমিটারের মতো স্কিইং করার জায়গা যার স্থানে স্থানে রয়েছে পাহাড়ি কুঁড়েঘর যেখানে পাওয়া যাবে আল্পাইন ঐতিহ্যবাহী খাবার-দাবার।

যদিও কিটজবুহেল সবচেয়ে কঠিন স্কিইং প্রতিযোগীতা “হাহনেনকাম” এর ভেন্যু, এটি সকল স্তরের স্কিইং করারই সুযোগ দেয় এর তিনটি স্কিইং এলাকায়। তবে শুধু স্কিয়াররাই কিটজবুহেলে যায় না, প্রচুর সাধারণ পর্যটকও যায়। কারণ কিটজবুহেল অন্যতম সুন্দর আল্পাইন গ্রামও বটে।

৭. ক্রিমলার এইক

ছবিঃ beautifulworld.com

অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাতের নাম ক্রিমলার এইক। প্রায় ৩৮০ মিটার উঁচু এই জলপ্রপাত মূলত তিনটা জলপ্রপাতের সম্মিলিত রূপ। অস্ট্রিয়ায় খুব সুন্দর ছুটির দিন কাটানো যায় এই জলপ্রপাতের অদূরবর্তী গ্রাম ক্রিমলে। ক্রিমল গ্রামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,০৭৬ মিটার উপরে অবস্থিত যার যাওয়া আসার রাস্তাটি পুরো ঢেকে আছে উঁচু উঁচু সব গাছের ছায়ায়।

তাই অস্ট্রিয়ায় হাইকিং করতে চাইলে ক্রিমল হতে পারে একটি আদর্শ ভ্রমণ গন্তব্য। এই হাইকিংয়ের পথে পথেই মিলবে অসাধারণ ছোট ছোট ঝর্ণা আর একদম শেষে আসবে ক্রিমলার এইক নামক উঁচু এই জলপ্রপাত। দক্ষ ট্রেকাররা এই জলপ্রপাতে গা ভেজানো শেষে আরো দূরের, আরো উঁচুতে পৌঁছানোর যাত্রা শুরু করে যা শেষ হয় ইটালিয়ান ফ্রন্টিয়ারের গ্লোকেনকার্কফে।

আয়তনে ছোট হলেও প্রচণ্ড সুন্দর এক দেশের নাম অস্ট্রিয়া। ইউরোপ ভ্রমণে কয়েকটি দেশ একেবারেই ঘুরে ফেলা সম্ভব। অস্ট্রিয়ার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণস্থানগুলো উপরে বর্ণনা করলাম। টাকা আর সময় মিলিয়ে এবার ঘুরে আসার পালা। আল্পস পর্বতের দেশ অস্ট্রিয়া ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী আর নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- wallpaperup.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কফি হাউস ও ইতিহাসের আকর্ষণে

দুই দিন এক রাতের ছোট ট্রিপে ঘুরে আসুন হাওরের রানী অষ্টগ্রামে