আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: সান ডিয়েগো নামা

আমেরিকার এক একটা প্রদেশ কখনো বা কোনো বিশেষ শহর নিয়ে গল্প করেছি আগের লেখাগুলোতে। আয়তনের দিক দিয়ে বিশাল দেশ আমেরিকার একেকটা জায়গার বৈশিষ্ট্য একেক রকম। যেমন দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো শহরের কথাই ধরুন, শহরটি ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে পুরনো শহর। সেই ১৭৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শহরের গোড়াপত্তন। তখন থেকে আজ অবধি বদলে গেছে অনেক কিছু, বদলায়নি সান ডিয়েগো, এর পুরনো ধাঁচের নাগরিক পথঘাট, জাদুঘর, বাগান অথবা স্প্যানিশ কলোনিগুলো।

ঐতিহ্যকে বুকে ধারণের পাশাপাশি এই শহরের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এর আবহাওয়া। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে আমুদে আবহাওয়ার অধিকারী সান ডিয়েগো যার তাপমাত্রা থাকে নাতিশীতোষ্ণ আবার দিনগুলো সবসময় থাকে বেশ ঝলমলে রোদে ভরপুর। এত কিছুর মাঝেও সান ডিয়েগোতে আছে প্রায় ৬৮ মাইলের মতো সমুদ্রসৈকত যার গরম বালিতে সূর্যস্নান থেকে সার্ফিং সবই করা যায় স্বাচ্ছন্দ্যে।

সান ডিয়েগো ভ্রমণে বের হতে চাইলে প্রথমেই দেখে নেয়া উচিত কী আছে এখানে ঘুরে দেখার। তাই বেশি কথা না বাড়িয়ে চলুন তাহলে দেখে আসা সান ডিয়েগোর খ্যাতনামা কিছু ভ্রমণস্থান যেগুলো সান ডিয়েগো ভ্রমণ সময়ে হতে পারে প্রতিদিনকার গন্তব্য।

১. বলবোয়া পার্ক

ছবিঃ trbimg.com

প্রায় ১,৪০০ একর জমির উপর ১৯১৫-১৬ সালে পানামা ক্যালিফোর্নিয়া এক্সিবিশনের জন্য তৈরী করা হয়েছিলো এই বলবোয়া পার্ক। তখন থেকে আজ পর্যন্ত একই রকম আছে পার্কের গঠনশৈলী। এখানে আছে ঐতিহাসিক ভবন, বেশ কয়েকটা জাদুঘর, বাগান আর সবুজ চত্বর। উদ্যানটির বেশির ভাগ স্থাপত্যশৈলী স্প্যানিশ আদলে বানানো কম উচ্চতার ভবনে ঘেরা যা আশেপাশের প্রকৃতির সাথে তৈরী করে অনন্য এক সাদৃশ্য।

উদ্যানটির মূল আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, পদ্ম পুকুর, মিউজিয়াম অফ ম্যান, মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরি, সান ডিয়েগো মিউজিয়াম অফ আর্ট আর বিখ্যাত সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানা। বুঝতেই পারছেন কত বিশাল জায়গা নিয়ে উদ্যানটি বানানো। তাই পুরো উদ্যানটি ঘুরে দেখতে গোটা একটা দিন লেগে গেলে খুব বেশি অবাক হবেন না, এখানে দেখার আছে অনেক কিছু।

২. সি-ওয়ার্ল্ড

ছবিঃ ellingtoncms.com

সান ডিয়েগো শহরের অন্যতম আকর্ষণ এই সি-ওয়ার্ল্ড। বাংলাদেশের ওয়াটার কিংডম বা নন্দন পার্কের মতো ভেবে ভুল করলে চলবে না, এটা আস্ত একটা একুরিয়াম। আমেরিকার পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর ঐতিহ্যবাহী জায়গা এটা, সেই ১৯৬০ সাল থেকেই চলে আসছে এই রীতি। এখানকার বিখ্যাত আকর্ষণগুলো হলো কিছু অভিনব প্রদর্শনী যেগুলোর মধ্যে ঘাতক তিমি, ডলফিন, সি লায়নের প্রদর্শনী সবচেয়ে বিখ্যাত।

বিভিন্ন রকমের রাইডের ব্যবস্থা আছে সি-ওয়ার্ল্ডে। রোলার কোস্টার থেকে শুরু করে কার্নিভাল জাতীয় বিভিন্ন রাইডগুলো যেমন রোমাঞ্চকর তেমনি অভিনবও বটে। এক্রিলিক টানেলের মধ্য দিয়ে হাতের কাছে হাঙ্গরের সাতঁরে বেড়ানো দেখার অভিজ্ঞতাই অন্যরকম। বাচ্চা-কাচ্চাদের খুব পছন্দের জায়গা এটি, তাই পরিবার নিয়ে সামুদ্রিক ভ্রমণ করতে ঘুরে আসা যায় এখান থেকে৷

৩. সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানা

ছবিঃ staticflickr.com

শুধু চিড়িয়াখানা বললে ভুল হবে, আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম চিড়িয়াখানা এটি যেখানে শুধু দর্শনার্থীদের প্রদর্শনীর জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা হয় না বরং বণ্যপ্রাণী পালন থেকে বংশবৃদ্ধি সবই করা হয় এখানে৷ বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের সংরক্ষণ করা সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানার অন্যতম একটি কর্মকাণ্ড।

এখানে আসলে প্রথমেই যে প্রাণীটি দৃষ্টি আকর্ষণ করবে তা হলো পান্ডা। প্রচুর পান্ডার বসবাসের স্থান এই সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানা। চিড়িয়াখানাটি একটি গিরিখাদের পাশে অবস্থিত বলে ঘুরে দেখায় অকৃত্রিমতার স্বাদ পাওয়া যায় এখানে। প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর আয়োজন চিড়িয়াখানাটিকে দিয়েছে বিশ্বমানের পরিচিতি৷

৪. গ্যাসল্যাম্প কোয়ার্টার

ছবিঃ segwaytoursandiego.com

সান ডিয়েগো ডাউনটাউনের দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক গ্যাসল্যাম্প ন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্ট কোয়ার্টার যা সান ডিয়েগোর শহরের ভেতরে অন্য এক শহর। উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর ভিক্টোরিয়ান দালানকোঠা আর পুরনো রাস্তাঘাটের ধারে বেড়ে ওঠা জমকালো দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট, গ্যালারিগুলো সান ডিয়েগোর স্থানীয় এবং পর্যটক দুই শ্রেণীর মানুষেরই সমান প্রিয়।

সান ডিয়েগোর ব্রডওয়ে থেকে সান ডিয়েগো বে পর্যন্ত বিস্তৃত এই কলোনির ব্যাপ্তি মাত্র ২০টি ব্লক যেখানে ইদানিং অনেক নামীদামী হোটেলও তৈরী করা হয়েছে ব্যবসায়ীক পর্যটকদের জন্য। সান ডিয়েগোতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের থাকার জন্য সর্বোত্তম জায়গা হলো এই গ্যাসল্যাম্প কোয়ার্টার যা ১৯৭০ সালে পুনরায় উদ্ধার করা হয়। ১৯৭০ সালের সেই সংস্করণ স্থানটিকে জায়গা দিয়েছে বিশ্বের ঐতিহাসিক সব কলোনির তালিকায়৷

৫. মিশন বীচ

ছবিঃ realestateinpacificbeach.com

সান ডিয়েগোর মিশন বীচ অনেকটা আমাদের দেশের কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের মতো তবে এটি মেরিন ড্রাইভের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর আর ঝামেলামুক্ত। দক্ষিণীয় ক্যালিফোর্নিয়ার জীবনযাত্রার স্বাদ পেতে হলে মিশন বীচে কাটাতে হবে একটি মাত্র বিকেল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিধৌত তিন মাইল দীর্ঘ এই মিশন বীচ বিখ্যাত বিকেলবেলায় হাঁটার জন্য, সূর্যস্নান আর বিভিন্ন মাত্রার জীবনযাত্রা উপভোগ করার জন্য।

এখানে প্রচুর পর্যটক আসে সাইক্লিং, স্কেটবোর্ডিং আর রোলারব্ল্যাডিং করতে। মিশন বীচের একটু দূরেই আছে বেলমন্ট পার্ক যা একটি ঐতিহাসিক রোলার কোস্টার, কিছু জমকালো রেস্তোরাঁ আর রাস্তার ধারে দেখানো প্রদর্শনীতে প্রতিদিন হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ।

৬. মিডওয়ে এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার মিউজিয়াম

ছবিঃ anothersideofsandiegotours.com

সান ডিয়েগোর ওয়াটারফ্রন্টের আশেপাশে ঘুরতে থাকা পর্যটকরা হঠাৎ চমকে যেতে পারে আমেরিকান মিলিটারির সবচেয়ে বড় জাহাজ “ইউএসএস মিডওয়ে” দেখে যা ওয়াটারফ্রন্টের পাশেই নেভি পিয়ারে রাখা আছে। এটি মূলত একটি যুদ্ধজাহাজ যেখানে যুদ্ধ বিমান, রানওয়ে আর বিমান বিষয়ক সবরকম সুযোগ সুবিধা ছিল একসময়।

এখন এটি একটি জাদুঘর হিসেবে সবার জন্য উন্মুক্ত করা আছে যা নিজে নিজেই ঘুরে দেখা যায় আর একটি রেকর্ড করা অডিও ক্লিপের মাধ্যমে জানা যায় এর পুরো ইতিহাস৷ ৬০টিরও বেশি প্রদর্শনী আছে জাদুঘরটিতে আর আছে ২৫টির মতো যুদ্ধবিমান। প্রায় ২,২৫,০০০ মিলিটারি একসময় জাহাজটিতে চাকুরীরত ছিলেন। আমেরিকান মিলিটারি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঘুরে আসা যায় ভাসমান এই অতীতের যুদ্ধ জাহাজ বা বর্তমানের জাদুঘর থেকে।

সান ডিয়েগোর বেশির ভাগ জাদুঘর অবস্থিত বলবোয়া পার্কে। তাই বলবোয়া পার্কে এক বা দুইদিন ঘুরে আসলেই দেখা হয়ে যাবে অধিকাংশ জাদুঘর। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সান ডিয়েগো ভ্রমণ হোক সুন্দর, নিরাপদ আর সাশ্রয়ী।

ফিচার ইমেজ- i.ytimg.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দালাল বাজার: এক ইতিহাসের হাতছানি

চর আলেকজান্ডারের পথে