সাইপ্রাসের যত অনিন্দ্যসুন্দর ভ্রমণস্থানের আদ্যোপান্ত

পৃথিবীর ছোট দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দেশ সাইপ্রাস। ছোট হলেও এই দেশের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলো এক এক করে শাসন করে গেছে সমুদ্রপাড়ের এই দেশটিকে, দিয়ে গেছে মিশ্র সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য। এখনো মানুষ আসে এই দেশটিতে, তবে শাসন করার উদ্দেশ্যে নয়। ঘুরতে আসে প্রচুর মানুষ প্রতি বছর সাইপ্রাসে। যারা বালি আর সমুদ্রের চেয়ে একটু বেশি কিছু চেয়ে থাকেন ঘুরতে গেলে তাদের জন্য সাইপ্রাস একটি ভালো ভ্রমণ গন্তব্য।

সাইপ্রাসে আছে সমুদ্র বাঁধানো দ্বীপপুঞ্জ, বাইজেন্টাইন চার্চ, পবিত্র আশ্রম আর বেশ ভালো সংখ্যক জাদুঘর। সাইপ্রাসের সবচেয়ে ভালো দিক এর আয়তন, দেশটি ছোট বিধায় সাইপ্রাসের যেকোনো শহরে আস্তানা গেড়ে তারপর সেখান থেকেই প্রতিদিন নতুন নতুন শহরে বা ভ্রমণস্থানে ঘুরতে যাওয়া যায় এবং রাতের মধ্যে আবার আগের শহরে ফিরেও আসা যায়। শীতকাল সাইপ্রাসের জন্য অনেক রোমাঞ্চকর অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার সম্ভার নিয়ে আসে।

ইউরোপিয়ান মেডিটেরানিয়ানের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম দেশ সাইপ্রাসের আশেপাশেই রয়েছে তুর্কি, সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল আর মিশর। সাইপ্রাসে গিয়ে কী দেখবেন সেকথা নিয়েই আজকের গল্প, চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

কৌরিওন

ছবিঃ allaboutlimassol.com

প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক জায়গা আছে সাইপ্রাসে দেখার, কিন্তু বলা হয়ে থাকে কৌরিওন সাইপ্রাসের আসল এবং নিখাদ প্রত্নতত্ত্ব ধারণ করে। সাগর পাড়ে খুবই প্রেমময় পরিবেশে অবস্থিত শত হাজার বছর পুরনো প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস জানায় কৌরিওন। স্থানীয়দের মতে, এটি একটি জাদুময় জায়গা যেখানে আসলে হাজার হতাশায় জর্জরিত মানুষের মনও সাগরের বাতাসে প্রফুল্ল হয়ে যাবে।

বিশাল এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা এখানকার থিয়েটার আর “হাউজ অফ ইউস্টোলিউস”। যারা হাতে একটু সময় নিয়ে যাবেন তাদের বিশেষভাবে বলবো কৌরিওনের পাশেই অবস্থিত “বাইজেন্টাইন ব্যাসিলকা” ঘুরে আসার জন্য। গম্বুজাকার সব কলাম আর মোজাইক ফ্লোরের প্রেমে পড়ে যাবেন এখানে, চারদিকে হরেক ডিজাইনের হরেক পাথরের মোজাইক করা যার প্রতিটি বারান্দা।

সেইন্ট হিলারিওন ক্যাসেল

ছবিঃ allaboutlimassol.com

সেইন্ট হিলারিওন ক্যাসেল কোনো রাজপ্রাসাদ নয়, বরং এটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। মেডিটারেনিয়ানের সবচেয়ে সুন্দর প্রাসাদ ধ্বংসাবশেষগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এটি ছিল মূলত ধর্মযোদ্ধাদের দূর্গ প্রকৃতির একটি নির্মাণ যা তৈরি করা হয়েছিল পাহাড়ের একদম চূড়োয়। এক সময়কার নামী-দামী বোদ্ধাদের স্থায়ী নিবাস ছিল এটি, সাথে অনেক কল্পকাহিনীরও। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনী হলো, প্রাসাদটি একজন পরী তৈরি করেছিলেন যিনি স্থানীয় মেষপালকদের সাথে আমোদ-প্রমোদে সময় কাটাতেন।

প্রাসাদটির অন্দরমহল থেকে শুরু করে প্রতিটা কড়িকাঠই অনুসন্ধানী মনের পর্যটকদের কাছে অনেক দামী। প্রাসাদের উচ্চতা থেকে পুরো দ্বীপটা দেখলে মনে হবে এক জীবনে অনেক কিছু দেখা হয়ে গেছে। সাইপ্রাসে গিয়ে যদি কোনো প্রাসাদ দেখতেই হয় তবে এখান থেকে ঘুরে আসুন নির্দ্বিধায়।

লার্নাকা

ছবিঃ airlines-airports.com

সাগরের পাশে আপাতদৃষ্টিতে সহজগম্য লার্নাকা কেবল একটি রিসোর্ট মনে হতে পারে, কিন্তু এটি এর প্রাকৃতিক সত্ত্বা ধরে রেখেছে সবচেয়ে উঁচুতে। সামুদ্রিক একটা সাধারণ রিসোর্টের পাশে সমুদ্রস্নান থেকে শুরু করে যাবতীয় যা আছে তা পাওয়া গেলেও লার্নাকাকে ঐতিহাসিক দিক দিয়ে আলাদা করেছে এখানকার টার্কিশ কোয়ার্টার নামক জায়গা আর এজিওস ল্যাজারস নামক গির্জা।

লার্নাকার ঠিক পশ্চিমেই আছে “সল্ট লেক” যেখানে বসন্তে “পিংক ফ্ল্যামিংগোস” ঘুরে বেড়ায়, যতদূর চোখ যায় শুধু গোলাপি রঙ দেখা যায়। লার্নাকার পশ্চাৎপ্রদেশে প্রচুর পাহাড়ি গ্রাম আর সাংস্কৃতিক পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে।

কার্পাস পেনিনসুলা

ছবিঃ res.cloudinary.com

সাইপ্রাসের সবচেয়ে সুন্দর অঞ্চল হলো কার্পাস পেনিনসুলা। উত্তর সাইপ্রাসের গোল্ডেন সমুদ্র সৈকতের কোল ঘেঁষে অবস্থিত কার্পাস পেনিনসুলায় সাইপ্রাসের সবচেয়ে কম পর্যটক যায়, এজন্য এর সৌন্দর্য অক্ষত আছে এখনো। চুনাপাথরের উপরে হাইকিং, শান্ত গ্রাম আর কেউ যায়নি এখন পর্যন্ত এমন সব জায়গায় ভরপুর এই কার্পাস পেনিনসুলা। অনাবিষ্কৃত আর অনুন্নত জায়গা আবিষ্কারের টান যদি থাকে কারো মাঝে তবে তার জন্য এই জায়গাটি একদম ঠিকঠাক।

সারাদিন এখানে গাড়িতে ঘুরে সিপাহি গ্রামের “এজিয়া ত্রিয়াদা”র মোজাইক শিল্প দেখে আসুন, আরো উত্তর-পূর্বে গেলে পাবেন দীপকার্পাজ গ্রাম আর এজিওস ফিলন গির্জা। সবশেষে চলে যান এখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত “গোল্ডেন বীচে”। কার্পাস পেনিনসুলায় পুরো একটা দিন মনে রাখার মত দিন হবে।

কলসসি ক্যাসেল

ছবিঃ tripadvisor.com

যদি পৃথিবীর সকল প্রাসাদকে আকর্ষণীয়তার দিক থেকে তালিকা করা হতো তবে একদম শুরুর দিকে সাইপ্রাসের কলসসি ক্যাসেলের নাম অবশ্যই থাকতো। সাইপ্রাসের লিমাসলের ঠিক বাইরেই একদম সঠিক আর সুনিপুণভাবে তৈরী করা এই প্রাসাদটি ছিল ধর্মযোদ্ধাদের ঘাঁটি।

এখানকার প্রথম অধিকারী ছিলেন সেইন্ট জনের রাজারা, তারা এটাকে আদেশ-নির্দেশ দেয়ার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতেন কারণ এখান থেকে খুব সুন্দরভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে নজর রাখা যেত। কলসসি গ্রামে দেখা মিলবে অন্যান্য প্রাসাদের তুলনায় পুতুলসম এই প্রাসাদের।

কেইপ গ্রেকো

ছবিঃ cyprusisland.net

সাইপ্রাসের যত দক্ষিণে যাওয়া যায় যান্ত্রিক জীবন আর নাগরিক কোলাহল ততই বাড়ে। কিন্তু উত্তরের দিকে দেখা যায় একদম বিপরীত চিত্র। সাইপ্রাসের উত্তর দিকে লোকালয় থেকে দূরে রয়েছে কেইপ গ্রেকো নামে অসম্ভব সুন্দর এক উপকূলীয় পার্ক। এখানকার এজিয়া নাপা থেকে পূর্ব দিকে এই পার্কের প্রচুর হাঁটা রাস্তা বানানো আছে যে সকল রাস্তার পাড় ঘেঁষে সমুদ্রের নোনা ঢেউ আছাড় খায়।

স্থানীয় ফ্লোরা ফুলের অনেক বড় সম্ভার এই পার্কটি, বসন্তের শুরুর দিকে যেখানে প্রচুর বিলুপ্তপ্রায় বন্য অর্কিড জন্মায়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এখানকার “আজোর” উপকূলীয় সৌন্দর্য। এই উপকূলে আসার পর এত পথ অতিক্রম করে কেইপ গ্রেকো আসার সকল ক্লান্তি ভুলে যায় প্রতিটি পর্যটক, এটাই এই উপকূলের বিশেষত্ব।

লেখক- i.pinimg.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গভীর অরণ্য, দুটি কুকুর ও বন্ধুত্বের গল্প!

রক্তাক্ত এবং অপরূপা কাশ্মীর: পর্যটনশিল্পের এক অনন্য অবদান