মরক্কোর আকর্ষণীয় মার্কেটগুলো

যদি মরক্কোয় যাওয়ার চিন্তাভাবনা থেকে থাকে, তাহলে আগে থেকেই মরক্কান মার্কেট এবং সৌকগুলোতে (আরব দেশের বাজার বা হাট) ঘুরে দেখার জন্য শিডিউল করে নেওয়া ভালো। সৌকগুলোর দৃশ্য, ঘ্রাণ এবং বৈচিত্র‍্যময় আবহসহ মরক্কান সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য ভালো একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কোনো কিছু কেনার ইচ্ছা না থাকলেও জায়গাগুলো ঘুরে দেখা উচিত। আর কে-ই বা মার্কেটে গেলে অন্তত একটা হলেও স্যুভেনিয়র কিনবে না?

মরক্কান সৌকগুলো শুরু হয়েছিল ছোট পরিসরেই। শহরের বাইরের এলাকাগুলোয় ব্যবসায়ীদের মালপত্র নিয়ে আসার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় হাটগুলোর। ছোট শহরগুলোতে সৌকগুলো হয়তো এখনো সাপ্তাহিক ভিত্তিতে বসে, তবে মারাক্কেশ এবং ফেজের মতো শহরগুলোতে সৌকগুলো এখন পর্যটকদের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। বিশাল জায়গা নিয়ে বসে হাটগুলো। পায়ের চপ্পল, কার্পেট, মৃৎশিল্প, বিউটি প্রোডাক্টস থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের পণ্যই পাওয়া যায় সৌকগুলোতে। নিচে মরক্কোর সবচেয়ে ভালো এবং সেরা মার্কেটগুলোর ব্যাপারে উল্লেখ করা হলো।

মরক্কোর সবচেয়ে বিখ্যাত মার্কেট এবং সৌক: মারাক্কেশ

বড়টা দিয়েই শুরু করা যাক। মরক্কো গেলে অনেক পর্যটকই হয় মারাক্কেশে থাকে নয়তো একবার হলেও শহরকে পাশ কাটিয়ে যায়। এই শহরটাতে রয়েছে ঘুরে দেখার মতো অসংখ্য মুগ্ধকর সৌক। পণ্য এবং মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখে অতিরিক্ত বাহুল্য মনে হতে পারে, তবে পরিবেশটার সাথে একবার খাপ খাইয়ে নিতে পারলে৷ মনে হবে যেন অন্য কোনো পৃথিবীতে এসে হাজির হয়েছেন। মারাক্কেশে অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন সৌক রয়েছে। সবগুলো এক এরিয়াতেই৷ অনেকটাই পণ্যের প্রকারভেদের মাধ্যমে ভাগ হয়ে আছে সৌকগুলো। অবশ্য প্রথমবার সেখানে যাওয়া কারো কাছে পুরোটাকেই একটা বিশাল বাজার মনে হবে।

মারাক্কেশের সৌকগুলোর একটিতে উঠা হস্তনির্মিত হারিকেন, image source – Stephen Barnes

সৌক সিমারিনে রয়েছে মৃৎশিল্পের সামগ্রী, সূতি কাপড় এবং অন্যান্য বস্ত্রের উপকরণ। আর স্লিপার বা চপ্পলের দেখা মিলবে সৌক স্মাটায়। এরপর রয়েছে সৌক আল-কবির এবং শেরাটিন – যেখানে পাওয়া যায় চামড়ায় তৈরি জিনিসপত্র, যেমন – ব্যাগ, পার্সেল ইত্যাদি। কাঠ বা লৌহনির্মিত সামগ্রীর দেখা মিলবে কাঠমিস্ত্রী এবং কামারদের বিশেষ সৌক চৌয়ারি এবং সৌক হাদ্দাদাইনে। এছাড়া সৌক কিমাখিনে যাওয়াটা সবসময়ই আনন্দদায়ক। বাদ্যযন্ত্রের উপকরণগুলো পাওয়া যায় এই সৌকে।

জিমা আল-ফানা স্কয়ার

রাত নামার সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়া উচিত শহরের সেন্ট্রাল স্কয়ারের উদ্দেশ্যে। প্রতিরাতেই এখানে স্ট্রিটফুডের বাজার বসে যায়। ঐতিহ্যবাহী স্নেইল স্যুপ এবং ট্যাজিনসহ চমৎকার সব খাবারের দেখা মেলে এখানে। এখানে কোনো একক টেবিল নেই। কম্যুনাল টেবিলে বসেই খেতে হয় সবাইকে। তাই লজ্জা না করে একটা চেয়ার টেনে বসে ভিড়ের সাথে মিশে যাওয়াই ভালো।

জিমা আল-ফানার সেন্ট্রাল স্কয়ার, image source – Jose Ignacio Soto

খাওয়ার পর বেরিয়ে পড়তে হবে স্কয়ারের প্রধান আকর্ষণ খুঁজে বের করার জন্য। স্টোরিটেলাররাই এখানের প্রধান আকর্ষণ। গল্প বলা মরক্কোর একটি চিরায়ত প্রথা। কৌতুক, বেছে নেওয়া বিষয়বস্তু এবং সঙ্গীতের সাথে গল্প বলার চর্চা রয়েছে দেশটিতে। এটিকে মরক্কোতে সম্মানজনক শিল্পের মাধ্যম হিসেবেও গণ্য করা হয়। তো, মরক্কো গেলে নিঃসন্দেহেই এই বিচিত্র বিনোদনের মাধ্যমটি উপভোগের সময় হাতে নিয়েই যাওয়া উচিত।

সৌক আল-আটারিন, ফেজ

ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ফেজ না দেখলে মরক্কো সফরই বৃথা। এখানেই বসে সৌক আল-আটারিন। ফেজ আসলে গোলকধাঁধার শহর। প্রায় ৯ হাজারের মতো অলিগলি রয়েছে এই শহরে। পুরোটা শহরই পরিপূর্ণ হয়ে আছে ইতিহাসের গল্প এবং ঐতিহাসিক নিদর্শনে। এর সবচেয়ে সেরা নিদর্শনটা সম্ভবত মধ্যযুগের সভ্যতাগুলোই রেখে গেছে। সহস্রাব্দি পেরিয়ে গেলেও সেই সময়কার ব্যবসায়িক রীতি ও শিল্পে কোনো পরিবর্তনই হয়নি। সৌক আল-আটারিনের দোকানগুলোতে মসলা, ওষুধি উদ্ভিদ, ধূপ এবং ঐতিহ্যবাহী মরক্কান হস্তশিল্পসহ অনেক ধরনের পণ্য কিনতে পাওয়া যায়।

সৌক আল-আটারিনে পাওয়া যায় এমন মাথার স্কার্ফগুলো, image source – RudiErnst

দোকানের কিছু কিছু গড়ে তোলা হয়েছে সৌন্দর্যময় পুরোনো প্রাসাদগুলোতে। তো ফেজের সৌকে শপিং করতে গেলে একই সাথে কেনাকাটা এবং ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা দুটোই হয়ে যায়।

এসাউইরা ফিশ মার্কেট, এসাউইরা

ফেজ এবং মারাক্কেশের সৌকগুলোতে ভিড় অনেক বেশি থাকে। কম ভিড়ের সৌকে ঘুরতে চাইলে যাওয়া যেতে পারে ফিশিং পোর্ট এবং মার্কেটটাউন এসাউইরাতে। শহরটি এখন ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। একসময় শহরটি মোগাদার নামে পরিচিত ছিল। আঠারো শতকে নির্মিত ইউরোপিয়ান সমুদ্র বন্দর এবং স্থাপনা কৌশলের নকশা এবং লে-আউট আজও সুরক্ষিতই রয়েছে। শহরের রাস্তাগুলো জুড়ে গড়ে উঠেছে অনেক অনেক সৌক। তবে ভিন্ন কিছুর স্বাদ পেতে চাইলে চলে যাওয়া উচিত শহরের বিখ্যাত ফিশ মার্কেটে৷ সদ্য পানি থেকে ধরে আনা টাটকা মাছের দেখা মেলে এখানে।

এসাউইরার ফিশ মার্কেট, image source – FREEDOMPIC

হাদ-দ্রা সৌক, এসাউইরা

মরক্কোর ঐতিহ্যবাহী গ্রাম্য হাটের অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে মূল শহর থেকে একদিনের ছুটি নিয়ে চলে যাওয়া উচিত হাদ-দ্রা সৌকে। এই হাটটি বসে হাদ-দ্রা নামের ছোট শহরে। মারাক্কেশ এবং এসাউইরার মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এই শহরটি। সপ্তাহের শুধু রবিবার বসে এই হাটটি। মরক্কোর স্থানীয়দের দেখা পেতে এই রবিবারের সৌকটিই সবচেয়ে সেরা জায়গা।

হাদ-দ্রা সৌক, image source – Marrakechfirsttrip.com

এই ঐতিহ্যবাহী বাজারে স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোরই কেনাবেচা হয় এবং পর্যটকদের ভিড়ও এখানে এতটা জমে না। আগে আগে চলে গেলে হয়তো গবাদিপশুর নিলাম দেখারও সৌভাগ্য হয়ে যেতে পারে। এছাড়াও তাজা মাংস, সবজি এবং কৃষিজ পণ্যের দেখা মিলবে এখানে। হাদ-দ্রা সৌক স্থানীয়দের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। যদি মরক্কান সংস্কৃতির খাঁটি নির্যাস নেওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে অবশ্যই এই সৌকে যাওয়া উচিত।

Feature image source – Stephen Barnes

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ক্রোয়েশিয়ার সেরা কিছু দ্বীপ

সুসং রাজবংশ ও তাদের পরগনার ইতিবৃত্ত