হংকং ভ্রমণ: কোথায় থাকবেন? কেন থাকবেন?

পুরনো দিনের চীন আর বর্তমানের পশ্চিমা দেশগুলোর মিশেলে পরিপূর্ণ হংকং দেশটি। এখানকার আধুনিক পোর্টগুলো হংকংকে এগিয়ে নিয়ে গেছে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে, কিন্তু একইসাথে এখনো হংকংয়ের আকাশচুম্বী বাড়িঘর, অফিস দালানের ফাঁকে-ফোঁকরে মিলবে এখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্যের খোঁজ। হংকং দেশটি এদিক থেকে অনন্য।

চকচকে দালানকোঠা থেকে রাস্তাঘাট কিংবা রাজধানী কৌলুনের অলিগলি ঘুরে রান্নার উপকরণ থেকে শুরু করে, সাধারণ শপিং এমনকি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সবার মিলিত অংশগ্রহণে উচ্ছ্বাসমুখর আবহাওয়া- এখানে সবই মেলে। তবে আপনি যা-কিছুর জন্যেই হংকংয়ে গিয়ে থাকেন না কেন, মূলত হংকংয়ে গিয়ে কোথায় কীভাবে নির্বিঘ্নে থাকতে পারবেন এবং সেসব জায়গায় কেন থাকবেন তা নিয়েই আমার এই লেখা।

সৌখিনতার জন্য: সেন্ট্রাল থেকে কওজওয়ে উপসাগর

হংকংকে বলা হয়ে থাকে ‘ভার্টিকাল সিটি’ বা ‘লম্বা শহর’। কেন বলা হয় সেটা আপনি হংকংয়ের সেন্ট্রাল-মিড-লেভেল এস্কেলেটরে যেতে যেতে টের পাবেন। এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ এস্কেলেটরের দেখা আপনি পাবেন। আর সেখান থেকে আশেপাশের শত শত আকাশ ছুঁতে চাওয়া দালানগুলোও চোখে পড়ে ভালোভাবেই। নামকরণ সার্থক!

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ এস্কেলেটর; ছবিসূত্র: theloophk.com

১৯০০ সাল থেকেই ব্যবসায় উন্নতি এবং পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর সুনজরের ফলে বার এবং বাটিক হাউজের লম্বা সারি দেখা যায় হংকংয়ের উত্তর অঞ্চলে। প্রচুর পরিমাণে নামীদামী রেস্তোরাঁ এবং দোকানপাট রয়েছে এখানে, তেমনি রয়েছে দামী হোটেলগুলোও!

১.  প্রাচ্যের আভিজাত্য অনুভবের জন্য: ম্যান্ডারিন ওরিয়েন্টাল

ম্যান্ডারিন ওরিয়েন্টালকে হংকংয়ের সেরা হোটেল বলা হয়; ছবিসূত্র: hotels.com

ম্যান্ডারিন ওরিয়েন্টাল হোটেলকে পুরো হংকংয়েরই সেরা হোটেল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি, এখানকার প্রতিটি রুমই চাইনিজ ট্যাপেস্ট্রি এবং নানারকম অ্যান্টিকে সমৃদ্ধ।

চাইনিজ ট্যাপেস্ট্রি; ছবিসূত্র: trippystore.com

২.  বিশাল কামরা, বিশাল দামে: রেনেসাঁ হারবার ভিউ হোটেল

নামের প্রতি মর্যাদা রেখে এই হোটেলের রুমগুলো থেকে দারুণ জলরাশির দর্শন পাওয়া যায়। গ্র্যান্ড হায়াট নামক আরেক হোটেল কোম্পানির সাথে অংশীদারিতে সুইমিং পুল এবং ফিটনেস সেন্টারও রয়েছে এই হোটেলের। কিন্তু গ্র্যান্ড হায়াটের তুলনায় তুলনামূলক কম দামেই সেগুলোর সেবা পাওয়া যায়।

এই হোটেলের রুমগুলো থেকে দারুণ জলরাশির দর্শন পাওয়া যায়;  ছবিসূত্র: booking.com

শহুরে ব্যস্ততার মাঝে বাজেটের মধ্যে হোটেল

হংকংয়ের মং কক সম্ভবত সেই দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। রাস্তার পাশে শত শত নিয়ন আলোর সাইনবোর্ডের নিচে পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা আর তাতে ক্রেতার ভিড়েরও কমতি নেই। কসমেটিক্স থেকে মোবাইল ফোন সবই পাওয়া যায় সেখানে।

নিয়ন আলোয় ঝলমল মং কক শহরের ব্যস্ত রাস্তাঘাট, দোকানপাট; ছবিসূত্র: thepoortraveler.net

বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য আদর্শ এই জায়গাটি। কেননা এখানেই রয়েছে সবচেয়ে কম দামে ভালো থাকার ব্যবস্থা আবার স্ট্রিট ফুড হিসেবে পাওয়া যায় স্থানীয় খাবারগুলোও।

১. সবচেয়ে কম দামে থাকতে চাইলে: ড্রাগন হোস্টেল

সাত তলা উঁচু এই গেস্ট হাউজটির রয়েছে ডর্ম, ডাবল এবং সিঙ্গেল বেডের সুব্যবস্থা। যদিও এটি মোটেও কোনো বিলাসবহুল হোটেল নয় (কোনো কোনো রুমে জানালাও নেই), তবুও এখানকার স্টাফ, কর্মচারী সবাই বেশ উপকারী এবং হংকংয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এই হোটেলের অবস্থানটাও একেবারে যুতসই।

ড্রাগন হোস্টেল; ছবিসূত্র: tripadvisor.com

২.  স্থানীয় সাংস্কৃতিক আবহ পেতে: রয়্যাল প্লাজা হোটেল

মং ককের এম টি আর স্টেশনের পূর্বদিকের উপরিভাগে এর অবস্থান। রয়্যাল প্লাজা মোকো শপিং সেন্টারের সাথে সংযুক্ত, যেখানে প্রসাধনী এবং বিভিন্ন ডিজাইনারের দোকান পাওয়া যায়। এখানে স্টিম বাথ আর স্পা এর মাধ্যমে আপনি নিজেকে সকল কোলাহল থেকে দূরে রেখে উপভোগ করতে পারবেন স্বস্তির সময়টুকু।

রয়্যাল প্লাজা হোটেল; ছবিসূত্র: reserving.com

নতুন নতুন জায়গা অনুসন্ধানে

নীরবতায় মুখর সমুদ্র সৈকত কিংবা পাহাড়ি সৌন্দর্যের কথা ভেবে নিশ্চয়ই আপনি হংকং ট্যুরে আসার পরিকল্পনা করেননি। কিন্তু আপনার যদি হাতে কিছুটা বেশী সময় থাকে তাহলে সেন্ট্রাল থেকে নৌকা ভাড়া করে চলে আসুন শহর থেকে বাইরের দিকের দ্বীপগুলোতে। এক ভিন্ন হংকংয়ের খোঁজ পাবেন আপনি সেখানে।

সেই ভিন্ন হংকংয়ের একটি দ্বীপ হচ্ছে লাম্মা। এখানে ভিন্ন দেশী মানুষজনেরা কম সময় থাকার জন্য বসবাস করে থাকে, যার ফলে দ্বীপটাকে ‘ভবঘুরেদের দ্বীপ’ বলেও ডাকা হয় মাঝেমাঝে। এখানে কোনো মোটর যানবাহন না থাকায় আপনি সমুদ্রের পাশের নীরবতা অনুভব করতে পারবেন সর্বাংশে। শহর থেকে মুক্তির জন্য এর থেকে ভালো জায়গা আর হয় না। শহরের মতো অত ঘনবসতিও নেই এই দ্বীপে।

এই লাম্মা দ্বীপকে ‘ভবঘুরেদের দ্বীপ’ হিসেবেও ডাকা হয়; ছবিসূত্র: droneandslr.com

এখানকার চেং চাও এবং মা ওয়ান হচ্ছে মাছ ধরা জেলেদের ছোট দুটি গ্রাম, ছবির মতো গ্রাম দুটি দেখে মানসিক প্রশান্তিতে সিক্ত হবেন নিশ্চয়ই।

১.  কম বাজেটের পর্যটকদের জন্য: কাঠমুন্ডু গেস্ট-হাউজ

বড় রুমে একসাথে বেশ কিছু বেড, এছাড়া এক রুমে ডাবল বেডের সুব্যবস্থা রয়েছে এখানে এবং অবশ্যই লাম্মা দ্বীপের মধ্যে সবচেয়ে কম রেটে। আর এই গেস্ট-হাউজটি এক কথায় বলতে গেলে একেবারেই সাধারণ, ছিমছাম। গেস্ট-হাউজে জাঁকজমক কিছু না থাকলেও প্রকৃতির কোলে শান্তিতে দুদণ্ড সময় কাটাতে জায়গাটি নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। সারাদিন ঘোরাঘুরি পর গেস্ট-হাউজের পাশের রেস্টুরেন্ট থেকে তাজা সামুদ্রিক মাছ দিয়ে ডিনার সেরে নিতে পারবেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই।

কাঠমুন্ডু গেস্ট হাউজের একটি রুমের একাংশ; ছবিসূত্র: getaroom.com

২.  প্রকৃতির মাঝে সৌখিনতায় ছুটি কাটানোর জন্য: রিগ্যাল রিভারসাইড

শিং মুন নদীর তীরবর্তী এলাকায় এই হোটেলের অবস্থান, হংকংয়ের আলোকোজ্জ্বল শহরগুলো থেকে খুব একটা দূরে না হলেও এখান থেকেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি ঠিক চোখের সামনে এসে ধরা পড়ে। বেশ জাঁকজমকে পরিপূর্ণ হওয়ায় এখানকার খরচটাও বেশী।

রিগ্যাল রিভারসাইড হোটেলের খাবার জায়গা; ছবিসূত্র: regalhotel.com

পুরনো চায়নার খোঁজে: ইয়াউ মা তেই

ইয়াউ সিম মং শহরের ইয়াউ মা তেই অঞ্চলের ঔষধি চায়ের স্বাদে, স্ট্রিট ফুড আর স্থানীয় মার্কেটের এন্টিকের মধ্যে খুঁজে ফিরে আসে পুরনো চীনের গন্ধ। পোর্ট থেকে ১৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে ফিরে যাবেন পুরনো দিনের চীনে এবং দেখা মিলবে নানারকম স্থানীয় লোকজনের সাথেও।

আকাশচুম্বী অট্টালিকার মাঝে এখানে এখনো বেঁচে আছে পুরনো দিনের চীনের স্মৃতিগুলো; ছবিসূত্র: scmp.com

১.  দারুণ লোকেশন: নাথান হোটেল

সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা নাথান রোডের পাশেই ইদানীংকালে নির্মাণ করা হয়েছে এই হোটেলটি। এই হোটেলের রুমগুলোও হংকংয়ের আর সব হোটেলের তুলনায় বেশ বড় এবং রাজধানী কৌলুনের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলোতে পায়ে হাঁটা দূরত্বে অবস্থান এই হোটেলটির।

কৌলুনের দর্শনীয় স্থানগুলো থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে নাথান হোটেলের অবস্থান; ছবিসূত্র: nathanhotel.com

২.  কম খরচে শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারবেন: বুথ লজ

বুথ লজের সম্মুখভাগ; ছবিসূত্র: trip.com

টেম্পল স্ট্রিট মার্কেটের কাছে অবস্থিত এই স্যালভ্যাশন আর্মি হোটেলটি। নিরিবিলি জায়গায় অবস্থিত হওয়ায় আপনি দিনশেষে সবচেয়ে আরামের ঘুমটি দিতে পারবেন এখানেই। তাছাড়া এই হোটেলের ছোটখাট কিন্তু পরিপাটি রুমগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারেও থাকতে পারেন নিশ্চিন্ত।

বুথ লজের ছোটোখাট কিন্তু পরিপাটি রুম; ছবিসূত্র: hotels.com

বিভিন্ন ক্যাটেগরিতে ভাগ করে দেওয়া এই হোটেল তালিকা, অবস্থান এবং সুযোগ-সুবিধাগুলোকে কেন্দ্র করে হংকং ভ্রমণের পরিকল্পনাটা করে ফেলুন আর ঘুরে আসুন আদিম সভ্যতা এবং ভবিষ্যতের আধুনিকতার মিলন-মেলার এই দেশটি থেকে। আপনাদের সকলের ভ্রমণ আনন্দের হোক! 

ফিচার ছবি: dezeen.com

Loading...

2 Comments

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশ ঘুরুন বাজেট ট্রিপে: ৪,৫০০ টাকায় সাজেক ভ্রমণ

আশুরার ছুটিতে সিলেট ভ্রমণ