শহরের প্রাণকেন্দ্রে বই পড়া ও আড্ডা দেওয়ার মনোরম স্থান ‘বেঙ্গল বই’

নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে নিজেকে সময় দেওয়া যেন অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সারাদিনের ক্লান্তি, দৌড়-ঝাপ শেষে সকলেই চায় বিশ্রাম নিতে। শহরের ইট পাথরের দালানের ফাক ফোঁকরে হারিয়ে গেছে শৈশব, পায়ে হাঁটা পথ, বইয়ের সাথে সখ্যতা, পাঠাগার ইত্যাদি।

ছবিসূত্রঃ লেখক।

সময়ের আগ্রাসনের সাথে সাথে মানুষ বই বিমুখ হয়ে পড়ছে এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখছে সাজুগুজু ও অন্য ফ্যাশনে। বই পড়ুয়া কিংবা বইপ্রেমী মানুষ খুব কম আছে বলা যায়। এমন আকাল যুগে রাজধানীর লালমাটিয়ায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশন কর্তৃক নির্মিত হয়েছে পাঠাগার ও আড্ডা দেয়ার স্থান। অতি আধুনিকতার মিশেলে লালমাটিয়ায় নির্মিত হয়েছে ‘বেঙ্গল বই’।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

বেঙ্গল বই শুধু একটি পাঠাগার কিংবা বইয়ের সংগ্রহশালা নয়। অতি আধুনিকতার ছোঁয়া, নান্দনিকতার ঝুলিতে এক অন্যরকম মনোরম স্থান এটি। এখানে রয়েছে দেশ বিদেশের বিচিত্র সকল বই। রয়েছে বিভিন্ন দেশের কালজয়ী সকল বইয়ের ভান্ডার। বাংলাদেশের বর্তমানে যারা সাহিত্য চর্চা করছে তেমন উদ্দীপ্ত তরুণদের বইও রয়েছে এখানে। রয়েছে অনুবাদ বই, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী, কবিতা, অণুগল্প, রান্না বিষয়ক বইসহ অসংখ্য বই।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

শুধু তাই নয়, ‘বেঙ্গল বই’ এ রয়েছে বই পড়ার সুন্দর স্থান। এটি শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, বরং অনেক সময় বসে থেকে বই পড়ার নিবিড় একটি জায়গা। চমৎকার নকশায় সাজানো হয়েছে এর অভ্যন্তর ও বাহ্যিক দিককে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

‘বেঙ্গল বই’ এর ভেতরে ঢুকতেই এক চমৎকার মাধুর্যে বুক ভরে ওঠে। কারণ চারপাশে শুধু বই আর বই। সেইসাথে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে চেয়ার টেবিল। তাকে তাকে অসংখ্য বই রাখা। বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া ও বই পড়ে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার মতো উপযুক্ত স্থান এটি। ‘বেঙ্গল বই’ এর নিচ তলায় একটি খালি জায়গা রয়েছে। অর্থাৎ একপাশে উন্মুক্ত ও ছাদবিহীন বসার স্থান রয়েছে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

সকালের শুভ্রতায় কিংবা বিকেলের ঈষৎ আলোয় জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যায় এখানে। ইচ্ছে করলে বৃষ্টিতেও ভেজা যায়। সেদিন আমি ‘বেঙ্গল বই’ এর দোতলা থেকে দেখছিলাম তিনজন ছেলে স্কুলের পোশাক পরে বৃষ্টিতে ভিজছে। বাইরে ছিল ঝুম বৃষ্টি। আর তিনজন তরুণ বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজছে এবং উপভোগ করছে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

‘বেঙ্গল বই’ এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা কী যে চমৎকার, তা না দেখলে বোঝা যায় না। অভ্যন্তরীণ নকশায় রয়েছে বৈচিত্র্য। আলোকসজ্জা ও সার্বিক নান্দনিকতা বেশ চমৎকার। উন্নতমানের ডিজাইন ও দেয়ালসজ্জা সত্যিই অপূর্ব। বিশেষ করে নিচতলার একপাশের দেয়াল জুড়ে সবুজ গাছের মনোরম নকশা ও অন্যপাশের দেয়ালের টিনের টুকরোর মতো সুন্দর নকশা সকল দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে। সিঁড়িঘরের সৌন্দর্যও উল্লেখ করার মতো। সিঁড়িঘরে রয়েছে দেশ বিদেশের বিভিন্ন পেইন্টিং ও নান্দনিক শিল্পকর্ম। ‘বেঙ্গল বই’ শহরের বুকে একটুকরো সুখের নাম। তিনতলা বিশিষ্ট এই নান্দনিক স্থানটির সুনাম ও পরিচিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

দ্বিতীয় তলায় রয়েছে বই পড়ার বিশেষ সুবিধা ও বসার স্থান। একসাথে বসে গল্প করা ও আড্ডা দেয়ার জন্য রয়েছে সুন্দর স্থান। রয়েছে শিশুদের বই পড়ার জন্য চমৎকার স্থান। শিশুরা যেকোনো বই পড়তে পারে এবং ক্রয় করতে পারে। বাবা মায়ের সাথে এসে, বসে বসে বই পড়া ও একটু নান্দনিকভাবে সময় পার করার জন্য এই স্থানটি উপযুক্ত। এখানে শিশুরা পড়ার পরিবেশ পায়। নিরব ও নিস্তব্ধ পাঠাগার এবং অনেক বইপ্রেমী পাঠকদের দেখে শিশুদের মনোরাজ্য ও কল্পনারাজ্যের বিস্তার ও বিস্তৃতি ঘটবে এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

তৃতীয় তলায়ও রয়েছে চমৎকার সুযোগ সুবিধা। বই কেনা ও পড়া ছাড়াও এখানে খাতা, কলম, রাবার, খেলনা ইত্যাদি যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। আর এর পাশেই রয়েছে কাউন্টার। প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ক্যাশ কাউন্টার। প্রতিটি সেক্টরে কর্মী নিয়োগ দেয়া রয়েছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন কর্তৃক নির্মিত ‘বেঙ্গল বই’ পাঠকদের জন্য এক অভিনব দ্বার খুলে দিয়েছে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

আমি যতবার ‘বেঙ্গল বই’ এ গিয়েছি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। ইটের পর ইট গেঁথে মানুষ যেখানে রোবোটিক হয়ে যাচ্ছে সেখানে মানুষকে মননশীলতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে ‘বেঙ্গল বই’ কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন বিকেলে অনেক ভিড় হয় এখানে। এছাড়া কোনো অনুষ্ঠান, পালা-পার্বণে, উৎসবে অনেক ভিড় হয়। মাঝে মাঝে শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এখানে। এছাড়া গান ও সঙ্গীতের কনসার্টের আয়োজন করা হয়। মোট কথা, বই পড়ার পাশাপাশি এখানে অন্যান্য সবকিছুর স্বাদ পাওয়া যায়।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

অনেক সময় ধরে আড্ডা দেয়া, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো ও আড্ডা দেয়ার জন্য স্থান রয়েছে এখানে। রয়েছে কফিশপও। কফিশপের অবস্থান, নকশা, বসার স্থান সবকিছুই উল্লেখযোগ্য। দোতলার কফিশপের ভেতরে যেমন বসার স্থান রয়েছে তেমনি বাইরের বেলকনিতেও বসার স্থান রয়েছে।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

আমি প্রথমবার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। বেলকনির উপর কোনো ছাদ নেই। মাথার উপর খোলা আকাশ রেখে আর চেয়ারে বসে প্রিয় মানুষের সাথে কফি খাওয়া ও আড্ডা দেয়া যায় এখানে। তবে অতিরিক্ত রোদ এবং বৃষ্টিতে কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হয়। বৃষ্টির দিনে ভিজে একাকার হয়ে যেতে হয়। অবশ্য আপনি যদি চান চা কিংবা কফি খেতে খেতে ভিজতে তাহলে আপনার জন্য উপযুক্ত স্থান এটি।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

রোজ বিকেলে কফিশপে দারুণ ভিড় হয়। বসার স্থান পাওয়া যায় না। এখানে মানুষ যতটা না বই পড়তে যায় তার চেয়ে বেশি যায় আড্ডা দিতে এবং ঘুরে বেড়াতে। অনেক স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীরা স্কুলশেষে এখানে আড্ডা দেয়। বই পড়া ও গল্প গুজব করে সময় কাটানোর জন্য ‘বেঙ্গল বই’ এর তুলনা নেই।
ছবিসূত্রঃ লেখক।

শহরের ব্যস্ত মানুষকে মনোরম ও নিবিড় সাহিত্যের দিকে টেনে আনায় ‘বেঙ্গল বই’ এর অবদান অনেক। শিশু কিশোরদের কল্পনারাজ্য ও মনোরাজ্যকে বিকশিত করার জন্য আপনি আপনার সন্তানকে এখানে নিয়ে যেতে পারেন। সুন্দর একটি বিকেল কাটবে পরিবার ও সন্তানদের সাথে।
ফিচার ইমেজ সোর্সঃ লেখক।

Loading...

One Comment

Leave a Reply
  1. আজাইরা জায়গা… এর থেকে বাতিঘর ঢের সুন্দর আর অভিজাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

E T B এর ইভেন্ট: চন্দ্রালোকে মেঘের রাজ্য সাজেকে রাত্রি যাপন

কুয়েট: রুপসৌন্দর্যে অনন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প