বাংলাদেশের চমৎকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাস ডায়েরি

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছে কার না হয়? বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার পর শুরু হয় পড়াশোনা জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ভর্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে কেউ হয় জয়ী আবার কারও কারও মেনে নিতে হয় পরাজয়ের গ্লানি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, হলের জীবনের চেয়ে উত্তম কিছু নেই, হবেও না কোনো দিন। ক্যাম্পাসের আড্ডা, গান, বন্ধুত্ব সবকিছুই খুব সাধারণের মাঝে অনন্যসাধারণ। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে।

নানান সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে তালিকা তৈরি করা হয় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেখানো হয় কোন বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন দিক থেকে সেরা। আমাদের আজকের আয়োজন বাংলাদেশের সুন্দরতম কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গল্প নিয়ে।

তবে এখানে কোনো তালিকা করা হবে না কারণ বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ই নিজ আঙ্গিকে এবং সংস্কৃতিতে সমসুন্দর। যেহেতু ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প এখানে এই লেখায় জায়গা দেয়া সম্ভব নয় তাই কয়েকটি ক্যাম্পাসের কথা তুলে ধরেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কার্জন হল,ঢাবি। ছবিঃ daily-sun.com

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র আমাদের সবার প্রিয়, বহু ইতিহাসের সাক্ষী বিশাল ক্যাম্পাসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে শিল্পপতি, আধুনিক বাংলাদেশের লেখক- কী তৈরি করেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়?

তবে সবকিছুর উপরে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি। শাহবাগের কার্জন হল থেকে শুরু করে তিন নং বিডিআর গেটের সমাজকল্যাণ ইন্সটিটিউট, লেদার ইন্সটিটিউট সহ ঢাবি ক্যাম্পাস গুণে গুণে ৬০০ একর জমির উপর স্থাপিত। ১৯২১ সাল থেকে ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শাটল ট্রেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ছবিঃ wikimedia.org

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর আর বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থী তো বটেই, পর্যটকদের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আকর্ষণীয় স্থান।

১,৭৫৪ একর জায়গার উপর স্থাপিত বিশাল এই ক্যাম্পাসের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী শাটল ট্রেন। প্রায় ২৩,০০০ শিক্ষার্থীর বর্তমান আবাস্থল এই ক্যাম্পাস সৌন্দর্যের মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। চায়ের কাপে আড্ডা কিংবা রাজনৈতিক তর্কসভায় মুখরিত এখানকার প্রতিটা টং দোকানের মামাকে বললেই দেখিয়ে দেবে জারুল তলা, ঝুপরি, জিরো পয়েন্টের মতো সুন্দর জায়গা।

এখানকার প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের মতে প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির প্রজাপতি, ৪৪০ প্রজাতির মৌমাছি আর ৩৬৮ প্রজাতির কীটপতঙ্গের অভয়ারণ্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ছবিঃ googleapis.com

পূর্ব পাকিস্তানের আমলে ১৯৫৩ সালে স্থাপিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়।

মূল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে মতিহারে অবস্থিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্যারিস রোড দিয়ে যখন আপনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবেন, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে বাইরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভেবে ভুল করলে খুব বেশি অবাক হবো না।

ইংরেজ স্থাপত্যের আদলে তৈরি এই বিশাল ক্যাম্পাসের প্রতিটি বটতলা বলে ইতিহাস আর সৌন্দর্যের গল্প। এখানকার সাদা পাথরের মূল প্রশাসনিক ভবন, লাল ইটের বিশাল লাইব্রেরি যোগ করেছে সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা। পুরো ক্যাম্পাস একবার চক্কর দিলেই বুঝে যাবেন সারা ক্যাম্পাস জুড়েই লেগে আছে সৌন্দর্যের আগুন।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সাস্ট, ছবিঃ i.ytimg.com

সিলেট ও বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যাকে সংক্ষেপে সাস্ট বলা হয়। ১৯৮৬ সালে স্থাপিত পাক্কা ৩০০ একরের এই বিরাট ক্যাম্পাসের অধিকাংশই পাহাড়ের উপর অবস্থিত। এমনকি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনারটি রয়েছে সাস্টের পাহাড়ের উপরে।

সাস্টে ঢুকতে গেলে আপনাকে পাড়ি দিতে হবে অনেক লম্বা একটা রাস্তা যা এখানকার শিক্ষার্থীদের কাছে ১ কিলোর রাস্তা নামে পরিচিত। খুব সম্প্রতি এই ক্যাম্পাসে নতুন দুটি ভবন “সিএসই ভবন” আর “অডিটোরিয়াম” হয়েছে যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

কুয়েট, ছবিঃ tradebangla.com.bd

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, গোছানো আর সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাস হচ্ছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় যার সংক্ষিপ্ত নাম কুয়েট। ১০১ একরের এই বিশ্ববিদ্যালয় আকারে ছোট হলেও এখানকার দুর্বার বাংলা, পদ্মপুকুর, মেইন গেইট, হলিউড লেখার মতো পাহাড়ের উপর কুয়েট লেখা, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহীদ মিনার দেখে একগাদা বিস্ময় নিয়ে বাড়ি ফিরবেন।

বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিষ্কার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাতি পাওয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের নাম ছিল বিআইটি, খুলনা। ১৯৮৬ সালে বিআইটি নামে যাত্রা শুরু করা এই ক্যাম্পাস কুয়েট নামে পরিণতি পায় ২০০৩ সালে।

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি

ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, ছবিঃ admission.iutoic-dhaka.edu

ঢাকার অদূরে গাজীপূরে অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC) এর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৮১ সালে গড়ে উঠেছিল ৩০ একরের ছোট্ট একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যার নাম ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি যাকে ছোট করে আইইউটি ডাকা হয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয় সহ উগান্ডা, নাইজেরিয়া আর মালয়েশিয়ায় আরো তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ওআইসির তত্ত্বাবধানে। লাল ইটের দূর্গে ঘেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সৌন্দর্যের আধার বলা চলে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ছবিঃ locationbd.com

উর্বর জমির দেশ বাংলাদেশের ১৯৬১ সালের আগে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না যা কৃষিতে উচ্চশিক্ষা দান করে। ১৯৬১ সালে একমাত্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১,২৬১ একরের বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ময়মনসিংহে ঘুরতে যাওয়ার জায়গার কথা জিজ্ঞেস করলে সবার প্রথমে আসবে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে অবস্থিত এই বিরাট ক্যাম্পাসে সারাদিন ঘোরাঘুরি করলেও শেষ হবে না এই ক্যাম্পাস এলাকা।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ছবিঃ i.pinimg.com

কৃষি শিক্ষায় অনন্য আরেক বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার দিক দিয়ে তো বটেই সৌন্দর্যের দিক থেকেও বেশ জনপ্রিয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৫ সালে সিলেট মূল শহর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে আলুরটল রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে সবুজের সমারোহে একাত্মতা জানান দেয় ক্যাম্পাসের প্রতিটি গাছপালা। সিলেটের আশেপাশে ঘুরতে চাইলে অনায়াসেই চলে আসা যায় এখানে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ছবিঃ wikimedia.org

২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা একদম তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বরিশাল রুপাতলির একটু আগে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে অসম্ভব সুন্দর বেশ কয়েকটি ভবন এবং বিভাগের সমন্বয়ে স্থাপিত এই বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে পড়ন্ত কোনো বিকেলে প্রেয়সী বা পরিবারকে নিয়ে ঘুরে আসার স্থান।

পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

পটুয়াখালি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,ছবিঃ i.ytimg.com

বরিশাল থেকে ৩৮ কিলোমিটার দূরে দুমকির পাগলার মোড়ে গেলেই দেখতে পাবেন ইউনিভার্সিটি স্কয়ার নামে জায়গা আছে।

সেখানেই ২০০০ সালে ৯০ একর জমিতে স্থাপিত হয়েছে এর মূল ক্যাম্পাস। বাবুগঞ্জে রয়েছে এর ২০ একরের আরেকটি ক্যাম্পাস। মূল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নীল বাস, প্যারিস রোড, প্রশাসনিক ভবন, সালসা বিল, নীল কমল ব্রীজ, জয় বাংলা চত্বর হলো এখানকার মূল আকর্ষণ।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বরফের চাদরে ঢাকা মানালির মুগ্ধতায়

বিশ্বের সেরা কয়েকটি হিল স্টেশনের সৌন্দর্যের কথা