দম বন্ধ করা সুন্দর সবুজ পুনাখা শহরে

খুব সকালে উঠে জ্যাম-জেলী, বাটার আর পাউরুটি খেয়ে গাড়িতে উঠে বসল। আমার আবার পাউরুটিতে এলার্জি আছে, এই জিনিসটা সহজে আমার পেটে ঢোকে না। যদিও বা ভুলবশত ঢুকে বসে, তাহলে খবর আছে। তাই আমি গাড়িতে শুকনো বিস্কিট আর আপেল জুস খেতে লাগলাম। সারা ভুটান ট্যুরে এই জিনিসটা আমি বেশি খেয়েছি। যাচ্ছি আমরা পুনাখাতে।
কথায় আছে, আপনি ভুটানে আসলেন অথচ পুনাখাতে গেলেন না, তাহলে আপনি আসল সৌন্দর্য দেখা থেকে বঞ্চিত হলেন। ভুটানের শীতকালীন রাজধানী বলা হয় পুনাখাকে। থিম্পু থেকে দুই ঘণ্টার পথ। পুনাখা যাওয়ার পারমিশন আগেই নেওয়া ছিল, তাই পথে আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি যা আমদের গাড়ির ড্রাইভার সুনিপুণ হাতে সামলেছেন। আমি যতদূর জানি আমাদের পাসপোর্টগুলো সারা ট্যুরে আমাদের গ্রুপ লিডার এবং আমাদের ড্রাইভার কাম গাইডের কাছেই ছিল, কিন্তু একবারের জন্যও চিন্তা হয়নি। এর আগেও আমি ভারতের লেহ-লাদাখ, কারগিল, পেনঙ্গং গিয়েছি কিন্তু একটিবারের জন্য পাসপোর্ট হাতছাড়া করিনি। তাই বুঝতেই পারছেন আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি, এরা কতখানি নিরাপদ ও পরোপকারী।

দুই পাহাড়ের মাঝে মেঘ, তার উপর আমরা ছিলাম; ছবিসূত্র: লেখক

আমাদের গাড়ী আস্তে আস্তে উপরে দিকে চলতে শুরু করল এবং ক্রমেই ঠাণ্ডা বাড়তে লাগল। পুনাখার আবহাওয়া অন্য শহর থেকে একটু ভিন্ন, কিন্তু খুবই উপভোগ্য। ঘণ্টাখানেক পরে আমরা দোচালা পাসে এসে নামলাম। এটা ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। সেখান থেকে ইস্টার্ন হিমালয়া রিজিওনের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। নামার পর কিছুক্ষণ আমরা ছবি তুলতে পেরেছি কিন্তু এর পরেই একরাশ মেঘ এসে আমাদের গ্রাস করে নিল আর সাথে তো ঠাণ্ডা আছেই।
মেঘের ভেলায় করে ভাসতে থাকি আমরা। একহাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সাথের মানুষটাকে দেখা যায় না। আমাদের মন্দ ভাগ্য বলতে হবে যে এখান থেকে হিমালয়ের সৌন্দর্যটা দেখা হলো না। দোচালা একটা সমাধিস্থল। উলফাদের সাথে যুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মরণে করা। এই যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে উলফারা ভুটান থেকে বিতাড়িত হয়েছিল, যার নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের চতুর্থ রাজা। অসম্ভব সুন্দর এই দোচালা পাস আর এর আশেপাশের জায়গা। আরেকটা জিনিস আপনাদের জানিয়ে রাখি, সারা ভুটান জুড়ে পাবলিক টয়লেট খুবই পরিষ্কার, যা আমি ভারতে পাইনি।
আদী দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে দোচালা পাস; ছবিসূত্র: লেখক

পথে একটি হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে নিলাম। খিদেটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল সকালে অল্প খাওয়ার কারণে। চাওমিন, নুডলস, ফ্রাইড রাইস, জুস, কোক যে যার মতো খেয়ে আমরা চললাম বিখ্যাত পুনাখা জংয়ের উদ্দেশে। চারদিকে পুরো দম বন্ধ করা সুন্দর সবুজ পাহাড়, ছিমছাম রাস্তা-ঘাট, আর এক এক করে ছোট ছোট গ্রাম, ধানক্ষেত, ওক আর পাইনের বন, পাশ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। পুনাখা জং অথবা পুংটাং ডেচেন ফোটরাং জং (দ্য প্যালেস অব গ্রেট হ্যাপিনেস অর ব্লেস)। দ্বিতীয় প্রাচীনতম এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম এই জং গড়েছিলেন জাবড্রুং নাওয়াং নামগিয়াল, সেটা ১৬৩৭-৩৮ সালে। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এখানেই ছিল ভুটান সরকারের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র।
১৬৩৭ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত পুনাখা ছিল ভুটানের রাজধানী। এই পুনাখা জঙেই বর্তমান রাজা-রানীর বিয়ে হয়েছিল ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবরে। দুটি নদীর সংগমস্থলে অবস্থিত কারুকার্যময় পুনাখা জং। পচু আর মচু নদীর মিলন। পচু (ছেলে নদী) আর মচু (মেয়ে নদী) নদীর ঠিক মাঝখানেই এই বিশাল সুদৃশ্য পুনাখা জং, শহরের মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উপাসনালয় আর প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্র। এই দুই নদী মিলিত হয়ে পুনা সাং চু বা সংকোশ নাম নিয়ে কালিখোলাতে সীমানা পার হয়ে মিলেছে ব্রহ্মপুত্রর সঙ্গে। ভুটানের ইতিহাসে পুনাখা জং বিখ্যাত হয়ে আছে ১৯৪৯ সালে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ‘পুনাখা চুক্তি’ নামে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কারণে।
সাসপেশন ব্রিজে আমরা কয়েকজন; ছবিসূত্র: লেখক

এরপর আমরা গেলাম পচু নদীর ওপর ভুটানের সবচেয়ে দীর্ঘতম সাস্পেনশন ব্রিজ যা ৬৫০ ফিট লম্বা ও মাত্র ৫ ফিট চওড়া । হাওয়ায় দুলে ব্রিজের ওপর হাঁটলাম এবং গ্রুপ ছবিও তুললাম। প্রথমে আমি যেতে চাইনি, কিন্তু পরে বুঝেছি না গেলে অনেক কিছু মিস করতাম।
সকাল থেকেই আমাদের সবাই রাফটিং করার জন্য অস্থির ছিল। বিশেষ করে আমার ছেলে আদী। প্রথমে আমি না করলে পরে মা আর ছেলে দুজনেই যোগ দেয় রাফটিং করতে। আমরা চার-পাঁচজন ছাড়া সবাই যোগ দেয় রাফটিং করতে। তাদের আনন্দ করার দৃশ্য আমরা ক্যামেরায় বন্দি করেছি। অতঃপর পুনরায় চললাম থিম্পু শহরের দিকে। পথে কোকা নুডলস আর ফিশ ফ্রাই খেয়ে নিলাম। সাথে তো আপেল জুস ছিলই। রাত আটটায় হোটেল পৌঁছে ৯ টায় ডিনার করে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। কারণ রাত দুটোয় বাংলাদেশে ফেরার জন্য রওনা দিতে হবে।
রাফটিং করছে সবাই; ছবিসূত্র: লেখক

ঠিক রাত দুটো। আমাদের গ্রুপ লিডার সবার রুমে রুমে এসে নক করা শুরু করলেন। এটা যে তিনি করবেন তা আগে থেকেই জানতাম আমি। উনি রাতে ঘুমাননি। রাতের খাওয়ার পর কয়েকজনের সাথে আড্ডা দিয়েছেন যাতে আমাদের সময়মতো উঠিয়ে দিতে পারেন। পারফেক্ট গ্রুপ লিডার। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম যে, এই গাড়ি করে ফ্রুন্টসলিং পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি আবার চেঞ্জ করব কিনা। তিনি জানালেন এই গাড়ি নিয়েই আমরা চ্যাংড়াবান্ধা-বুড়িমারি বর্ডার পর্যন্ত চলে যাব। কথাটা শুনেই মনটা ভালো হয়ে গেল।
পুনাখা জং; ছবিসূত্র: লেখক

আমাদের দুটো গাড়ি ৩৩ জন পাগল ট্রাভেলার নিয়ে রাতের অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলছে প্রিয় বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশ তুমি যাই হও-আমার জন্মভূমি। কিছু না দিতে পারার দায় আমার, তোমার না।
আমি আমার প্রথম লেখায় লিখেছিলাম বুড়িমারি হোটেলের বুড়ির সম্পর্কে কিছু লিখব কিন্তু সঙ্গত কারণে লিখলাম না। তবে বুড়ি তুমি বেঁচে থাকো বহুকাল। তোমাদের কারণেই বাংলাদেশটা আজও সুন্দর।
ফিচার ইমেজ- lifetoreset.com

Loading...

3 Comments

Leave a Reply
  1. নিজের দেশের পাবলিক ট্যলেটের কথা বলুন তারপর ভারতের নিন্দা করবেন।আপনাদের দেশে তো পাবললিক ট্যলেটই নেই।যা আছে তা দুর্গন্ধ যুক্ত এবং বেশ্যারা ব্যবহার করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতের শ্বাসরুদ্ধকর কিছু হিল স্টেশনের গল্প

পাহাড় খোদাই করে হাজার বছর ধরে তৈরি অজন্তা-ইলোরা গুহার ইলোরা পর্ব