নীলাদ্রি শহর বান্দরবানের অপরূপ এক উপাখ্যান

বান্দরবানের সবগুলো জায়গা ঘোরা শেষে নীলাচলে যখন যাচ্ছি, তখন গোধূলি লগন। চেকপোস্টে আমাদের চান্দের গাড়ি চেক আপ করার জন্য যখন থামালো, চেকপোস্টের লোকটাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, নীলাচল দেখতে কেমন?’ পাল্টা প্রশ্ন এলো, ‘বান্দরবান শহরের আশেপাশের অন্যসব কিছু দেখে এসেছেন না?’ আমরা মাথা ঝাঁকাতেই উত্তর এলো, ‘অন্য সবকিছুর চেয়ে নীলাচল বেশি সুন্দর।’

ড্রোনক্যামেরায় নীলাচল। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

আসলেই তাই। বান্দরবান শহরের অন্যান্য স্পটগুলোর তুলনায় নীলাচল সবচেয়ে উঁচুতে। ওখান থেকে পুরো বান্দরবান শহর দেখা যায়। রাশি রাশি পাহাড়ের মাঝে অল্প খানিকটা নাগরিক চিহ্ন সম্বলিত ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তোরাঁর অংশ নিয়ে বান্দরবান শহর। উপর থেকে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এমনকি স্বর্ণ মন্দিরটাকেও দেখা যাচ্ছে অনেক নিচুতে।

এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটাকে দেখে মনে হচ্ছে, পাখির চোখে বান্দরবান শহরকে দেখছি৷ আকাশে মেঘ না থাকলে নাকি শহরের পাশের সাঙ্গু নদীকেও খালি চোখে দেখা যায় নীলাচল থেকে।

নীলাচল থেকে পাখির চোখে বান্দরবান শহর। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তুলেছে বান্দরবান জেলা পরিষদ৷ জেলা শহর থেকে এর অবস্থান প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া এলাকায়৷

শহর ছেড়ে চট্টগ্রামের পথে প্রায় তিন কিলোমিটার চলার পরেই হাতের বাঁ দিকে ছোট একটি সড়ক এঁকেবেঁকে চলে গেছে নীলাচলে। এ পথে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড় বেয়ে পৌঁছুতে হয়। মাঝে পথের দুই পাশে ছোট একটি পাড়ায় দেখা যাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। চাইলে এখানে আসার পথে তাদের গ্রামে গিয়ে জীবনযাত্রা প্রত্যক্ষ করা যায়।

মেঘলার কাছেই অবস্থিত এই অপূর্ব স্থানটি। এ স্থানের তদারকি করে জেলা প্রশাসন। এই পর্যটন কেন্দ্রটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য ছবি তোলার আদর্শ স্থান। অবশ্য আমাদের আসতে আসতেই সন্ধ্যে নেমে গিয়েছিল। ফলে তেমন ছবি তুলতে পারিনি।

নীলাদ্রি শহর। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

বর্ষাকালে বেলা গড়ানোর আগে এখানটায় আসলে মেঘের মধ্যে দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। এছাড়া নীলাচল থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি রাতের বেলা চাঁদের চিরসবুজ আলোকেও উপভোগ করতে পারবেন। শীতের সকালে নীলাচল থাকে কুয়াশায় ঢাকা।

২০০৬ সালের পহেলা জানুয়ারি এই প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। কমপ্লেক্সে বাচ্চাদের খেলাধুলার এবং বসার ব্যবস্থা রয়েছে। নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হল এখানকার নীল রংয়ের রিসোর্ট। নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এ জায়গায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনুমতি আছে। আমরা এখানটায় বসতে পেরেছি সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পর পর্যন্তও। রিসোর্টের অতিথিরা অবশ্য এখানে থেকে সারা রাতই উপভোগ করতে পারেন নীলাচলকে৷

নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট। সোর্স:infopedia365.blogspot.com

নীলাচলে সম্প্রতি নতুন কয়েকটি জায়গা তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য। এখানকার টিকেট ঘরের পাশে ‘ঝুলন্ত নীলা’ থেকে শুরু করে ক্রমশ নীচের দিকে আরও কয়েকটি বিশ্রামাগার তৈরি করা হয়েছে। ঝুলন্ত নীলায় কয়েক জায়গায় ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে ফিরে এসেছি, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে বলে। তাছাড়া সারাদিনের দৌড় ঝাপ শেষে তখন ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল।

সিঁড়ি বেয়ে নামতে কষ্ট না হলেও ওঠার কষ্টের কথা ভেবে ফিরে এসেছি। আমার মতোই সারাদিন ঘোরাঘুরি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে যাবার স্ট্যামিনা পেল না দলের অন্য কেউ। অন্তত একজনকে সঙ্গী হিসেবে পেলে আমি নিশ্চিত যেতাম। এই সময়টায় খুব আফসোস লাগলো, কেন বেলা থাকতেই এখানে এলাম না!

ঝুলন্ত নীলা ছাড়াও উল্লেখযোগ্য আরোও দুটি হলো ‘নীহারিকা’ এবং ‘ভ্যালেন্টাইন’ পয়েন্ট। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো হয়েছে এ জায়গাগুলো। একটি থেকে আরেকটি একেবারেই আলাদা। একেক জায়গা থেকে সামনের পাহাড়ের দৃশ্যও একেক রকম। তবে মূল নীলাচলের সৌন্দর্য অনেক বেশি। এখান থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় আরও ভালোভাবে।

ঝুলন্ত নীলা। সোর্স: wikimedia.org

মেঘের ভেলার ওপাশে মনোরম সূর্যাস্ত দেখলাম মুগ্ধতা নিয়ে। কেন যে দিনের শেষে এখানে এলাম, তা ভেবে আফসোস করে মরলাম আরোওকিছুক্ষণ। এরপর পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। উপরেই পাহাড়ি বাতাসে দোলনায় দোল খেলাম। ছবির চেয়ে অনেক সুন্দর এই নীলাচল।

নীলাচল ঘুরে হোটেলে ফিরে গেলাম। শেষ হল নীলাদ্রি শহরে প্রথম দিনের ভ্রমণ।

প্রবেশমূল্য:

নীলাচল পর্যটন কমপ্লেক্সে জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য ৪০ টাকা। নীলাচলে যেতে সড়কের টোল পরিশোধ করতে হয়। অটো রিকশা ৩০ টাকা, জিপ ৬০ টাকা। পর্যটকরা সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীলাচলে অবস্থান করতে পারবেন।

মেঘের সমুদ্র। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

কীভাবে যাবেন

প্রথমে আপনাকে বান্দরবান শহরে যেতে হবে। ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশ্যে কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির গাড়ি ছেড়ে যায়। যেমন শ্যামলি, হানিফ, ইউনিক, এস আলম, ডলফিন এর যেকোনো একটি বাসে চড়ে আপনি বান্দরবানে যেতে পারেন। রাত ১০টায় অথবা সাড়ে ১১টার দিকে কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা ফকিরাপুল থেকে এসব বাস বান্দরবানের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। নন এসি বাসে জন প্রতি ভাড়া ৫৫০ টাকা। এসি ৯৫০ টাকা।

চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান যেতে পারেন। বদ্দারহাট থেকে বান্দারবানের উদ্দেশে পূবালী ও পূর্বানী পরিবহনের বাস যায়। এসব বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া রাখা হয়।

এরপর বান্দরবান বাস ষ্টেশন থেকে নীলাচল পর্যটন কমপ্লেক্স যেতে অবস্থানের সময়ানুযায়ী অটো রিকশার ভাড়া পড়বে ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। আর চাঁদের গাড়ি কিংবা জিপ গাড়ির ভাড়া পড়বে ১ হাজার ২শ’ থেকে ৩ হাজার টাকা।

নীলাচলের বিকেল। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

পরিবহন ভাড়া

ট্রেনে ঢাকা হতে চট্টগ্রাম: এসি- ৩৬৫-৪৮০ টাকা। নন এসি-১৫০-১৬৫ টাকা।

বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম: এসি- ৫৮০-৭৯০ টাকা। নন এসি-২০০-২৫০ টাকা।

ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি চট্টগ্রাম: ৩৫০ টাকা

চট্টগ্রাম হতে বান্দরবন: ৭০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

আপনি চাইলে নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে থাকতে পারেন। নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে তিনটি কটেজে ছয়টি কক্ষ আছে। প্রতিটি কক্ষের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। এছাড়া রিসোর্টের অতিথিদের জন্য ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করে থাকেন কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগ: ০১৭৭৭৭৬৫৭৮৯।

সৌন্দর্যরূপ। সোর্স: infopedia365.blogspot.com

এছাড়া বান্দরবানে অসংখ্য রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল এবং রেস্টহাউজ রয়েছে। যেখানে ছয়শ থেকে তিন হাজার টাকায় রাত্রিযাপন করতে পারবেন।

ফিচার ইমেজ: ভ্রমণপ্রিয়.কম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাজারিখিলে ট্রি অ্যাডভেঞ্চার এবং ক্যাম্পিং

রংপুরের ভিন্নজগত পার্ক যেন এক অন্য জগতে নিয়ে যায়