বান্দরবান: অপার্থিব আনন্দ আর চাপা বিষণ্ণতা যেখানে হাতে হাত রেখে চলে!

ছেলেবেলা থেকেই চারপাশটা ঘুরে দেখার একটা প্রবল আগ্রহ অনুভব করতাম। বাবা-মা আর ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকাতেই স্থায়ীভাবে থাকছি। আত্মীয়স্বজনদেরও প্রায় সবাই ঢাকাতেই থাকেন। নিজের গ্রামের বাড়িতে তাই যাওয়া হয়েছে খুবই কম।

এটা নিয়ে সবসময়ই একটা আফসোস কাজ করত, যেটা এখনো করে! বাবা-মা চাকরি নিয়ে বেশ ব্যস্ত থাকতেন, ছুটি সেভাবে পেতেন না কেউই। একটা দীর্ঘ সময় তাই ইট, পাথর আর কংক্রিটের এই শহরেই পার করে দিতে হয়েছে।

গ্রামের বাড়িও ঢাকা বিভাগে হওয়ায় বলতে গেলে ঢাকার বাইরে পা দেয়ার সুযোগই হয়নি কখনো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম দেশের যতগুলো জেলা আছে, যাবো সবগুলোতেই। শুরুটা করেছিলাম বান্দরবান দিয়ে, ২০১৫ সালে। বান্দরবানের অবর্ণনীয় প্রাকৃতিক রুপ দেখে বিশাল একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম রীতিমতো।

শীত শুরু হওয়ার কিছুটা আগে অক্টোবর মাসের এক রাতে আমরা ছয় বন্ধু ফকিরাপুল থেকে বাসে উঠে পড়লাম। বাসের খোলা জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাসে মুক্তির স্বাদ পাচ্ছিলাম! জীবনের প্রথম ট্যুরের উত্তেজনা আসলেই অন্যরকম। এমন অনুভূতি পরের অন্য কোনো ট্যুরেই কাজ করেনি। এমনকি বাসে কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্তও উপভোগ করছিলাম!

হোটেলের বারান্দার ভিউ, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

পরদিন সকাল ৭টার মধ্যে পৌঁছে যাই বান্দরবান শহরে। ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন, পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর একটি শহর। গিয়েই মন ভালো হয়ে গিয়েছিল! পর্যটন মৌসুম না হওয়ায় ভালো হোটেল পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি আমাদের। আগে থেকে হোটেল বুকিং দিয়ে যাইনি আমরা। তাই শহরের বেশ কয়েকটা হোটেল দেখে শুনে হোটেল রিভার ভিউতে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম সবাই।

হোটেলের বারান্দা থেকে সাঙ্গু নদী আর পাহাড় দেখা যায়। বাইরে নদীর পাড়ে হোটেলের রেস্টুরেন্ট। সুন্দর একটা বসার জায়গা সেটা। পাশেই ছোটখাটো একটা পার্কের মতো জায়গাও তৈরি করা আছে। সবকিছু মিলিয়ে বেশ পছন্দ হলো আমাদের।

স্বর্ণমন্দির, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

হোটেলে চেক-ইন করে নাস্তা শেষে আমরা বেরিয়ে পড়লাম চাঁদের গাড়ির খোঁজে। পেয়েও গেলাম। ছয় জন উঠে পড়লাম গাড়ির ছাদে, শুরু হলো যাত্রা! প্রথমেই চলে গেলাম বান্দরবানের বিখ্যাত স্বর্ণমন্দিরে। এর ধর্মীয় নাম বুদ্ধ ধাতু জাদি।

দেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে বেশ উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায়, বিস্ময়কর ব্যাপার! এখান থেকে আপনি পাহাড়গুলোর দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সোনালি রঙের এই মন্দিরটিও যথেষ্ট মনোমুগ্ধকর। এর ভেতরে একটি ছোটখাটো জাদুঘরও আছে।

স্বর্ণমন্দিরের ভেতরে, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

মন্দির দেখা শেষে আবার উঠে পড়লাম গাড়িতে। এবার চলে এলাম মেঘলায়।

মেঘলায় আমরা, ছবিঃ আলিজা হোসেন

মেঘলা থেকে আমাদের গাড়ি সরু পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে চললো নীলাচলের দিকে। এই পুরোটা সময় গাড়ির ছাদের ওপরেই বসে ছিলাম আমি। নীলাচলের কাছাকাছি চলে আসতেই দেখলাম আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের মাঝখানে কংক্রিটের ঘরবাড়ি।

দৃশ্যটা প্রথম দেখায় অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম পুরোপুরি। বাংলাদেশে এরকম অসাধারণ সুন্দর জায়গা থাকতে পারে সেটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না! ওই সময়টুকু এমনভাবে ভেতরে নাড়া দিয়ে গিয়েছিল যেটা মনে পড়লে এখনো বেশ লাগে!

নীলাচলে সূর্যাস্ত, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

নীলাচলে সুন্দর কিছু সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এলাম হোটেলে।

নীলগিরি, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

পরদিন আবারো আমাদের চাঁদের গাড়িতে উঠে চলতে শুরু করলাম নীলগিরির পাহাড়ি পথে। আমরা রওনা দিতে কিছুটা দেরি করে ফেলেছিলাম, তাই নীলগিরি পৌঁছে মেঘ দেখা হয়নি। উল্টো কড়া রোদ উঠে গেছে তখন।

নীলগিরি, ছরিঃ ওয়াহিদা জামান

নীলগিরির সৌন্দর্য তাতে কমে যায়নি একটুও। বেশ অনেকটা সময় নিয়ে আমরা নীলগিরি ঘুরে দেখলাম। খানিকটা সময় নিজেদের মতো করে কাটালাম।

নীলগিরি, ছবিঃ ওয়াহিদা জামান

নীলগিরি থেকে চলে গেলাম শৈলপ্রপাতে। সেই সময়টায় শীত তখনো পড়তে শুরু করেনি, প্রপাতে পানির পরিমাণও ছিল ভালো। বন্ধুদের একজন ছবি তোলার দায়িত্বে থাকলেন, বাকি সবাই গা ভেজাতে নেমে পড়লাম তাড়াতাড়ি। বলে রাখা ভালো শৈলপ্রপাতের পাথুরে দেহটা খুবই পিচ্ছিল।

পা ফেলতে হয় সাবধানে। আমাদেরই একজন অসাবধানতাবশত পা পিছলে অনেক খানি নিচে পড়ে গিয়েছিল। কোনোমতে হাঁচড়ে-পাচড়ে শেষ পর্যন্ত উঠে আসতে পেরেছিল সে। ভাগ্যের জোরে বড় কোনো ক্ষতি হয়নি তার। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সবাই।

সেদিনের মতো হোটেলে ফিরে এলাম। বন্ধুটির পা হালকা ছিলে যাওয়ায় হোটেলের পাশের ফার্মেসি থেকে ড্রেসিং করিয়ে আনলাম। পরদিন রাতে আমরা ঢাকায় ফিরছি। সকালে উঠেই দেখলাম আমাদের বন্ধুর অবস্থা বেশ ভালো। পায়ে তেমন কোনো ব্যথাই নেই তার। আমরাও খুশি। এই খুশিতে অটো ঠিক করে শহর ঘুরে দেখা শুরু করলাম। অটো ড্রাইভার কিছুক্ষণ পর একটা নৌকা ঠিক করে দিলে সাঙ্গুর বুকেও একটা জলযাত্রা হয়ে গেল আমাদের।

সাঙ্গুর বুকে নৌকায় আমরা, ছবিঃ আলিজা হোসেন

পাড়ে এসে একটা ছোটখাটো ঝর্ণাও পেয়ে গেলাম। ঝর্ণার নাম বান্দু। বান্দু ঝর্ণায় লাফঝাঁপ দেয়ার পর আশপাশের কয়েকটা মন্দির ঘুরে দেখলাম।

বান্দু ঝর্ণা, ছবিঃ দুর্জয় শৌরি

দুপুরের খাবার সারলাম বান্দরবানের জনপ্রিয় খাবার শুঁটকি মাছের পানি দিয়ে রান্না করা “মুন্ডি” আর কাবাব দিয়ে। মুন্ডি খেতে খারাপ না, কিন্তু খাওয়ার আগে জানতে পারিনি এটা শুঁটকির পানি দিয়ে রান্না করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটা খেতে খেতেই জানতে পারলাম এবং বাকিটা আর শেষ করা হলো না!

বিকেলের ভেতর পৌঁছে গেলাম হোটেলে। বার্মিজ মার্কেটে চললো সন্ধ্যা নাগাদ হালকা কেনাকাটা। এরপর ৯টার ঢাকার বাসে উঠে পড়লাম। সাথে নিয়ে নিলাম খুব ভালো কিছু স্মৃতি।

সবার ক্ষেত্রে এমন হয় কিনা জানি না, তবে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলে আমার ভেতরে এক ধরণের চাপা বিষণ্ণতা কাজ করে। অপার্থিব আনন্দ আর বিষণ্ণতা যে হাতে হাত রেখে একসাথে চলতে পারে, বান্দরবানে এসে সেটা প্রথমবারের মতো অনুভব করেছিলাম। জায়গাটার জন্য তাই আলাদা একটা অনুভূতি সবসময় কাজ করে এবং করবে!

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি বান্দরবান। ট্রেনে আসতে চাইলে আপনাকে চট্টগ্রামে নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে বাসে বান্দরবান।

খুঁটিনাটি

কিছুদিন আগেও পার্বত্য এলাকায় ভারি বর্ষণ হয়েছে। যাওয়ার আগে আবহাওয়ার খোঁজ নিয়ে যাবেন।
পুরো ট্যুরে আমাদের ছয়জনের প্রত্যেকের খরচ পড়েছিল ৪,০০০ টাকা। এটা যদিও তিন বছর আগের হিসেব। এখন ৫,০০০-৫,৫০০ টাকার মধ্যেই উপরের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে পারবেন। দল বড় হলে খরচ কমে যাবে।

হোটেল রিভার ভিউ এর ফোন নম্বর- ০১৭৩৩১১৫৫৮৫
শৈলপ্রপাতে নামার সময় সাবধান থাকবেন।
অবশ্যই পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
ফিচার ইমেজ- ওয়াহিদা জামান 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহের কুঠিবাড়ী

ঘুরে আসুন মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে