বাটালী পাহাড়: চট্টগ্রাম শহরের সব থেকে উঁচু পাহাড়

আমি তখন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে সবে একদিন কাটিয়েছি। হাতে সময় আছে এখনও অনেক দিন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহ্যে ঘেরা চট্টগ্রাম ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছিল না। তাই ঠিক করলাম আরও কিছুদিন এখানে থেকে যাব আর চট্টগ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করব। কিন্তু এভাবে হোটেলে থেকে আর কত দিন! খোঁজ নিয়ে এক নিকট আত্মীয়ের ঠিকানা যোগাড় করলাম। ছোটবেলা চট্টগ্রামে কাটানোর সুবাদে ঠিকানাটা খুঁজতে বেশি সময় লাগল না।
বাসায় পৌঁছে নানান জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হলো। তাদের অভিযোগ চট্টগ্রামে এসে কেন হোটেলে রাত্রিযাপন করলাম। অতি সুকৌশলে অভিযোগ খণ্ডন করলাম এবং চট্টগ্রামে আসার মূল উদ্দেশ্যটা তাদের বুঝিয়ে বললাম। অবশেষে তারা মেনে নিল কিন্তু তাদের মুখে অভিমানের ছায়াটা তখনও কাটেনি। আর সেই ছায়া সরানোর জন্য বিকাল পর্যন্ত এখানেই কাটাতে হলো এবং তাদের আপ্যায়ন গ্রহণ করতে হলো।
বিকালে বাসা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর আসতেই ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি নামল। গায়ে লাগার মতো না, তবে ঠাণ্ডা-জ্বর লাগানোর জন্য খুবই কার্যকর। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে মনে বললাম এই বৃষ্টি কী আর আমাকে বাঁধতে পারে! ঘোরাঘুরির নেশা থাকায় এর চেয়ে কত বড় বড় বৃষ্টি মাথার উপর দিয়ে গেল। বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে কতবার মধ্য রাতে বাসায় ফিরেছি! চট্টগ্রামের আকাশ সেটা জানে না বলেই আমাকে আটকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছে।
এভাবে মনে মনে কৌতুক সাজাতে সাজাতে টাইগারপাস মোড়ে পৌঁছে গেলাম। এখানে আশেপাশে কোথাও একটি পাহাড় আছে যেটি চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। অবশ্য রাস্তা থেকে বেশ কয়টি ছোটখাটো পাহাড় চোখে পড়ছে, কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় নিশ্চয় এত ছোট হবে না। উচ্চতায় ২৮০ ফুট একেবারে কম নয়। আবার শুনেছি এটি নাকি টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত।
হাতে সময় কম, তাড়াতাড়ি পাহাড়টিকে খুঁজে পেতে হলে স্থানীয় কারো সাহায্য নিতে হবে। আশেপাশে দুয়েকজন যারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল তাদের কাছে বাটালী পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তাটা জানতে চাইলাম। একজন তো আকাশ থেকে পড়ল। আর অন্যজন এদিক-ওদিক তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করল কিন্তু অবশেষে বিফল হয়ে জানালো, সে চেনে না। কী আর করার এর মধ্যেই বুঝে গেলাম, স্থানীয় কেউ এই পাহাড়ের রাস্তা বলতে পারবে না। কারণ গরুও গোয়ালের কাছের ঘাস খায় না। এটি আমাদের আঞ্চলিক প্রবাদ হলেও তার সত্যতার প্রমাণ পেলাম চট্টগ্রাম শহরে।
ইতি-উতি করতে করতে চোখে পড়ল ট্রাফিক পুলিশ। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম ওখানে যেতে হলে আগে লালখান বাজার যেতে হবে। হাঁটতে থাকলাম লালখান বাজারের দিকে। খানিকদূর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দেয়ালের মতো কিছু টিলা রয়েছে। কিছুদূর গিয়ে চোখে পড়লো রাস্তার দুই পার্শ্বে দুইটি বাঘের মূর্তি। দেখলে মনে হচ্ছে বাঘ দুটো রাস্তা ক্রস করতে যাচ্ছে। বুঝতে দেরি হলো না যে বাঘ দুটি দ্বারা টাইগারপাস বোঝানো হচ্ছে। কী জানি, এই জায়গার নামকরণের পেছনে কোনো বাঘের উপস্থিতি ছিল কিনা!
কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর বাম পার্শ্বে দুইটি টিলার মাঝ বরাবর একটি রাস্তা দেখতে পেলাম। রাস্তার মুখে দুইটি ১০-১২ বছরের বাচ্চা কথা বলছিল। তাদের কাছে বাটালি পাহাড় নামটি বলা মাত্রই চিনে ফেলল আর সেই ভাঙা রাস্তা বরাবর হাঁটতে বলল। তাদের কথা মতো কিছুদূর হাঁটতে হাঁটতে আবিষ্কার করলাম রাস্তাটি ক্রমে উপরের দিকে উঠছে কিছুদূর উঠে চোখে পড়ল একটি বসতি। জায়গাটা বেশি একটা সুবিধার মনে হচ্ছিল না। একটু ভয় ভয় লাগছিল, কোনো বিপদে পড়ব না তো!

উল্লিখিত বস্তির সামনে থেকে বাটালী পাহাড়ের চূড়া; panoramio.com

কিছুক্ষণ পর দেখলাম কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে একটি বাচ্চা ওদিক থেকেই আসছে। তার কাছে বাটালি পাহাড় বলতেই হেসে জবাব দিল এটাই বাটালি পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়ার রাস্তা জানতে চাইলে সে ওই বসতির দিকে দেখিয়ে দিল। মনে খানিকটা সাহস পেলাম কারণ আমি জানি বাচ্চারা কখনো ভুল পথ দেখায় না। কিন্তু তবুও কেমন যেন লাগছিল কারণ ওদিকে কিছুদূর গিয়েই রাস্তাটা শেষ। মনে খানিকটা সংশয় নিয়ে এগুতে থাকলাম।
রাস্তার শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখলাম ডান পাশে একটি লোহার সিঁড়ি উপর দিকে উঠে গেছে। মনে স্বস্তি ফিরে এলো। ওখান থেকে একটু উঠেই একটা আনসার ক্যাম্প সেখানে নিজের পরিচয় দেয়া মাত্রই একজন আনসার এসে প্রয়োজনের অধিক জিজ্ঞাসা করতে লাগল আর অবশেষে জানাল, তার বাড়ি আমাদের জেলাতে।
চূড়ায় ওঠার সিঁড়ি; Source: Kanak Khan

এত দূরে এসে নিজের এলাকার একজন মানুষের সাথে দেখা হয়ে বেশ ভালোই লাগছিল। শরীরে শক্তি ফিরে এলো, তাকে সাথে নিয়ে লোহার সিঁড়ি বেয়ে হড়-হড় করে উঠতে থাকলাম উপরের দিকে। কিছুদূর খাড়া ওঠার পর পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের কাঙ্ক্ষিত চূড়ায়।
এখান থেকে সমগ্র বন্দর নগরীর বার্ডস আই ভিউ দেখা যায়। ঝিরি ঝিরি বর্ষার কারণে পুরো বন্দর নগরী যেন কুয়াশার চাদর জড়িয়ে বাটালী পাহাড়ের গায়ে তার গা এলিয়ে দিয়েছে।
চট্টগ্রামের বার্ড’স আই ভিউ; Source: অচিন্ত্য আসিফ

সাথে থাকা দেশী ভাইয়ের (চট্টগ্রামে আগত মানুষেরা নিজের এলাকার অপরিচিত কারো সাথে দেখা হলে তাকে দেশী ভাই বলে সম্বোধন করে) বর্ণনা অনুযায়ী চূড়ার পূর্ব দিকে রয়েছে চট্টগ্রামের অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্লু চিটাগাং বে ভিউ। দক্ষিণ দিকে রয়েছে সাগর, বন্দর, আগ্রাবাদ এলাকা, উত্তর দিকে টাঙ্কির পাহাড়, পশ্চিম দিকে এ কে খানের পাহাড় আর এসবের মাঝখানে দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট বাড়িঘর। এসব দেখে বেশ ভালোই লাগছিল আর প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছিল,

আমি যদি পাখি হতাম;

নীড় হারা পাখি!

সকাল-সন্ধ্যা উড়ে বেড়াতাম;

ঘুরে বেড়াতাম পুরো পৃথিবীর আকাশে।

বাটালী পাহাড়ের সর্বচ্চ চূড়া থেকে; Source: অচিন্ত্য আসিফ

কীভাবে যাবেন:

বাটালী পাহাড়ে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে চট্টগ্রামে যেতে হবে। তারপর চট্টগ্রাম মূল শহর থেকে বাস বা সিএনজি করে আধ-ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যেতে পারবেন বাটালী পাহাড়ে। লালখান বাজার বা টাইগার পাস মোড়-এই দুই দিক দিয়ে বাটালী পাহাড়ে যাওয়া যায়।
ফিচার ইমেজ- ইব্রাহীম খলিল

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অপরূপা মেঘালয়ের দর্শনীয় যত স্থান

ট্রেনবিহীন দেশগুলোর ইতিবৃত্ত