জিলাপির প্যাঁচে ঘুরে ঘুরে বাটালি পাহাড়ে আরোহণ

প্রীতিলতার আত্মাহুতিস্থল আর রেলওয়ে স্কুল দেখতে দেখতেই টিপ টিপ করে বৃষ্টি নেমেছিলো। ওখান থেকে কাছেই জিলাপি পাহাড়। কত কাছে, বা হেঁটে যাওয়া যাবে কি না, তা কিন্তু জানি না! যেহেতু চিনি না, তাই ঝুঁকি না নিয়ে একটা সিএনজি থামালাম। জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের নিয়ে জিলাপি পাহাড়ে যাবে কি না। রাজি হলো।

তিনজনের ভাড়া চাইলো ৬০ টাকা। আমি আর নিলয় একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইলাম, অযথা ভাড়া দিয়ে সিএনজিতে যাচ্ছি কিনা। ভাড়া যেহেতু কম চাচ্ছে, হয়তো একটু সামনেই পাহাড়টা!

টাইগার পাসের বাঘের ভাস্কর্য।  সোর্স: মাদিহা মৌ

ছাইপাঁশ না ভেবে উঠে পড়লাম। পরে বুঝেছি, উঠে খুব ভালো করেছি। সিএনজি চলতে শুরু করার মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঝুম বৃষ্টি নামলো। যেহেতু আমাদের কাছে ছাতা নেই, ভিজতে হতো। সেই সাথে সারাটা দিন মাঠে মারা যেত। সিএনজি একটা পাহাড়ের গোড়ার কাছে এনে বললো, ‘এটাই জিলাপি পাহাড়। আপনারা কার কাছে যাবেন?’

তখনো ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। চট করে নেমে যাব কি না ভাবছিলাম। দোনোমনা করতে করতে সিএনজি চালককে বললাম, ‘আমরা আসলে ঘুরে দেখতে এসেছি। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় যাব না।’

উনি আর একটা কথাও না বাড়িয়ে পাহাড়ে ওঠার পেঁচানো রাস্তায় সিএনজি তুলে দিলেন। সিএনজি সামনে আগাচ্ছে, পেঁচানো রাস্তাগুলো বাঁক নিয়ে নিয়ে পেরুচ্ছে ঠিকই, কিন্তু রাস্তার ধারে অনেক ময়লা। আর ঘিঞ্জি বাড়িঘর। নিলয়কে অবাক হয়ে বললাম, ‘এটাই বাটালি পাহাড়?’

ও অনিশ্চিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়লো।

শতায়ু অঙ্গনের ব্যায়ামের উপকরণ।  সোর্স: মাদিহা মৌ

তারপর আরো একটা মোড় ঘুরলো। দুইপাশে ঘরবাড়ির অবস্থা খুব একটা ভালো না। লোকজন অবাক হয়ে আমাদের সিএনজিটার দিকে তাকাচ্ছে। সিএনজিওয়ালা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আপনারা এখানে নামবেন?’

আমি ফিরতি বললাম, ‘এটাই কি বাটালি পাহাড়?’

‘আপনারা বাটালি পাহাড় যাবেন! ওটা তো আরেকটু সামনে।’

আর কোনো কথা না বলে তিনি সিএনজি ঘুরিয়ে এই পেঁচানো রাস্তা ধরে নামতে শুরু করলেন।

আমরা জানতাম, বাটালি হিলেরই আরেক নাম জিলাপি পাহাড়। এখন দেখি সিএনজি চালক অন্য কথা বলছে। তিনি আমাদের টাইগার পাসের চৌরাস্তার কাছে নামিয়ে দিয়ে বললেন একটু সামনে গেলেই বাটালি পাহাড় পাবো। ওখানে সিএনজি আর যাবে না।

৬০ টাকা করে ভাড়া ঠিক করলেও আমরা উনাকে ১০০ টাকা দিলাম। কারণ, ইনি যদি আমাদের বৃষ্টির মধ্যে আগের পাহাড়টার গোড়ায় নামিয়ে দিতেন, কিংবা জিলাপি পাহাড়ের উপরে, তাহলে আমরা ভালোই বিপদে পড়তাম।

জিলিপির প্যাঁচ। সোর্স: মাদিহা মৌ

যাই হোক, হাঁটতে হাঁটতে টাইগার পাসের মোড়টা পেরুচ্ছি। এখানকার রাস্তার দু’পা‌শে উঁচু পাহাড়। এই জায়গার নাম টাইগার পাস হবার পিছনে কিছু লোককথা আছে। গেল শত‌কে এই এলাকার পাহাড় গভীর বনজঙ্গলে অাবৃত ছিল। কোনো লোকজন বাস করতো না।

এই জঙ্গলে দিনদুপু‌রে বাঘ চলা‌ফেরা কর‌তো। প্রায়ই বা‌ঘের গর্জন শোনা যেতো এখানে। ‌কোনো ক্রমে গৃহপালিত গরু ম‌হিষ জঙ্গলে ঢ‌ুক‌লে আর ফি‌রে আসতো না। এমনকি বাগে পেলেই মানুষও মার‌তো বাঘ।

চট্টগ্রাম শহরের অনেকটা অংশ পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। সোর্স: মাদিহা মৌ

টাইগার পাসের কাছেই বাটালি পাহাড়। আসলে এটাকে সত্যিই জিলাপি পাহাড়ও বলা হয়। সিএনজি চালক হয়তো জানতেন না। জিলাপি পাহাড় নাম হবার কারণ, পাহাড়ে ওঠার রাস্তাটা জিলাপির প্যাঁচের মতো এঁকেবেঁকে চূড়ায় উঠেছে। পাহাড়ে যাওয়ার পথটা ছায়াঘেরা সবুজ। ২৮০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এই পাহাড়টি চট্টগ্রামের সর্বাধিক উঁচু পাহাড়।

আমরা প্রথম কয়েকটি জিলাপির প্যাঁচ ঘুরে ঘুরেই উঠেছি। বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি এই মোড়গুলো অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। এই রাস্তা বানাতে কী পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেটা ভেবেই অবাক হই। কিছুক্ষণ সরাসরি উঠে, তারপর ক্লান্ত হয়ে পড়ায় সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেছি। ওহ হ্যাঁ, বলতেই তো ভুলে গেছি, মোড়গুলো পেরুনো ছাড়াও উপরে ওঠা যায় সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ি বানানো হয়েছে শর্টকাট রাস্তা হিসেবে।

এখানটায় তিন তিনটে টাইগারের ভাস্কর্য আছে। সোর্স: মাদিহা মৌ

উঠতে উঠতে ডিসির বাংলো সহ আরোও কিছু বাড়ি দেখলাম বাটালি পাহাড়ে। একসময় চূড়ায় চলে এলাম। এখানে এসে প্রথমেই একটা সাইনবোর্ড পেলাম। ১৯৭৫ সালে নির্মিত শতায়ু অঙ্গন। এখানে নিয়মিত এলে সত্যিই হয়তো শত বছর আয়ু লাভ করা যাবে। কারণ এটি একটি খোলা ব্যায়ামাগার। ব্যায়াম করার কিছু উপকরণ এখানে আছে। আরমান তো রীতিমতো গা গরম করে ফেললো এখানে এসে।

শতায়ু অঙ্গনের উঁচু মঞ্চে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম শহরের অনেকটা অংশ পরিষ্কারভাবে দেখতে পেলাম। এমনকি একটু আগে সিএনজিতে করে আমরা যে জিলাপি পাহাড়ে উঠেছি ওটাও একদম কাছেই মনে হলো। হয়তো ওটা এই পাহাড়েরই একটা অংশ। এখান থেকে নাকি বঙ্গোপসাগরও দেখা যায়। আমি অবশ্য দেখিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই বাটালি পাহাড়ের চূড়াতে বিমান বিধ্বংসী কামান স্থাপন করা হয়েছিল।

জিলিপির একটা প্যাঁচ উঠে গেছে উপরের দিকে, একটা নেমে গেছে নিচে। সোর্স: মাদিহা মৌ

অবস্থান:

চট্টগ্রাম শহরের প্রাণ কেন্দ্রের লালখান বাজার এলাকার ইস্পাহানী মোড়ের উত্তরে ফাহিম মিউজিকের পাশ ঘেঁষে এবং ম্যাজিস্ট্রেট কলোনির পিছন দিয়ে পিচ ঢালা পথ বেয়ে উপরে দিকে উঠে গেছে বাটালি হিলের রাস্তা। চট্টগ্রাম শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে টাইগার পাসের বাটালি হিল।

কীভাবে যাবেন:

বাটালি হিল যেতে হলে আগে আপনাকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। চট্টগ্রামে যেতে পারেন বাসে অথবা ট্রেনে। চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশায় কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাটালি হিল যেতে পারেন।

আরমান রীতিমতো ব্যায়াম করতে শুরু করেছে। সোর্স: মাদিহা মৌ

কোথায় থাকবেন:

চট্টগ্রামে নানান মানের হোটেল আছে। নীচে কয়েকটি বাজেট হোটেলের নাম ঠিকানা দেয়া হলো। এগুলোই সবই মান সম্পন্ন কিন্তু কম বাজেটের হোটেল।

১. হোটেল প‌্যারামাউন্ট, স্টেশন রোড।

২. হোটেল এশিয়ান এসআর, স্টেশন রোড।

৩. হোটেল সাফিনা, এনায়েত বাজার।

৪. হোটেল নাবা ইন।

৫. হোটেল ল্যান্ডমার্ক।

ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উপভোগ্য ১৫টি অসাধারণ সমুদ্র সৈকত

সিলেটে ক্যাম্পিং বাউন্ডুলেদের