বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের দ্বৈতরূপ

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলা বিভিন্ন কারণে পর্যটকদের কাছে আর্কষণীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডে রয়েছে অশেষ নয়নাভিরাম চন্দ্রনাথ পাহাড়, ইকোপার্ক সবুজ বনাঞ্চল বেষ্টিত আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি পথ, পাহাড়ি লেকের মনোরম দৃশ্য। কিছুদিন আগে নতুন একটি পর্যটন স্থান যুক্ত হয়েছে আগের তালিকায়, সেটি হলো বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত। আমার একদিনের চট্টগ্রাম ভ্রমণ পরিকল্পনায় এই বীচটি ছিল তালিকার সবার শেষে। সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সৈকতের নোনাজলে পা ডোবাবো, এটাই ছিল ইচ্ছে।

সবুজ ঘাসে ঢাকা সৈকত। সোর্স: লেখিকা

চট্টগ্রাম আসবো, আর অমিয়েত্রা-অমিয়েন্দ্র খ্যাত লেখক ফরহাদ চৌধুরী শিহাবের সাথে দেখা করবো না, তাই কি হয়? ভাইয়াকে কল করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাঁশবাড়িয়া যাচ্ছি, যাবেন?’
তখন আমরা বায়েজিদ বোস্তামির মাজারে। ভাইয়া বললেন, ‘যাব।’ শুধু যাব বলেই ক্ষান্ত হননি, চলে এসেছেন মাজারে। এখান থেকে আমরা সিনজি রিজার্ভ করে একে খান চলে গেলাম।
বালুকাবেলা। সোর্স: লেখিকা

চট্টগ্রাম শহর থেকে ২৫ কি.মি. উত্তরে একটি ছোট্ট বাজারের নাম বাঁশবাড়িয়া বাজার। এই বাজারের মধ্য দিয়ে সরু পিচ ঢালা পথে মাত্র ১৫ মিনিটে পৌঁছানো যায় বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র উপকূলে। বাজারের একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে-

“বাঁশবাড়ীয়া বাজার হতে সমুদ্র সৈকত পর্যন্ত প্রতিজনে সিএনজি ভাড়া ২০ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়া প্রদান করবেন না।
আদেশক্রমে-ঘাট কর্তৃপক্ষ।”

এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো। টুরিস্ট স্পট হয়ে গেলেই ওই এলাকার লোকাল বা রিজার্ভ যানবাহনের চালকরা আকাশচুম্বী দাম চেয়ে বসে। এখানে এটা নির্ধারিত করে দেওয়ায় ঠগবাজির হাত থেকে বাঁচা গেল। আমরা ভাড়া ঠিক না করেই রিকশায় চেপে বসলাম।

ঝাউবনের পাশে জনারণ্য। সোর্স: লেখিকা

রিকশাটি সাধারণ রিকশার মতো নয়। ব্যাটারিচালিত, তবে এটাই একমাত্র বিশেষত্ব নয়। পিছনে যাত্রীর বসার জায়গা তো থাকবেই, তার সাথে চালকের পাশেও যাত্রী বসার জায়গা আছে। পিছনে অনেক জায়গা। দুজন বসার পরেও খানিকটা জায়গা থেকে যায়। আমি, নিলয়, আরমান কষ্টেসৃষ্টে পিছনে বসলাম। আর শিহাব ভাই সামনে বসলো।
ঝাউগাছের সারি। সোর্স: লেখিকা

বাঁশবাড়িয়া বীচে যাওয়ার পথটা অসাধারণ। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে আলোর খেলা। উপরে খোলা আকাশ, পাশে খোলা জায়গা। একটু সামনে এগিয়ে গেলে বিশাল সমুদ্র। ঝাউ বাগানের সারি সারি গাছ ও নতুন জেগে ওঠা বিশাল বালির মাঠ। সেই মাঠ ঢেকে আছে সবুজ ঘাসে। এখন পর্যন্ত আমি কেবল বালির বীচই দেখেছি, সবুজ ঘাসে ঢাকা বীচ দেখিনি। ঝাউবন, সবুজ ঘাসের বীচ, শেষ বিকেলের মোহনীয়া আলো- সব মিলিয়ে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে আছে প্রকৃতি। আজ আকাশের মন ভালো, তাই মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটাই খুব দারুণভাবে উপভোগ করা যেত, যদি পুরো বীচ জুড়ে বাজারের মতো মানুষ না থাকতো। ঈদের তৃতীয়দিনে সবাই পরিবার পরিজন নিয়ে এসেছে সমুদ্রের রূপের আধার দেখতে।
সূর্য দিনের শেষভাগের আলো ছড়াচ্ছে। সোর্স: লেখিকা

চট্টগ্রামে অনেকগুলো সমুদ্র সৈকত আছে। সবগুলোকে বাদ দিয়ে বাঁশবাড়িয়ায় আসতে চেয়েছি এজন্য যে, এই সমুদ্র সৈকতের প্রায় আধা কিলোমিটারের বেশি সমুদ্রের ভেতর হেঁটে যাওয়া যায়। ঘাসের বীচ মাড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। জুতো পায়েই পানির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম, একটু পর পর ঢেউ এসে পায়ের মধ্যে আছড়ে পড়ছে।
নিলয় হাত তুলে হাতের ডান দিকে দেখালো। ওখানকার সমুদ্রে কেবল কতগুলো লাল পতাকা দেখতে পেলাম। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্রিজ কই?’ ও বললো, ‘জোয়ার চলছে। ব্রিজটা ডুবে গেছে পানি বাড়ায়। তোর আর ব্রিজের উপর হেঁটে যাওয়া হলো না।’
এই সমুদ্র সৈকতের প্রায় আধা কিলোমিটারের বেশি সমুদ্রের ভিতর হেঁটে যাওয়া যায়। সোর্স: xion

গতকালই টিওবি হেল্পলাইনে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম, কখন গেলে ব্রিজটায় উঠতে পারবো। কয়েকজন জানালো, শেষ বিকেলের দিকেই নাকি ওঠা যাবে। এইসময় ভাটা থাকবে। কিছুই মিললো না। তবে আফসোস হচ্ছে না তেমন। কারণ, এত মানুষ এখন বীচে, ব্রিজটা ভাসমান থাকলেও এদের সরিয়ে আমি ওই ব্রিজে উঠতে পারতাম, এটা আশা করা বোকামি।
এরকম একটা জায়গায় আসতে হবে নিরিবিলিতে। সাধারণ সময়ে এসে ব্রিজের ওপর দিয়ে হেঁটে একদম শেষ প্রান্তে যাব, একটু পর পর ঢেউ আছড়ে এসে পায়ে পড়বে, এরকম আশ্বাস দিয়ে মনকে দমিয়ে রাখলাম।
একটু পর পর ঢেউ এসে পায়ের উপর আছড়ে পড়ছে। সোর্স: শিহাব ভাই

প্লাস্টিকের তৈরি এই ব্রিজটি কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন। এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মালিকানায় নির্মিত যা একান্তই সন্দ্বীপবাসীদের চলাচলের জন্য। প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হয়েছে, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি লোহা বা স্টিল তাড়াতাড়ি ক্ষয়ে যায় বলে। কেউ চাইলে স্পিড বোটে করে জনপ্রতি ৪০০ টাকা (আপডাউন) দিয়ে সন্দ্বীপ ঘুরে আসতে পারে। ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তখন আর সন্দ্বীপ যাওয়ার সময় নেই। তাছাড়া খরচটাও নেহায়েত কম নয়। তাই আপাতত ওই ইচ্ছেটাকেও মুলতবি দিতে হলো।
বাঁশবাড়িয়ার সূর্যাস্তকালে আমার ভাইটার গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন টাইপের আলোকচিত্র। সোর্স: শিহাব ভাই

পাশের ঝাউ বনে ঘুরলাম। কোথাও কোথাও থকথকে কাদা। ওই কাদা মাড়িয়ে সামনে এগুতেই দেখি আইসক্রিমওয়ালা আইস্ক্রিম বিক্রি করছে। শিহাব ভাই খুব আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেল আইস্ক্রিমওয়ালার কাছে। আইস্ক্রিমওয়ালা নাকি কি এক নারকেল আইস্ক্রিম বিক্রি করছে। ছোটবেলায় নাকি ভাইয়া এই আইস্ক্রিম অনেক খেয়েছেন। এতদিন পর পেয়ে একদম খুশিতে গদগদ। আমি আগে আর এই আইস্ক্রিম খাইনি শুনে, “চাঁদপুর কি অন্য গ্রহের জায়গা নাকি!” এসব বলে পচালেন ইচ্ছেমতো। নারকেল স্বাদের আইস্ক্রিমটা খেতে ভালো বলে উনার কথায় আর গা করিনি।
নারকেলের আইসক্রিম। সোর্স: শিহাব ভাই

সতকর্তা:

বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে অবস্থিত ব্রিজটি মজবুত খুঁটি ছাড়া নির্মিত, যার কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। অহেতুক বড় দল নিয়ে ব্রিজে না ওঠাই ভালো। যেহেতু কোনো বেষ্টনী নেই, জোয়ার-ভাটার সময় মেনে চলা উচিৎ। তবে বর্তমানে খুব সম্ভবত ব্রিজটায় টুরিস্টদের ওঠায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কারণটা বেশ মর্মান্তিক।
বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতটি ছবি তোলার জন্য খুব ভালো একটি স্পট হলেও এর অন্তরালে রয়েছে মৃত্যুকুপ। এটি আসলে কোনো ট্যুরিস্ট স্পট নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন নৌ-চলাচলের ঘাট। তাই এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। ব্যবসায়িক লক্ষ্যে কেবল কিছু খাবারের দোকান এবং একটি নৌকাঘাট আছে।

জনসমুদ্র। সোর্স: লেখিকা

২১ জুন ২টি ছেলে ব্রীজ থেকে পড়ে ডুবে গিয়েছিল। পরের দিন তাদের লাশ পাওয়া যায়। তাই এখন লাল পতাকার বেষ্টনী দিয়ে কিছু জায়গা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরেও বিপদ কাটেনি। কারণ, বাঁশবাড়িয়ার এই সমুদ্রে সৈকত থেকে ক্রমে ঢালু হয়ে নিচু হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় ঝপ করে গভীরতা পাওয়া যাবে। এই গভীরতা আর জোয়ারের ঢেউয়ের সময় দক্ষ সাঁতারুও বাঁচতে পারে না। তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে কয়েকদিন আগে তিনজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
গত ১০ই জুলাই ব্যক্তি উদ্যোগে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা সি-বিচে আবারও তিন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে বিচ নামের মৃত্যুকূপটিতে গোসল করতে গিয়ে তারা নিখোঁজ হন। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বিচটি ক্রমেই মৃত্যুকূপে পরিণত হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন গ্রাম পুলিশ দিয়ে পাহারা এবং মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করলেও পর্যটক প্রবেশ বন্ধ করতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিচটি বড় পরিসরের এবং সব দিকে খোলা। চাইলেই যে কেউ যে কোনো দিক দিয়েই ঢুকতে পারে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য বেষ্টনী দেওয়া সম্ভব নয় বললেই চলে।
তাই কিছু সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে বিচে। ইদানীং এখানে বেশ কিছু সতর্কতা সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ফেরীঘাট কর্তৃপক্ষের দেওয়া সেই সাইনবোর্ডের সাবধান বাণীতে লেখা আছে, “অনুমতি ছাড়া ভুলেও কেউ সাগরের পানিতে নামবেন না।”
“ঘাটের যাত্রী ছাড়া কোনো পর্যটক ব্রিজে না ওঠা ও সাগরের পানিতে না নামার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।”
স্পটটিতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে, তবুও কিছু প্রভাবশালী ওইখানে ব্যবসার সুবিধার্থে চালু রেখেছে। কাজেই বাঁশবাড়িয়া গেলেও সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। সমুদ্রের পানিতে না নামাই উত্তম।
প্লাস্টিকের ব্রিজ। সোর্স: অপু নজরুল

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে সীতাকুণ্ডে অথবা চট্টগ্রামের অলংকার থেকে সীতাকুণ্ড যাওয়ার যেকোনো বাস বা টেম্পুতে করে বাঁশবাড়িয়া নামতে হবে। ভাড়া ৩০-৪০ টাকা। অলংকার থেকে চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে ২৩ কি.মি. যেতে হবে। এটা বাড়বকুণ্ডের একটু আগে। বাঁশবাড়িয়া নামার পর সিএনজিতে করে আরও ২.৫ কি.মি. গেলে বেড়িবাঁধ পাওয়া যাবে। সিএনজি ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা করে। চাইলে রিজার্ভও নেওয়া যায়। তাহলে আপনাকে বাঁধের সামনে পযর্ন্ত নিয়ে যাবে। রিজার্ভ ভাড়া ৩০০ টাকা নেবে।

কোথায় থাকবেন

মীরসরাই বা সীতাকুণ্ডে নিম্নমানের হোটেল পাবেন। সীতাকুণ্ড বাজার গেলে সেখানে হোটেল সাইমুন আছে। ভালো হোটেলে থাকতে চাইলে চট্টগ্রাম চলে আসতে হবে। নয়দুয়ারি বাজারে খুঁজলে মধ্য মানের থাকার হোটেল পাওয়া যেতে পারে।
চট্টগ্রামে নানান মানের হোটেল আছে। এগুলোই সবই মান সম্পন্ন কিন্তু কম বাজেটের হোটেল।
তথ্যসূত্র :
http://www.bd-pratidin.com/first-page/2018/07/07/343128
ফিচার ইমেজ: অপু নজরুল

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মানালির রূপালি জ্যোৎস্না ও নীল পাহাড়ের গল্প!

উভচর বিমানে সুন্দরবনের উপকণ্ঠে (ভিডিও)