বারিক্কা টিলা থেকে জাদুকাটা নদীর রূপের অ্যাখ্যান

বারিক্কা টিলাকে বারেক টিলাও বলা হয়। এর অবস্থান সুনামগঞ্জ জেলার টেকেরঘাটে। নৌকা নিয়ে হাওর ঘুরতে বেরিয়েছি। ঠিক মধ্যদুপুরে নৌকা আমাদের নামিয়ে দিল টেকেরঘাটে। খেয়েদেয়ে মোটরবাইক ঠিক করা হয়েছে এখানকার ভ্রমণ স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য। লাকমাছড়া ঘুরে ওখান থেকে বাইকাররা আমাদের নিয়ে চললো বারিক্কা টিলার দিকে।

বাইকে চলার জন্য বারিক্কা টিলায় যাওয়ার রাস্তাটা দারুণ। একধারে দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয় পর্বতমালা, অন্যপাশে হাওর। সকালে কোনো রোদ না থাকলেও, দুপুর হতেই সূর্যি মামা দেখা দিলেন। কোনো সমস্যা নেই, পিঠে আরামদায়ক রোদ আর বাইকের ছুটে চলা। আমার তো রীতিমতো তন্দ্রা এসে যাচ্ছিল!

বাইকে করে যাত্রা। সোর্স: পাগলের দল

চোখ রগড়ে ঘুম দৌড়ালাম। দু’পাশের প্রকৃতি দেখছি। এর মধ্যেই কিছু বসতি আর দুটো চার্চ দেখলাম। অনেকটা পথ আসার পর এক জায়গায় আমাদের মোটর বাইক থেকে নামতে হলো। বারিক্কা টিলাটি প্রায় ১৫০ ফুট উচ্চতায়। এতক্ষণ আমরা প্রায় সমতল একটা রাস্তা দিয়ে বাইক রাইড করেছি। এখন এই সমতল রাস্তাটিই খাড়া উঠে গেছে একটি টিলার উপরে। এখানটায় বাইকে চেপে উপরে যাওয়া বিপজ্জনক।

উপরে উঠে আবার বাইকে চেপে বসলাম। এখান থেকেই বারিক্কা টিলার শুরু। তাই আমরা পায়ে হেঁটে এই চড়াইটুকু পেরুলাম। পলাশ বাজার, ধরপুর বাজার পেছনে ফেলে, চিনাকান্দি বাজার, কড়ই গড়া ও রাজাই গ্রাম ছাড়িয়ে বাইক নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের কাছে। আমরা যাচ্ছি জিরো পয়েন্টের দিকে। এই টিলায় ৪০টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে। তার নমুনা দেখতে পেলাম। ঠিক জিরো পয়েন্টে বাইক আমাদের নামিয়ে দিল।

যাদুকাটায় যাওয়ার রাস্তা। সোর্স: পাগলের দল

বাইক থেকে নেমে টিলার নিচের নদীটা দেখে আমি থ হয়ে গেলাম। এই সেই জাদুকাটা নদী! সত্যি সত্যিই নদীটার নাম যত সুন্দর, অদ্ভুত সৌন্দর্য তার নিজেরও। নদীর পানি এতটাই স্বচ্ছ যে নিচের বালুকণা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! গভীরতা কম, সে জন্যই তলদেশ দেখতে পাচ্ছি। নদীর একপাশে বিস্তীর্ণ বালুচর। আর অন্যপাশে দোর্দণ্ড প্রতাপে মেঘালয়ের খাসিয়া পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে বুক চিতিয়ে।

দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে নেমে এসেছে এই রহস্যময়ী নদীটি। টাঙ্গুয়ার হাওরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুন্দর ও মনোরম দৃশ্যপট এই টিলা আর টিলা থেকে দেখা জাদুকাটা নদী। অপরূপ এই নদীটি বর্ষাকালে অনেক প্রশস্ত হয়ে যায়। জাদুকাটা নদী থেকে বেশ কিছু খালের সৃষ্টি হয়ে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে।

বারিক্কা টিলার উপরে দুই দেশের সীমানা পিলার। এই পিলারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডদের একটা টহল চৌকিও আছে। এখানে এসে ভারতীয় বিএসএফের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিৎ। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই সতর্ক থাকে না। সীমানা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। বারেকটিলা থেকে বড়ছড়া চারাগাঁও শুল্ক স্থলবন্দর ৪০ মিনিটের হাঁটা পথ।

টিলায়। সোর্স: পাগলের দল

বারিক্কা টিলায় দাঁড়িয়ে জানতে ইচ্ছে করছে, নদীর অপর পাড়ে কী আছে। পরে জানতে পারলাম, ওখানে রয়েছে লাউয়ের গড় বি.ডি.আর ক্যাম্প। পেছনে আরো একটি পাহাড় আছে। জাদুকাটার পূর্বে শাহ আরেফিনের (রহ.) আস্তানা এই লাউড়েরগড় গ্রামে। সেই গ্রামের দক্ষিণ কোণের নদী তীরে রয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। প্রতিবছর চৈত্র মাসে প্রায় একই সময়ে শাহ আরেফিনের আস্তানায় উরশ ও জাদুকাটা নদী তীরে পুণ্যস্নান হয়। দুই উৎসব ঘিরে সে সময় নদী তীরে নামে দুই ধর্মের মানুষের ঢল।

হাজার হাজার মানুষ নদীর গা ঘেঁষে নেমে যায়। তীর্থ আর উরশের সময় বিডিআর ও বিএসএফের সমঝোতায় ২-১ দিনের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করা হয়। সেই সময় দুই দেশের লোক উৎসবে জড় হয়। শোনা যায়, একসময় এই জাদুকাটা নদীর তীরেই ছিল প্রাচীন রাজ্য লাউড়ের রাজধানী। কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে সেই রাজ্য এবং রাজধানী। প্রাচীন সেই রাজ্যের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এখনো গ্রামটির নাম ‘লাউড়ের গড়’। বিজিবির অনুমতি পেলে গ্রামটি ঘুরে দেখা যায়।

বর্ষার ঢলে খাসিয়া পাহাড় হতে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বালু আর পাথর। বালু-পাথর তোলার জন্য শত শত নৌকা জড় হয় এখানে। টিলা থেকে কয়েকটি ঝর্ণা ধারা দেখতে পেলাম দূরের ওই খাসিয়া পাহাড়ে। কিছু সৌন্দর্য আমার দূর থেকে দেখতেই ভালো লাগে। এই নিয়ে আক্ষেপ করি না।

চড়াই পেরুচ্ছি। সোর্স: পাগলের দল

বারিক টিলা থেকেই জাদুকাটা দেখা হলো আমাদের। এর নীল সলিল ছুঁয়ে দেখা হলো না বাইক ওয়ালাদের জোচ্চুরিপনার জন্য। আমাদের জাদুকাটায় নামার সুযোগ না দিয়েই টিলা থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল। আমরা তো প্রথমে ভেবেছিলাম, কাছাকাছি অন্য কোনো জায়গা আছে, ওটা দেখাতে নিচ্ছে। কিন্তু ওরা যে আমাদের জাদুকাটার রূপ অবলোকন করতেই দেবে না, সেটা তো বুঝিনি!

এই নিয়ে পরে অনেক বাক্য বিনিময় হয়েছে, কিন্তু আমাদের লাভ হয়নি কিছুই। কাছেই জাদুকাটার চর ছিল, ওখানে যেতে পারতাম। পানির গভীরতা কম বলে সবাই নেমে দাপাদাপি করে এই নীলাভ পানিতে। আমাদের করা হলো না। এখানে একটু সতর্কতা দিয়ে রাখি, জাদুকাটায় নামলে বেশিদূর না যাওয়াই ভালো। কারণ থেকে থেকে হঠাৎ করেই পায়ের নীচের মাটি হারিয়ে যায়। পাহাড়ি নদী বলে পানির স্রোতও বেশ তীব্র।

কীভাবে যাবেন:

বারিক্কা টিলা আর জাদুকাটা নদী দেখতে হলে আপনাকে আগে সুনামগঞ্জ যেতে হবে। ঢাকা সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫৫০ টাকা করে। যাওয়া আসা মামুন পরিবহনে করলে, যাওয়ার সময় ভাড়া পড়বে ৪৫০-৫০০ টাকা, আসার সময় ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা।

সুনামগঞ্জ থেকে বাইক বা লেগুনায় তাহিরপুর আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ৮০ টাকা। ট্রলার ভাড়া করে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে টেকেরঘাট। ভাড়া ট্রলারের আকারের উপর নির্ভর করবে। টেকেরঘাট মোটরবাইকে বারিক্কা টিলা। টেকেরঘাটেই বাইক পাওয়া যায়।

রহস্যময়ী যাদুকাটা। সোর্স: পাগলের দল

টেকেরঘাট থেকে নৌপথেও জাদুকাটা নদীতে আসা যায়। বললে নৌকা হাওর হয়ে আপনাদের নদীর ঘাটে নামিয়ে দেবে।

আবার সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকেই জাদুকাটায় যেতে পারেন। ওখান থেকে দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। সুরমা নদীর সাহেববাড়ীর ঘাট থেকে নৌকায় করে রওনা দিলে আধ ঘণ্টা পর দেখা মিলবে মণিপুরী ঘাটের। ঘাটে নেমে ভাড়ার মোটরবাইকে আবার যাত্রা শুরু। বর্ষাকালে সাহেব বাড়ি ঘাট হতে স্পীড বোট অথবা ইঞ্জিন বোটে সরাসরি গন্তব্যে পৌঁছা যায়।

পতাকা। সোর্স: পাগলের দল

তবে ওরস ও পুণ্যস্নানের সময় এখানে এলে আপনাকে যানবাহন সংকটের মুখে পড়তে হবে। পাশের মূল সড়ক থেকে পুরো রাস্তাটা আপনাকে আসতে হবে হেঁটে।

কোথায় থাকবেন

বড়ছড়া বাজারে রেস্ট হাউজ আছে, ২০০-৪০০ টাকায় থাকা যায়। বারেক টিলা পার হয়েই বড়ছড়া বাজার। চাইলে টেকেরঘাট থেকে হেঁটেও আসতে পারবেন বড়ছড়া বাজারে। এছাড়াও লেকের পাশে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি চুনা পাথরের কারখানা আছে তার গেস্ট হাউজে থাকতে পারবেন যদি খালি থাকে।

১. উপজেলা ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার কৃপেশ দাস: ০১৭২৪৯৬৮১৬১
২. উপজেলা গেস্টহাউজের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান জনাব আনিসুল হককে অনুরোধ করতে হবে: ০১৭১৫১৭২২৩৮

প্রতীক্ষা। সোর্স: পাগলের দল

কোথায় খাবেন

বারেক টিলাতে খাবারের হোটেল আছে, এছাড়াও বড়ছড়া বাজারে খেতে পারেন অথবা লেকের পাশেই টেকেরঘাটে একটা ছোট বাজার আছে। একটি মাত্র খাবারের হোটেল আছে।

কয়েকজন মাঝি, লেগুনা ড্রাইভার এবং বাইক ড্রাইভারের নাম আর ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি।

লোকমান মাঝি (সোনালি পরিবহন)
মোবাইল: 01736447984
তার ট্রলার টা ৭-৮ জনের জন্য

পরাণ মাঝি
মোবাইল: 01718168314
এর ট্রলার ২০ জনের, মোটামুটি বড় সাইজের

বনি ইয়ামিন (তাহিরপুর এর লেগুনা ড্রাইভার)
মোবাইল: 01997699824

আকতাস (টেকেরঘাট এর বাইক ড্রাইভার)
মোবাইল: 01761214673

সতর্কতা:

পাহাড়, নদী কিংবা ঝর্ণা- যেখানেই যাই না কেন, সব জায়গাতেই দেখেছি প্রচুর অপচনশীল বস্তু যেখানে সেখানে পড়ে আছে। লোকে ঝর্ণার পানিতে গোসল করতে গিয়ে শ্যাম্পু ব্যবহার করে, সেই শ্যাম্পু-সাবানের প্যাকেট সেখানেই ফেলে আসে। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন।

যে কোনো পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

ফিচার ইমেজ: পাগলের দল

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যেভাবে ট্রাভেল জার্নাল লিখবেন

বিকালপর্বে চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে হন্টনের গল্পকথা