ষাইট্টা গ্রামে পঞ্চশতক বয়সী বট পাকুড়ের আলোছায়া

আমার স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার সিট পড়েছে ধামরাইয়ের কুশুরায়। একেক পরীক্ষার দিন বাচ্চাদের সাথে একেক টিচার যান৷ কুশুরায় সিট পড়ার খবর শুনেই আমি ভাবতে শুরু করলাম, ধামরাইয়ে কী কী দেখার জায়গা আছে, খুঁজতে হবে। গুগল করে জানতে পারলাম, ষাইট্টা বট গাছের কথা। এই গাছটা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে আমার আগে থেকেই ছিল।

কুশুরা থেকে ষাইট্টা খুব বেশি দূরে নয়। ভ্যানে চড়ে গেলে প্রতিজনে ১৫-২০ টাকা ভাড়া। আমরা দুই বান্ধবী ভ্যানে চড়ে বসলাম। ষাইট্টা যাবার রাস্তা বেশ মসৃণ। দুই পাশে যতদূর চোখ যায়, লেবু বাগান। ক্ষণে ক্ষণে চোখে পড়ে লেবু চাষীদের ব্যস্ততা। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, লেবু ফুলের মধু সংগ্রহ করার জন্য ভ্রমরের দল উড়ে বেড়াচ্ছে।

ফুলের প্রেমিকেরা; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

ভ্যানচালক ষাইট্টা গ্রামের কাছে এসে একটা মেঠোপথের দিকে নির্দেশ করে জানালেন, সামনেই কাঙ্ক্ষিত সেই বটবৃক্ষ। ভ্যানচালককে অনুরোধ করায়, তিনি আমাদের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে দিয়ে এলেন বট গাছের ঠিক সামনে।

কিন্তু কোথায় বটগাছ? কোথায় কী? এ তো দেখি একটা গুহা! না না, চমকে উঠবেন না। গাছের মূল কান্ডের কাছে যাওয়ার জন্য যে প্রবেশদ্বার, তা ঠিক যেন একটা গুহার মতো। সবুজরঙা গুহা। একচিলতে ঢোকার জায়গা। ঠিক যেন পৌরাণিক কোনো রহস্য লুকিয়ে রেখেছে বুকের গভীরে।

মন্দির; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

সেই রহস্য উন্মোচন করার জন্য আমরা গুহা দ্বার পেরিয়ে গেলাম। আমাদের ঠিক সামনেই একটা বিশাল গাছের কান্ড উন্মোচিত হলো৷ যে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছে ৫ বিঘা জমি জুড়ে!পাঁচ পাঁচটে বিঘা জমিতে নিজের ডালপালা ও মূল ছড়িয়ে দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? এটা কিন্তু একদিন দুইদিনে হয়নি। ১-২ বছরেও নয়। গাছটি এই অবস্থায় আসতে সময় লেগেছে পাঁচ শতাব্দী।

কিন্তু আমরা তো শুনেছিলাম, এখানে দুটি গাছ। দেখতে তো পাচ্ছি একটা। তাহলে অন্য গাছটা কই? ভালোভাবে খেয়াল করতেই বুঝলাম, না একটা নয় মোটেও। গাছ দুটোই। দুটো গাছ নিজেদের আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরে আছে পরম ভরসায়। যেন কথা দিয়েছিল নিজেদের, কখনো কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। এই অদ্ভুত প্রেমোখ্যান মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে এলাম। ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে মনে হলো, গাছদুটো যেন সঙ্গমরত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কীভাবে এই গাছেদের মিলন ঘটলো? সৃষ্টির কী এক রহস্য। আশপাশের মানুষের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করলাম গাছ দুটোর ইতিহাস।

বট ও পাকুড়; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

প্রায় ৫০০ বছর আগে ঢাকার ধামরাই উপজেলার যাদবপুর ইউনিয়নের এই ষাইট্টা গ্রামে বসবাস করতো দেবীদাস বংশের পূর্বপুরুষরা। তারাই পাশাপাশি একটি পাকুড় গাছ এবং একটি বটগাছ রোপন করেন। মজার ব্যাপার হলো, বট আর পাকুড়; দুটি গাছই বেনিয়ান গোত্রের গাছ। গাছ দুটোকে চেনা যায় কেবল এদের পাতা দেখে। বটগাছের পাতা তো সবাই চেনে, যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই বটগাছ আছে। আর পাকুড় গাছের পাতা হৃদয়াকৃতির। মানুষের হৃদয়ের মতোই দেখতে পাকুড় পাতা। আর পাকুড় গাছের পাতা দেখতে অশ্বত্থের মতো।

পাতাগুলো যখন গজায় তখন রক্তিম উজ্জ্বল বা তামাটে রঙের পাতা গজায়। পাতাগুলো পরে ধীরে ধীরে গাঢ় সবুজের রূপ ধারণ করে। পরিপক্ব হলে তা সবুজ রং ধারণ করে। বসন্ত শেষে অশ্বত্থের মতো এদের পাতাও ঝরে যায়। এছাড়াও পাকুড় গাছের কান্ড অমসৃণ ও খসখসে, ওদিকে বটের কান্ড তুলনামূলকভাবে বেশি মসৃণ। পাকুর আকার আয়তনে অনেকটা বট গাছের মতোই; ঝুরিবহুল, বিস্তৃত ও বিশাল। তবে চওড়ায় কম ও লম্বা একটু বেশি। এসব দিক খেয়াল করলে গাছ দুটোকে অনায়াসেই আলাদা করা যাবে।

কালী, শীতলা ও সরস্বতীদেবী; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীর লোকজন এই গাছ দুটিকে দেবতা মনে করেন। তাই তারা গাছের ছায়ার নিচে কালি মন্দির নির্মাণ করেছেন। কালি মন্দির নাম হলেও, এখানে সনাতনে বিশ্বাসীরা কালী, সরস্বতী, বুড়ির পূজা করে। দশমী ও বাসন্তী মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে।

পুরো জায়গাটি জুড়েই একটা শীতল পরিবেশ বিরাজ করে গাছের ডালপালা আর পত্ররাজির ছায়ার জন্য। ভরদুপুরেও গা ছমছমে একটা অনুভূতি হয়। এখানে গেলে প্রকৃতিপ্রেমীরা প্রকৃতির পূর্ণ স্বাদ পাবে। নাম না জানা বিভিন্ন পাখির কলতান, পোকার ডাক শোনা যাবে সারা দিন জুড়েই৷

ঝুড়ি; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

বর্তমানে দুইটি গাছ নিয়ে স্থানীয় মানুষের মনে বেশ কিছু বিশ্বাস প্রচলিত আছে। সাধারণত এরকম শতবর্ষী যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রেই যে ধরনের লোক কথা কিংবা আরবান লেজেন্ডস প্রচলিত থাকে। সেই লোককথা অনুযায়ী পাকুড় গাছকে পুরুষ এবং বট গাছকে নারী বিবেচনা করে সনাতন ধর্মানুসারে গাছ দুইটির বিয়ে দিয়েছিল দেবীদ্বার বংশের সেই সদস্যরা। তবে আমার কাছে বরং বিপরীতটা মনে হয়েছিল৷ বটগাছটিকে ভেবেছিলাম পুরুষ আর পাকুড়-গাছ মহিলা।

সেই সময়ে সব ধরনের ধর্মীয় নিয়ম মেনে দেবীদ্বার বংশের পূর্বপুরুষেরা ঢাকঢোল, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিবাহের উপকরণসহ ব্রাহ্মণ দ্বারা বৈদিক মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে বট ও পাকুড় গাছ দুটোর বিবাহ সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি বহু লোকের খাবারেরও আয়োজন করেছিলেন তারা। তাই স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয়রা এই বৃক্ষদ্বয়কে স্বামী-স্ত্রী বলে অভিহিত করেন।

বট পাকুড়ের সঙ্গমস্থল; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

অনেকে মনে করে, এই গাছ দুটোর ডাল কাটলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পুজো দেওয়া ছাড়া আর সেই অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করা যায় না। তাই স্থানীয়দের কেউ গাছের ডাল কাটে না। ব্যাপারটা সত্য হোক, আর মিথ্যা- এই ভাবনার কারণেই হয়তো গাছ দুটো এতটা ছড়িয়ে দিতে পেরেছে নিজেদের৷

বিভিন্ন রকম ভৌতিক ঘটনার প্রচলন থাকায় রাতের বেলা কেউ সাধারণত এই গাছের কাছে যায় না। এমনকি গাছের নীচ দিয়ে যাওয়া রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যান রাস্তাটিকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যান, যাতে গাছের কোনো ডাল কাটতে না হয়।

লোকমুখে জানা যায় যে, একবার এই বট-পাকুড়-গাছের নিচ দিয়ে ইট-ভর্তি একটি ট্রাক যাওয়ার সময় গাছের ডালের সঙ্গে আটকে যায়। এসময় ওই ট্রাক-চালক বটগাছের ডালটি কাটলে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে প্রবীণ ব্যক্তিদের পরামর্শে বটগাছের নিচে কয়েক কেজি বাতাসা আর মোমবাতি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে ট্রাক-চালক সুস্থ হন।

পাঁচ শত বছরের পুরনো এই গাছ যুগল; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

এছাড়াও কার্তিক সরকার নামে এক কৃষকের জমিতে বটগাছের ডাল ছড়িয়ে পড়লে তিনি ডালটি কেটে দেন, এরপরও ঘটে একই ঘটনা। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ওই বটগাছের নিচে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে পূজা-অর্চনা করতে থাকেন। এ রকমই অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে এই বট-পাকুড়-গাছ নিয়ে। এরপর থেকে ভয়ে এলাকার আর কেউ ওই গাছের ডালপালা কাটেনি।

আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন অবশ্য এসব জানতাম না। বড় গাছের কান্ডে পা ঝুলিয়ে বই পড়ার স্বভাবটা আজকের নয়। অনেক আগে থেকেই নিরিবিলি জায়গায় বসে বই পড়ার স্বভাব আমার৷ বই পড়তে পড়তে বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আপনমনেই হেসে ওঠা, কেঁদে ফেলা, রেগে যাওয়া, মন খারাপ করা- এসবও অতি পুরনো অভ্যেস। তাই বট আর পাকুড় গাছের সঙ্গমস্থলে বসে পড়েছিলাম বই হাতে। পরে অবশ্য মনে হয়েছিল, খুব যে বসে বসে বই পড়েছি, আমার কি কোনো ক্ষতি হবে? প্রায় মাসখানেক পেরিয়ে গেলেও অবশ্য কোনো ক্ষতি হয়নি আমার।

বট ফল; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ষাইট্টা বটগাছের নীচে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে যেতে চাইলে মানিকগঞ্জগামী বাসে চড়ে ঢুলিভিটা নামক স্থানে আসতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা ভাড়া লাগবে। তারপর ঢুলিভিটা থেকে ৫ টাকা অটো ভাড়ায় ধামরাই বাজার। সেখান থেকে যাদবপুর ইউনিয়নের ষাইট্টা গ্রামে যাওয়ার অটোরিকশা ভাড়া পাবেন। অটো রিজার্ভ নিতে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা লাগতে পারে।

এছাড়াও ঢাকার গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে জনসেবা বা এস.বি. লিংক মিনিবাসে চড়ে মহিষাশী বাজার আসুন। জনপ্রতি ভাড়া লাগবে ৫০ থেকে ৭০ টাকা। মহিষাশী বাজার থেকে কুশুরা আসতে ৫ টাকা সিএনজি ভাড়া লাগে। আর কুশরা থেকে ষাইট্টা যেতে ২০ টাকা ভ্যান ভাড়া লাগে। ভ্যান বা অটোচালককে বললেই চলবে, “বট গাছ” যাব।

ষাইট্টা গ্রামের প্রাকৃতিক দৃশ্য; image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

বাইক/সাইকেল/নিজস্ব গাড়ি থাকলে এই পথে বেশি সুবিধা হবে। তবে স্থানীয়দের সাহায্য ছাড়া জায়গাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না রাস্তা থেকে। এমনিতে স্থানীয়রা খুবই অমায়িক। যে কাউকে বললেই পথ দেখিয়ে যেবে৷

সতর্কতা

বট পাকুড়ের এই মিলনস্থল কিন্তু কোনো দর্শনীয় স্থান নয়। স্থানীয়দের অসুবিধা হয় এমন কিছু করবেন না। যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। গাছের গায়ে প্রচুর নামের অক্ষর খোদাই করা দেখেছি, দয়া করে এই কাজটি করবেন না। নিজের নাম সবাইকে জানাতে চাইলে এমন কোনো ভালো কাজ করুন, যাতে সবাই মনে রাখে।

Feature image source : তাসমিয়া তাবাসসুম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আগ্রার সেরা কয়েকটি নিদর্শন

দীননাথ চক্রবর্তীর গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির আদ্যোপান্ত