চুড়ির শহর জয়পুর!

জয়পুরের হোটেল আল মদিনার বিশেষ আর মনের মতো খাবারের উপহারে মনের স্বাদ মিটিয়ে খেয়ে বেরিয়েছি। যেহেতু আমাদের তেমন কোনো তাড়া নেই তাই সবাই মিলেই হেঁটে হেঁটে জয়পুর শহরে প্রাচীন বাড়িঘর, অলিগলি আর পুরনো দোকান পাট দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। যে পথে এসেছিলাম তার ঠিক উল্টো পথে। কারণ এত প্রাচীন একটা শহরের কীই বা দেখতে পেরেছি মাত্র এক বেলাতে? তাই যতটা পারি একটু দেখে নেই রাত নামার আগে, আলোর ঝলকানিতে আসল শহর ঢেকে যাবার পূর্বে।

আমি দেখেছি আজকাল কোনো শহরই তার আসল রূপটা মেলে ধরতে পারে না, রাতের নানা রঙের আলোর রোশনাই আর জাঁকজমকে ঝলকানিতে, নানা রকম উদযাপন আর উদ্দীপনাতে। শহরগুলো তার রূপ হারিয়ে ফেলে নানা রকম সাময়িক মেকআপের আড়ালে। তাই রাতের রূপে কোনো কিছু দেখার চেয়ে দিনের আলোতে দেখতে পারাটা অনেক বেশি প্রাকৃতিক আর সত্যিকারের অবস্থাটা উপলব্ধি করার জন্য আদর্শ। এখানেও ঠিক তাই হয়েছিল আমাদের। আমরা দিনের আলোতে দেখেছিলাম এক অন্য রকম জয়পুরের প্রাচীন, লোকজ আর প্রাকৃতিক পরিবেশ আর পরিস্থিতির জয়পুর শহরকে। যেটা সন্ধ্যা নামলে, রাতের আলো জ্বলে উঠলে কিছুতেই দেখা যেত না, বোঝা যেত না, যেত না উপলব্ধি করা।

চুড়ির শহরে… ছবিঃ লেখক

হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এগোতেই ভীষণ অবাক করে দিয়ে আমাদের নজর কাড়লো ঝলমলে আলো ছড়ানো এক সোনালি রঙের দোকান। আসলে দোকানটা সোনালি রঙের নয় বা আলাদা কোনো আলোর ঝলকানি ছিল না সেই দোকানে। তবে যা এমন সোনালি আলোর ঝলকানি দিয়ে যাচ্ছিল তা হলো দোকান ভর্তি সোনালি রঙের নানা রকমের চুড়ির সমারোহ। কোনো দ্বিধা না করেই সেই দোকানে ঢুকে গেলাম সবাই।

মাঝারি ধরনের একটি দোকান। যে দোকানের পুরোটা জুড়েই নানা রকম চুড়ি সাজানো রয়েছে দেয়ালে দেয়ালে, মেঝেতে, ব্যাগে, বস্তাতে। বেশ অবাক লেগেছে প্রথমে এই দোকান দেখে। দাম করার ইচ্ছা হয়নি কারো। কারণ দেখেই বোঝা গেছে এখানে খুচরা বিক্রি করা হয় না সাধারণত। তাই সেখান থেকে বের হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম।

প্যাকেটিং। ছবিঃ সংগ্রহ

একটু সামনে এগোতেই দেখি আরও একটি চুড়ির দোকান! তার সামনে এগোতেই আরও একটি। তবে এক একটি দোকানে এক এক রকমের চুড়ির আধিক্য বেশি। মানে হলো যে দোকানে যে রকমের চুড়ি আছে, অন্য দোকানে সাধারণত সেই একই রকমের চুড়ি সেভাবে নেই বললেই চলে। এক একটি দোকানে এক এক রকমের, ধরনের আর বর্ণের চুড়ির পসরা সাজিয়ে বসেছে সবাই। আরও সামনে এগোতেই সকল দোকানে শুধু চুড়ি আর চুড়ি। যেদিকে চোখ যায় লাল, নীল, হলুদ, সোনালি রঙের হাজার হাজার চুড়ির সম্ভার। যেন চুড়ির মেলা বসেছে পুরো বাজার জুড়ে।

বর্ণীল চুড়ির সম্ভার। ছবিঃ লেখক

এবার একটু খোঁজ খবর নেয়া শুরু হলো। শুরু হলো একটু দাম দেখা, মান দেখা, ধরন দেখা আর পরখ করে দেখার ইচ্ছা। দাম শুনে তো মাথায় হাত অবাক হয়ে বিস্ময়ে। এক ডজন যে কোনো ধরনের চুড়ির দাম মাত্র ১০০ রুপী সর্বোচ্চ। মানে এর চেয়ে বেশি কেউ কোনো দামই চায়নি। মান, ধরন আর রঙ ভেদে কিছু কিছু চুড়ি ডজন প্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকায়ও অনায়াসে দিয়ে দিচ্ছে বা দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে নিজ থেকেই।

এত এত কম দাম যে প্রথম প্রথম বেশ সন্দেহই হতে শুরু করলো যে আসলেই হাতে দেয়া যাবে তো ওগুলো! ওগুলো কি আসলেই হাতে দেয়ার মতো চুড়ি নাকি শুধুমাত্র দেখার জন্য বা সাজিয়ে রেখে দেয়ার জন্য? কিন্তু না হাতে নিয়ে, পরখ করে, যাচাই করে দেখা গেল যে এগুলো বেশ ভালো মানের আর ডিজাইনের চুড়ি কিন্তু দাম এত কম কেন? সেই খোঁজ নিয়ে জানা গেল আর ঘুরে ঘুরে দেখে দেখে বোঝা গেল যা তা হলো-

মনকাড়া চুড়ি। ছবিঃ সংগ্রহ

এই পুরো চাঁদপোল এলাকাটা হলো চুড়ির এলাকা। নানা রকম চুড়ির সব রকমের প্রাথমিক কাঁচামাল এখানে পাওয়া যায়। এখানেই তৈরি হয় চুড়ির একদম শুরু থেকে শেষ করে প্যাকিং হওয়া পর্যন্ত সকল কাজ। আর এখান থেকেই জয়পুরের নানা প্রান্তসহ ভারতের এমনকি ভারতের বাইরেও যেসব জায়গায় চুড়ির ব্যবহার আছে সেসব জায়গায় চলে যায় জয়পুরের এই চুড়ির নানা রকমের, ধরনের, দামের আর মানের বর্ণীল চুড়ির প্যাকেট।

এমনকি চাইলে কিছু কিছু দোকানে খুচরাও কিনতে পাওয়া যায় চুড়ির নানা রকম আর ধরন নানা রকম দামে। তবে সেই খুচরা বলতে একটি, দুটি বা চারটি করে নয়। ওদের কাছে খুচরা বলতে অন্তত এক ডজন।

রঙ বেরঙের চুড়ি। ছবিঃ সংগ্রহ

এসব দেখে দেখে যতক্ষণে চাঁদপোলের অলিগলিতে ছিলাম, হেঁটেছি, বেড়িয়েছি, দেখেছি আর নানা জায়গায় দাঁড়িয়েছি সব জায়গায় শুধু চুড়ি, চুড়ি আর চুড়ির ঝলমলে, সোনালি, রুপালি আর বর্ণীল আয়োজন দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে। যে সব দোকানের অধিকাংশই মহিলা। যারা চুড়ি আর চুড়ির নানা রকম প্যাকেট তৈরি আর বেচাকেনা করছে। আর সেই দোকানগুলো সাধারণত ওদের বসত বাড়ির সামনের অংশকে দোকানের মতো করে গড়ে তুলেছে নিজেদের প্রাচীন আর পুরনো ব্যবসা ধরে রেখে বর্ণীল চুড়ির কেনাবেচা করে নিজেদের জীবন ধারণ করার জন্য।

চুড়ির বেচাকেনা। মনকাড়া চুড়ি। ছবিঃ সংগ্রহ

এসব দেখে দেখেই মনে হলো যেন কোনো চুড়ির শহরে এসে পড়েছি বুঝি। যেদিকেই যাই, যেখানেই তাকাই শুধু চুড়ি, চুড়ি আর চুড়ি। নানা রকমের, নানা ধরনের, নানা আকারের, ঢঙের, রঙের আর বর্ণের চুড়ির আয়োজন দৃশ্যমান পুরো শহরের সবটুকু জুড়েই।

তাই আমি জয়পুর শহরকে নিজের মতো করে নাম দিয়েছি…

চুড়ির শহর জয়পুর!

ফিচার ইমেজ- staticflickr.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নৈনিতালের রোমাঞ্চিত সকালে

গোমুখ অভিযান: শেষ দেড় কিলোমিটার অথবা জীবন!