বাংলাদেশ ঘুরুন বাজেট ট্রিপে: ৪,৫০০ টাকায় সাজেক ভ্রমণ

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের কোথায় গেলে খুব কম খরচে সৌন্দর্য আর শান্তি পাওয়া যাবে তবে আমি নির্দ্বিধায় বলবো পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে যে সৌন্দর্যের আগুন লেগে আছে তা একবার গেলেই বোধগম্য হয়ে যাবে। সেই অপরিসীম সৌন্দর্যের সাম্রাজ্যে কখন যে হারিয়ে যাবেন সে খবর হয়তো নিতে মনে থাকবে না।

বিশাল পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে অন্যতম জেলা হলো বান্দরবান, খাগড়াছড়ি আর রাঙ্গামাটি। গত লেখায় বান্দরবানের কেওক্রাডং আর নাফাখুম-আমিয়াখুমের বাজেট ট্রিপের গল্প করেছি। লেখার শিরোনাম দেখেই এতক্ষণে বুঝে গেছেন আজকের গল্পের বিষয় সাজেক ভ্রমণ।

খাগড়াছড়ি জেলার বাঘাইঘাট থেকে আরো দক্ষিণে গেলে পাওয়া যাবে মোহনীয় এক পাড়া, নাম সাজেক। পর্যটনের জন্য সাজেকের চেয়ে নিরাপদ জায়গা আমার চোখে পড়ে না। আমার এই লেখায় মূলত তুলে ধরবো কীভাবে কম খরচে সাজেক ভ্রমণ করা যায়। বাজেট ট্রিপের এই সিরিজের লেখাগুলো আপনাকে সাহায্য করবে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার আগে আপনার বাজেটটি গুছিয়ে নিতে। চলুন তাহলে শুরু করা যাক সাজেকে বাজেট ট্রিপের ইতিবৃত্তান্ত।

সাজেক, ছবিঃ লেখক

ইতোমধ্যেই বলেছি সাজেক খাগড়াছড়িতে অবস্থিত। তাই সাজেকের সাথে সাথে ইচ্ছে করলে আপনি খাগড়াছড়িও ঘুরে আসতে পারবেন। সাজেকের ভ্রমণটা শুরু হয় ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে। সায়েদাবাদ থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে প্রচুর বাস ছেড়ে যায়। তবে বাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো সার্ভিস দেয় শান্তি পরিবহন। সায়েদাবাদ থেকে খাগড়াছড়ি ভাড়া ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা। সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা।

চেষ্টা করুন রাতের বাসে উঠে পড়ার। বাসের টিকেট কাটা যাবে শান্তি পরিবহনের বুকিং নাম্বারে (01191213438) ফোন দিয়ে। বাজেট ট্রিপে যদি খরচ বাঁচাতে চান তবে প্রথমেই পিক-সিজনে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিন। সাজেকের পিক-সিজন হলো শীতকাল আর দুই ঈদের ঠিক পরের সময়টা। এই সময়গুলো সাজেকের কটেজ বুকিং দেয়া না থাকলে কটেজ পেতে এত বেশি ঝক্কি পোহাতে হবে যে সাজেক যাওয়ার ইচ্ছেটাই মাটি হয়ে যাবে।

কটেজের বারান্দা থেকে দেখা সাজেক, ছবিঃ লেখক

আর পিক সিজনে সাজেক যদি যেতেই হয় তবে খরচ আর ঝক্কি এড়াতে আগেভাগেই কটেজ আর বাসের টিকেট বুকিং দিয়ে রাখুন। সাজেকের মেঘপুঞ্জি কটেজ সেখানকার সবচেয়ে ভালো কটেজ। কটেজগুলো এমনভাবে নির্বাচন করুন যাতে বারান্দা থেকে খুব ভালো একটা দৃশ্য দেখা যায়। মেঘপুঞ্জির কটেজের জন্য যোগাযোগ করুন ইয়াসিন (01849887972) এর সাথে। ইয়াসিন মেঘপুঞ্জির কটেজগুলোর সার্বিক দেখাশোনা করেন।

নিরিবিলিতে সাজেক যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে রোজার ছুটি। এসময় পুরো সাজেকে পর্যটক থাকে না বললেই চলে। তবে তাই বলে নিরাপত্তা থাকবে না এমনটা ভেবে ভুল করবেন না। সাজেক পাড়ার প্রত্যেকটা মানুষ, হোক সে বাঙালি বা আদিবাসী সবাই প্রচুর ভালো।

সাজেক যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

যাই হোক, ঢাকা থেকে রাতে রওনা দিলে খাগড়াছড়ি পৌঁছে যাবেন সকাল সকাল। বাস স্ট্যান্ড থেকে ৫ টাকা অটো ভাড়া দিয়ে চলে আসুন শাপলা চত্বরে। গ্রুপ যদি ১২ জনের হয় তবে সেখানেই পেয়ে যাবেন চান্দের গাড়ি। যদি দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসেন সাজেক থেকে তবে ভাড়া ৫,০০০-৫,৫০০ টাকা নেবে। আর যদি একরাত সাজেকে থাকতে হয় তবে ভাড়া পড়বে ৭,০০০-৮,০০০ টাকা। যদি গ্রুপ ৪-৫ জনের হয় তবে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন শাপলা চত্বরে। অন্য কোনো গ্রুপ সাজেকের উদ্দেশ্যে যেতে চাইলে তাদের সাথে বোঝাপড়া করে উঠে পড়ুন চান্দের গাড়িতে।

আর যদি অন্য কোনো গ্রুপ না পান তবে সিএনজি ঠিক করুন। দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসলে সিএনজি আসা-যাওয়া ভাড়া পড়বে ২,০০০-২,৫০০ টাকা। আর যদি এক রাত থাকতে হয় তবে ভাড়া পড়বে ৩,৫০০-৪,০০০ টাকা। তবে ব্যক্তিগত অভিমত থাকবে সাজেকে এক রাত থাকার। পরদিন সকালে সাজেকে ঘুম থেকে উঠে কংলাক পাড়া যেতে ভুলবেন না।

হাজাছড়া ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যেতে সময় লাগে তিন ঘণ্টার মতো। মাঝপথে হাজাছড়া ঝর্ণা পড়বে। রাস্তার পাশে চান্দের গাড়ি বা সিএনজি থামিয়ে মিনিট দশেক জল-জঙ্গল দিয়ে পানির ধারা দেখে দেখে হাঁটলেই পেয়ে যাবেন সুন্দর হাজাছড়া ঝর্ণা। সকালের গোসলটাও সেরে নিতে পারেন এই ঝর্ণায়। হাজাছড়া ঝর্ণা থেকে একটু সামনে এগোলেই পড়বে বাঘাইঘাট আর্মি ক্যাম্প। এখানে নাম-পরিচয় লিখিয়ে নিলে সাথে করে তারা একজন এস্কোর্ট মানে আর্মি পার্সন দিয়ে দেবে যাতে রাস্তায় কোনো রকম ঝামেলা না হয়।

এমনিতে খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে কোনো ধরনের ঝামেলা হয় না। তাই সবসময় এস্কোর্টের প্রয়োজনও পড়ে না। বাঘাইঘাট থেকে দেড় ঘণ্টার পথ সাজেক পাড়া। অনেক উঁচু রাস্তা চলে গেছে সাজেক পর্যন্ত। তাই চান্দের গাড়ি বা সিএনজি যেভাবেই যান না কেন সাবধানে চালাতে বলবেন। মোটরসাইকেলেও সাজেক যাওয়া যায়, তবে নিরাপদ নয়। ভাড়া ১,০০০ টাকা।

হাজার ফুট উপরের সাজেক, ছবিঃ লেখক

সাজেকে ইদানিং প্রচুর নতুন কটেজ হচ্ছে। তবে আগেই বলেছিলাম কটেজ নেবেন দেখেশুনে। সাজেকের কটেজের ভাড়া পরিবর্তিত হয় ওয়াশরুমের ধরনের উপর ভিত্তি করে। সাজেকে হাই-কমোড ওয়াশরুম সহ কটেজগুলোর ভাড়া ৩,৫০০ টাকা থেকে শুরু হয় আর নরমাল ওয়াশরুম সহ কটেজগুলোর ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। তবে আপনি যদি অফ সিজনে যান তবে হাই-কমোড ওয়াশরুম সহ কটেজগুলো ২,০০০ টাকায়ও পেয়ে যেতে পারেন।

সাজেকে খাওয়া-দাওয়ার ধরনটা অনেকটাই বান্দরবানের পাহাড়ি ট্রেকে পাওয়া খাওয়া-দাওয়ার মতোই। ডিম, অফুরন্ত ভাত, সবজি আর ডাল দুপুরে এবং রাতে খাওয়া যাবে ১৫০ টাকায়। সকাল বেলার নাস্তা খরচ ৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। সকাল বেলায় খাগড়াছড়ি থেকে রওনা দিলে সাজেক পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ১১টা বেজে যাবে। সেদিন পুরোটা সময় সাজেক পাড়া, হেলিপ্যাড, হ্যাংগিং গার্ডেন আর কফি শপের আশেপাশে ঘুরে কাটান। বিকেল বেলার সূর্যাস্ত দেখুন হেলিপ্যাড থেকে। অসম্ভব সুন্দর এক সূর্যাস্তের দেখা মিলবে সেখানটায়।

পরদিন খুব ভোরে হেলিপ্যাড ছাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান কংলাক পাড়ায়। আপনি চাইলেই আপনার সাথে চান্দের গাড়ি অথবা সিএনজির চালক আসবে। সকাল আটটার ভেতর সাজেক পাড়ায় ফিরে আসুন কারণ সকাল দশটায় ফেরার পথ ধরতে হবে। একমাত্র সকাল দশটায়ই এস্কোর্ট পাওয়া যাবে সাজেক থেকে। আর দেরী করে ফেললে এস্কোর্ট পাওয়া যাবে না। এবং এস্কোর্ট ছাড়া সাজেক থেকে কোনো মোটরচালিত যান বের হতে দেয়া হয় না। তাই সময়ের ব্যাপারে রাখুন সর্তক দৃষ্টি।

হেলিপ্যাড থেকে দেখা, ছবিঃ লেখক

মোটামুটি এই ছিল দুই দিন এক রাতের সাজেক ভ্রমণের পূর্ণ পরিকল্পনা। পাঠকের সুবিধের জন্য জনপ্রতি যাবতীয় খরচাদি নিচে দিয়ে দিলাম।

১. ঢাকা-খাগড়াছড়ি-ঢাকা (শান্তি পরিবহন) = ৫৮০+৫৮০ টাকা
২. খাগড়াছড়ি-সাজেক-খাগড়াছড়ি (চান্দের গাড়ি, ১২ জন) = ৬৭০ টাকা
অথবা, সিএনজি (৫ জন) = ৭০০ টাকা
৩. কটেজ ভাড়া (প্রতি কটেজে তিন জন থাকা যাবে) = ৮৫০ টাকা
৪. খাবার খরচ (৬ বেলা) = ৫০+১৫০+১৫০+৫০+১৫০+১৫০ = ৭০০ টাকা

সাজেকের হ্যাংগিং গার্ডেন, ছবিঃ লেখক

মোট খরচ= ৪,০৮০ বা ৪,১০০ টাকা। মানে মোটামুটি ৪,৫০০ টাকার মধ্যেই খুব সুন্দর করে শেষ হয়ে যাবে আপনার সাজেক ভ্রমণ। সাজেক অত্যন্ত সুন্দর পরিষ্কার এক পাড়ার নাম। সাজেকের স্থানীয়দের পাশাপাশি আমাদেরও কিন্তু দায়িত্ব সাজেককে পরিষ্কার রাখার। তাই নিজেদের ফেলে দেয়া ময়লা-আবর্জনা কুড়িয়ে যথাস্থানে ফেলতে দ্বিধাবোধ করবেন না। দেশটাকে সুন্দর রাখার দায়িত্ব যে এ যুগের পর্যটকদের ঘাড়েই বর্তায়। ভ্রমণ হোক সুন্দর, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ।

ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দিনে দিনে ঘুরে আসুন ফুলের রাজধানী গদখালি থেকে

হংকং ভ্রমণ: কোথায় থাকবেন? কেন থাকবেন?