প্রাণী রাজ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একদিন

কক্সবাজার কেউ বেড়াতে আসলে মূলত সমুদ্র সৈকত বা সেন্টমার্টিন দ্বীপ দেখতে আসে। আর এসব দেখার পর যদি হাতে অল্প কিছু সময় থাকে তাহলে আশেপাশের কোনো এক জায়গায় বেড়াতে গিয়েই ভ্রমণের ইতি টানে সকলে।

আজকে আপনাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবো যেটা আপনার কক্সবাজার ভ্রমণে সহায়ক জায়গা হিসেবে থাকবে আর আপনার ভ্রমণকে ষোল আনা সার্থক করবে। বলছিলাম “ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক” এর কথা। আর দেরি না করে চলুন তাহলে ঘুরে আসি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক থেকে।

প্রবেশ মুখ। ছবি : লেখক

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন ডুলাহাজারা নামক স্থানেই এর অবস্থান। গাড়ি থেকে নামতেই ভয় বা অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিশাল আকৃতির যে দুটি হাতি অপেক্ষা করছে আপনাকে স্বাগত জানাতে এগুলো আসল না, ভাস্কর্য। খুশি মনে তাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন।

আসল গন্তব্যের জন্য ভেতরের পাকা রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে একটু গেলেই খুঁজে পাবেন নামের সার্থকতা। মূল পার্কে প্রবেশের আগেই তৈরী করা হয়েছে “বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য”। আর তার পাশেই নারিকেল গাছ সমেত বিশাল মাঠটি রাখা হয়েছে পিকনিকে আসা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে ঢুকে পড়ুন পার্কে। জনপ্রতি টিকেট মূল্য ৫০ টাকা।

প্রথমেই চোখে পড়বে ” বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য “। ছবি: লেখক

মূল পার্কে প্রবেশের সাথে সাথেই দেখতে পাবেন ডাইনোসর, বাঘ ও সিংহের ভাস্কর্য আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। তার একপাশে রয়েছে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র ও প্রকৃতি রক্ষণ কেন্দ্র। আবার অপরপাশে পুরো পার্কটির একটি মানচিত্র, যা আপনি প্রথমেই দেখে নিলে পুরো পার্কটা সহজে আয়ত্তে চলে আসবে আর ঘুরতে কোনো ধরনের অসুবিধা হবে না। না হয় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যেতেে পারেন আগে কখনো না আসলে, কোন না কোন দিকে যাবো।

শিশুদের খেলার জন্য পার্ক। ছবি :লেখক

যাই হোক, প্রাণীদের মধ্যে সর্বপ্রথম আপনার চোখে পড়বে বিরল প্রজাতির কচ্ছপ। ৫/৬ ধরনের কচ্ছপ রয়েছে এখানে। ডানে এবং বামে দুটো পাকা রাস্তা চোখে পড়বে আপনার। বামে যাওয়ার রাস্তা দিয়েই আমরা চলে গিয়েছিলাম সামনের দিকে। সে রাস্তার প্রথমেই দেখা যায় “অজগর” গুটিসুটি হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। আর ফার্মের মুরগী খাবার হয়ে তার চারপাশে ঘুরছে।

বিশ্রাম নিচ্ছে অজগর। ছবি :লেখক

কক্সবাজার জেলা শহর থেকে এ পার্কের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার, আর চকরিয়া থেকে ১০ কিলোমিটার। এবার সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনি দেখতে পাবেন প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত উঁচু-নীচু টিলা, প্রবাহমান ছড়া, হ্রদ, বিচিত্র গর্জনের মতো সুউচ্চ ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক বৃক্ষ, চিরসবুজ বনের জানা-অজানা গাছগাছালি, ফলজ-ভেষজ উদ্ভিদ, লতার অপূর্ব উদ্ভিদের সমাহার ও ঘন আচ্ছাদনে গড়ে উঠেছে সাফারি পার্ক।

গাছপালায় ঘেরা উঁচু-নিচু রাস্তা। ছবি : মোমেন

দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশের স্বাদ পাবেন আপনি। মনে হবে এই বুঝি কিছু একটা বেরিয়ে এলো জঙ্গল থেকে। ঠিকই কোনো বাঁদর বসে থাকতে দেখবেন রাস্তার ধারে। তবে ছায়া ঘেরা পথ, সবুজ বনানী, জানা অজানা গাছের সারি, বানর আর পাখির কিচিরমিচির- সব মিলিয়ে যেন এক অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে এখানে।

কুমির দেখার জন্য তৈরী করা হয়েছে বিশেষ ব্রিজ। ছবি :লেখক

হরিণ, উটপাখি, ময়ুর আর বেশ কিছু পাখির বেষ্টনী চোখে পড়বে এই রাস্তা দিয়েই। তবে এই পাখপাখালিদের কোনো রকম খাবার দিয়ে বা অন্যভাবে বিরক্ত না করাটাই উত্তম। এরপর সোজা হাঁটতে থাকলে আবার দুটো রাস্তা চলে আসবে। এই জায়গায় এসে কর্তৃপক্ষ সুন্দরভাবে দিকনির্দেশনা দিয়ে দিয়েছে কোন পথে গেলে কী কী প্রাণী দেখা যাবে।

অতিথি পাখির লেক। ছবি : লেখক

আপনি বামে গেলে দেখতে পাবেন লামচিতা আর শকুন। আরেকটু সামনে গেলেই নানা রকম জলজ পাখি। এবার দেখার পালা কুমির ও প্রাকৃতিক লেক। তারপরেই হাতির বিচরণ স্থান। সম্প্রতি কুমির দেখার জন্য তার বেষ্টনীর উপরেই তৈরী করা হয়েছে একটি ব্রিজ। এতে নিরাপত্তার মধ্যে থেকেও অনেক কাছ থেকে কুমির দেখার সুযোগ পেয়েছি আমরা।

খাঁচায় বন্দী বাঘ। ছবি : লেখক

আর আপনার মন খারাপ হলেও এই প্রাকৃতিক লেকের পাড়ে অল্প সময় কাটালে মন ভালো হওয়াটা নিশ্চিত। প্রতিবছর শীতকালের ন্যায় এবারো এ লেকে এসেছে অতিথি পাখি। তাদের সারাদিনের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। ঝাঁকে বেঁধে তাদের উড়াউড়ি দেখে নেচে উঠবে আপনার মনও। এই লেক শীতকালের প্রতিক্ষায় থাকে অতিথি পাখিদের বরণ করে নিতে। এ যেন বিশেষভাবে তাদের জন্যই নির্ধারণ করা জায়গা।

বাঘ ভাস্কর্য। ছবি : লেখক

পার্কে প্রাণী দেখার পাশাপাশি দেখবেন পুরোটা জুড়েই রয়েছে ব্যাঙ, বাঘ, সিংহ, অজগর, পাখি সহ নানা রকম জীবজন্তুর ভাস্কর্য। যা এই পার্কে যুক্ত করেছে নতুন সৌন্দর্য রূপে। আবার আপনি যদি হাটঁতে ইচ্ছে না হয় তাহলেও পুরো পার্ক ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে বাসের ব্যবস্থা। ১০০ টাকার বিনিময়ে যে কেউ এ বাসে সেবা নিতে পারে। বাসে করে অতি অল্প সময়ে পুরো পার্কটি ঘুরে দেখা সম্ভব।

ব্যাঙের ভাস্কর্য। ছবি :লেখক

এবার পার্কের আরেকপাশে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ভালুক, বাঘ, সিংহ ও জলহস্তী। যাকে আমরা পুরো পার্কের চৌম্বক অংশ বলতে পারি। বাঘ ও সিংহ দেখার জন্য তৈরী করা হয়েছে দুতলা ওয়াচ টাওয়ার। যেখান থেকে দর্শনার্থীরা এসব প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ দেখতে পাবে। আরেকটু সামনে এগিয়ে গেলেই একেবারে নির্জনে রয়েছে জলহস্তী। এটা পার্কের একেবারে একটি সাইডে।

নানা রকম পাখি। ছবি : লেখক

এতবড় একটা পার্কে কিছুটা সতর্কতাও অবলম্বন করা দরকার। দলবল বেঁধে আসলে আপনার জন্য পুরোটা সময় হবে দুষ্টুমি, খুনসুটি ও উপভোগের। ঝটপট আপনার কক্সবাজার ভ্রমণের ঘোরার তালিকায় যুক্ত করে নিন এই পার্ককে। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যুক্ত হবে নতুন কিছু।

ফিচার ইমেজ : bdquery.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মায়াদ্বীপ: মেঘনার বুকে সবুজে আচ্ছাদিত এক চরের গল্প

ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ৭টি বিশেষ টিপস