থানচি: বান্দরবানের বিস্ময়!

দেশের বেশির ভাগ রোমাঞ্চকর ট্রেকিং ডেস্টিনেশনে যেতে হলে বান্দরবানের থানচি হয়েই যেতে হবে আপনাকে। রেমাক্রি, তিন্দু, নাফাখুম, আমিয়াখুম, সাত ভাইখুম, ভেলাখুম, আলি কদম ছাড়াও থানচি থেকে যতটা গহীনে প্রবেশ করতে থাকবেন, প্রকৃতি আপনাকে বিস্মিত করতে থাকবে ততটাই। আমরা সবাই তাই হয়তো এই গহীন থেকে গহীনে প্রবেশ করাতেই ব্যস্ত থাকি। থানচি গিয়ে যদি সেখানেই কোনো কারণে আপনাকে যাত্রাপথে ক্ষান্তি দিতে হয়, তবে কি খুব হতাশ হবেন? কিংবা থানচি পৌঁছে যদি নাফাখুমে যাওয়ার অনুমতিটুকুও কোনো কারণে না পান, তখন কি শোকে দুঃখে বাকরুদ্ধ হয়ে যাবেন? নাফাখুম যাওয়া হচ্ছে না দেখে আমার অবস্থা অনেকটা তেমনি হয়েছিল যদিও। তবে সেই অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কেন হয়নি, এই লেখায় বলবো সেটাই।
নাফাখুম যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাতের বাসে ঢাকা থেকে বান্দরবান এসেছি আমরা ছয় জন। সকাল ৭টায় বাসস্ট্যান্ডে নেমে পড়লাম সবাই। নাস্তা করে একটু সামনে এগিয়ে থানচির বাসের টিকেট কেটে ফেলি। যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই আপনাকে দেখিয়ে দেবে থানচির বাস কাউন্টার। আমাদের বাস সকাল ১০টায়।
বাস ঠিক ১০টায় ছেড়ে দিলো। এক ঘণ্টা চলার পরই বাস উঠে গেল সরু পাহাড়ি রাস্তায়। থানচি যাওয়ার এই রাস্তাটি এক কথায় অসাধারণ। যেতে যেতে দেখতে পাবেন সারি সারি পাহাড়। সূর্যের আলো পড়ে কোনোটাকে দেখাচ্ছে গাঢ় সবুজ, আবার ছায়ায় ঢেকে থাকা অনেকগুলো পাহাড়কে দেখাচ্ছে হালকা নীল। আপনি যদি পাহাড়প্রেমী হয়ে থাকেন, তবে পাহাড়ের এই ভয়ঙ্কর রূপ আর বিশালতা আপনাকে ভীষণভাবে বিমোহিত, উন্মাতাল করে তুলবে!
বাস চলতে চলতে মিলনছড়ি চেকপোস্টে দশ মিনিটের একটা বিরতি নেবে। এই সময় কোনোভাবেই বাসের ভেতরে বসে থাকবেন না। নেমে সামনে তাকালেই আপনি নিঃসন্দেহে দেখে ফেলবেন স্বর্গের এক ঝলক! দূরে দুই সারি পাহাড়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে যাচ্ছে সাঙ্গুর সূক্ষ্ম চিকন রুপালি জলধারা। আকাশে আছে মেঘ। আর আপনার দৃষ্টি সীমানার পুরোটা জুড়েই থাকবে শত শত ছোট বড় পাহাড়। মিলনছড়ির এই রূপকে নিশ্চিতভাবেই পার্থিব কোনো দৃশ্য হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হবে আপনার!

কুটিরের সামনের ভিউ, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

পাহাড় দেখতে দেখতেই বাকিটা সময় কেটে গেল। দুপুর ২টায় আমরা থানচি পৌঁছে গেলাম। উঠলাম থানচি কুটিরে। রুমে ব্যাগ রেখে কুটিরের সামনের খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে দেখে নিলাম চারপাশ। কুটিরটা ছোটখাটো একটা টিলার ওপরে তৈরি করা হয়েছে। এখান থেকে তাই বেশ ভালো একটা ভিউ পাওয়া যায়। একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে একটা পাহাড়। আর মাথার ওপর আকাশটাও দেখা যায় ভালোমতোই।
দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম থানচি বাজারে। নাফাখুমের উদ্দেশ্যে পরদিন ভোরে রওনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি সবাই।
রাতে কুটিরের খোলা জায়গাটায় বারবিকিউয়ের ব্যবস্থা করে ফেললাম। শীতকাল হওয়ায় পুরু কুয়াশার চাদর এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। শীত শীত একটা ভাবও চলে এসেছে। এমন পরিবেশে বারবিকিউয়ের যোগাড়যন্ত্র বেশ জমে উঠলো। পাহাড়ি মোরগের স্বাদটাও ভালোই, শুধু মাংসটা খানিকটা শক্ত ধরনের। অনেকটা মাংস আমরা পুড়িয়েই ফেলেছিলাম! তবে খেতে খারাপ লাগেনি একদমই!
নাফাখুমে যাওয়ার জন্য আমরা মাঝির সাথে কথাও বলে রেখেছিলাম সন্ধ্যার দিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তখনই জেনে গেলাম যাওয়া হচ্ছে না সকালে। থানচিতে পরের দিনটাও থেকে যেতে হবে।
থেকে যখন যেতেই হবে, তখন থানচির চারপাশটাই ঘুরে দেখবো বলে ঠিক করলাম সবাই। সকালে নৌকা আমাদের নিয়ে যাবে বড় পাথর পর্যন্ত। এরপর ফিরে এসে চাঁদের গাড়িতে ঘুরবো। রাতে এখানেই থেকে পরদিন চলে যাবো বান্দরবান শহরে।
থানচি ঘাট, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

সকালে উঠে থানায় নিজেদের নাম লিখিয়ে ছবি তুলে নৌকায় চড়ে বসলাম ছয় জন। পানি কম থাকায় এক নৌকাতেই বসতে পেরেছিলাম আমরা। বড় পাথর পর্যন্ত দুই ঘণ্টার এই নৌকাভ্রমণটি আপনি বেশ উপভোগ করবেন। স্বচ্ছ পানির নিচে দেখতে পাবেন অসংখ্য ছোট বড় পাথর। দুই পাশে পাহাড় তো থাকছেই। স্থানীয়দের জীবনযাত্রার কিছুটাও নৌকা থেকেই আপনার চোখে পড়বে। নদীতে পানি যেখানে কম, সেখানে নেমে নৌকা কিছুটা ঠেলতেও হবে আপনাকে।
নৌকা চলছে, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

দুই ঘণ্টার মধ্যেই আমরা চলে এলাম বড় পাথর। তার আগে পথে পড়েছিল কুমারি নামের একটা ছোট ঝর্ণা। ঝর্ণায় পানি তখন একদমই ছিল না।
সাঙ্গুর বুকে নৌকা, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

বড় পাথর জায়গাটায় বিশাল বিশাল বিভিন্ন আকৃতির পাথর চোখে পড়বে আপনার।
বড় পাথর, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

উঁচু পাহাড় থেকে ভেঙে নদীর পানিতে ভেসে পাথরের টুকরোগুলো এখানে এসে জমা হয়েছে। বড় পাথর অনেক বড় একটা পাথরের টুকরো হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা একে পূজো করে। এই পাথরের নামানুসারেই জায়গাটার নাম হয়েছে বড় পাথর।
বড় পাথরে আমরা, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

এখান থেকে আবার ফিরে গেলাম থানচি কুটিরে। দুপুরের খাবার খেয়ে উঠে পড়লাম চাঁদের গাড়িতে।
সামনেই উঁচু পাহাড়, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

কুটিরের ম্যানেজার রাসেল ভাই পাহাড়ের ওপরে আদিবাসীদের একটা পাড়া দেখাতে নিয়ে যেতে চান আমাদের, যেখান থেকে খুব ভালোভাবে সূর্যাস্ত দেখা যায়। তাকেও নিয়ে নিলাম সাথে।
সেই নাম না জানা পাড়ার এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছি, ছবিঃ ফারজানা তাসনিম

জায়গাটা সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত হলেও চাঁদের গাড়ি নিয়ে ঢুকে যেতে পারবেন। তবে ঢোকার পাঁচ মিনিট পরই নেমে গিয়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরে আধ ঘণ্টা উপরের দিকে উঠতে হবে আপনাকে। তেমন কষ্টকর কিছু নয়, উঠে যেতে পারবেন সহজেই।
পাড়ার পেছনের দিক, ছবিঃ লেখক

পাড়ায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গেলাম সবাই! আদিগন্ত বিস্তৃত নীলাভ-সবুজ পাহাড় দেখতে পাবেন আপনি। পাহাড়ে ঘেরা জায়গায় পাহাড়ই দেখবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটা জায়গারই আলাদা একটা বিশেষত্ব থাকে। এখানেও তার ব্যতয় ঘটেনি। প্রতিবারই পাহাড়গুলো নতুনভাবে ধরা দিচ্ছিল আমাদের চোখে। পাড়ায় দাঁড়িয়ে উপর থেকে নিচে তাকালে পাহাড়ি গ্রামগুলোর যে দৃশ্য আপনি দেখবেন, সেটা পাকাপাকিভাবে পাহাড়ের বাসিন্দা হয়ে যাওয়ার জন্য আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবেই!
পাড়াটার খবর বাইরের জগতের কাছে সেভাবে ছড়ায়নি, তাই এর নামটাও জানা হয়নি। রাসেল ভাইও বলতে পারেননি। পাড়ায় যারা থাকেন তাদের সাথেও কথা বলতে পারিনি আমরা।
এখান থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই সম্পূর্ণ টিনের তৈরি তিন তালা একটি গির্জা দেখতে পাবেন। দেখার মতোই একটা স্থাপনা এটা।
পাহাড়ে সূর্যাস্ত! ছবিঃ রাগীব রহমান

আরো কিছুক্ষণ এখানে থেকে মুগ্ধতা মেশানো সূর্যাস্ত দেখে ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। কুটিরের উঠোনে শুয়ে পূর্ণিমার চাঁদ আর তারাভরা আকাশ দেখেই রাতটা কাটিয়ে দিয়েছিলাম। পরদিন সকালে চাঁদের গাড়িতে করে চলে এলাম বান্দরবান শহরে। নাফাখুম যেতে না পারার আফসোসটা কাজ করেনি আর একটুও।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে রাতের বাসে বান্দরবান। থানচি কাউন্টার থেকে বাসে করে অথবা চাঁদের গাড়িতে করে থানচি।

খুঁটিনাটি:

কিছুদিন আগেও পার্বত্য এলাকায় ভারি বর্ষণ হয়েছে। যাওয়ার আগে আবহাওয়ার খোঁজ নিয়ে যাবেন।
বান্দরবান থেকে থানচির বাস ছেড়ে যায় সকাল ৭টায় এবং ১০টায়। থানচি থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় দুপুর ৩টায়। ভাড়া ২০০ টাকা।
চাঁদের গাড়িতে ভাড়া নির্ভর করবে সময় এবং আপনার দামাদামি করার দক্ষতার উপর। আমরা ৪,৫০০ টাকায় গাড়ি পেয়েছিলাম। তবে ভাড়া কোনভাবেই ৬,০০০ টাকার বেশি নয়।
থানচি কুটিরের প্রতি রুমের ভাড়া সময়ভেদে ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা। এক রুমে তিন জন থাকতে পারবেন।
দুই দিনে আমাদের প্রতেক্যের তিন বেলার খাবারের খরচ পড়েছিল ৬০০ টাকা।
বড় পাথর পর্যন্ত নৌকা ভাড়া নিয়েছিল ৩,০০০ টাকা। নৌকার মাঝি মিজান ভাই (০১৫৫৩৬৭৫৬৬২) অনেক সাহায্য করেছেন পুরোটা সময়।
আইডি কার্ড অবশ্যই সাথে রাখবেন।
থানচি গেলে নীল দিগন্ত এবং অবশ্যই থানচি-আলি কদম সড়কে যেতে ভুলবেন না। ৩৩ কিমি. দীর্ঘ ২৫০০ ফুট উঁচু এই সড়কের দুই পাশেই দেখতে পাবেন পাহাড়ের সারি। সেই সাথে দেখতে পাবেন ডিম পাহাড়। থানচি থেকে বাইক নিয়ে যেতে পারেন। প্রতি বাইক ৬০০ টাকা, দুই জন বসতে পারবেন।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন অবশ্যই।
ফিচার ইমেজ- ফারজানা তাসনিম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বন্দরনগরী দার এস সালামে একদিন

সুখী দেশ ভুটানের পথে