পাহাড়িকন্যা বান্দরবানের বুকে পাঁচদিনের বাজেট ট্যুর

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পাহাড়ি কন্যা বান্দরবান জেলাটি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য একপ্রকার স্বর্গরাজ্য বলা যায়। বান্দরবানের সবটা ঘোরা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং খরচসাপেক্ষ। এখনো প্রতিনিয়ত এখানে আবিষ্কার হচ্ছে নানা দর্শনীয় স্থান। আজ এই বান্দরবানে ৫ দিনের বিশাল ট্যুরের খুঁটিনাটি বিশদভাবে লিখব।

মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স; Source: adarbepari.com

দিন-১: ঢাকা-বান্দরবন-মেঘলা-নীলাচল

ঢাকার টিটিপাড়া, গাবতলী, ফকিরাপুল, কমলাপুর, কলাবাগান, সায়েদাবাদ কাউন্টার থেকে ইউনিক, শ্যামলী, সৌদিয়া, এস আলম, ডলফিন বাসগুলো বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। রাত ১০-১১টার মধ্যে বাসে উঠলে ভোরের মধ্যে বান্দরবান পৌঁছে যাবেন। ভাড়া ৫৫০ টাকা (ননএসি)। এসি ৯৫০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে যেতে চাইলে শহরের বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোকাল বাস ছেড়ে যায়। ভাড়া ১১০ টাকা। 

মেঘলা

বান্দরবান শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পূর্বে মেঘলার অবস্থান। সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন মেঘলাতে নামিয়ে দেয়। এখানে রয়েছে চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, সাফারি পার্ক, প্যাডেল বোট, ক্যাবল কার আর চা বাগান। পাহাড়ের চূড়া থেকে বান্দরবানের ঢেউ খেলানো দৃশ্য, লেকের স্বচ্ছ পানি আর সবুজ প্রকৃতি, সবমিলে অদ্ভুত সুন্দর একটা সময় কাটবে।

★ মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে প্রবেশমূল্য= ৫০/-
★ ক্যাবল কার= ৪০/-

নীলাচল; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

মেঘলা-বান্দরবান শহর-নীলাচল

মেঘলা থেকে সিএনজিতে করে চলে যাবেন বান্দরবান শহরে। বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড থেকে ট্রাফিক মোড় পর্যন্ত অনেক হোটেল রয়েছে। মোটামুটি মানের হোটেলগুলোর ভাড়া রুমপ্রতি ৮০০-১,০০০ টাকা। চারজন থাকা যাবে এক রুমে। হোটেলে ব্যাগপত্র রেখে ফ্রেশ হয়ে বাসস্ট্যান্ড থেকেই কোনো হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে নেবেন।

বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি ভাড়া করতে হবে নীলাচল যাওয়ার জন্য। নীলাচলে সূর্যাস্ত দেখাটা আপনার ট্রাভেলিং বাকেট লিস্টে থাকা উচিত অবশ্যই। সুউচ্চ পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। 

★ সিএনজি ভাড়া= ৫৫০/- (যাওয়া আসা)
★ পার্কিং= ৩০/- 
★ প্রবেশমূল্য জনপ্রতি= ৫০/-

স্বর্ণমন্দির; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

দিন-২: স্বর্ণমন্দির-রামজাদী মন্দির, শৈলপ্রপাত-চিম্বুক পাহাড়-নীলগিরি

সকালে উঠে হালকা নাস্তা করে বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজি ভাড়া করতে হবে স্বর্ণমন্দির ও রামজাদী মন্দিরের উদ্দেশ্যে। এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো মন্দিরেই হাফপ্যান্ট বা থ্রি কোয়াটার প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় ঢুকতে দেয় না। দুপুরের মধ্যে হোটেলে চলে আসুন।

★ সিএনজি ভাড়া= ৬০০/- (যাওয়া আসা)
★ স্বর্ণমন্দিরে প্রবেশ মূল্য= ৫০/-
★ স্বর্ণমন্দিরে জুতা সংরক্ষণ= ৫/-
★ রামজাদী মন্দিরে প্রবেশ মূল্য= ৩০/-

রামজাদী মন্দির; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

দুপুরের খাবার খেয়ে নীলগিরির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। বান্দরবান শহর থেকে বাস, সিএনজি, জীপ অথবা চাঁদের গাড়িতে করে নীলগিরি যাওয়া যায়। তবে নীলগিরির আসল রূপ অনুভব করার জন্য চাঁদের গাড়িতে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে সংখ্যায় কম হলে সিএনজি কিংবা বাসে করেও যেতে পারেন।

নীলগিরিকে বলা হয় বাংলার দার্জিলিং। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত নীলগিরি দেশের অন্যতম সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র। মেঘ ধরতে পারার এই অনাবিল অনুভূতি দেশের আর কোথাও পাওয়া যায় বলে আমার জানা নেই। নীলগিরি যাবার পথেই শৈলপ্রপাত আর চিম্বুক পাহাড় পড়ে।

★ চাঁদের গাড়ি= ৪,০০০/- 
★ পার্কিং= ৩০০/-
★ নীলগিরিতে প্রবেশ মূল্য= ৬০/-
★ চিম্বুক পাহাড়ে প্রবেশ মূল্য= ২০/-
=> ড্রাইভার দীপাল দাস – 01882905568

চিংড়ী ঝর্ণা; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

দিন-৩: রুমা বাজার-কমলা বাজার-বগালেক

সকালে হোটেল থেকে চেক আউট করে টমটমে করে রুমাবাজার যাওয়ার বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। সেখান থেকে বাসে করে রুমাবাজার। প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় পূবালী, পাহাড়িকা বাস রুমার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। রুমাবাজার নেমেই আগে গাইড ঠিক করতে হয়।

=> গাইড সুমন বড়ুয়া (01828922570), সুমন বড়ুয়া অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও মিশুক লোক।
★ টমটমে ট্রাফিক মোড় টু রুমা বাসস্ট্যান্ড=১০/-
★ রুমাবাজার বাসভাড়া = ১১০/-
★ গাইড খরচ (প্রতিদিন ৬০০/-)= ১,৮০০/- (তিন দিন)

কমলাবাজারের পথে; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

রুমাবাজার-বগালেক 

নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ করতে হয়। প্রত্যয়নপত্র আর ফর্ম গাইড ম্যানেজ করে দেবে। রুমাবাজার থেকে চাঁদের গাড়িতে কমলাবাজার যেতে হবে। এক্ষেত্রে চাঁদের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কমলাবাজার থেকে খাড়া পাহাড়ে ট্রেকিং করে বগালেক পৌঁছাতে হয়। তাই এক্ষেত্রে লাঠি নেয়া আবশ্যক।

পাহাড়ের নিচেই লাঠি ভাড়া দেয়া হয়। বগালেকে কটেজ ভাড়া করে রাতে থাকতে হবে। উল্লেখ্য যে, বগালেক ও কেওক্রাডংয়ে রবি আর টেলিটক ছাড়া অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক নেই।

★ প্রত্যয়ন পত্র এবং ফর্ম= ১০০/-
★ চাঁদের গাড়িতে রুমাবাজার টু কমলাবাজার= ২,৫০০/-
★ কমলাবাজারে বাঁশের লাঠি = ১০/-
★ বগালেকে জনপ্রতি কটেজ ভাড়া= ১৫০/-
★ দুপুরের বা রাতের খাবার-
ভাত, ডাল, ভর্তা, ডিম= ১২০/-
ভাত, ডাল, সবজী, মুরগী= ২০০/-
★ পাহাড়ি কলা= ৫/- (জোড়া)
★ কফি= ১৫/-
★ লিকার চা= ৫/-

বগালেক; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

দিন-৪: বগালেক-কেওক্রাডং

বগালেক থেকে ৫ ঘণ্টার মতো ট্রেকিং করে যেতে হয় কেওক্রাডং। তবে বৃষ্টি পড়লে এই রাস্তা হয়ে ওঠে ভয়ানক পিচ্ছিল। তাই ট্রেকিং শু কিংবা ফ্রিকশন ভালো এমন জুতা পরা আবশ্যক। কেওক্রাডং যাবার পথে পড়বে লতা ঝর্ণা আর চিংড়ি ঝর্ণা। এছাড়াও পড়বে লুংথুং পাড়া যাত্রী ছাউনি এবং পরিষ্কার দার্জিলিং পাড়া। এখানে হেলিপ্যাডে বিকেল ৬টা এবং চূড়ার গোলঘরে রাত ১০টা পর্যন্ত থাকতে পারবেন।

এখানে বলে রাখি, কেওক্রাডং যাবার সময় বগালেকে ব্যাগ হালকা করে নেবেন। যেহেতু সম্পূর্ণ পথটাই ট্রেকিং করে পাহাড়ের উপরে উঠতে হয়। আদিবাসীদের কাছেই আপনার জিনিসপত্রগুলো রেখে যেতে পারবেন স্বাচ্ছন্দ্যে। 

★ কেওক্রাডংয়ে জনপ্রতি কটেজ ভাড়া= ২০০/-
চূড়ার দিকে কটেজ ভাড়া= ৩০০/-
★ গোসলের পানি বালতি প্রতি= ৫০/-
★ দুপুর বা রাতের খাবার-
ভাত, ডাল, ডিম, ভর্তা= ১৩০/-
ভাত, ডাল, সবজী, মুরগী = ২০০/-

কেওক্রাডং-এর পথে; Source: শত্রুঘ্ন অর্পিত 

দিন-৫: কেওক্রাডং-বান্দরবান-ঢাকা

খুব ভোরে কেওক্রাডং পাহাড়ের সূর্যোদয় দেখে রওনা দিন। কেওক্রাডং থেকে বগালেক ফিরতি পথে লাগে ৩ ঘণ্টা। বগালেক থেকে আদিবাসীদের কাছ থেকে আপনার জিনিসপত্র নিয়ে কমলাবাজার চলে আসুন। কমলাবাজার থেকে চাঁদের গাড়িতে করে রুমাবাজার। রুমাবাজার থেকে বাসে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে রাতের বাসে করে ঢাকায়। 

★ কমলাবাজার থেকে রুমাবাজার চাঁদের গাড়ি ভাড়া= ২,৭০০/-
★ রুমাবাজার থেকে বান্দরবান বাস ভাড়া= ১১০/-
★ বান্দরবান থেকে ঢাকা= ৫৫০/- 

কেওক্রাডং পাহাড়; Source: adarbepari.com

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট

★ কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় সব মৌসুমেই ঠাণ্ডা থাকে। তাই গরম কাপড় সাথে রাখুন।
★ রুমা বাজার থেকে বগালেক ও কেওক্রাডং যেতে আর্মি ক্যাম্প, থানা ও লোকাল দোকান সহ মোট ৫ জায়গায় সাইন ইন এবং সাইন আউট করতে হয়।
★ পাহাড়ের ট্রেকিং পথ, তাই যথেষ্ট পরিমাণে পানি ও স্যালাইন সাথে নিন। পাহাড়ে ওঠার সময় যথাসম্ভব হালকা জামাকাপড় পরিধান করুন। 
★ মোট ৫ দিনের বিশাল এই ট্যুরে জনপ্রতি ৫,৫০০-৬,০০০ খরচ হবে। (ঢাকা থেকে)
★ যত্রতত্র ময়লা ফেলা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন এবং অন্যদেরও সর্তক করুন। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না পেলে ব্যাগে সংরক্ষণ করুন।

তথ্যসূত্র: Swarup Bhowmik Antu
ছবি কৃতজ্ঞতা: শত্রুঘ্ন অর্পিত

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ড্রোন ব্যবহারে কিছু সতর্কতা

রিছাং ঝর্ণা: উচ্ছ্বাস ও উৎকণ্ঠা যেখানে হাত ধরে চলে