বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সাঙ্গু নদী আর রিঝুক ঝর্ণার মহামায়া

ততদিনে আমরা বগালেক, চিংড়ি ঝর্ণা ঘুরে রুমায় এসে পৌঁছেছি। রুমায় একরাত থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করি সবাই। সে রাতে আবার জন্মদিনও ছিল আমার। সে গল্প আগের লেখায় বলেছি। তবে জন্মদিন পালনের পাশাপাশি আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সে রাতেই শেষ করে রেখেছিলাম, সেটা হলো রিঝুক ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য ট্রলার ঠিক করা। রুমায় রাতের খাবার খেতে যাওয়ার সময় কথা বলে নিলাম স্থানীয় এক মাঝির সাথে, রিঝুক ঝর্ণা ঘুরিয়ে নিয়ে আমাদের ট্রলার চলবে সাঙ্গু নদীর উপর দিয়ে একদম বান্দরবান সদর পর্যন্ত। ৫,০০০ টাকার কমে কোনোমতেই রাজি করাতে পারছিলাম না মাঝিকে, অতঃপর সেই টাকাতেই ঠিক করলাম ট্রলার। এমনিতে রুমা থেকে হেঁটেও রিঝুকে যাওয়া যায় আবার শুধু রুমা থেকে রিঝুক ঝর্ণায় ট্রলার আসা যাওয়া বাবদ ১,৫০০-২,০০০ টাকায় হয়ে যাবে।

সাঙ্গু এবং আমি, ছবিঃ কাওসার

পরদিন সকালে উঠে গেলাম সবাই ঘুম থেকে। হোটেলের পাশেই খাবার দোকান। ডিম ভাজি, ডাল-সবজি আর পরোটা দিয়ে নাস্তা করে নিলাম সবাই। তারপর আয়েশ করে আস্তে ধীরে সকালের চা-টা খাওয়া হলো সেখানেই বসে, তারাই চায়ের দোকান থেকে আমাদের জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আসলো। সব মিলিয়ে ৬০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল। রুমা থেকে বাসার জন্য হালকা-পাতলা কেনাকাটা করে নিলাম। আমাদের মাঝি রাতে বলেছিল সকাল ৯টায় বের হতে হবে, তাই সেই অনুযায়ী কাপড়-চোপড় গুছিয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে গেলাম পৌনে নয়টায়।
সাঙ্গু, ছবিঃ লেখক

বাজারের ভেতর দিয়ে এ গলি-ও গলি হাঁটতে হাঁটতে ৫ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম ঘাটে, সামনে সাঙ্গু নদী। পুরো বান্দরবান আর মিয়ানমারের এক মাত্র নদী এই সাঙ্গু নদী। পানির রঙ স্বচ্ছ না হলেও সাঙ্গুকে ভালোবেসে ফেললাম প্রথম দেখাতেই। নদীর চারপাশের পরিবেশ এর সৌন্দর্যের মূল কারণ। ব্যাগপত্র নিয়ে উঠে গেলাম ট্রলারে, আর দেরী করা যাবে না। বান্দরবানের এই ট্রলারগুলো সাধারণ ট্রলার থেকে একটু লম্বা আর ভেতরে বসার জায়গার পাশাপাশি নৌকার ছাউনির উপরও বসা যায় আরামসে। বেশ রোদ ছিল সে সময়টায়, তবুও রোদের তোয়াক্কা না করে আমি ছাউনির উপর গিয়েই বসলাম।
ছবিঃ লেখক

ট্রলার চলতে শুরু করে আমাদের। আহা! মৃদু মন্দ বাতাসে বেশ লাগছিল ট্রলারের সেই ভ্রমণ। চারপাশের ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাওয়া পাহাড় আর পাহাড়ের উপর হরেক রকমের গাছপালা সাঙ্গু নদীর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। নদীর দুইধারে তাকালে দেখা যায় পাহাড় পরিষ্কার করে জুম চাষ করছে স্থানীয়রা। এগুলো শুধুই বইয়ের পাতায় পড়েছিলাম, আজ দেখছি। ট্রলার খুব বেশি জোরে চলছে না, নদীরও স্রোত নেই বললেই চলে। তবে সাতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট নিয়েই রিঝুকে যাওয়া উচিত, অন্যথায় বিপদের আশংকা থাকে।
মেঘ, পাহাড়, জল। ছবিঃ লেখক

রুমা থেকে রিঝুক যাওয়ার রাস্তাটা বান্দরবান সদরের রাস্তার ঠিক বিপরীত দিকে। রুমা থেকে খুব বেশি হলে এক থেকে দুই ঘণ্টা লাগবে রিঝুক ঝর্ণায় যেতে। আমরা সাড়ে নয়টায় রওনা দিয়ে সকাল ১১টায় পৌঁছে গেলাম রিঝুকে। বিশাল গর্জনে মোটামুটি উচ্চতা থেকে আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে পিচ্ছিল পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে রিঝুকের প্রতিটি জলকণা। সাঙ্গু নদীর ডান পাশে অবস্থিত এই ঝর্ণার পানির বেগ চিংড়ি ঝর্ণা থেকেও বেশি।
রিঝুক ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

পানির স্রোত বেশি হওয়ায় বেশ কয়েকজন ঝর্ণায় যেতে চাচ্ছিল না। আমার আগে তিন জন চলে গেছে ঝর্ণার ছত্রছায়ায়। ক্যামেরাটা একজনকে দিয়ে আস্তে ধীরে এগোলাম ঝর্ণার দিকে। ঝর্ণার পাথরগুলোয় পৌঁছাতে হলে আগে নদীতে নেমে দশ-বারো কদম হাঁটতে হয় বুক সমান পানিতেই।
পানিতে নামার আগে মনে করেছিলাম নিচে তো পাথর থাকবেই, অনায়াসেই চলে যেতে পারবো ঝর্ণায়। পানিতে নেমে বুঝলাম আমার চিন্তা সম্পূর্ণ ভুল, একদম নরম কাদামাটি ছাড়া পাথরই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাতে একটা বাঁশ ধরিয়ে দিলো এক বন্ধু, সেটা দিয়ে পানির নিচে দেখে নিচ্ছিলাম কোথায় পাথর আছে আর সেই ভাবে পা ফেলছিলাম অতি সাবধানে।
ঝর্ণায় যাওয়া, ছবিঃ জুনায়েদ

অবশেষে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিজেকে আবিষ্কার করি প্রচণ্ড বেগে বুলেটের গতিতে আছড়ে পড়া বিশাল এক ঝর্ণার নিচে। খুব পিচ্ছিল এর প্রতিটি পাথরে উঠে গেলাম আমি, বাকিরা ঘুরে এসেছে আগেই। তবে রিঝুকের বেশি উপরে না ওঠাই শ্রেয়, এত বেগে পানি নিচে পড়ে সেখানে যে পিচ্ছিল পাথরে পা হালকা ফসকালেই একদম নিচে পড়ে যাওয়ার ভালো সম্ভাবনা আছে। আমাদের যাওয়ার কয়েকদিন আগেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু হয় সেখানে। এর মূল কারণ হলো রিঝুকের পানির বেগের কারণে এর ঠিক নিচে তৈরী হয়েছে গভীর এক খাদ যেখানে একবার পড়ে গেলে উঠে আসা খুব কঠিন। এজন্য রিঝুকে উঠে যাওয়া এবং নেমে আসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
স্থানীয় জীবন, ছবিঃ লেখক

রিঝুকে ঘণ্টাখানেক গা ভেজানোর পর নেমে আসলাম ধীরে সুস্থে। আমার দেখা বান্দরবানের অন্যতম সুন্দর ঝর্ণা এটি। ট্রলার একদম ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে আবার চলা শুরু করলো বান্দরবানের পথে। সারাক্ষণ মাচাং এর উপরেই ছিলাম। সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে লাগলো, আকাশটাও মেঘে ঢেকে গেল। দুপুরের দিকে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। ট্রলার দুলতে শুরু করে বৃষ্টির তালে তালে। বৃষ্টির সময়ই কেবল ভেতরে গিয়ে বসলাম, ট্রলার চলছে পুরোদমে।
রিঝুক থেকে ফেরার পথে, ছবিঃ জুনায়েদ

একসময় বৃষ্টি শেষ হয়ে পরিষ্কার আকাশের দেখা মেলে। চারিদিকে পানি থৈ থৈ করছে আর বিকেলের সূর্য সোনালি রঙ ছড়াতে শুরু করেছে নদীর পাড় ঘেঁষে। মেঘ, পাহাড় আর পানির যে অসাধারণ ত্রৈবন্ধন তা সাঙ্গুর উপর দিয়ে না গেলে বোঝা কঠিন। বিশাল পাহাড়ের প্রতিচ্ছবিও সাঙ্গু অনায়াসে ধারণ করে বিনা অভিযোগে।
বিকেলের সাঙ্গু, ছবিঃ লেখক

সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো, চারপাশের লোকালয় দেখে বুঝলাম এসে গেছি শহরের সীমানায়। বান্দরবান সদরের কাছাকাছি একটা জায়গায় মাঝি নামিয়ে দিল আমাদের বিকেল সাড়ে চারটায়। সাথে অভাবনীয় সুন্দর সাঙ্গু ভ্রমণ শেষ হলো একরাশ আনন্দ আর উদ্দীপনা নিয়ে। হোটেল প্যারাডাইসে গিয়ে উঠলাম সবাই। পরদিনের পরিকল্পনা নীলাচল আর নীলগিরি। সকালের নীলগিরি আর গোধূলীর নীলাচলের গল্প নিয়ে আসছি পরের লেখাগুলোতে।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বালিতে বসে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১০ ফাইনাল দেখা

আহসান মঞ্জিল: বাংলার মুসলিম নবাবদের সূতিকাগার