বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সূর্যোদয়ে নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড় ও শৈল প্রপাত

বান্দরবান ট্যুরের চতুর্থ দিন চলছে। ইতোমধ্যে বগালেক, চিংড়ি ঝর্ণা, রিঝুক ঝর্ণা দর্শন করে আমরা ১২ জন এখন বান্দরবান সদরে। ব্রীজের সাথে হোটেল প্যারাডাইসে চার বেডরুমের বিশাল এক রুম নিয়েছি মাত্র ১,৮০০ টাকায়। হোটেলে চেক-ইন করেই সবাই ভালোমতো গোসল করে নিলাম, কয়েকদিন ধরে শুধু ঝর্ণার পানিতেই গোসল সারতে সারতে ভুলেই গিয়েছিলাম বাথরুমের কৃত্রিম পানি বলে কিছু আছে! ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সন্ধ্যার দিকে।

সকালের অপার্থিবতা, ছবিঃ লেখক

ছিমছাম শহর বান্দরবান। পরিষ্কার রাস্তাঘাট আর শীত শীত আমেজে বেশ লাগছিল বান্দরবান শহরকে। সকালে নাকি বৃষ্টি হয়েছিল তাই আরো পরিষ্কার হয়ে গেছে শহরের রাস্তাঘাট। একটা রেস্টুরেন্টে সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। খাওয়া-দাওয়া করে বের হয়ে একটু বাজারের দিকে গেলাম, উদ্দেশ্য আগামীকালের নীলগিরি নীলাচলের জন্য চান্দের গাড়ি ঠিক করা। এক ড্রাইভারকে পেলাম শুধু নীলগিরি যাবে, ভাড়া চাইলো ৪,০০০ টাকা। ২,৭০০ টাকায় ঠিক করে ফেলাম চান্দের গাড়ি। পরদিন ভোর সাড়ে চারটায় চান্দের গাড়ি থাকবে হোটেলের সামনে।
চান্দের গাড়ি থেকে দেখা, ছবিঃ লেখক

পরদিন চারটায় ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরলাম ড্রাইভারের, এসে গেছে সে হোটেলের সামনে। আধ-ঘণ্টার ব্যবধানে তৈরী হয়ে নিলাম সবাই। যেকোনো ট্যুরে এসে এই সকালে উঠে যাওয়াটা খুব দরকার, সারা বছরের মতো ট্যুরে এসেও যদি সকালে ঘুমানো হয় তবে হাতছাড়া হয়ে যাবে সবচেয়ে সুন্দর কিছু মুহূর্ত। আমাদের গাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে প্রচণ্ড গতিতে চলছে, সাথে প্রচণ্ড শীতও পড়েছে সকালে। কুয়াশা আর মেঘের মাঝ বরাবর চলেছি আমরা। মনে হচ্ছিল মেঘের ভেলায় চড়ে বসেছি, এমনি এমনি তো আর চান্দের গাড়ি নাম হয়নি। চারিদিকের অপার্থিবতা ঘিরে রেখেছে পুরো গাড়িটিকে।
মেঘের রাজ্যে, ছবিঃ লেখক

ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে গাড়িখানা। যতই উপরে উঠছে, ততই ভালো লাগছে। তখনো সূর্য ওঠেনি। পূর্ব দিকে একটা লাল আভা উঁকি দিচ্ছে ধীরে ধীরে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িতে বসেই আমরা সাক্ষী হলাম অপূর্ব এক সূর্যোদয়ের। আস্তে আস্তে চারদিকে রক্তিম আভা ছড়িয়ে মেঘের কোল থেকে উঠে এলো সূয্যি মামা। সূর্য ওঠার সময় মেঘের উপর ধীরে ধীরে যে লাল আভা পড়ছিল তা এক কথায় পৃথিবীর বাইরের কোনো দৃশ্যের মতো লাগছিল। মেঘের অনেক উপরে ছিলাম আমরা।
যাওয়ার রাস্তায় মেগের সমুদ্র, ছবিঃ দীপ সেন

বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নীলগিরি। এখানে হেলিপ্যাড থেকে ধরে বাঘা বাঘা সব রিসোর্ট সবই আছে। নীলগিরি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল সাতটা বেজে গেল। টিকেট কাটতে হয় নীলগিরির, ৫০ বা ৭০ টাকার টিকেট ছিল মনে হয়। আর্মি ক্যান্টিন আছে এখানে একটি। দাম একটু বেশি আর সকালে তেহারি ছাড়া তেমন কিছু পাওয়া যায় না। আমরা খাওয়া-দাওয়া পরে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে হেঁটে উঠে গেলাম একদম উপরে।
প্রথম দেখায় নিলগিরি, ছবিঃ দীপ সেন

উপরে উঠেই চারদিকের সুন্দর আগুন দেখে ধাক্কা খেয়ে গেলাম। আমরা এতই উঁচুতে ছিলাম যে গ্রীলে ঘেরা ব্যালকনির মতো একটা জায়গায় দাঁড়ানোর পর মনে হচ্ছিল আমরা মেঘের সমুদ্রে আছি। সাদা শুভ্র মেঘের বিশাল ঢেউ স্থির, শান্ত হয়ে আছে চোখের সামনে। এই সৌন্দর্য লিখে বোঝানো যায় না। চোখের দেখাকেই মনে হয় অপূর্ণ, মনে হয় একটু চোখ বুজে রেকর্ড করে নিই মস্তিষ্কের নিউরনগুলোতে। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ জাগানো এই ভয়ংকর সৌন্দর্য অগ্রাহ্য করা কারো পক্ষে সম্ভব কিনা জানি না, আমার পক্ষে যে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব তা আমি নীলগিরি গিয়েই বুঝেছি।
উপরে আমরা, নিচে মেঘ, ছবিঃ লেখক

আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য খুব সুন্দর করে বসার জায়গা করে দেয়া আছে নীলগিরিতে। এমনিতেই উঁচু জায়গা, আরো উঁচুতে উঠতে গেলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সেখান থেকে প্যানারমিক যে দৃশ্য চোখের সামনে উজাড় হবে তা ফেলে নীলগিরি থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে না। প্রচণ্ড নীল আকাশ, আকাশের নিচে বিশাল প্রান্তর, নিচে মেঘের রাজ্য আর বিস্তর গোল জায়গা করে করা হেলিপ্যাডের মায়ায় পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় বসে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে দিন যত গড়াবে সৌন্দর্য তত কমতে থাকবে, তাই এখানে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় ভোরবেলা।
অকৃত্রিম সৌন্দর্য, ছবিঃ দীপ সেন

নীলগিরি থেকে আমরা ফেরার পথ ধরি সকাল দশটার দিকে। ফিরে আসার আগে আর্মি ক্যান্টিনে তেহারি খেয়ে আসি ১৫০ টাকা দিয়ে। অত ভালো না লাগলেও ক্ষিদে লেগেছিল প্রচুর, তাই আর সদরে নাস্তা না করে এখানেই খেয়ে নিলাম। আবারো সেই আঁকাবাঁকা পথে ফিরে যাওয়া। তবে ততক্ষণে মেঘ সরে গিয়ে বিশাল নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে।
নীলগিরি থেকে দেখা নিচের দৃশ্য, ছবিঃ লেখক

এজন্য যত সকালে সম্ভব তত তাড়াতাড়ি নীলগিরি যাওয়া উচিত, পরে গেলে মেঘ পাওয়া যায় না। নীলগিরি থেকে আসার পথেই পড়বে চিম্বুক পাহাড়। উপর থেকে পুরো বান্দরবানকে দেখা যায় এক নিমেষে। উড়োজাহাজ থেকে নিচে তাকালে যেমন দেখা যায় চিম্বুক থেকে নিচে তাকালে দৃশ্যটা অনেকটা তেমন হয়।
হেলিপ্যাডে যাওয়ার রাস্তা, ছবিঃ লেখক

আসার পথে আমরা আরও দেখলাম শৈলপ্রপাত। শৈল প্রপাত ঝর্ণার জলধারা প্রচণ্ড বেগে বয়ে চলেছে নিচের দিকে। বান্দরবান সদরের খুব কাছেই অবস্থিত এই শৈলপ্রপাত। নীলগিরি থেকে যখন শৈলপ্রপাত আসলাম তখন বুঝে গেলাম সদরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।
শৈল প্রপাত, ছবিঃ দীপ সেন

সদরের আশেপাশে স্বর্ণ মন্দিরও আছে, তবে সেসময় যেকারো প্রবেশ নিষেধ ছিল। তাই সবাই রাত সাড়ে নয়টার ঢাকার বাসের টিকেট কেটে নিয়ে হোটেলে ঢুকে গেলাম চান্দের গাড়ির পাওনা পরিশোধ করে। তবে ঢাকায় যাওয়ার আগে বান্দরবানের আরো দুটো জায়গা ঘোরা বাকি, সেগুলো নিয়ে হাজির হচ্ছি পরের লেখায়।
ফিচার ইমেজ- দীপ সেন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পৃথিবী ঘুরুন ভ্রমণের উপার্জনে

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সূর্যাস্তে নীলাচল ও মেঘলাকথন