বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সূর্যাস্তে নীলাচল ও মেঘলাকথন

বান্দরবানের প্রথম ট্যুরের শেষ দিন আজ। ইতোমধ্যে বগালেক, চিংড়ি ঝর্ণা, রিঝুক ঝর্ণা, নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড় আর শৈলপ্রপাত ঘোরা শেষ। ঢাকা যাওয়ার রাত সাড়ে নয়টার বাসের টিকেট কেটে রেখেছি দুপুরে। দুপুরে হালকা একটু ঘুমিয়ে নিলাম কারণ অনেক সকালে উঠে নীলগিরি যেতে হয়েছে। নীলগিরির সৌন্দর্য এখনো চোখে লেগে আছে, ঘুমের ঘোরেও মনে হয় নীলগিরিতে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। দুপুর বারোটা থেকে দুপুর দুটো পর্যন্ত টানা ঘুম দিয়ে চাঙ্গা হয়ে নিলাম। বিকেলের পরিকল্পনা নীলাচল যাবার।

নীলাচল, ছবিঃ লেখক

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খেতে বের হলাম বন্ধুর সাথে। আশেপাশে হাঁটাহাটি করে বুঝলাম ভালো কোনো জুতসই খাবার হোটেল খোলা নেই, তাই যেটা খোলা আছে সেখানেই বসে পড়লাম। ১২০ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বাজারের দিকে হেঁটে এলাম আর টং দোকানে চা খেয়ে আসলাম। ব্যস্ত বান্দরবানকে অলস ঘুম ঘুম চোখে মোটেই খারাপ লাগছিল না। তবে পরেরবার যখন বান্দরবান এলাম তখন আর খাবার হোটেল খুঁজতে ভুল করলাম না, ব্রীজ থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই ছোট ক্যান্টিনমতো একটি দোকান পড়বে যেখানে ভাত-মাংস মেলে ১০০ টাকারও কমে, আর স্বাদটাও যথেষ্ট ভালো।
মেঘের রাজ্য নীলাচলে, ছবিঃ দীপ সেন

হোটেলে ফিরে এসে রেডি হয়ে নিলাম সবাই। দ্রুত বের হয়ে যেতে হবে নাহলে নীলাচলের সূর্যাস্ত হাতছাড়া হয়ে যাবে। হোটেলের সামনেই ব্রীজ পার হলে চান্দের গাড়ির স্ট্যাণ্ড, তাই গাড়ি পেতে তেমন সমস্যা হয়নি। প্রথমে সিএনজির দিকে নজর পড়ে কারণ আশেপাশের লোকজন বলছিল নীলাচল খুবই কাছে, সিএনজি দিয়ে অনায়াসেই যাওয়া যাবে। তবে সিএনজিতে যেহেতু ১২ জন যাওয়া সম্ভব না তাই চান্দের গাড়ির দিকে মন দিলাম। নীলাচল যাবেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই চান্দের গাড়ির এক ড্রাইভার বললেন যাবেন, ভাড়া ৯০০ টাকা। আমরা ৭০০ টাকা ঠিক করে রওনা দিলাম নীলাচলের উদ্দেশ্যে।
পথে আরেকটি জায়গায় থামাবে, নাম মেঘলা। মেঘলা একটি পার্ক বিশেষ। টিকেট কেটে ঢোকা লাগে এতে। তবে আমাদের সবারই মনে হয়েছে মেঘলায় একটা ঝুলন্ত ব্রীজ ছাড়া আর কিছুই নেই। আছে কয়েকটি কেবল কার, তবে সেগুলোতে কাউকে চড়তে দেখিনি। মেঘলা করা হয়েছে মোটামুটি বড়সড় এলাকা নিয়ে কিন্তু এর বেশিরভাগেই যাওয়া সম্ভব না। দূর থেকে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী আর পাহাড় দেখা ছাড়া উপায় নেই। এমনিতে পরিবার নিয়ে একান্তে সময় কাটাতে চাইলে মেঘলায় যেতে পারেন, তবে নিতান্তই ঘুরতে গেলে পুরোটা ঘুরে আসতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগবে না।
নীলাচলের গোধূলি, ছবিঃ লেখক

মেঘলা থেকে কিছুক্ষণ পরই বের হয়ে আসলাম আমরা। চান্দের গাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে উপরে উঠে যেতে লাগলো। আমি যত ভালো ভালো জায়গায় ঘুরতে গেছি তার প্রায় সবকটিতেই আঁকাবাঁকা রাস্তা পড়বেই, বান্দরবানের রাস্তাগুলো তখন অনেক গতি-অসুস্থতার কারণ হলেও এখন আর তেমন কিছু মনে হয় না। তবে নীলাচলের রাস্তা বান্দরবানের অন্যান্য রাস্তা থেকে অনেক ভালো। অন্ততপক্ষে দুই বছর আগে ভালো দেখেছিলাম, এখন কেমন আছে জানি না। নীলাচল পৌঁছাতে চল্লিশ মিনিটের বেশি লাগলো না। চান্দের গাড়ি থেকে নেমে উপরে উঠে গেলাম তাড়াতাড়ি কারণ সূর্যাস্তের কেবল কয়েক মিনিট বাকি।
বেলাশেষে, ছবিঃ লেখক

সুন্দর সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠার ব্যবস্থা করা আছে নীলাচলে। তার উপরে ঘর বানানো আছে আরো ভালো করে সূর্যাস্ত দেখার জন্য। শুধু সূর্যাস্তই না, নীলাচল থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয়গুলোর মধ্যে একটি। নীলাচল থেকে যে ভয়ংকর সুন্দর সূর্যাস্ত দেখলাম একটু পরেই তার বর্ণনা ঠিক কী উপাধি দিয়ে দেবো আমি জানি না। জানতেও চাই না, শুধু এটুকুই বলবো বেলা শেষে অনিমেষে সারা আকাশে রক্তিমতার তাণ্ডব লাগিয়ে নীলাচলের সূর্য বিদায় নেয় আকাশ থেকে। এমনিতেই সূর্যাস্ত দেখার জন্য প্রচুর ভিড় হয় সেখানে, তবে ঠিক সূর্যাস্তের সময় মৌনতা এমনভাবে বিরাজ করে জায়গাটিতে যেন এই মুহূর্তটির জন্যই নীলাচলের সৃষ্টি।
শেষের শুরু, ছবিঃ লেখক

আমরা যেমন বিভিন্ন সিনেমায় মরুভূমির আকাশে সূর্যাস্ত দেখি নীলাচলের সূর্যাস্ত অনেকটা তেমন। গাঢ় লাল আকাশের মাঝখানে বিশাল এক অগ্নিপিণ্ড সারাদিনের দাবদাহ শেষে বিদায় নিচ্ছে এক পৃথিবী ক্লান্তি নিয়ে। তেপান্তর পার হয়ে এই সূর্য লালিমা ছাড়িয়ে যায় সেই নীলাচলে যেখানে আছে বিভিন্ন জায়গা থেকে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ। এখান থেকেও পুরো বান্দরবান শহরকে দেখা যায় খালি চোখে। ছোট ছোট আলোক বিন্দুর মতো লাগে পুরো বান্দরবানকে। বেশ ভালো লাগে পাখির চোখে পুরো বান্দরবানকে দেখতে, আকাশের তারার ন্যায় টিমটিমে আলোয় প্রজ্বলিত আধো জমকালো আধো সাধারণ বান্দরবান সাহিত্যিক চোখে সবসময়ই অনন্যতার উপমা।
উপর থেকে বান্দরবান, ছবিঃ লেখক

সারাটা জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখলাম। কাঠের সীমানা দেয়া খোলা ব্যালকনির মতো জায়গা থেকে পেছনের সৌন্দর্য সবচেয়ে ভালো উপভোগ করা যায়। বিস্তর পাহাড় আর পাহাড় দেখা যাবে নিচের দিকে তাকালে। নীলাচলের উচ্চতা নেহাত কম না হওয়ায় বাতাস প্রচুর জায়গাটিতে। বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস নীলাচলকে ভালো লাগার পরিমাণকে কয়েকগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমরা অনেকক্ষণ ধরে বসে আড্ডা দিলাম বসার জায়গাগুলোতে। গাছের নিচে বসার সুন্দর জায়গা করা আছে, দশ-বারো জন আরামসে বসে মেতে উঠতে পারবে তারুণ্যের উল্লাসে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামতে শুরু করে নীলাচলের বুকে। সূর্যাস্তের এই মোহনীয় দৃশ্য আমাদের সবাইকে একটা জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে বাধ্য করে।
সবুজের সাম্রাজ্য, ছবিঃ ওয়াহিদুজ্জামান

সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে আমরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। গোধূলীর নেশা তখনো চোখে লেগে আছে। নীলাচল থেকে সিঁড়ি দিয়ে সমতলে নেমে সরাসরি চলে যাই যেখানে গাড়িটি পার্ক করা আছে সে জায়গাটায়। পুরো জায়গাটি অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত দাঁড়ালাম নীলাচলে, উপর থেকে টিম টিম করে জ্বলতে থাকা বান্দরবান শহরের সকল লাইটের জ্বলতে-নিভতে থাকা দেখতে লাগলাম।
সন্ধ্যা নামার কালে, ছবিঃ লেখক

শেষে সবাই গাড়িতে করেই চলে এলাম বান্দরবান সদরে। ড্রাইভারকে আসা-যাওয়া সহ মোট ১,৪০০ টাকা দিয়ে হোটেলে ফিরে গেলাম। হালকা ফ্রেশ হয়ে হোটেলের নিচেই রাতের খাবার খেয়ে সাড়ে নয়টার দিকে উঠে গেলাম বাসে। বাস চলছে আবার আঁকাবাঁকা পথ ধরে, কানে বাজছে বিটলসের ইয়েলো সাবমেরিন। আহা! এই সময়গুলোকে ধরে রাখা যায় না, ভালো সময়গুলো বালিকণার মতো, হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে না। যদি বাক্সবন্দী করে রাখা যেত এই ট্যুরগুলোকে তবে এমন হাজারটা বাক্স কিনতাম আমি। বাস যখন চট্টগ্রাম পার হয়ে গেল, তখন বুকের ভেতরটা জানি কেমন করে উঠল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আবার আসবো ফিরে বান্দরবানের কাছে। আবার আসবো।
ফিচার ইমেজ- ওয়াহিদুজ্জামান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বান্দরবানের স্বপ্নকথন: সূর্যোদয়ে নীলগিরি, চিম্বুক পাহাড় ও শৈল প্রপাত

বিশ্বের দুর্দান্ত কিছু মেট্রোরেল ভ্রমণ