গুঠিয়ায় ২১টি পবিত্র জায়গার মাটি সম্বলিত বাইতুল আমান জামে মসজিদ

স্বরূপকাঠিতে যারাই ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে আসে, তারা সবাই একবার গুঠিয়া মসজিদ ঢুঁ দিয়ে আসেন। তাই আমি ভেবেছিলাম, এটা হয়তো পিরোজপুর জেলার মধ্যে পড়েছে। কিন্তু আমার বরিশাল ভ্রমণ করার পরিকল্পনা তৈরি করার সময় দেখলাম, এটি বরিশাল জেলাতেই, কিন্তু পিরোজপুর থেকে কাছে বলে লোকে ভাসমান পেয়ারা বাজার ঘুরে গুঠিয়া মসজিদ দেখে যায়।

মূল মসজিদ; Source : মাদিহা মৌ

গুঠিয়া মসজিদের নাম কিন্তু বাইতুল আমান জামে মসজিদ। গুঠিয়ায় অবস্থিত বলে লোকমুখে গুঠিয়া মসজিদ হয়ে গিয়েছে। মসজিদটিতে নির্দিষ্ট সময় ছাড়া দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষেধ বলে ঝালকাঠি থেকে তড়িঘড়ি করে রওনা করলাম গুঠিয়ার দিকে।

আট গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির চত্বরে ২০ হাজারের অধিক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন ঈদগাহ ময়দান রয়েছে। চাংগুরিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী এস সরফুদ্দিন আহমেদ ১৬ ডিসেম্বর ২০০৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। মসজিদের উঠোনের একধারে একটি বড় ফলকে লেখা আছে যে, এই মসজিদের স্তম্ভটি বিশ্বের বিভিন্ন পবিত্র স্থানের মাটি ও জমজমের পানি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফলকটিতে যেসব স্থান থেকে মাটি সংগৃহীত হয়েছে সেগুলোর নামের তালিকা ও বিস্তারিত বর্ণনা লেখা হয়েছে।

মহিলাদের নামাজঘর; Source : মাদিহা মৌ

মাটি, পানি ও অন্যান্য জিনিসগুলো যেসব স্থান থেকে সংগৃহীত হয়েছে, তা হলো- পবিত্র কাবা শরীফ, আরাফাহ এর ময়দান, মুযদালিফাহ, ময়দানে মিনা, জাবালে নূর পাহাড়, জাবালে সূর পাহাড়, জাবালে রহমত পাহাড় (নবীজি ও হযরত আবু বকর সিদ্দিকী এই পাহাড়ে লুকিয়েছিলেন) নবীজীর জন্মস্থান, মা হাওয়া এর কবরস্থান, মসজিদে রহমত, মসজিদে কু’বা, ওহুদের যুদ্ধের ময়দান, হযরত হামজা (রাঃ) এর মাজার, মসজিদে আল কিবলাতাইন, মসজিদে হযরত আবু বক্কর (রাঃ), জান্নাতুল বাকী, মসজিদে নববী, জুলহুলাইফা-মিকাত, বড় পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর হাতের লেখা তাবিজ ও মাজারে পাওয়া দুটি পয়সা এবং হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) এর মাজার। মাটি সংগ্রহ করার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে কাজ করেছেন মসজিদটির নির্মাণ কর্তা এস সরফুদ্দিন আহমেদ। এই স্তম্ভের কাছেই আরোও একটি ছোট ফলক আছে।

লম্বা বারান্দা; Source : মাদিহা মৌ

নির্মাণ কর্তার ভাষ্যে ওতে লেখা আছে,

“এখানে একটি পুরাতন মসজিদ ছিলো।
এই মসজিদের জায়গা সংরক্ষণের জন্য এরচেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আমার আর জানা নাই।”

কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশ পথের ডানে বড় পুকুর। পুকুরের ঘাটটিও নিজের চমৎকারত্ব বজায় রেখেছে। পুকুরের পশ্চিম দিকে মসজিদ অবস্থিত। এছাড়া মসজিদটির সীমানার মধ্যে ঈদগাহ ময়দান, এতিমখানা, মহিলাদের নামাজের স্থান, ডাকবাংলো, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা, লেক, বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের বাগান রয়েছে। এর মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৯৩ ফুট। চৌদ্দ একর জমির উপর স্থাপিত এই মসজিদটিতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নতমানের কাঁচ, ফ্রেম, বোস স্পিকার।

ঈদগাহ; Source : মাদিহা মৌ

মসজিদের ভিতরে ঢুকে পুকুর পাড়ে বসতেই প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। এখানে বসেই পুরো মসজিদ দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম, যেহেতু মহিলাদের নামাজের জায়গা আছে, নামাজটা পড়েই নিই। কিন্তু ততক্ষণে মহিলাদের নামাজের ঘর সহ মূল মসজিদের প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। তাই মসজিদের সামনের জায়গাটুকুতেই নামাজ আদায় করে নিলাম।

মসজিদে ঢোকার দরজা; Source : মাদিহা মৌ

প্রবেশের সময়সূচী

দিনে দুই বেলায় মসজিদে দর্শনার্থীদের ঢোকার অনুমতি মেলে। দুপুর ১২টা থেকে ২টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মসজিদ ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি মিলবে। মসজিদটি ঘুরে দেখতে কোনো টিকেট কাটার প্রয়োজন হয় না।

টানা বারান্দার একাংশ; Source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

বরিশাল যাওয়ার দুটি পথ আছে। নৌপথে বা লঞ্চে এবং বাসে বা সড়ক পথে।

ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চগুলো রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সদর ঘাট থেকে ছাড়ে। এর মধ্যে সুন্দর বন ৭/৮, সুরভী ৮, পারাবত ১১, কীর্তনখোলা ১/২ লঞ্চগুলো খুবই ভালো। একেকটি লঞ্চ যেন চার তারকা আবাসিক হোটেল। লঞ্চে ডেক ভাড়া ১৫০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৯০০-১,০০০, ডাবল কেবিন ১,৬০০, ভিআইপি ৪,৫০০ টাকা। লঞ্চগুলো বরিশাল পৌঁছায় ভোর ৫টার দিকে।

শান্ত পুকুরঘাট; Source : মাদিহা মৌ

সড়কপথে ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সময় লাগবে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে বেশ কিছু বাস বরিশালের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বেশিরভাগ বাস পাটুরিয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায়, আবার কিছু কিছু বাস মাওয়া ঘাট অতিক্রম করে বরিশালে যায়। ঢাকা থেকে আগত বাসগুলো বরিশালের নতুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ডে থেমে থাকে।

বাসগুলো হচ্ছে শাকুরা পরিবহন, ঈগল পরিবহন, হানিফ পরিবহন। এগুলোর মধ্যে এসি বাসের ভাড়া ৭০০ টাকা, নন এসি বাসের ভাড়া ৫০০ টাকা, লোকাল বাসের ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। তবে বাসের চেয়ে লঞ্চে বরিশাল গেলেই ভ্রমণ আনন্দদায়ক হবে।

বিশালতা; Source : মাদিহা মৌ

মসজিদটি উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়ার চাংগুরিয়া গ্রামে অবস্থিত। বরিশাল হতে স্বরুপকাঠি যাবার যে কোনো বাসে উঠলেই গুঠিয়া মসজিদের সামনে নামতে পারবেন। এছাড়া বরিশাল সদরের নতুল্লাবাদ এলাকা থেকে মাহেন্দ্র গাড়িতে প্রতিজন ৩০ টাকা ভাড়ায় একেবারে মসজিদের সামনে পৌঁছে যেতে পারবেন। অথবা বরিশাল শহরের নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে বানারীপাড়ার উদ্দেশে ১৫ মিনিট পর পর বাস ছাড়ে। মসজিদে যেতে ভাড়া লাগে ১৫ টাকা।

রাতের গুঠিয়া; Source : বন্ধন

কোথায় থাকবেন

দুর্গাসাগর দীঘির পশ্চিমপাড়ে ঘাট সংলগ্ন স্থানে রয়েছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো। চাঁদনী রাতে দীঘির পাড়ে রাত কাটাতে ইচ্ছা করলে ভ্রমণকারীরা এখানে থাকতে পারেন। এছাড়া আপনি চাইলে বরিশাল ফিরে আসতে পারেন। বরিশালের কাঠপট্টিতে থাকার জন্য বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব হোটেলের রুম ভাড়া ৮০০-২,০০০ টাকার মধ্যে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চর আলেকজান্ডারের পথে

এম. ভি. পারিজাতের অনাবিল যাত্রা