বাগেরহাট ভ্রমণ: চন্দ্রমহলের সৌন্দর্যে একদিন

হুমায়ুন আহমেদ বাংলা সাহিত্যের একটি বিশাল নাম। যারা বই পড়তে ভালোবাসি, তাদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে কিনা হুমায়ুন স্যারের বই পড়েনি। হুমায়ুন আহমেদ স্যার তার লেখার মায়ায় এমনভাবে সবাইকে আবদ্ধ করে ফেলেছিলেন যে তার মৃত্যুর পরে ভক্ত পাঠকেরা নিজেদের সংগঠিত করেছে ‘হিমু পরিবহন’ নামে।
একজন হুমায়ুন ভক্ত হিসেবে আমিও কমবেশি হিমু পরিবহনে যাতায়াত করি। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার আমরা একসাথে মিলে আড্ডা জমাই, বই নিয়ে কথা বলি, নানা সমাজ সচেতনতামূলক কাজের পরিকল্পনা করি। বর্ষার সময় চলছে। আড্ডা দিতে দিতে কথা উঠল, এবার আমরা আনন্দ ভ্রমণে যাব। সবাই মিলে হইহই করে উঠলাম। কোথায় যাওয়া হবে? কোথায় যাওয়া হবে?

যেন তাজমহলের বাংলা সংস্করণ; ছবি: লেখক

সবার কণ্ঠে আগ্রহ ফেটে পড়ছে। নানা জায়গার নাম আসলো। কিন্তু সবশেষে ঠিক হলো আমরা চন্দ্রমহল যাব। বাগেরহাট জেলার রঞ্জিতপুরের নিভৃত পল্লীতে গড়ে উঠেছে এই রিসোর্ট। এর নির্মাতা জনৈক সৈয়দ আমিনুল হুদা সেলিম। তার স্ত্রীর নামে এটির নামকরণ করেন। তাজমহলের বাংলা সংস্করণ আরকি।
একে তো বর্ষাকাল তার উপরে প্রেমের স্থান- এ তো পোয়াবারো। সবাই হইহই করে রাজি হয়ে গেলো। নির্ধারিত দিনে সকল প্রস্তুতি শেষে আমরা রওনা দিলাম বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে। বেশ রোদ বেরিয়েছে। আকাশে মেঘের চিহ্নও নেই। আমরা সকাল সকাল খুলনা থেকে রওনা দিলাম। মূল রাস্তা থেকে ছোট একটি রাস্তা নেমে গেছে চন্দ্রমহলের দিকে। সেই পথ ধরে যাব আমরা।
কাকড়া আর ঝিনুক; ছবি: লেখক

ভেতরে যেতে মুগ্ধ হলাম আমরা। রিসোর্টের একপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বেশ প্রশস্ত খাল। যদিও তাতে পা ভেজানোর চিন্তাও করা গেল না, কারণ তার পানি বেশ কালো। তবে বড় বড় পুকুর আমাদের মন ভালো করে দিলো। পুকুরের মধ্যে তাকিয়ে দেখি মাঝখানে বিশাল এক রাজকীয় নৌকা ভাসছে। যদিও নট নড়ন-চড়ন। মানে ওটা আসলে একটি ঘর যা পুকুরের তলদেশ থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু নৌকার আকৃতিতে।
আরেকটি জিনিস মজা লাগলো। জলের ওপরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা দৈত্যাকৃতির কাঁকড়া আর তার চেয়েও বড় এক ঝিনুক। কপাট হাঁ করে খোলা ঝিনুকের মধ্যে সকালের রোদ লেগে জ্বলজ্বল করছে পাঁচ নম্বর ফুটবলের মতো মস্ত এক মুক্তো। অবশ্য সমস্তটাই কংক্রিটের ভাস্কর্য। আর সবার মাথা ছাড়িয়ে জ্বলজ্বল করছে এক প্রকাণ্ড তাজমহল স্টাইলে বানানো বাড়ি। ওটাই সেই চন্দ্রমহল যেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ সমৃদ্ধ এক সংগ্রহশালা।
পেছনে সেই চন্দ্রমহল আর সংগ্রহশালা; ছবি: অচিন্ত্য আসিফ

সবকিছু দেখারই সময় পাওয়া যাবে আস্তে আস্তে। আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে গেলাম। একটি দ্বিতল ভবন তার নিচতলা উন্মুক্ত, সেখানেই জমায়েত হলাম আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যে চন্দ্রমহলের নির্জনতা ভেসে গেলো সংগীতের মূর্ছনায়। শিল্পী আমাদের সাথে যাওয়া সুপ্ত প্রতিভারা। আমার বন্ধু অচিন্ত্য আসিফ তো গিটারের ঝংকারে সবাইকে নাচিয়ে ছাড়ল। আমি অবশ্য গান-টান জানি না। তাই সবাই যখন বেশি উত্তেজিত হয়ে গেলো, আমি তখন জীবনানন্দ আর আবুল হাসানের কবিতায় সবাইকে শান্ত করে আনলাম।
তারপর আবার শুরু হলো উল্লাস। এবার খেলাধুলা। আগে থেকে ফুটবল নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রথমে চাইলাম শুধু ছেলেরাই ফুটবল খেলব। কিন্তু মেয়েরা আপত্তি জানিয়ে বসল। ছেলে-মেয়ে সমান অধিকার। তাদের খেলায় নিতে হবে। অগত্যা কী করা!
সবাই মিলে ভাগ-যোগেই খেলা হলো।
খেলা চলতে চলতেই এলো ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি। মেঘ নেই! অথচ বৃষ্টি এলো কোথা থেকে? সবাই অবাক। কিন্তু সেই বিস্ময় ভেসে গেল উচ্ছ্বাসে। আমরা সবাই মিলে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। আমি আর অচিন্ত্য আসিফ প্রথমেই সেই রাজকীয় নৌবহরে হানা দিলাম। খানিক পরে অন্যদের চোখে পড়লো বিষয়টা। সবাই সেদিকে সাঁতার দিলো। আমরা নেমে পড়লাম অন্য পাড়ের উদ্দেশ্যে। যখন সবাই মিলে নৌকাকে ঘিরে ধরেছে তখন কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিলো নৌকায় ওঠা যাবে না! আমি আর অচিন্ত্য হেসেই খুন।
ফুটবল খেলার দৃশ্য; ছবি: অচিন্ত্য আসিফ

ঘণ্টাখানেক সাঁতার দিয়ে যখন উঠে আসলাম, দেখি বিখ্যাত আব্বাসের চুই ঝালের মাংসের ডেকচি পৌঁছে গেছে আমাদের সামনে। তা দেখলে কী আর মাথায় অন্য কিছু থাকে? আমরা তখন হাতা গুটিয়ে খেতে বসে গেলাম সেই চুই ঝালের মাংস।
খাওয়াদাওয়া শেষে সবাই মিলে ঢেকুর তুলতে তুলতে চন্দ্রমহল ঘুরতে গেলাম। একটি খাল দিয়ে ঘেরা ভবনটি। যেতে হয় একটি সুড়ঙ্গ দিয়ে। বেশ একটা থ্রিলিং অভিজ্ঞতা। এই সংগ্রহশালায় রয়েছে নানাবিধ দেশের মুদ্রা, বিভিন্ন পোকামাকড়ের সংগ্রহ, প্রাচীন তৈজসপত্র, অস্ত্র প্রভৃতি।
একপাশে দেওয়ালে দেখি একটি বাঘের মাথা। অনেকে উত্তেজনা নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো। আমি দূর থেকে ক্যামেরায় ক্লিক মারলাম। যেভাবে তার গায়ে আলো পড়ে ঝলসে উঠলো, বুঝতে দেরী হলো না প্রকাণ্ড কাঁকড়া, মুক্তোওয়ালা ঝিনুকের মতো এটাও রেপ্লিকা বৈ আর কিছু নয়।
নৌকা আর শঙ্খ; ছবি: লেখক

কীভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে আপনি দুইভাবে বাগেরহাট যেতে পারেন- সরাসরি এবং খুলনা হয়ে। ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যায় অনেকগুলো বাস। সকালের ট্রিপগুলো ছাড়ে সকাল ৬টা থেকে ১০টার মধ্যে। বিকেলের ট্রিপগুলো ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। এসব পরিবহনের মধ্যে রয়েছে- মেঘনা পরিবহন যাদের কাউন্টার যোগাযোগ নাম্বার- ০১৭১৭১৭৩৮৮৫৫৩, পর্যটক পরিবহন যাদের কাউন্টার যোগাযোগ নাম্বার- ০১৭১১১৩১০৭৮।
এছাড়া রয়েছে আরা, বলেশ্বর, হামিম, দোলা প্রভৃতি পরিবহন। গাবতলি বাস টার্মিনাল থেকে পাবেন হানিফ, সোহাগ আর ইগলের মতো গাড়িগুলো। এগুলো আপনাকে পৌঁছে দেবে বাগেরহাট শহরে। সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সহজেই চলে যেতে পারবেন ষাটগম্বুজ মসজিদে। বাকি গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আপনাকে স্থানীয় কারো উপর নির্ভর করতে হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে করে যেতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে নামতে হবে খুলনা রেলস্টেশনে। তারপর সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ড থেকে কিংবা রূপসা ঘাট পার হয়ে বাসে সোজা ষাটগম্বুজ মসজিদ।

গানের আসব; ছবি: লেখক

কোথায় থাকবেন?

খুলনার অন্যতম আধুনিক হোটেল হলো ‘হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনাল’। এটি কেডিএ এভিনিউতে অবস্থিত। ফোন নাম্বার ০৪১-৭২১৬৩৮। এখানে থাকতে হলে ভালোই টাকা খসবে আপনার। সিঙ্গেল রুমের জন্য পড়বে বারোশো টাকা আর ডাবল টুইন রুমের জন্য দুই হাজার টাকা। আরেকটি অভিজাত হোটেলের নাম ‘হোটেল ক্যাসল সালাম’।
সুইমিং পুলবিশিষ্ট এই হোটেলটি হোটেল রয়্যাল ইন্টারন্যাশনালের সামনেই অবস্থিত। ফোন নাম্বার- ০৪১-৭২০১৬০। এখানে থাকতে হলে আপনাকে গুণতে হবে নন এসি সিঙ্গেল: ১,০০০ টকা, এসি স্ট্যান্ডার্ড সিঙ্গেল: ১,৫০০ আর স্ট্যান্ডার্ড কাপল: ১,৮০০ টকা। এছাড়া আছে হোটেল সিটি ইন, হোটেল জেলিকো, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল ইন, হোটেল মিলেনিয়াম প্রভৃতি। কম খরচে থাকতে চাইলে সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালের পাশে অনেকগুলো হোটেল আছে। ফেরিঘাট বাস টার্মিনালের সামনেও কিছু হোটেল রয়েছে।
Feature Image- blogspot.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জলাবদ্ধ যশোরে মেডিকেল ক্যাম্প ২০১৬: মানবতার সেবায় এক অসাধারণ অভিযাত্রা

এক নজরে একটি জেলা: খুলনার আনাচে-কানাচে