বগাকাইন: এক শান্তজলের হ্রদ

সময়টা ২০১৫…

এখনকার মতো তখন এত মানুষ ঘোরাঘুরি করত না। ব্যাঙের ছাতার মতো এত অনলাইন ভিত্তিক ভ্রমণ গ্রুপও ছিল না। হাতে গোনা কয়েকটা গ্রুপ ছিল। সেই গ্রুপগুলো সাধারণত পাহাড়-পর্বতসহ দেশের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়াতে মানুষকে উৎসাহিত করত।

বগালেক পাড়ায় সঙ্গী সাথীরা; ছবি- সৌরভ জামান

পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার প্রথম ভ্রমণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বগালেক-কেওক্রাডং-জাদিপাই এর মাধ্যমে। সে সময় মনে মনে খুঁজছিলাম, কোথাও কয়েকদিনের জন্য ডুব দিয়ে আসা যায় কিনা। এমন সময় ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে হুট করেই নজরে আসে এই রকম এক ইভেন্ট। খুশিতে ডগমগ করতে করতে যত দ্রুত সম্ভব নিজের আসনটি কনফার্ম করি।

মজার ব্যাপার হলো, ঐ ভরা এক বাস মানুষ মানে ৩৬ জন মানুষের কাউকেই আমি তেমন চিনি না। একজন আমার পরিচিত ছিল আগে থেকে। এই যা। এতগুলো অপরিচিত লোকের সাথে ভ্রমণ করতে আমার মোটেও খারাপ লাগেছে না। নতুন মানুষের সাথে মেশার আগ্রহ থেকে হয়তো এমনটা হয়েছিল।

নৌকায় সঙ্গী সাথীদের একাংশ; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

সে যাই হোক, যেহেতু ট্রেকিংয়ের কিছুই বুঝতাম না তাই কী নিতে হবে আর কী নিতে হবে না সেই সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না আমার। যদিও গ্রুপ থেকে বলে দিয়েছিল কী কী লাগবে, কিন্তু বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত না থাকায় তেমন কার্যকর হয়নি আমার জন্য।

পাড়ায় ছেলেপেলের ছোটাছুটি; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

দিন গড়িয়ে দিন যেতে লাগল। আর সেই সাথে আমার অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালের কোরবানির ঈদের পরের দিন রাতে বান্দরবানের দিকে রওনা হই। ট্যুর নিয়ে খুব বেশি উত্তেজিত থাকায় ২ ঘণ্টা আগেই বাস কাউন্টারে গিয়ে বসে থাকি।

সাপের মতো আঁকাবাঁকা পথের মধ্যে ঢুকতেই বুঝলাম বান্দরবান জেলায় প্রবেশ করেছে। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। রাতের আঁধারের ঝাপটা লেগে আছে। ভোর ৪টায় বান্দরবান শহরে নামি।

একটুকর স্বর্গ; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

ভোর হওয়ার জন্য ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষা করে আগে থেকে রিজার্ভ করা বাসে উঠি। তখনো পুরোপুরি অন্ধকার কাটেনি। তার মধ্যে কয়েকজন বাসের ছাদে উঠে বসলো। আমিও তাদের সাথে জুটে গেলাম। হাড় কাঁপানো কনকনে হাওয়া আর বৃষ্টির মতো ঝরছে ভোরের কুয়াশা। এরই মধ্যে গাড়ি ছাড়ার সাথে সাথে হাওয়া যেন রকেটের গতিতে গায়ে লাগতে থাকে। সবাই একবারে গাদাগাদি করে বসেছি যাতে করে ঠাণ্ডা কম লাগে।

একটু একটু করে পূবের আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করে। আর অন্যদিকে আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি। নিজের চোখকে নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। সামনে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে এক টুকরো স্বর্গ। সফেদ সাদা মেঘের চাদর বিছানো রয়েছে দিগন্তজুড়ে। অবাক বিস্ময়ের সাথে আরও লক্ষ্য করলাম যে মেঘের সাথে রোদের এক অপরূপ সম্পর্ক আছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে রোদের ফালিগুলো বের হবার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছে।

সারি বেঁধে ঘাটের দিকে; ছবি- কামরুন নাহার ইতি

বেলা ৯ টার দিকে রুমা থেকে নৌকায় করে রুমা বাজারে পৌঁছে যাই। নাস্তা সেরে বিজিবি ও  পুলিশের অনুমতি নিয়ে যাই। এর মাঝে বিজিবি এসে আমাদের ব্যাগ চেক করে। কোথায় যাচ্ছি , কেনও যাচ্ছি ইত্যাদি বিষয় গুলো জানতে চায়। অনুমতি পেলে চান্দের গাড়ি করে ১১ মাইল যাই।

মূলত ট্রেকিং শুরু ১১ মাইল থেকে। সামনের দিকে কিছুটা এগোতেই কমলাবাজার। সেখান থেকে প্রত্যেকে একটা করে বাঁশের লাঠি নিয়ে ট্রেকিং শুরু করি। মজার ব্যাপার হলো ঐ ট্যুরের বেশির ভাগ লোকের পাহাড়ে প্রথম ট্রেকিং ছিল। তো সেই যাই হোক, আমরা সবাই গুটিগুটি পায়ে হাঁটা শুরু করি। কিছুক্ষণ হাঁটতেই সূর্যের তাপে প্রায় সেদ্ধ হওয়া অবস্থা সকলের। যেখানেই একটু ছায়া পাই সেখানেই সবাই জিরিয়ে নেই।

ট্রেকিং কী জিনিস ততক্ষণে সকলেই তা বুঝে গেছে। বগালেকে ওঠার আগে যে খাড়া পাহাড় আছে আমরা তখন তার পাদদেশে। এই খাড়া পথ দেখে মোটামুটি সকলের গলা শুকিয়ে গেল। তার উপর নেই তেমন কোনো গাছপালা। হাছড়ে-পাছড়ে ওঠার চেষ্টা করি পাহাড়। এরকম বেশ কিছুক্ষণ পরে নিজেকে আবিষ্কার করি ঐ পাহাড়ের চূড়ায়। দপাদপ সেখানে শুয়ে হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে থাকি আর ভাবতে থাকি ট্রেকিং মোটেও কোনো সহজ কাজ নয়।

বগাকেইন বা বগালেক; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

চূড়া থেকে নিচের দিকে তাকাতেই চোখে অবাক বিস্ময়। পাহাড়ের উপরে লেক। ভাবতেই অবাক লাগে। চূড়া থেকে পুরো বগালেক এলাকা স্পষ্ট দেখা যায়। সবুজ গাছপালা ঘিরে রেখেছে সম্পূর্ণ লেককে। আকাশ থেকে একটু নীল ধার করেছে হ্রদের নিটোল পানি। যত দেখছি আকাশ, পাহাড় আর জলের মিতালী তত যেন মুগ্ধ হচ্ছি।

সুমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৭০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছে বগালেকের। প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাকৃতিকভাবেই উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা ভূতত্ত্ববিদদের। বগালেক মূলত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে তৈরি। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির হ্রদ বগাকাইন বা বগালেক।

তবে পাহাড়ের স্থানীয় আদিবাসীদের ধারণা অন্যরকম। তাদের ধারণা এই পাহাড়ের চূড়ায় ড্রাগন বাস করত। আর এই ড্রাগনের মৃত্যুর ফলে তৈরি হয় বগালেকের। বম ভাষায় বগা মানে ড্রাগন। তাই অনেকেই বগালেককে ড্রাগন লেকও বলে থাকে। দুর্গম পাহাড় ঘন অরণ্যে ঢাকা। এই পাহাড়কে ঘিরে বাস করত বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষ। ম্রো, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা প্রভৃতি।  

ঐ টিনের ঘরগুলোই বিজিবি ক্যাম্প; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

বগালেকের পাশেই বিজিবি ক্যাম্পে রিপোর্ট করে আমরা পাড়ায় ঢুকি। সিয়াম দিদির কটেজে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খাবার রেডি হতে কিছুটা সময় লাগায় সেই ফাঁকে আমরা বগালেকের জলে ডুবাতে যাই।

পানিতে নামতে গা জুড়িয়ে গেল। দুর্গম পাহাড় পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তি এক নিমেষেই হারিয়ে যায় লেকের অতল গহ্বরে।

শান্ত জলের হ্রদ; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

পেটে ছুঁচো দৌড়াচ্ছে ততক্ষণে। খেতে বসে টের পেলাম পেট যেন রাক্ষস হয়ে গেছে। বেগুন ভর্তা, ডাল, সবজি আর ভাত যেন অমৃত লাগছিল।

ছবি তোলায় ব্যস্ত; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। সবাই যে যার মতো করে ঘুরে দেখছে পাড়া, সাথে ছবি তোলা তো আছেই।

নিকষকালো অন্ধকারে চাঁদের আগমন; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পশ্চিম আকাশে একফালি চাঁদের দেখা পাই। পাহাড়ের চূড়ায় নিকষ কালো অন্ধকারে একফালি চাঁদের আলো সবুজে ঘেরা লেকের শান্তজলকে দিয়েছে এক অন্যরকম রূপ।

বারবিকিউ চলছে; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

রাতের খাবার আয়োজনে বারবিকিউ চলছে। রাত ১০টা নাগাদ খাওয়া শেষ করে সবাই ঘুমাতে চলে যাই। কারণ খুব সকালে উঠে যেতে হবে কেওক্রাডং জয়ের অভিযানে।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বান্দরবান

ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে হানিফ, ইউনিক, শ্যামলি ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানে যায়। ভাড়া জনপ্রতি নন-এসি ৬২০ টাকা।

রোদে তাকাতে না পারলে কি হবে ছবি তো তুলতেই হবে; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

বান্দরবান থেকে রুমা 

সকালে বান্দরবান শহর থেকে লোকাল বাস রুমা যায়। লোকাল বাস/ জীপ রিজার্ভ নিয়ে যেতে পারেন।

থাকা-খাওয়া ও গাইড

আগে থেকে গাইডের সাথে কথা বলে রাখা ভালো। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা গাইড করে রাখবে।

অবশ্যই মনে রাখবেন

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন। 

*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।

*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

*লেকে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে। 

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শরতের কাশফুল দেখতে ঘুরে আসতে পারেন আমুলিয়া মডেল টাউন

ভার্জিন আইল্যান্ডস ভ্রমণ: যে সাতটি কাজ অবশ্যই করবেন