সিরাজদিখানের সবুজতায় মাথা উঁচিয়ে দণ্ডায়মান বাবুর বাড়ির মঠ

মুন্সিগঞ্জের একটি উপজেলা সিরাজদিখান। সিরাজদিখানের বাবুর বাড়ির মেঠোপথে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি মঠ। এই মঠ দেখতেই পাড়ি জমালাম মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে।

সকাল সকাল গুলিস্তান মাজারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ডি এম পরিবহনে উঠে বসলাম। এই বাসটি এখান থেকে কানায় কানায় পরিপূর্ণ না করে ছাড়বে না। তাই আরামদায়ক সিট পাবার জন্য একটু আগেই উঠে বসে থাকতে হবে। মুড়ির টিন মার্কা বাসটি ফ্লাইওভার দিয়ে পোস্তগোলার রাস্তায় পাড়ি জমালো। এই রাস্তাটায় রাস্তার কাজ চলছে। তাই প্রচুর ধুলো। সেই সাথে খুবই বাজে রাস্তা। বাসের ঝাঁকি খেয়ে খেয়ে শরীরের হাড়গোড় আর আস্ত নেই বলে মনে হচ্ছে। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর সিরাজদিখানের নিমতলী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। নিমতলী থেকে সিরাজদিখান উপজেলায় যাওয়ার পথে দেখলাম ১০০ বছরের পুরনো শ্মশান ঘাট। দেড় ঘণ্টা সময় লাগলো আমাদের পৌঁছাতে।

হযরত পাঁচ পীর সাহেবের মাজার শরীফ; source: মাদিহা মৌ

সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরশা দিয়ে নাস্তা খেয়ে নিলাম বাজার থেকে। পাতক্ষীরশার কাহিনী একটু পর বলছি। নাস্তা খেয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছি বাবুর বাড়ি যাওয়ার জন্য অটো খুঁজতে। তাকিয়ে দেখি, রাস্তার ধারে মাজারের একটা বড় প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বারে বড় বড় করে লেখা, হযরত পাঁচ পীর সাহেবের মাজার শরীফ। আমাদের এই দেশটায় মাজারের এত আধিক্য কেন, আল্লাহই জানেন!

সবচেয়ে বেশি কারুকাজ করা মঠটি; source: মাদিহা মৌ

রাস্তার ওপারে বাবুর বাড়ি যাওয়ার অটো পেয়ে গেলাম। প্রতিজনে ১০ টাকা করে ভাড়া। এই পথটা খুব সুন্দর। সরু ইট বিছানো পথ। বড়জোর একটা অটো বা রিকশা চলতে পারে। বেশিক্ষণ লাগলো না বাবুর বাড়ি পৌঁছাতে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল মঠের মাথা। কাছে গিয়ে দেখি মোট তিনটি মঠ। একটা অনেক বড়। প্রায় পাঁচতলা দালানের সমান হবে। এই মঠটিতেই সবচেয়ে বেশি কারুকাজ করা।

মেটে ইটা রঙের মঠের উপরের দিকের আলপনা সিঁদুর লাল রঙে রাঙানো। এত আগের রঙ এখনো কী করে এমন জ্বলজ্বল করছে, ভেবে অবাক লাগলো। মাঝে মাঝে মনে হয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমাদের এই প্রজন্ম এগিয়ে থাকলেও আগের প্রজন্মের মানুষগুলো আরো অনেক বেশি সৃষ্টিশীল আর আত্মপ্রত্যয়ী ছিল। সেজন্যই তাদের কাজ এত বেশি নিখুঁত আর অক্ষয়।

গাছের আড়ালে প্রাচীনতম স্থাপনা; source: মাদিহা মৌ

দ্বিতীয় মঠটি প্রায় চার তলা দালানের সমান। এটাতেও ভালোই কারুকাজ করা। তৃতীয় মঠটি অন্য দূটির তুলনায় বেশিই ছোট। এটায় কোনো কারুকাজও নেই। মঠের রাস্তার উল্টোদিকে একটা পুকুর। শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, এই পুকুরও মঠের আমলেরই। ঘুরে ঘাটে গেলাম। ঘাটটিও দারুণ। আর ঘাট থেকে মঠ তিনটিকে আরোও ভালোভাবে দেখা যায়। পুকুরের পানিতে মঠের প্রতিবিম্বিত রূপ আরো বেশি মুগ্ধতা ছড়ায়। পুকুরটি শান্তিবাড়ির পুকুর নামে পরিচিত। পার্শ্ববর্তী বাড়ির নামে পুকুরটির নামকরণ করা হলেও ঘাটে বসে আমার নিশ্চিত ধারণা হয়েছে যে এইক সময়কালে বানানো হয়নি পুকুরটি।

তাজপুর গ্রামের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এই তিনটি মঠ তাজপুর মঠ নামে পরিচিত। বাংলা ১৩০৫ সালে শ্রী রমেন্দ্র চন্দ্র সেনের স্মৃতি রক্ষার্থে মঠ তিনটি নির্মাণ করা হয়। রমেন্দ্র চন্দ্র সেন সম্পর্কে কোনো তথ্য পাইনি কোথাও। তবে যতোদূর জানি, মঠ নির্মাণ করা হতো জমিদারদের শ্মশান ঘাটের উপর। সেই হিসেবে রমেন্দ্র চন্দ্র সেন হয়তো এই তাজপুর গ্রাম ও আশেপাশের এলাকার জমিদার ছিলো।

এই জায়গাগুলো ভ্রমণ স্থান নয় বলে আশেপাশের মানুষজন অবাক হয়ে দেখছিল আমাদের। তবে খারাপ কিছু বলেনি, বরং সহায়তাই করেছিলো। পুকুর পাড়ে গিয়েছিলাম, ছবি তুলবো বলে। দুজন মহিলা গোসল করার জন্য ঘাটে এসেছিলো তখন। আমাদের মনোভাব বুঝতে পেরে কিছুক্ষণের জন্য ঘাট ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তারা। তাদের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়েছি।

ছোট মঠ; source: মাদিহা মৌ

সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরশা

সিরাজদিখান গেলে ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরশা খেয়ে আসতে ভুলবেন না যেন! ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি আমার অদ্ভুত টান। যেকোনো জায়গায় বেড়াতে যাবার আগে আমি ওই এলাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। সিরাজদিখানের একটি ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত খাবার পাতক্ষীরশা। একে পাতক্ষীর নামেও ডাকা হয়। মিষ্টান্নটির নাম পাতক্ষীরশা হবার কারণ হলো- তৈরি হবার পর কলাপাতায় জড়িয়ে রাখা হয়।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা সদরের মোড়ে নেমে আমি আগেই পাতক্ষীরের দোকান খুঁজতে শুরু করলাম। পাতক্ষীর বিক্রি করা হয় পাতা হিসেবে। একটি পাতা আধা কেজি ওজনের হয়। প্রথমে এক দোকানে দাম জিজ্ঞেস করতেই বললো, ‘এক কেজি ছয়শো। আধাকেজির একটা পাতা তিনশো টাকা।’

আড়াইশ টাকায় দিতে বললাম, রাজি হলো না কিছুতেই।

আমরাও কম কিসে? এই দোকান ছেড়ে সামনের দিকে আরেকটা দোকান খুঁজে বের করলাম। দোকানের নাম নিউ মুসলিম সুইটস। ওখানে আড়াইশ টাকায় এক পাতা পাতক্ষীর দিতে রাজি হলো। উনি জানালেন, চারশ টাকা কেজিতেও পাতক্ষীর বিক্রি করেছেন। এখন দুধের দাম বেশি, তাই বেড়ে গেছে ক্ষীরের দামও। বক্স খুলে চামচ দিয়ে কেটে এক চামচ পাতক্ষীর তুলে মুখে নিয়ে মনে হলো অমৃত! আমাদের দলের সবাই পাতক্ষীর খেয়ে একবাক্যে মেনে নিলো, এমন একটা জিনিস না খেলে খুব মিস হয়ে যেত।
আসল কারিগরদের হাতের তৈরি পাতক্ষীর পাবেন সন্তোষপুর গ্রামে। এছাড়া পাতক্ষীর সিরাজদিখান বাজারে পাওয়া যায় (সিরাজদিখান থানার বিপরীতে)।

সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী পাতক্ষীরশা; source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে সিরাজদিখানের বাস পাওয়া যায়। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে ডি এম পরিবহন সিরাজদিখান যায়। যাত্রাবাড়ী থেকে সিরাজদিখান পরিবহন ছাড়ে কিছুক্ষণ পর পরই। ভাড়া নেবে ৫০ টাকা।

সিরাজদিখান বাজারে রাস্তার ওপারে বাবুর বাড়ি যাওয়ার অটো পাবেন। প্রতিজনে ১০ টাকা করে ভাড়া।

Feature Image – মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের গৌরব মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট

নো ম্যান্স ল্যান্ডে কী হবার? আর কী হলো!