পুনর্ভবা, নামের আকর্ষণে!

বছরখানি আগের কথা, সেবার এক ঈদে শ্বশুরবাড়ি গেলাম ছুটিতে। আমার তো পাগুলে চিন্তা আর উচাটন-অস্থির মন! ভাবছি কীভাবে এই ৫-৭ দিন কাটাবো? বাসায় থাকলে সারাদিন খাও আর খাও, এতো বেশী-বেশী খাতির বা জামাই আদর আমার আবার সহ্য হয় না! ওতে আমি হাঁপিয়ে উঠি আর অপরাধ বোধে ভুগি। এই আমার মতো একটা ফালতু আর পিচ্চি জামাইয়ের জন্য সবার এত তাড়াহুড়ো আর এত আয়োজন দেখে আমি বড়ই বিব্রত হই! সত্যিই বিব্রত হই। আমি সাধারণ আর স্বাভাবিক থাকতে ভালোবাসি, স্বাভাবিকতাই বেশী উপভোগ করি।

কোথায় যাই, কী করি, কার সাথে সময় কাটাই? এই সব চিন্তা করি আর একে-ওকে জিজ্ঞাসা করি কোনো ঘোরার বা দর্শনীয় জায়গা আছে কিনা। শেষমেশ আমার অস্থিরতা আর বাসায় বসে থাকার অস্বস্তি টের পেয়ে আমার শ্বশুর মশাই-ই আমাকে কয়েকটি পরামর্শ দিলেন। এসবের মধ্যে সর্বশেষ তিনি বললেন ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা আর এঁকেবেঁকে চলা স্রোতস্বিনী পুনর্ভবার কথা! একটি নদী।

পুনর্ভবা নদী। ছবিঃ wikimedia.org

পুনর্ভবা নদী! নামটা শুনেই আকর্ষিত হলাম! কী রোমান্টিক একটা নাম পুনর্ভবা! সাথে সাথে ঠিক করে করে ফেললাম ওখানেই যাব। আর ভারত ভ্রমণ যেহেতু আমার কাছে প্রেমের মতোই তাই দূর থেকে সেই প্রেমিকাকেই নাহয় একবার দেখে আসবো? তবে যেতে হবে বেশ দূরে, নওগাঁ শহর থেকে প্রায় ৭০-৮০ কিলোমিটার দূরে আর তিনটা উপজেলা পেরিয়ে ভারতের নিতপুর সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে পুনর্ভবা নদী এঁকেবেঁকে।

কিন্তু লোকাল আর মফস্বলের বাসে করে যেতে সময় লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা! আসতেও তাই! তার মানে পুরো দিনটাই যেতে আর আসতেই শেষ। তাই আমাকে সবরকমভাবে নিরুৎসাহিত করা হলো যেন না যাই। কিন্তু নামেই যখন ভালো লাগা তৈরি হলো, আর সেও এক নদী, সাথে দূর থেকে প্রেমিকার মুখ দেখার সুখানুভূতি সুতরাং, বাঁধবে আমায় কে? আমি যাবই আর দেখবোই ওই পুনর্ভবার এঁকেবেঁকে বয়ে চলা। হোক সে সুন্দরী বা অসুন্দর ম্যাড়মেড়ে-থকথকে আর প্যাঁচপেঁচে এক নদী! সব রকম নদীই আমার কাছে ভালো লাগে।

দুই দেশের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদী। ছবিঃ i.ytimg.com

এক সকালে খুব দ্রুত নাস্তা খেয়ে আর হাতে একটি পানির বোতল নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম দূর থেকে প্রিয় প্রেয়সীর মুখ আর নামেই ভালো লেগে যাওয়া পুনর্ভবা দেখতে, বাসার অনেক অনুরোধ-অনুনয়-বিনয়-স্নেহ-ভালোবাসা-ছেলের আদর-আকুলতা আর বউয়ের মান-অভিমান সব কিছুকে উপেক্ষা আর তুচ্ছ করে। মন যে তখন ব্যাকুল-বধীর আর বিষণ্ণ পুনর্ভবা আর কভু নিজের করে না পাওয়া প্রেমিকার প্রিয় মুখ দেখতে। তাই চলেছি সেই পথেই।  

সকাল আটটার বাসে উঠলাম টিকেট কেটে ৮০ টাকা ভাড়া। বেশ পছন্দসই একটা সিটও পেয়ে গেলাম, হয়তো একটু ট্যুরিষ্ট-ট্যুরিষ্ট ভাব দেখে খাতির-ই পেলাম একটু! তেমনই মনে হলো, কারণ বাসের সুপারভাইজার নিজ থেকে এসে ভালো দেখে একটা সিটে বসিয়ে দিয়ে গেল। আসল কারণ ছিল বোধহয় অত দূরের গন্তব্য পর্যন্ত পূর্ণ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে বাসে ওঠা যাত্রী একমাত্র আমিই ছিলাম। আর সব লোকাল যাত্রী। কিন্তু সে কারণ যাই হোক, আলাদা খাতির পেয়েছিলাম এটাই ছিল বড় আর একটি ছোট্ট তৃপ্তির ব্যাপার।

বাস ঠিক ৮:৩০ মিনিটে যথাসময়ে ছেড়ে দিল, প্রথমে কিছুটা শহর, ধুলো-বালি-কালি-ট্রাকের কালো ধোঁয়া-ভটভটির বিকট আর উৎকট শব্দ-অটো রিক্সার অযথা জটিলতাময় জ্যাম-বিড়ি-সিগারেটের অসহ্য দুর্গন্ধ আর মফস্বলের মধ্যবয়সীদের স্বাভাবিক ও সাধারণ পারিবারিক-সামাজিক-আর্থিক ব্যঞ্জনা শুনতে-দেখতে আর সহ্য করতে করতে অসহ্য হয়ে উঠেছিলাম। ভাবছিলাম ভুল করলাম না তো? নেমে ফিরে যাবো কি?

পথে যেতে… ছবিঃ লেখক 

নাহ, সে যাওয়া যাবে না, তাহলে আবার বউ ইচ্ছামতো পচাবে আর আমার হেরে যাওয়াটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবে। পারলে ঢাক-ঢোল নিয়ে বাদ্য বাজাবে তার অনুনয় আর নিষেধ উপেক্ষা করে গিয়ে হেরে এসেছি বলে! সে আমি হতে দেব না, হতে দিতে পারিই না! “পরাজয়ে ডরে না বীর!” যদিও আমি পরাজিতও হইনি এখনো আর ভয়ের তো প্রশ্নই নেই।

কিন্তু তবুও এই যে মনের মাঝে একটা ক্ষীণ ইচ্ছা তৈরি হলো যে যাব কি যাব না, এই দোদুল্যতা, নেমে যাবো কিনা এই ভাবনা, এটাও তো প্রায় পরাজয়েরই মতো। তাই জেদ চেপে বসলো, না যাবই। না হয় হোক না একটু তিক্ত অভিজ্ঞতা, না হয় হলাম কিছুটা হতাশ দেখে শুকনো-খটখটে-অসুন্দর পুনর্ভবা! তাই বসে রইলাম গোঁজ হয়ে, সেঁটে রইলাম পিঠ বেঁধে সিটের সাথেই!

নওগাঁ শহরের কোলাহল আর মুখরতা পেরিয়ে পত্নিতলা পড়তেই এক নিমেষেই উধাও সব বিরক্তি আর অসহ্য অস্থিরতা, দেখে দুপাশের সবুজের ঢেউ দোলানো ধান ক্ষেত, স্বচ্ছ টলটলে জলের বহমানতা, বিশুদ্ধ শরীরে প্রশান্তির পরশ বুলানো নির্মল আর ঝিরিঝিরি বাতাস। আহ কী শান্তি! মনে পড়ে গেল সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন “মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে” উপমাটা কি ঠিক হলো? রুপক অর্থে ঠিক-ই আছে। কারণ একটু আগে সামান্য জটিলতা দেখেই নেমে যেতে চেয়েছিলাম আর তার খানিক পরেই এই পরিবর্তিত ভাবাবেগ। অদ্ভুত আর একেবারেই উল্টো অনুভূতি! অল্প কিছু সময়ের আগে-পিছে।

সবুজ মাঠের সুখ। ছবিঃ লেখক 

এরপর আর কিছুই ভাবিনি আর কিছুই বুঝিনি প্রায় সারা দিনের জন্যই ভুলে গিয়েছিলাম আমার বর্তমান। পত্নীতলায় বাসের বিশ্রামের সময় বেশ কিছুক্ষণ। সেই ফাঁকে একটু গ্রামের গরম রসগোল্লা আর পোড়া পরাটা খেয়ে নিলাম ধুলো ধূসরিত রাস্তায় দাঁড়িয়েই। বাস আবার চলতে শুরু করলো, আবারো কিছুক্ষণ সেই ফেলে আসা অস্বস্তি আর তারপরেই আবার শুরু মোহময় মাদকতা আর প্রাকৃতিক সম্মোহন আর সবুজের হাতছানি।

পিচ ঢালা সরু কালো রাস্তা, রাস্তার দুই ধারে নানা রকমের গাছের আচ্ছাদন আর ছায়া ঘেরা দুইপাশ, দুই পাশে সারি সারি সবুজ ধান ক্ষেত, বাতাসে ধান গাছের দোলা যেন সবুজ সমুদ্রে সবুজের ঢেউয়ের মতো, উত্তাল কিন্তু উম্মত্ত নয়! সেচের জন্য তৈরি ছোট-ছোট জলাশয় আর সেই জলাশয়ের মাছের তিড়িংবিরিং দারুণ উপভোগ্য আর আহ্লাদিত হবার মতোই একটা ব্যাপার। এইসব দেখতে-দেখতে আর মন-প্রাণ ভরে উপভোগ করতে-করতে পোরশা পেরিয়ে চলে এলাম সীমান্তের শেষ লোকালয় নিতপুর।

নিতপুর। ছবিঃ 1.bp.blogspot.com

বাস থেকে নামতেই একটা গা শিহরিত অনুভূতি টের পেলাম! অবাক হচ্ছেন কেন এমন হল? অথবা যারা আমার অন্য লেখা আছে পড়েছেন ভাবছেন “এই এর এক কমন ডায়লগ” কোনো জায়গায় গেলেই শিহরিত হয়! ফালতু!” আসলে আমার এমনই হয়, আসলেই হয়। কোনো নতুন জায়গায় গেলে, কোনো নতুন ভ্রমণের কথা শুনলে বা শুরু করলে, আর ভারতের আশেপাশে গেলে তো কথাই নাই। তো এখানেও সেই অবস্থা। আর একটু এগিয়ে নদীর পাড়ে পৌঁছালেই নাকি ভারতের দেখা পাওয়া যাবে। নিতপুর সীমান্ত ফাঁড়ি।

এবার গ্রামের মাটির মেঠো পথ আর চারপাশের গোবর দিয়ে জ্বালানি তৈরির মহোৎসবের যজ্ঞ পেরিয়ে সমতলে প্রায়। একটু ছোট মাঠ সবুজের চাদর বিছানো মিহি ঘাস আর সামনেই বয়ে চলা পুনর্ভবা। বেশ দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে আঁকাবাঁকা আর স্রোতস্বিনী এক ঘোলা জলের নদী। বামে সীমান্ত চৌকি আর ডানে বিরান ভূমি, ধু ধু কাদাময় চরাচর। প্রথম দেখায় তেমন ভালো নাও লাগতে পারে অনেকের। কিন্তু, কিন্তু-কিন্তু…. যদি হাতে সময় নিয়ে যান, সাথে কিছু পানি আর হালকা খাবার আর সাথে যদি থাকে কয়েকজন সমমনা বন্ধু বা ভালো লাগা মন্দ লাগা ভাগাভাগি করার মতো কোনো আপনজন তাহলে একটু বসুন।

পথে যেতে পরবে এমন বিল। ছবিঃ লেখক

দূরে ভারতের মালদহ জেলা, নদীটা পেরুলেই। চাইলে নৌকায় করে একটু ঘুরেও আসা যায়, তাতে বিএসএফ তেমন কিছু বলে না, কারণ বিল আর বিশাল জলময় প্রান্তর আপনাকে খুব বেশী দূর এগোতে দেবে না সে ওরা জানে। তাই তেমন কিছু বলেও না। সুতরাং একটু ঘুরে আসতেই পারেন, সেই ভীষণ স্রোত আর অনেক বেশি বেশিই আঁকাবাঁকা নদীর ঘোলা জলে। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে নদীর জল ঘোলা কেন? কারণ ভারতের পাহাড়ি ঢলের পানি পাহাড়ের মাটি ধুয়ে নিয়ে এসে এই ঘোলাটে নদীর সৃষ্টি করেছে।

এবার একটু বসুন আর বসে নদী আর তার ওপারে তাকান। এমন নদী আমি খুব কমই দেখেছি। আঁকাবাঁকা আর আঁকাবাঁকা কয়েকশ ফুট পরপরই নদী এঁকেবেঁকে গেছে ইচ্ছেমত। অথচ খুব সরু বা পাহাড়ের একদম গাঁ ঘেঁষে বয়ে চলা কোনো নদী নয়। পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে বয়ে চলা নদী সাধারণত সরু আর আঁকাবাঁকা হয়ে থাকে। কিন্তু এই পুনর্ভবা নদীটি বেশ বড়ই আর স্রোতও অনেক সেই সাথে আঁকাবাঁকা হবার কারণে স্রোতের বেগ যেন আরও বেশী হয়ে গেছে।

পুনর্ভবা নদী।

নদীর তীরে সময় নিয়ে বসলেই দেখবেন নিজের অজান্তেই একটা ভালোলাগার রেশে আপনি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছেন ধীরে-ধীরে, ওর মায়াবী বাতাস, বয়ে চলা কুলকুল জলে মৃদু উর্মিমালা, চারপাশের সবুজ, দূরে ঘোমটার আড়াল থেকে তাকিয়ে থেকে চোখের ইশারায় কাছে টানতে চাওয়া অধরা প্রেমিকা বা প্রেম। আমি ভারতের কথা বলছি আসলে। ওপারে ভারতের মালদহ জেলা। আমাদের মতোই একটি ছোট শহর।

এই পুনর্ভবা নদীটির ওই আঁকাবাঁকা সর্পিল বয়ে চলাটাই আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে বা অভিভূত করেছে। আমি মুগ্ধ হয়ে অলস আর অবিরাম দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম ওর বয়ে চলার দিকে। আর ওর স্রোত দেখে মনে হচ্ছিল নেমে শরীরটা ভাসিয়ে দেই, আর সাঁতার না কেটেই ভেসে চলে যাই কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে, অনন্তকালের স্রোতে হারিয়ে ফেলি নিজেকে ইচ্ছে করেই!

শীতে পুনর্ভবা। ছবিঃ 1.bp.blogspot.com

আবার হয়ে এলো ওদিকে যাবার সময়। আমি আবারো যেতে চাই পুনর্ভবার সেই স্রোত আর আঁকাবাঁকা সর্পিল মাধুর্য দেখতে। বসে থাকতে আর কাটাতে একান্ত ভালো লাগা আর আবেশে আপ্লুত কিছু সময়।

পুনর্ভবা নামটাই আমাকে টানে, এই নামটার ভেতরেই একটা জাদুকরি স্পন্দন আছে যা আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল আর করেছিল সার্থক শতভাগ আমার সেবারের নিরামিষ বেড়ানোকে রঙিন আর বর্ণিল।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মদেসিয়াদের গল্প

শ্রীমঙ্গলের শিহরণ!