অবশেষে তাজিংডংয়ের স্বপ্ন চূড়ায়

রাতে ঠিকঠাক ঘুম হলো না কারোই, কারণ দিনের চরম গরমের মতো করেই রাতে ঠিক উল্টো কনকনে হাড় কাঁপানো শীত, তার চেয়েও বড় কথা ছিল, যে টং ঘরে ছিলাম সেটির উপরে-নিচে এবং চারপাশে অনেক ফাঁকা থাকায় অসভ্য আর নির্দয় বাতাসেরা অহর্নিশ ঢুকে পড়ে আমাদের কাঁথার উপর থেকেই তার ছোবল দিচ্ছিল। সেই সাথে ছিল, ছাগল-ভেড়া-শুকর ও হাঁস-মুরগীর ঘ্যানঘ্যানানি আর প্যানপ্যানানির উৎকট গন্ধ ও বিকট সব শব্দ। সুতরাং রাত, সেও এক অভিশাপ!

যেহেতু প্রায় নির্ঘুম তাই সকালের দিকে সবাই-ই একটু ঘুমিয়ে গিয়েছিল, যে কারণে উঠতে বেশ দেরীই হলো, আর বের হতে হতে আরও দেরী, কারণ আজ আর কাজ নেই। এই চূড়ায় উঠে, তারপর নেমে, ফিরে এসে নাস্তা করেই ফেরার পথ ধরবো, আর এবার তো ফেরার পথ চেনাই সুতরাং সমস্যা নেই! যে কারণে এবার সবাই আরও ধীরে এবং আরও আরাম-আয়েশে হাঁটা শুরু করলো! যার ফলাফল হাতেনাতে পেয়েছিলাম সেই দিনের শেষে রাত্রির আঁধারে গাইডহীন থানচি পৌঁছাতে!

স্বপ্ন চূড়া থেকে দূরের পাহাড়। ছবিঃ লেখক

তবে এবার যাই স্বপ্নের তাজিংডংয়ের চূড়ায়, এ যাত্রায় কিন্তু আমাদের সাথে গাইড হিসেবে ছিল শেরকর পাড়ার কারবারি নিজেই আর এই পথটুকুই ছিল ভীষণ মনোরম আর মোহময়। সবুজ গাছের পাতায় পাতায় শীতের শিশির, পানি কমে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ঝরাতে জমে থাকা আজলা জল, কাছে দূরে মেঘ-কুয়াশার মিতালী, ঘন জঙ্গলের ভেতরে ফুটে থাকা অসময়ের বুনো ফুল, পাহাড়ি পাখিদের গুঞ্জন, ঘাসে-লতায়-পাতায় জড়িয়ে থাকা স্নিগ্ধতা, বাতাসের বিশুদ্ধতা আর সর্বোপরি ছিল শীতের সকালের মিষ্টি আর উষ্ণতা বোলানো মিহি রোদ্দুর। এইসব অপার প্রকৃতির সাথে শেরকর পাড়া থেকে অনেকটা নেমে গেলাম এক পাহাড় থেকে আর একটি পাহাড়ের পাদদেশে।

এখানে অরণ্য এতটাই গভীর আর আমরা দুই পাহাড়ের এতটাই খাঁজে ছিলাম যে, সবুজ গাছপালা, ঘাস, লতাপাতা, আমাদেরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল একটা অদ্ভুত শিহরণ দিয়ে। এখানে কোনো রোদের কিরণ ছিল না, শীত আঁকড়ে ধরেছিল আমাদের, একটা গা ছমছমে অনুভূতি হচ্ছিল সবার। দুই পাহাড়ের খাড়ি থেকে উপরে উঠছিলাম ধীরে ধীরে। প্রায় ২০ মিনিট ওঠার পরে সেই পাহাড়ের রিজ ধরে চলতে শুরু করতেই দেখতে পেয়েছিলাম আমাদের চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড়ের সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা। সবুজে সবুজে আঁকড়ে ধরা গাছপালায় পুরো দৃষ্টি সীমার সবটুকু জুড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ।

শেরকর পাড়া। ছবিঃ লেখক 

কিছুটা সামনে এগিয়ে একটু সমতল মতো জায়গা পেয়ে বিশ্রাম নিতে বসেছিলাম। যেখানে কিছুটা রোদ আর গাছের ছায়ার লুকোচুরি চলছিল। আর সেখান থেকে গাছের ফাঁকফোঁকর দিয়ে কিছুটা দূরের আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই তাজিংডংয়ের চূড়া দেখতে পাচ্ছিলাম। গাছের শেকড়ে বসে সবাই পানি আর শুকনো খাবার খেয়ে পথ চলতে শুরু করেছিলাম। ফাঁকা পথটুকু শেষ হতেই একদম ছায়া ঘেরা আর গভীর অন্ধকারের মাঝে গিয়ে পড়লাম হুট করেই।

পথে দু’পাশে পাহাড় জুড়ে শুধু ছোট, বড় আর মাঝারি বাঁশ ঝাড়। যে বাঁশ ঝাড়ের জন্য চারদিকে ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল। বাঁশ ঝাড়ের ঘন অন্ধকার পার হতেই বাম পাশে একটি উঁচু জায়গা, যেটা ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে উঠে গেছে তাজিংডংয়ের সেই স্বপ্ন চূড়ায়। আমাদের সাথে থাকা শেরকর পাড়ার হেডম্যান তেমনই জানালেন। তার মানে পৌঁছে গেছি?

নাহ যত সহজ মনে হচ্ছে তত সহজ তো নয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু চূড়া বা সর্বোচ্চ বিন্দু বলে কথা। একটা আভিজাত্য আছে তার, এত সহজেই চূড়ায় উঠে গেলে হবে? তাই বেশ কিছুটা চড়াই-উৎরাই, গাছের শেকড়, বাঁশের কঞ্চি, ঝুলে থাকা গাছের ডাল ধরে ঝুরো মাটির ঝরে পড়া, শুকনো কিন্তু পিচ্ছিল পাহাড় পেরিয়ে, একে-অন্যের হাতে হাত ধরে সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে একজন একজন করে পৌঁছে গেলাম সেই স্বপ্ন চূড়ায়! তাজিংডংয়ের চূড়ায়, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বিন্দুতে। শিখরে।

শীতের সকালে চুড়ার পথে। ছবিঃ লেখক

তাজিংডংয়ের চূড়ায় পৌঁছেই দেখেছিলাম আরেক চূড়া, সাধ জেগেছিল সেই চূড়ায় যাবার। সাকা হাফং। কথিত আছে, এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া বা বিন্দু। কিন্তু এটার সরকারী স্বীকৃতি এখনো মিলেছে কিনা জানা নেই। তবে সেবার আর সম্ভব ছিল না, যদিও মাত্র এক দিনের পথ ছিল সেই সাকা হাফং, কারবারির ভাষ্য মতে। এরপর একবার আবার যাবো, তবে সেবার সাকা হাফং জয় করতে সেই প্রত্যাশা রেখে চূড়া থেকে নামার পথ ধরেছিলাম।

শেষটুকু যদিও সামান্য বন্ধুরতম ছিল কিন্তু আগের দিনের কষ্ট আর যন্ত্রণার তুলনায় তেমন কিছুই না, তাই কারোই আর সেটা গায়ে লাগেনি বা উল্ল্যেখযোগ্য মনে হয়নি। অথচ শিকড় ধরে চূড়ায় ওঠাটা বেশ কষ্টসাধ্য আর কিছুটা কৌশলের ব্যাপার-স্যাপারও ছিল, কিন্তু ওই যে বললাম আগের দিনের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই নগণ্য! আর চূড়ায় পৌঁছে সে কী উল্লাস! ভাষায় প্রকাশ বা শব্দে বর্ণনাসাধ্য বা যথার্থ হবে না, এটা বুঝে নিতে হবে যার যার অভিজ্ঞতা বা না গিয়ে থাকলে কষ্ট করে গিয়ে, অর্জন করে। কোনো পার্থিবতা দিয়ে বোঝানো আমার সাধ্যের অনেক অনেক অনেক বাইরের।

তাজিংডং এর চূড়ায়! ছবিঃ লেখক

তবে হ্যাঁ, নেমে আসার সময় কিছু বিড়ম্বনার শিকার বা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছিলাম কয়েকজন, সে নিয়ে কিছু মান-অভিমানও আছে, কারণ পাহাড়ে ওঠার চেয়ে নেমে আসাটা অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ, তাই সাবধান থাকতে হয় অনেক বেশী, তাতে পথ যত সহজ আর নির্ঝঞ্ঝাটই হোক না কেন।

আজকাল শুনেছি তাজিংডং যেতে আর এত এত রোমাঞ্চের ট্রেক আর পথে পথে ঝঞ্ঝা নাকি পোহাতে হয় না। থানচি থেকে নাকি বেশ মিহি রাস্তা হয়ে গেছে! তাহলে নিশ্চয়ই সেখানে গাড়ি-টাড়িও যায়? সঠিক জানি না, তবে তেমনই শুনেছি। তাই কারো ইচ্ছা হলে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারেন স্বীকৃত সেই স্বপ্ন চূড়া।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিকালপর্বে চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে হন্টনের গল্পকথা

ড্রোন ব্যবহারে কিছু সতর্কতা