সান্দাকফুর চূড়ায়!

সান্দাকুফু, যেখান থেকে চোখ ফেরানো দায়! ছবিঃ weramblers.com

রাত ৮টাতেই চারদিক নিশ্চুপ হয়ে যায় সান্দাকফুতে। কারণ সেখানে বিদ্যুৎ নেই, রাত আটটা পর্যন্ত সোলার বিদ্যুতের কিছু মৃদু আলোর ঝলক দেখা যায় মাত্র। তাই রাত আটটার মধ্যেই সবাইকে যার যার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে রুমে ঢুকে পড়তে হয়। আর এইদিন যেহেতু খুব বেশী ট্রেকিং করা হয়নি, তাছাড়া সারাদিন বসে-হেঁটে আর বিশ্রাম নিয়েই কাটিয়ে দেয়াতে তেমন ক্লান্তিও ছিল না। যে কারণে ঘুমও আসছিল না। আধো ঘুম আর আধো জাগরণে কাটছিল সেই অস্থির রাত। সাথে মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম আগামীকাল যেন স্বচ্ছ আকাশ হয়, তবে তার পূর্ব শর্ত শুনেছিলাম রাতে যদি কিছু বৃষ্টি হয়।

এই ভাবনা ভাবতে-ভাবতেই সৃষ্টিকর্তার অসীম আশীর্বাদ হয়ে ঝুম বৃষ্টি এলো। আর সেই বৃষ্টির শব্দ শুনে গুমোট মনের মেঘ কেটে যেতে লাগলো ধীরে ধীরে। বেশ ঘণ্টাখানেক ধরে বৃষ্টি হলো ঝুমঝুম। এরপর বৃষ্টি থেমে যাওয়াতে, আর ঘুম না আসাতে আবারো বাইরে বের হলাম হিম শীতল বেলকনিতে, ডাবল কম্বলের উষ্ণতাকে উপেক্ষা করে।

রাতের সান্দাকফু। ছবিঃ static2.tripoto.com

ভাগ্যিস বেলকনিতে বের হয়েছিলাম, শীতের কামড়কে উপেক্ষা করেই, নইলে এমন অপার্থিব রাতের, অপার্থিব মুহূর্ত কীভাবে পেতাম? কোনোমতে গায়ে গরম কাপড় চাপিয়ে, মাথায় গরম টুপি পরে, হাত দুটোকে গ্লাভসের ভেতরে ঢুকিয়ে, ঠক-ঠক করতে করতে রুমের বেলকনিতে বের হতেই দেখি, সারাদিনের মেঘ কেটে গিয়ে মধ্য আকাশে ঝকঝক করছে সান্দাকফুর আকাশ, তারায় তারায় সেজেছে পুরো অন্ধকার জগত, হয়েছে বেশ ঝলমলে আর আলোকিত!

তবে কি বরফ চুড়াগুলোও দেখা যেতে পারে কিছুটা? নিজের কাছেই নিজের জিজ্ঞাসা। এরপর খুব সন্তর্পণে কাঠের পাটাতনে পা ফেলে, নিচে নেমে গেলাম কাঠের সিঁড়ি দিয়ে। সামনে এগোতেই মনে হচ্ছিল আলোর রোশনি একটু একটু করে বাড়ছে যেন, নাকি মনের ভ্রম? অধিক প্রত্যাশা আর উত্তেজনার মিশেল? ভাবছি আর সামনে এগোচ্ছি। ভেজা উঠোনে পা দিতেই হিম ঠাণ্ডা বাতাস জড়িয়ে ধরলো, দাঁতে দাঁতে ঠক ঠক করে কেঁপে উঠলাম মুহূর্তেই। আরও সামনে যাবো কি যাবো না ভাবছিলাম।

বৃষ্টি শেষের সান্দাকফু। ছবিঃ flickr.com

এত রাতে, শীতের মধ্যে বাইরে নেমেই যেহেতু পড়েছি, যাই নাহয় একটু কষ্ট করে চূড়ায়, যদি দেখা মেলে অপার্থিব কোনো মুহূর্তের, সেই আশায়। যেখানে বরফের চূড়াগুলোয় চাঁদের রূপালী আলো পড়ে চিকচিক করে হাসবে, পাহাড়-আকাশ আর পুরো পৃথিবী। ভাগ্যিস কষ্ট করে হলেও গিয়েছিলাম, আর গিয়েছিলাম বলেই ঠিক চিকচিকে বরফের হাসি দেখতে না পারলেও, দেখেছিলাম এক অপার্থিব জ্যোৎস্না রাত, তারা ভরা স্বচ্ছ আকাশ আর চাঁদ-তারার আলোতে আলোকিত বরফের বেশ কয়েকটি ঝকঝকে চূড়া!

কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য। কারণ এত এত বেগে বাতাস বইছিল যে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব ছিল। তার উপরে নিয়মিত সাদা বা কালো মেঘেদের উড়ে উড়ে, বরফ চূড়াগুলোকে বারে বারে ঢেকে ফেলা। একটি পরেই আবারো মেঘে ঢেকে গিয়ে বৃষ্টির ফোটা পড়তেই চলে আসতে হলো রুমে। আর রুমে ফিরেই এবার আর কোনো কথা নেই, ঘুম।

বিমুগ্ধ চোখে অপলক তাকিয়ে থাকা! সান্দাকফু। ছবিঃ tripadvisor.com

মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলেও, উঠে পড়েছিলাম ঠিক রাত সাড়ে চারটায়। প্রথম সূর্য ওঠার আগেই পৌঁছাতে হবে চূড়ায়, দেখতে হবে তুষার জড়ানো বরফ পাহাড়গুলোর ধূসর রূপ। ধীরে ধীরে আলোকিত হবার সাথে সাথে, দেখতে পেলাম… আধো অন্ধকারে ধূসর বরফ পাহাড়গুলোর ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলের খেলা।

ধীরে ধীরে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে, রাত দূরে সরে গেল। সাথে সাথে পাহাড় আর আকাশের রঙ বদলে যেতে থাকলো এভাবে, ধূসর থেকে সাদা, সাদা থেকে সোনালী সূর্যের প্রথম আলো পড়ে! সোনালি থেকে লাল, কখনো গোলাপি, আর হালকা হলুদ রঙের হাতছানি! ধীরে ধীরে পুরো কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন জ্বলে উঠলো তার আপন মহিমা নিয়ে।

আলো ফুটছে আর কাঞ্চনজঙ্ঘা হাসছে.. একসময় সে যে এত বড় হয়ে সামনে এসে পড়লো যেন, হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেয়া যাবে! এমন দূরত্বে, এতটা কাছে, এতটা অসম্ভব সামনে এসে পড়লো যে উপস্থিত সবাই হতবাক, নির্বাক আর নিস্তব্ধ, খুশিতে সবাই প্রায় বাকরুদ্ধ!

উহ, এর পরের বর্ণনা অসম্ভব অসম্ভব! এর পরের চার ঘণ্টা ছিল এখন পর্যন্ত পাওয়া জীবনের শ্রেষ্ঠ সকাল, কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই। সূর্য ওঠার সাথে সাথে ডান থেকে বামে একে একে জেগে উঠতে থাকলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত হিমালয় আর তার বরফে বরফে মুড়ে থাকা চূড়াগুলো। ভুটান থেকে শুরু করে, ভারত হয়ে পুরো নেপাল জুড়ে যে হিমালয়ের বিস্তার চোখের সামনে হাসতে লাগলো তার সবটুকু রূপ ছড়িয়ে। স্তব্ধ হয়ে ছিলাম কোনদিকে দেখবো আর কোনদিকে বাদ দেব এই ভেবে ভেবে, ভাবনাগুলোও ভোঁতা হয়ে পড়ছিল।

সান্দাকফুতে রঙ বদলের খেলা। ছবিঃ .bp.blogspot.com/-
অপার্থিব সেই মুহূর্ত! ছবিঃ wordpress.com

কানে কি একটু ভুল শুনলাম নাকি আমার অলীক কল্পনা! কে যেন বলল, এভারেস্ট আর লোথসে-মাকালু দেখা যাচ্ছে! আসলেই কি দেখা যাচ্ছে, নাকি কেউ মজা করছে? বুঝতে চেষ্টা করলাম খুব মনোযোগ দিয়ে, কিন্তু কাউকেই মজার মুডে দেখতে না পেয়ে, ধীরে ধীরে ডান থেকে বামে চোখ ঘোরাতে শুরু করলাম…

যতদূর চোখ যায় শুধু বরফে মোড়া পাহাড়ের চূড়ারা তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে, নিচে সাদা মেঘেদের দল তখনো ঘুমন্ত, বাতাসরা ছুটি নিয়েছে আজ সকালে, বইবে না তাই! কালো মেঘেদের ধুয়ে দিয়েছে গত রাতের বৃষ্টি। চোখ ফেরাতে ফেরাতেই চোখে পড়লো একই সাথে, একই উচ্চতায়, একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি বরফ চূড়া, পাশাপাশি, গা ঘেঁষে একে-অন্যের। ওরাই নাকি থ্রি সিস্টারস! বাহ, ওয়েব সাইট আর পত্র-পত্রিকার ছবিতে ঠিক এমন করেই দেখেছি এদের! ঠিক ঠিক তেমনই করেই দাঁড়িয়ে হাসছে তিন বোন পাশাপাশি!

অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম, তিন বোনের দিকে এক দৃষ্টিতে। এভারেস্টের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছে না যে! যদি সত্যি না হয়, বড় ব্যথা পাবে মন। আর যদি সত্যি হয়, তবে না আবার অজ্ঞান হয়ে পড়ি, অতি আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে, আবেগের বিষম ঢেউয়ে না আবার পড়ে যাই পাহাড় থেকেই! সেই ভাবনায়। কারণ এভারেস্ট কোনোদিন দেখতে পারবো ভাবিই-নি। বিমানে নেপাল যাওয়া সাধ্যের বহু দূরে। আর এখান থেকে দেখা যায় শুনেছি, ওয়েদার খুব ভালো থাকলে, তাই বলে কি সত্যি-ই দেখা যাচ্ছে নাকি? ভাবতে বেশ ভয়-ভয় লাগছে যে! নাহ, সবাই ডানে ঘুরে ছবি তুলছে একের পর এক।

থ্রি সিস্টারস। ছবিঃ peakadventuretour.com

চোখ ঘোরালাম আরও একটু ডানে। কিছুটা মেঘের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনটি বিশাল বরফ পাহাড়, ধবধবে সাদা। কোথাও এতটুকু আঁচড় নেই কিছুর। ওটাই কি তবে? কী জানি, চিনি তো না! আগে তো দেখিনি কখনো ছবিতে ছাড়া। তাই যেটাকে এভারেস্ট বলবে লোকে সেটাকেই মেনে নিতে হবে। একে-একে আট থেকে দশজনকে অন্তত জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা এভারেস্ট? সবাই ওই বিশাল সাদা তিনটি পাহাড়ের মাঝেরটাকেই নির্দেশ করলো!

বিশ্বাস হচ্ছিল না তবুও, আসলেই কি ওটাই এভারেস্ট? আর দুই-পাশের দুটি মাকালু আর লোথসে? আরও নিশ্চিত হবার জন্য এমন একজনের কাছে গেলাম, যে কিনা এর আগেও ১২ বার সান্দাকফু এসেছে! ওনার সাথে গতকাল বিকেলে কিছুটা আলাপ হয়েছিল আর তিনি বাঙালি, দুই বন্ধু মিলে নিজেদের গাড়ি নিয়ে এসেছেন। যাদের গাড়ির শ্লোগান হলো-

“নো রোড? নো প্রবলেম!”

মানে রাস্তা নেই? তবুও সমস্যা নেই সেই গাড়ির! এমনই গাড়ি যে রাস্তা নিজে তৈরি করে নিতে পারে! আহা, তার কাছে গেলাম নিশ্চিত হতে। এবং তিনি খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে আর দেখিয়ে দিলেন যে ওই বিশাল বরফে মোড়া পাহাড় তিনটির মাঝের একটু ছোট দেখা যায় যেটা, সেটাই এভারেস্ট! শুনে কানে যেন তালা লেগেছিল, সুখে অবশ ছিলাম কিছুক্ষণ, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম, কোথায় জানি না। হয়তো এভারেস্টের দিকে, হয়তো কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে, অথবা হয়তো অন্য কোনো অজানা আকাশে, বরফের চূড়ায় চূড়ায়!

কতক্ষণ জানি না, তবে যখন চেতনা ফিরে পেলাম… এরপর? এরপর যখন নিশ্চিত হলাম যে হ্যাঁ ওটাই এভারেস্ট, নিজে নিজে ঠিক করে নিলাম। যতক্ষণ এই বরফের হিমালয়রাজি দেখা যাবে এখান থেকে, কোত্থাও যাবো না এখান থেকে এক পাও! কোথাও যাইনি এরপরের চার ঘণ্টা। বসে ছিলাম শেরপা চ্যালেটের কাঠের বেঞ্চিতে ঠাঁয়! দাঁত ব্রাশ ওখানে বসেই, ফ্রেশ হওয়া সেও ওখানেই! সকালের কফি আর বিস্কিট? ওখানে বসেই! মোট কথা যতক্ষণ মেঘে ঢেকে না গেছে এভারেস্ট, থ্রি সিস্টার, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পুরো হিমালয়ের সমস্ত বরফে আচ্ছাদিত রেঞ্জ, বসেছিলাম সেখানে নিজেকে গাছের খুঁটি বানিয়ে!

একবার ডান থেকে বামে ঘাড় ঘোরাই, আর একবার বাম থেকে ডানে! কোনটা দেখবো আর কোনটা বাদ দেব, সেই দোটানায়! একদম মাথার উপরে, হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে এমন কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এদিক-ওদিক করলেই থ্রি সিস্টার আর এভারেস্ট চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কল্পনার-ছবির-নেটের-পোস্টারের-অন্য মানুষের পোস্ট দেখে আক্ষেপে পোড়ার সেই অধরা এভারেস্ট! আজ আমার চোখের সামনে, আহ! সে যে কী এক অপার্থিব সুখ-আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে নিজেকে বার-বার হারিয়ে ফেলা সে বোঝাবার নয়, আদৌ!

সে শুধু অনুভবের, উপলব্ধির আর হৃদয়ে সুখের অসীম পাহাড় গড়ে তোলার!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাস্তায় ও ছবিতে উচ্ছ্বাসের শহর কলকাতা

স্কাইডাইভিং, ক্যাম্পিং, স্কুবায় দুবাই অ্যাডভেঞ্চারে মগ্ন বিশ্ব