এক নজরে একটি জেলা: ইসলামের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম

বাংলাদেশে কবে কখন ইসলামের প্রবেশ ঘটেছিল তা সুনির্দিষ্ট করে বলা দুরূহ ব্যাপার। তবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, বাংলায় ইসলাম প্রবেশের মূল পথ ছিল চট্টগ্রাম অঞ্চল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গবেষকদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়- হিজরি প্রথম শতাব্দীতে যখন চট্টগ্রামের সাথে আরবীয় বণিকদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তখনই বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। এই বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে বলা হয়, চট্টগ্রামের ভাষা ও ঐতিহ্যে আরবীয় প্রভাব এখনো লক্ষ করা যায়।
চট্টগ্রামকে যেমন ইসলামের প্রবেশদ্বার বলা হয় ঠিক তেমনই বলা হয় বারো আউলিয়ার দেশও। এছাড়াও ইতিহাস ঘাঁটলে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে বারো আউলিয়াদের অসামান্য অবদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই আমি আজকের এই ফিচারটি সাজিয়েছি চট্টগ্রামের বারো আউলিয়া প্রসঙ্গে জড়িত নানা স্থানের বর্ণনায়। তাঁর আগে বারো আউলিয়াগণের মধ্য থেকে দেখে নেওয়া যাক ড. গোলাম সাকলায়েন উল্লিখিত দশ আউলিয়াগণের নাম। তারা হলেন-
১. হযরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.), ২. হযরত শেখ ফরিদ (রহ.), ৩. হযরত বদর শাহ্‌ বা বদর আউলিয়া বা পীর বদর (রহ.), ৪. হযরত কতল পীর (পীর কতল) (রহ.), ৫. হযরত শাহ্‌ মহসিন আউলিয়া (রহ.), ৬. হযরত শাহ্‌ পীর (রহ.), ৭. হযরত শাহ্‌ উমর (রহ.), ৮. হযরত শাহ্‌ বাদল (রহ.), ৯. হযরত শাহ্‌ চাঁদ আউলিয়া (রহ.), ১০. হযরত শাহ্‌ জায়েদ (রহ.)

শাহ আমানতের মাজার

শাহা আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর; Source: netrakonazila.com

শাহ আমানত একজন বিখ্যাত দরবেশ ছিলেন। তাঁর মাজার চট্টগ্রাম শহরের অতি পরিচিত স্থান লাল দীঘির ঠিক পূর্ব দিকে অবস্থিত।
শাহ আমানত (রহঃ)-এর নামে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি স্থাপত্যের নামকরণ করা হয়েছে- এগুলো হলো চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত ব্রিজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল।

হযরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামির মাজার

হযরত বায়েজিদ বোস্তামি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অতি প্রচলিত আদর্শের নাম। মাতৃসেবার প্রসঙ্গ সামনে এলেই যেন এসে পড়ে এই আউলিয়ার নাম, যিনি মায়ের সেবা করে আউলিয়া হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়।

বায়েজিদ বস্তামির মাজারের মূল গেইট; Source: ThePinsta

হযরত বায়েজিদ বোস্তামির মাজারটি চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ সেনানিবাসের কাছেই অবস্থিত। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী এটিকে বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার বলে উল্লেখ করা গেলেও ইতিহাসে এর কোনো ভিত্তি নেই। বায়েজিদ বোস্তামী নামক কোনো ব্যক্তি আদৌ কখনো বাংলাদেশে এসেছিলেন কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার নামে পরিচিত এই দরগার পুকুরে প্রায় ২০০-৩০০টি বিরল প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে। এছাড়াও সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত একটি তিন গম্বুজ মসজিদ রয়েছে।

বদর আউলিয়ার মাজার

বদর আউলিয়ার মাজার; Source: বাংলা উইকিপিডিয়া

চট্টগ্রামের বারো আউলিয়ার মধ্যে বদর আউলিয়া অন্যতম। মনে করা হয়, হযরত বদর আউলিয়ার আগমনের পর থেকেই মূলত চট্টগ্রাম শহরে মানুষের বসবাস শুরু হয়।
চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লায় বখশীর হাটের নিকটবর্তী বদরপট্টি নামক স্থানে বদর আউলিয়ার মাজার অবস্থিত। ঐতিহাসিকদের ধারণা বদর আউলিয়ার এই মাজারই চট্টগ্রামের প্রাচীনতম স্থাপত্য।
মাজার প্রাঙ্গণে রয়েছে, হযরত বদর আউলিয়ার সমাধিসৌধ ও একটি পাকা কুয়া। এছাড়াও কাঁচের আবরণে একটি পাথরের কয়েকটি খণ্ডও সংরক্ষণ করা হয়েছে। জনশ্রুতি আছে, এই পাথরে চড়েই বদর আউলিয়া চট্টগ্রামে আগমন করেন।

শাহ মোহসেন আউলিয়ার মাজার

এই মাজারটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার বটতলী গ্রামে অবস্থিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী জানা যায়, হযরত মোহসেন আউলিয়া ছিলেন হযরত বদর আউলিয়ার ভাগ্নে। তিনি একটি পাথর খণ্ডে চেপে চট্টগ্রামে আগমন করেছিলেন, যা এখনো তাঁর মাজারে সংরক্ষিত আছে।

চেরাগি পাহাড়

চেরাগির মোড়; Source: অচিন্ত্য আসিফ

বলা হয়, প্রায় কয়েক’শ বছর আগে সুফি সাধক বদর আউলিয়া (রা:) সমুদ্রে ভাসমান একটি পাথর খণ্ডে আরোহণ করে চট্টগ্রামে আগমন করেন। তখন চট্টগ্রাম ছিল গভীর পাহাড়-পর্বতে ঘেরা এবং জন-মানবহীন। এখানে ছিল জ্বীন-পরিদের আবাসস্থল।
হযরত বদর আউলিয়া এখানে আসার সময় একটি অলৌকিক চেরাগ সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এটি দ্বারা তিনি সমস্ত দুষ্টু জ্বীনকে বিতাড়িত করেন এবং চট্টগ্রামকে বসবাসের উপযোগী করে তোলেন।
হযরত বদর আউলিয়া যেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর এই অলৌকিক কাজটি করেছিলেন, সেই জায়গাটিই এখন চেরাগির মোড় নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণ কেন্দ্র এই চেরাগির মোড়ে রয়েছে চেরাগ আকৃতির একটি মনুমেন্ট।

বারো আউলিয়ার মাজার

চট্টগ্রামে ‘বারো আউলিয়া’ প্রসঙ্গটির সাথে সব থেকে বেশি সম্পর্ক রয়েছে সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়িতে অবস্থিত বারো আউলিয়ার মাজার নামক স্থানের। জায়গাটির নাম সোনাইছড়ি হলেও এটি বারো আউলিয়ার মাজার নামেই অধিক পরিচিত।
‘বারো আউলিয়ার মাজার’ নামটি শুনলেই হয়তো অনেকের মনে হতে পারে যে, এখানে বারো আউলিয়া বা তাঁদের কারো সমাধি বা মাজার রয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা তাঁর উল্টো। এখানে আসলে কোনো আউলিয়ার সমাধি বা মাজার নেই।
জানা যায়, ‘বারো আউলিয়ার মাজার’ নামক স্থানটি এক সময় বারো আউলিয়াগণের দরগা বা সম্মিলনস্থল ছিল। এখানে বারো আউলিয়া একত্রিত হয়ে তাঁদের কর্ম পরিকল্পনা করতেন।

বারো আউলিয়া মসজিদ

চট্টগ্রাম মূল শহর থেকে প্রয় ৯-১০ কিঃমিঃ দূরে বালুচরা নামক স্থানে বারো আউলিয়া নামক একটি মসজিদ রয়েছে। এটি ১৯৩৩ সালে নির্মাণ করা হয়।

কিছু কথা:

প্রাচীন চাটগাঁ থেকে বর্তমান চট্টগ্রামে রূপ নেওয়ার পথে এখানে আগমন ঘটেছে বেশ কয়েকজন আউলিয়ার। উপরে উল্লিখিত মাজার ছাড়াও চট্টগ্রামে আরো বেশ কিছু মাজার ও আউলিয়াদের সমসাময়িক কিছু কীর্তি রয়েছে, যা একটি ফিচারে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যদি কখনো সম্ভব হয় তবে বারো আউলিয়া প্রসঙ্গে জড়িত আরো কিছু স্থানের বর্ণনা নিয়ে ফিরে আসব। তাঁর আগে হাইপার লিংকে গিয়ে জেনে নিতে পারেন উল্লিখিত সকল স্থানের আদ্যোপান্ত।
Feature Image: Bangla News 24

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অভাবনীয় সুন্দর আগ্রা দুর্গ থেকে অপূর্ব তাজ দর্শন

নোয়াখালী-সোনাইমুড়ী-সেনবাগ-দাগনভূঁইয়ায় একদিনের ঘোরাঘুরি