এক নজরে একটি জেলা: প্রাচীন জনপদের শহর যশোর

বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন স্থানের নাম যশোর। যশোর নামটিও অতি পুরনো, তাই এই নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিবিধ মতামত রয়েছে। তার মধ্যে একটিতে বলা হয়, যশোর একটি আরবি শব্দ যার অর্থ সাঁকো। যখন খানজাহান আলী বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে ভৈরব নদী পার হয়ে মুড়লিতে আগমন করেন, তখন এই বাঁশের সাঁকো থেকেই যশোর নামের উৎপত্তি হয়।
সমতটের প্রাচীন জনপদের বসতিস্থল এই যশোরে রয়েছে, অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। তার মধ্যে থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাথে এখন আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

১. এগারো শিব মন্দির

শিব মন্দির; Source: অমিতাভ অরণ্য

এটি যশোরের অভয়নগরে অবস্থিত একটি অন্যতম পুরাকীর্তি। এখানে এগারোটি শিব মন্দির রয়েছে, যা রাজা নীলকণ্ঠ রায় তাঁর মেয়ে অভয়ার জন্য নির্মাণ করেছিলেন। বাংলাদেশের আর কোথাও একই স্থানে এতগুলো শিব মন্দির নেই।

২. পৌর পার্ক

পৌর পার্ক যশোরের মূল শহরে অবস্থিত একটি জনপ্রিয় পার্ক। এখানে নারকেল গাছ বেষ্টিত দুটি বড় বড় পুকুর রয়েছে, যা দূর থেকে লেকের মতো মনে হয়। এই পুকুর দুটিকে নিয়ে জনশ্রুতি আছে, কেউ এই পুকুর সাঁতরে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে পারে না। তবে তা কতটুকু সত্য, এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

৩. কেশবপুরের হনুমান গ্রাম

কালো মুখ হনুমান; Source: banglatribune.com

প্রায় কয়েক’শ বছর যাবৎ কেশবপুর সদর উপজেলা ও তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিছু ভবঘুরে হনুমানের বসবাস রয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই হনুমান প্রজাতিটি এক সময় ‘গ্রেট মানকি’ নামে খ্যাত ছিল। বিলুপ্ত প্রায় এই প্রজাতিটি কালোমুখ হনুমান বা মুখ পোড়া হনুমান নামে সর্বাধিক পরিচিত।
জানা যায়, বর্তমানে এখানে প্রায় ৪০০টি মুখ পোড়া হনুমানের বাস। কেশবপুর বাজারের সাহাপাড়া, পশু হাসপাতাল, উপজেলা অফিস, শ্রীগঞ্জ বাজার, ব্রহ্মকাঠি, রামচন্দ্রপুর প্রভৃতি এলাকা এই হনুমানদের বিচরণক্ষেত্র।

৪. দম দম পীরের ডিবি

দম দম পীরের ডিবি; Source: jessore.gov.bd

মাটির নিচে থাকা এই পুরাকীর্তিটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা মতে, এটি প্রায় তেরো-চৌদ্দ’শ বছরের প্রাচীন একটি স্থাপনা, যা মহাস্থান গড়ের সমসাময়িক। মাটি খুঁড়ে এই ডিবিতে পাওয়া গেছে বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম এই তিন সভ্যতার নিদর্শন। এটি মনিরামপুর উপজেলার ডোগাগাতি ইউনিয়নের সোনার গ্রাম নামক স্থানে অবস্থিত।

৫. খড়িঞ্চা বাঁওড়

যশোর থেকে চৌগাছা হয়ে ধুলিয়ানীর দিকে ৪ কি.মি. গেলেই পৌঁছে যাবেন খড়িঞ্চা বাঁওড়ে। ২১৭ হেক্টর জমির উপর অবস্থিত এই হাওড়ে শীতকালে গেলে পাওয়া যায় বিচিত্র সব অতিথি পাখির দেখা। এছাড়াও এর নির্মল জলরাশি আপনাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে তুলবে। এটি মূলত মাছ চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়।

৬. পানিগ্রাম রিসোর্ট

তিন পাশে নদী বেষ্টিত এই রিসোর্টটি চৌগাছার এক প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত। এটি একটি বিশ্বমানের ইকো রিসোর্ট। পানি আর সবুজের স্বাদ এক সাথে উপভোগ করতে চাইলে যেতে পারেন পানিগ্রাম রিসোর্টে।

৭. গদখালীর ফুলের বাগান

ফুল গাছে কিটনাশক ছড়ানোর সময়; Source: Rahul Banik

গদখালী বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের সব থেকে বড় ফুলের বাজার। গদখালী বাজারে আসা ফুলগুলো গদখালী সহ ৯০টি গ্রামের প্রায় ৪ হাজার বিঘা জমিতে চাষ করা হয়। এই গ্রামগুলো ঝিকরগাছা ও শার্শা থানার অন্তর্গত, যা যশোর থেকে প্রায় ২৫ কি: মিঃ দূরে অবস্থিত। গ্রামগুলোর রাস্তার দুইপাশে দিগন্তবিস্তৃত জমিতে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি আর সাদা রঙের ফুলের সমাহার দেখে মন্ত্রমুগ্ধের মতO তাকিয়ে থাকতে হয়। এখানে প্রায় একশ ধরনের ফুলের চাষ হয়।

৮. শেখপুরা জামে মসজিদ

যশোরের একটি অন্যতম পুরাকীর্তি শেখপুরা জামে মসজিদ, যা  ১৯৯৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি মোগল স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত একটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। এটি সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের শেখপুরা গ্রামে অবস্থিত।

৯. ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি

ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি; Source: Jessore.Info

ধীরাজ ভট্টাচার্য পেশায় প্রথমে একজন পুলিশ ছিলেন। এই সময় তিনি মাথিন নামক এক রাখাইন তরুনীর প্রেমে পড়েন। তাঁর এই প্রেম আজ এক কালজয়ী প্রেম হিসেবে স্বীকৃত। তিনি তাঁর এই প্রেম কাহিনী নিয়ে একটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘যখন পুলিশ ছিলাম’।
ধীরাজ ভট্টাচার্য এক সময় পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলচ্চিত্রে যোগদান করেন। তখনকার কাহিনী নিয়ে তিনি আরো একটি উপন্যাস  রচনা করেন, যার নাম ছিল ‘যখন নায়ক ছিলাম’। এই প্রেমিক পুরুষ, চলচ্চিত্র নক্ষত্র এবং লেখক ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়ি কেশবপুরের পাঁজিয়া গ্রামে অবস্থিত।

আরো কিছু:

১০. কালুডাঙ্গা মন্দির- আনুমানিক ৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দির কালুডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত হওয়ায় এর নাম কালুডাঙ্গা মন্দির।
১১. যশোর বধ্যভূমি- যশোর শহরের শঙ্করপূরে অবস্থিত এই বধ্যভূমি থেকে ১৯৯২ সালে কয়েক ট্রাক কঙ্কাল সরানো হয়। বর্তমানে এখানে একটি স্মৃতি স্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছে।
১২. যশোর বোট ক্লাব- ক্যান্টনমেন্ট ও এয়ারপোর্ট সংলগ্ন এই বোট ক্লাবে রয়েছে ১৭ জন বীর সেনানীর সমাধি ও বিনোদনমূলক কিছু আয়োজন।
১৩. বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক- এটি সেনানিবাসের সানতলা এলাকায় অবস্থিত একটি পার্ক। এখানে কৃত্রিম ঝর্ণা, শিশু পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা সহ রয়েছে বিনোদনের নানা আয়োজন।
১৪. তুলা বীজ বর্ধন খামার- এটি চৌগাছার জগদীশপুরে অবস্থিত একটি তুলা গবেষণা কেন্দ্র, যা বাংলাদেশ সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
১৫. খান জাহান আলী জামে মসজিদ- এটি অভয়নগর উপজেলার ধুলগ্রাম নামক স্থানে অবস্থিত। এটি শুভরাঢ়া মসজিদ নামেও পরিচিত।
১৬. কায়েম কোনা মসজিদ- এটি ঝিকরগাছা উপজেলায় অবস্থিত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।
১৭. গদাধরপুর বাঁওড়- এটি চৌগাছা উপজেলার সদর হতে ৮ কি.মি দূরে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তে অবস্থিত।
১৮. লাল দীঘি- এটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো দীঘি, যা যশোর পৌরসভার প্রাক্কালে কাটা হয়। এটি কালেক্টরেট পার্কের কাছেই অবস্থিত।
১৯. বেনাপোল স্থল বন্দর- বেনাপোল স্থল বন্দর বাংলাদেশের সব থেকে বড় স্থল বন্দর। এটি যশোর জেলার শর্শা উপজেলার বেনাপোল গ্রামে অবস্থিত।
Feature Image: Amitav Aronnno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খুলনার দক্ষিণডিহি: ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির পথে

স্বল্প খরচে ভ্রমণের জন্য সেরা দশটি গন্তব্য